26/09/2026
১
ছোটবেলার ঈদের কথা একবার মনে করুন। নতুন জামা কেনা হয়েছে সাত দিন আগে, কিন্তু পরা যাবে না। আলমারির কোণে লুকিয়ে রাখা, যাতে ঈদের আগে কেউ দেখে না ফেলে। দিনে তিনবার খুলে দেখা, ভাঁজ খুলে গন্ধ নেওয়া, তারপর আবার যত্ন করে রেখে দেওয়া। চাঁদরাতে উত্তেজনায় ঘুম আসে না।
তারপর ঈদের দিন, বিকেল তিনটা। জামাটা গায়েই আছে, সকাল থেকে ঘোরাঘুরিও কম হয়নি। সেই উত্তেজনাটা কি একই আছে? যে জামার জন্য সাত দিন এতো অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, সেটা এখন শুধুই একটা জামা।
বড় হয়ে জামার জায়গা হয়তো নিয়েছে অনলাইন অর্ডার। "Order confirmed", তারপর তিন দিনের অপেক্ষা। রাইডারের ফোন এলে বুকের ভেতর ছোট্ট একটা লাফ। অথচ প্যাকেট খোলার দশ মিনিট পর জিনিসটা টেবিলে পড়ে থাকে, আর আপনার আঙুল ততক্ষণে পরের জিনিসটা খুঁজতে শুরু করেছে।
প্রশ্নটা তাই খুব সহজ। পাওয়ার পরেই কেন ফাঁকা লাগে?
২
নব্বইয়ের দশকে বিজ্ঞানী উলফ্রাম শ্যুলজ বানরের মস্তিষ্কের ডোপামিন কোষ নিয়ে একটি পরীক্ষা করেন। পরীক্ষাটি বেশ সাধারণ - প্রথমে একটি সংকেত দেওয়া হতো, আর কয়েক সেকেন্ড পর বানরের মুখে পড়ত এক ফোঁটা ফলের রস।
শুরুর দিকে হঠাৎ করে ফলের রস পেলেই বানরের মস্তিষ্কের ডোপামিন নিউরনে তীব্র activity দেখা যেত। কিন্তু বানরটি যখন বুঝে গেল যে সংকেত দেখলেই রস আসবে, তখন ঘটল মূল ঘটনা। ডোপামিনের সেই ঝলক রস পাওয়ার মুহূর্ত থেকে সরে গিয়ে সংকেত দেখার মুহূর্তেই দেখা দিতে শুরু করল।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো - যেদিন সংকেত দেওয়া হলো কিন্তু রস এল না, ঠিক যে সময় রস আসার কথা, তখন ডোপামিন নিউরনের activity স্বাভাবিকের চেয়েও নিচে নেমে গেল।
অর্থাৎ, মস্তিষ্ক শুধু কী পেল তার হিসাব রাখে না। সে হিসাব মেলায় - যা আশা করেছিলাম, তার তুলনায় আসলে কী পেলাম।
এ কারণেই ডোপামিনের ভূমিকা শুধু কোনো কিছু পাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; কোনো পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা ও তার পূর্বাভাসের সঙ্গেও এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। তাই কোনো কিছু হাতে পাওয়ার আগেই তার দিকে আমাদের তীব্র টান তৈরি হতে পারে - কারণ মস্তিষ্ক শুধু প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়া জানায় না, প্রাপ্তির প্রত্যাশাকেও গুরুত্ব দেয়।
৩
আরেক বিজ্ঞানী কেন্ট বেরিজ ইঁদুরের মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা কমিয়ে বিষয়টি আরও পরিষ্কার করেন। দেখা যায়, এতে ইঁদুরের নিজে থেকে খাবার খোঁজার আগ্রহ কমে যায়, কিন্তু মুখে খাবার দিলে তৃপ্তির অনুভূতি অক্ষত থাকে। অর্থাৎ, কোনো কিছুর পেছনে ছোটার তাড়না আর পাওয়ার পর ভালো লাগা - মস্তিষ্কে এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা ব্যবস্থা। ডোপামিন আনন্দ দেয় না, এটি কেবল 'চাওয়ার' তাড়না তৈরি করে। এ কারণেই আমরা কোনো কিছুর জন্য যতটা তীব্রভাবে ছুটি, পাওয়ার পর তার আনন্দ ততটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
৪
এর ফলে দূরের যেকোনো অপ্রাপ্তির ওপর আকাঙ্ক্ষার একটা আলো জ্বলে ওঠে। জিনিসটা হাতে এলেই সেই আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যায়, আর মন চলে যায় নতুন কোনো দূরত্বের দিকে - নতুন ফোন, পরের পদোন্নতি, কিংবা পরের ভিডিও।
সমস্যাটা চাওয়ার মধ্যে নয়। চাওয়া আমাদের বেঁচে থাকারই অংশ। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন চাওয়ার তাড়নাকেই আমরা প্রাপ্তির আনন্দ বলে ভুল করি।
হয়তো এখানে দুটি আলোর কথা ভাবা যায়। একটি আকাঙ্ক্ষার আলো - যা কোনো অপ্রাপ্তির দিকে আমাদের টেনে নেয়। আরেকটি মনোযোগের আলো - যা আমরা সচেতনভাবে বর্তমানের কোনো কিছুর ওপর ফেলতে পারি।
তৃপ্ত মানুষ হয়তো এমন মানুষ নয় যে কিছুই চায় না। বরং সে এমন একজন, যে চাওয়ার পরও নিজের মনোযোগকে শুধু পরের জিনিসের দিকে ছুটতে দেয় না। যা ইতিমধ্যে তার হাতে এসেছে, সেটাকেও সে দেখতে শেখে।
৫
মানুষের এই অন্তহীন চাওয়ার প্রবণতাকে রাসূলুল্লাহ (সা.) একটি গভীর উপমায় বলেছেন: আদম সন্তানের যদি এক উপত্যকা পরিমাণ সোনা থাকে, সে আরেকটি উপত্যকা চাইবে। তার মুখ মাটি ছাড়া আর কিছুই ভরাবে না। [সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম]
একটার পর একটা অপ্রাপ্তির পেছনে ছুটতে ছুটতে জীবন কেটে যেতে পারে। অথচ কখনো কখনো আমাদের প্রয়োজন নতুন কিছু পাওয়া নয় - ইতিমধ্যে পাওয়া জিনিসটির দিকে নতুন করে তাকানো।
একসময় খুব করে চেয়েছিলেন, অথচ এখন সেটিই আপনার কাছে আছে - এমন কোনো কিছুর দিকে আজ আরেকবার তাকান।
দেখুন, এবার আকাঙ্ক্ষার আলো নয়।
মনোযোগের আলো দিয়ে সেটাকে দেখুন।
---
Tahsin Kamal
Founder, Attention Mastery Club