06/08/2025
মিথিলা, আমার মা
মিথিলা, আমার মা,
খেটে খাওয়া বিশ্বাসগুলো পুঁজি করে
কংক্রিটের শরীর নিয়ে মা পথচলে
পাশে পড়ে আছে স্বপ্নের কবর।
পর্বতের মত সুউচ্চ বুক, কঙ্কালসার তনু,
গর্ভশূণ্য প্রসবণে খাঁখাঁ পোড়া মরুভূমি
উপেক্ষার বৈষম্য নিয়ে নিঃস্ব নদীপার,
তবুও গ্রন্থিত স্বপ্নের মহাকাশ।
অস্পৃহমান কালো ছায়ার ভেতরে
জন্মান্ধ আমি, ধানের শীষে কুয়াশার মুক্তোদানা
আমার দেখা হয়নি,
দেখা হয়নি নিদ্রাভাঙ্গা দুচোখে যমুনার জল।
মিথিলা, আমার মা,
ক্ষুধার্ত শিরায় যোনিফাটা রক্তের চিৎকার
চন্দনের বনে প্রেতাত্মার ছায়া,
গোলাপ জবাই হচ্ছে করাতের দানায়
তবুও তুমি উৎকৃষ্ট, মহাপ্রাণ কালেশ্বরী।
মিথিলা, আমার মা,
আমার চোখে তুমি রক্তমাখা এক মানচিত্র
পতাকার মত শাড়ির ভাঁজে উইপোকার দখলদারি
এবং নাভিশ্বাসের ব্লেডেকাটা ইতিহাসের ঋতুপরিক্রমা।
বিগত আগুণের ক্ষেতমৌসুমে জলবর্ষের প্রার্থনা
তবুও অন্ধকার খেয়ে ফেলেছে সবটুকু,
এমনকি একরত্তি বাঁকাচাঁদও।
মিথিলা, আমার মা,
আদি স্তব্ধতার স্তন্যদাত্রী,
যার নিঃশ্বাসে উড়ে আসে মাটিরগন্ধে মিশেথাকা
আমার আত্মপরিচয়।
ধলেশ্বরীতে মাঝিরা শুনেছিলো আমার জন্মকান্না
সাক্ষী দিয়েছিলো ভোরের আজান,
কিন্তু আজানের প্রতিটি শব্দে ছিলো বুলেটের ঘ্রাণ!
ঘুমভাঙা গ্রাম, জন্মে, রক্তে, এবং প্রতিজ্ঞায়
তার আঁচলে বাঁধা ছিল যুদ্ধ,
মাটির ফাঁকে জেগেওঠা এক অদৃশ্য পতাকা।
মিথিলা, আমার মা,
তিপ্পান্ন বছরের এই আমি যখন তোমার ছায়ায় দাঁড়াই,
আমার শিরদাঁড়া হয়েওঠে প্রত্নতাত্ত্বিক খণ্ডচিত্র,
রাষ্ট্রের লিঙ্গহীন অবয়ব,
তোমার স্তন আর শিরার তফাৎ অস্তিত্বের মাঝে।
তুমি যখন নিঃশব্দ,
তোমার মৌনতা রক্তধারা ভূকম্প তুলে বঙ্গোপসাগরে।
মা, তুমি ব্যাকরণভাঙা প্রতিবাদের ভাষা,
যেখানে মিথিলা মানে আর শুধু জন্মদাত্রী নয়,
সে নিজেই ভূখণ্ড, সীমান্তচিহ্নহীন এক মহাদেশ।
মিথিলা, আমার মা,
তুমি জেগে থাকলে আমার ইতিহাস বাঁচে,
তুমি ঘুমালে আমি এক পরাধীনতার স্বপ্ন দেখি।
তোমার প্রতিটি শ্বাস আমার স্বাধীনতার গণনা,
তোমার স্তব্ধতা মানেই যুদ্ধের অব্যক্ত নকশা।
তুমি সেলাই করো বিধ্বস্ত সীমান্ত,
পিঁড়িতে বসে শীতের বিকেলগুলোয়
তুমি বুনে দাও আমাদের নাগরিক পরিচয়,
তাঁতের ফাঁকে জড়ানো এক ভাষাহীন সংবিধান।
মিথিলা, আমার মা,
তোমার চোখে ভূ-অক্ষের সংশয় দোলে উঠলে
সেখানে ঘুরতে থাকে জনপদ,
চুলের ফাঁকে জেগেথাকা গ্রাম এবং শহর
যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় রচিত হয় শতাব্দীর নতুন ইতিহাস।