24/11/2025
হঠাৎ করে বদলে যাওয়া মানুষগুলো কেমন হয়? মেয়েটির প্রশ্নে আমি থমকে গিয়েছিলাম, কিন্তু তাকে বুঝতে দেইনি আমি এই কথার অর্থ বুঝতে পারিনি। তাই তাকে বলতে লাগলাম, হঠাৎ করে বদলে যাওয়া মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য তার জন্মের সময় একটি হৃদয় থাকে আর বদলে যাওয়ার সাথে সাথে তার আরেকটি হৃদয় তৈরি হয়, তখন মানুষটি দুটি হৃদয়ের অধিকার সম্পন্ন বদলে যাওয়া মানুষ হয়। কিংবা তার মাথায় শিং গোজায় বা শরীরের সমস্ত অংগ সমুহ এক থেকে দুই, দুই থেকে চার হয়ে যায়। কিন্তু তা অবশ্যই অদৃশ্যমান এবং এমন বদলানোর সুখ সেই মানুষটি ছাড়া অন্য কেউ উপভোগ কিংবা অনুভব করতে পারেনা। তাইতো মানুষ হঠাৎ করে বদলে যায়।
মেয়েটি আমার কথা শুনে উচ্চস্বরে হেসে উঠলো, তার হাসির কারনটাও আমার অজানা। তার মায়াবী হাসিতে কি প্রমান করতে চেয়েছিলো, তা আমার ছোট মাথায় খেলে না। তার হাসি যেন থামানো বড্ড মুশকিল একটি ব্যাপার সে হাসছে, অনর্গল সে হেসে যাচ্ছে, হাসতে হাসতে তার মায়াবী চোখের কাজল মুছে দিয়ে পানির ধারা বইতে লাগলো। তারপরেও সে হেসে যাচ্ছে, সেই চোখের পানি রৌদ্রের উত্তপ্ত ঝলকানি, আর পুবের বাউলা হাওয়ায় শুকিয়ে গেলো তবুও সে হেসে যাচ্ছে। হাসতে হাসতে, চোখের পানিতে মসৃণ গালে এক আবছা কালো রংয়ের রেশ পড়ে গেছে, তার অপুর্ব কাজলনয়ন ভিজে ছ্যাত ছ্যাত হয়ে গেছে, তারপরেও সে হাসছে।
আমি অধম শুধু তার কষ্টলুকানোর এক সুষ্ঠুগঠন ভাবে তৈরিকৃত হাসির নাটক দেখছিলাম। সে আমার কথায় হয়ত আনন্দিত কিংবা দুঃখিত তা সে ছাড়া কেউ বুঝতে পারবে না তাই সে হাসছে। যে হাসতে হাসতেই প্রচন্ড কাশি শুরু হলো, প্রতিটি কাশির সাথে রক্তের ছেটা বের হয়ে আসতে লাগলো, আমি ঘাবড়ে গেলাম, ভয় পেয়ে আই সি ইউ কেবিন থেকে বের হয়ে ডাক্তারকে ডাক দিলাম। আমি তার পাশে বসা ছিলাম, আমার হাত তার হাতের উপর ছিলো, সে আমার হাতকে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে ধরে রেখেছিলো। যেন কোনভাবেই এই হাত না ছুটে, কিন্তু ডাক্তারের চিকিৎসা শেষ হবার আগেই তার নিশ্বাস থেমে গেলো। বুকের মাঝে যে হৃদয় রয়েছে তা থমকে গেলো, এই হৃদয় আর কোনদিন স্পন্দন তুলবে না। তার মনেতে আর কোনদিন আজগুবি প্রশ্ন উঠবে না, আর কখনো আমাকে আজব কথা বলে মাথা ঘুরিয়ে দিবেনা। আর কখনো হাসতে হাসতে তার মায়াবী কাজলনয়ন থেকে অশ্রুকণা ঝরে মসৃন গালে কালো রেশ ফেলবে না। কোন কথা না বলে তার হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে বের হয়ে আসলাম কেবিন থেকে। তার পছন্দের জায়গা পায়রানদীর তীর ঘেষে শহুরে কোলাহল মুক্ত নির্জলা বাড়ির পাশের বকুল তলায় গিয়ে বসলাম, সেই বকুল তলায় আজো যেন তার হাসি বাতাসের ন্যায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, কখন যেন তার কথা ভাবতেই দুচোখের পানি ঝরে পড়লো বকুল তলার মাটির উপর।
আজ থেকে ৫ বছর আগে......
সবে মাত্র কলেজে উঠেছে রায়হান, খুব গম্ভীর প্রকৃতির বালক, কারো সাথে তেমন কথা বলে না, একা চলা টাই তার সবচেয়ে প্রিয়। প্রিয় না হবার কোন কারন নেই। বাবা মা হীন ছেলে হাজারো মানুষের অবহেলা অপমান সয়ে আজ সে নীরব শ্রোতা হয়েছে। এতিম খানা থেকেই তার পড়ালেখা, সেখান থেকে ভালো ফলাফল করে ঢাকার একটি কলেজ এ চান্স পেয়েছে। মাহিনুর এর সাথে তার পরিচয় কলেজের প্রথম দিনেই। কিন্তু রায়হান কখনো নিজ থেকে কথা বলতে যেত না। আজ কলেজে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এর আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে রায়হান নিজ লেখা একটি কবিতা উপস্থাপন করবে, স্টেজে উঠে সে কবিতা বলতে লাগলো।
ছল ছল বাকা নয়নে, যাই যদি হারিয়ে,
খুজবে কি আমায় তোমার নয়ন জ্বলে?
এলোমেলো কেশের বাউতে যাই যদি হারিয়ে,
খুজবে কি আমায়, কেশ দোলনার সাথে?
মিষ্টভাষী কোয়েল সুরে, যাই যদি হারিয়ে,
খুজবে কি আমায় তোমার মধুর ধ্বনির মাঝে?
নির্জন পথে, তোমার পদতলি দেখে যদি হারিয়ে যাই বৃন্দাবনে,
খুজবে কি আমায়, পদরেখার মাঝে?
বসন্ত বাতাসে, নদীর জোয়ারে, দক্ষিনা বাতাসের লগনে,
তোমায় দেখে দেখে যদি হারিয়ে যাই সুখ কেনা বেচার হাটে,
খুজবে কি আমায় তোমার ভালোবাসার মাঝে?
হারিয়ে যেতে নেই মানা, যদি তুমি খুঁজো,
এক জীবনপথে সংগী যদি থাকো।
মিলন হবে, প্রেম হবে, হবে বাচা মরন।
হাজার কিংবা লক্ষ কোটি হারাবো তোমার মাঝে,
একবার শুধু খুজবে তুমি আপনমন ভরে।
রায়হানের কবিতা শেষ হবার পর মঞ্চ থেকে নেমে যেতে লাগলো, তার পাশে মাহিনুর এসে বলতে লাগলো, এত ভালো লিখতে পারেন তাই বুঝি এত ভাব নিয়ে চলেন?
০- এমনটা কিছু নয়, নীরব শ্রোতা হয়ে থাকতে ভালোবাসি।
-- নীরব শ্রোতারা কি বন্ধুত্ব করতে পারেনা?
০- হয়ত এতিম হবার যন্ত্রনা বুকে পোষা তাই কারো যোগ্য না।
-- এতিম তো আমিও, তারপরেও কি যোগ্য হবোনা।
মাহিনুর এর কথা শুনে রায়হান তার পানে ঘুরে তাকালো, নীলচে রংয়ের শাড়ী, চোখে লম্বা করে টেনে দেওয়া কাজলনয়ন এ যেন এক মায়াবী পরী দাঁড়িয়ে আছে, রায়হানের মুখে কোন কথা নেই। মাহিনুর এর কন্ঠেও কোন শব্দ নেই, একজন আরেকজনের নীরবতার মাঝেই তৈরি হলো, দুই এতিমের এক না ছেড়া বাধনে বাধা বন্ধুত্ব।
।
আজকের দিনে বন্ধুত্বের ৫ বছর পরে
।
যে মেয়েটির লাশ পড়ে রয়েছে মর্গে, সে একজন ধর্ষিতা মেয়ে, নীরব রাস্তা দিয়ে একাকী ভাবে বাসায় ফেরার অপরাধে স্বাধীন বাংলাদেশের কিছু স্বাধীন মানুষ, তাকে একের পর এক স্বাধীন ভাবে ধর্ষন করেছে। যেহেতু স্বাধীন দেশ, আর সে এক এতিম মেয়ে তাহলে এর বিচার নাইবা হোক। এমন কত খুন, ধর্ষন নীরবে ধামাচাপা পড়ে রয়েছে মাহিনুরেরটাও থাকবে, এতে আর কি সমস্যা। ধর্ষনের পরে তাকে নির্মমভাবে ছুড়ি চালিয়ে তার বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টার পরেও বেচে যায় কিন্তু সে বাঁচবে না বলে পণ নিয়েছে তাই তাকে বাচানো গেলোনা।।
।
এসব মানুষগুলো সত্যি হঠাৎ করে জানোয়ার হয়ে উঠে, হঠাৎ করে বদলে যায়, তাহলে আমার বর্ণনা ঠিক ছিলো, তাদের মাথায় শিং গোজায়। শরীরের অংগ সমুহ দ্বিগুন হয়ে যায়, হৃদয় দুটো হয়, এক হৃদয় পরিবার পরিজনের জন্য ভালোবাসার মিথ্যে নাটক, আর এক হৃদয়ে শুধু হিংস্রতা, ঘৃনা আর দেহলোভি এক নরপশু। কিন্তু তা সম্পুর্ন অদৃশ্যমান।
একটি ছেলে বদলে যায় কোন কারন ছাড়াই, একটি মেয়েও বদলে যায় কারন ছাড়া, এসব বলদে যাওয়ার খেলা অনেক ভয়ংকর হয়। মারাত্মক চিন্তাধারা তাদের, কখনো প্রতারনা, কখনো ব্লাকমেইল, কখনো খুন, কখনো ভালোবাসার মিথ্যে নাটকে তারা নোবেল প্রাপ্ত এক একজন অভিনেতা হয়ে উঠে।
কি সাংঘাতিক বেপার, কাটা গাথিলে বেথা পাবে বলে বলে পিছন দিক দিয়ে রাম দা ঢুকিয়ে দেয়। এভাবেই বদলে যাওয়ার খেলা চলছে অবিরত। বন্ধু বদলে যায়, প্রেমের মানুষ বদলে যায় বদলে যায় জীবন ধারা, বদলে যায় শরীরের গঠন, বদলে যায় চাওয়া পাওয়ার খেলা।
আমি কিন্তু বদলিয়েছি, আজকাল পাথরের গায়ে বদলে যাওয়া মানুষের প্রতিচ্ছবি আকি, কলমের কালিতে বদলে যাওয়া মানুষের বৈশিষ্ট্য লিখি, তৈরি করি একটি বদলে যাওয়া মানুষের চরিত্রায়ন। কেউ বদলে গেলে সর্বনাশ কেউ বদলে গেলে জীবন নাশ। মানুষটি বদলে গেছে কথার মাঝে রয়েছে হাজারো ইতিহাস, হাজারো বেদনা, হাজারো আকুতি, হাজারো চাওয়া পাওয়ার বিসর্জন। প্রতিটি গল্পই একজন মানুষের বদলে যাওয়া চরিত্র, শুধু জায়গা, নাম, আর ধরন গরন আলাদা।
।
লেখা: Tashriq Intehab