05/01/2026
আমেরিকার বিস্তীর্ণ ভূমিতে, টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থ থেকে ওয়াশিংটন ডি.সি. পর্যন্ত প্রায় ২,৩০০ মাইলের এক দীর্ঘ পথচলা শুরু হয়েছে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে। এই যাত্রার নাম ‘ওয়াক ফর পিস’—শান্তির জন্য পদযাত্রা। প্রায় ২৪ জন বৌদ্ধ ভিক্ষু, তাদের সঙ্গে একটি উদ্ধারকৃত কুকুর আলোকা, এই কঠিন পথে হেঁটে চলেছেন শান্তি, করুণা, ভালোবাসা এবং সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে। তারা হুওং দাও ভিপাসনা ভাবনা সেন্টার থেকে যাত্রা শুরু করেন, এবং এই পিলগ্রিমেজ ১২০ দিনের মতো চলবে, ১০টি রাজ্য অতিক্রম করে।এই যাত্রা শুধু শারীরিক কষ্টের নয়, বরং আধ্যাত্মিক সাধনার এক অনন্য উদাহরণ। ভিক্ষুরা প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসরণ করে দিনে মাত্র একবেলা আহার গ্রহণ করেন, খোলা আকাশের নীচে ঘুমান এবং ধ্যান ও প্রার্থনায় নিমগ্ন থাকেন। পথে তারা বিভিন্ন শহর, গ্রাম এবং সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে মিলিত হন, ধ্যানের শিক্ষা দেন এবং শান্তির বার্তা ভাগ করে নেন। হাজার হাজার মানুষ তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় অনুসরণ করছেন, এবং পথে পথে স্থানীয়রা তাদের স্বাগত জানাচ্ছেন ফুল, খাবার এবং আশীর্বাদ নিয়ে।
কিন্তু এই শান্তির যাত্রা কষ্টহীন ছিল না। ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর, টেক্সাসের ডেটন শহরের কাছে ইউএস হাইওয়ে ৯০-এ এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। ভিক্ষুরা রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে চলছিলেন, তাদের পিছনে একটি এসকর্ট গাড়ি হ্যাজার্ড লাইট জ্বালিয়ে ধীরে ধীরে চলছিল। হঠাৎ একটি পিকআপ ট্রাক গাড়িটিকে পিছন থেকে ধাক্কা দেয়, যার ফলে গাড়িটি ভিক্ষুদের দিকে ঠেলে দেয়। এতে দু'জন ভিক্ষু আহত হন—একজন গুরুতর। শ্রদ্ধেয় ভিক্ষু ফ্রা আজার্ন মহা দাম ফোম্মাসান (ভান্তে দাম ফোম্মাসান নামেও পরিচিত) হেলিকপ্টারে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁর পায়ে এতটাই গুরুতর আঘাত লাগে যে ডিসেম্বর মাসে তাঁর একটি পা কেটে ফেলতে হয়।
এই দুর্ঘটনা সত্ত্বেও ভিক্ষু মহা দামের মনে কোনো ক্রোধ বা ক্ষোভ জাগেনি। বরং তিনি চালকের প্রতি করুণা ও ক্ষমা প্রকাশ করেন। WSB-TV-এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “শান্তি, ভালোবাসা, আশা, করুণা, সম্প্রীতি ও দয়ার বার্তা ছড়িয়ে দিতে যদি একটি পা হারানোও লাগে, তবে সেই ত্যাগ আমি আনন্দের সঙ্গেই গ্রহণ করি।” তিনি আরও বলেন যে এই দুর্ঘটনা তাঁর মৃত্যুর ভয় জাগিয়েছিল, কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা অনুসারে তিনি সবকিছু স্বীকার করে নিয়েছেন। এমনকি তিনি বলেন, আমি আমার জীবনও দিতে প্রস্তুত ছিলাম এই শান্তির যাত্রার জন্য।এই ঘটনার পর থেকে যাত্রাটি আরও বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দুর্ঘটনার পর পুলিশের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। বিভিন্ন শহরের পুলিশ বিভাগ ভিক্ষুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসকর্ট দেয়, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের পথ দেখায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শুরু থেকে, বিশেষ করে জর্জিয়া এবং অন্যান্য রাজ্যে, পুলিশ কর্মকর্তারা ভিক্ষুদের প্রতি সম্মান ও সংহতির নিদর্শন হিসেবে তাদের হাতে অফিসিয়াল পিন এবং ব্যাজ তুলে দিতে শুরু করেন। এগুলো শান্তি ও করুণার বার্তার প্রতি তাদের সমর্থনের প্রতীক হয়ে ওঠে। শ্রদ্ধেয় ভিক্ষু পান্নাকার (ভেনারেবল ভিক্ষু পান্নাকারা), গর্বের সঙ্গে তাঁর রোবে এই সব পিন ও ব্যাজ পরেন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, “যেসব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তা আমাদের সুরক্ষা দিয়েছেন, পথ দেখিয়েছেন এবং যে আন্তরিকতা ও দয়া প্রদর্শন করেছেন—আপনাদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ।” এই সমর্থন ভিক্ষুদের যাত্রাকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।
যাত্রাটি এখনও চলছে। ভিক্ষু মহা দাম হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে জর্জিয়ায় ফিরে এসেছেন এবং স্নেলভিলে তাঁর মন্দিরে দলের সাথে পুনর্মিলন হয়েছে। তিনি হাঁটতে পারছেন না, কিন্তু তাঁর আত্মা যাত্রার সাথে রয়েছে। এই যাত্রা শুধু একটি পদযাত্রা নয়—এটি করুণা, ক্ষমা এবং অহিংসার এক জ্বলন্ত উদাহরণ। একটি পা হারানোর পরও শান্তির বার্তা অটুট রয়েছে, এবং পুলিশের সমর্থন এই বার্তাকে আরও বিস্তৃত করেছে। এই হৃদয়স্পর্শী ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের শান্তি বাইরে নয়, আমাদের অন্তরে। যদি আমরা সকলে একসাথে করুণা ও দয়া ছড়াই, তবে বিশ্ব শান্তিময় হয়ে উঠবে।এই যাত্রা ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ওয়াশিংটন ডি.সি.-তে শেষ হবে, যেখানে তারা একটি শান্তি সমাবেশ করবেন। ততদিন পর্যন্ত, এই ভিক্ষুদের পদক্ষেপ আমাদের সকলকে অনুপ্রাণিত করুক-এস বি তুহিন চৌধুরী।