09/07/2026
#আবুজ_পাখির_বায়না
#লেখনীতে_লামিয়া_খান_লামহা
#পর্ব_২৫
⭕কপি করা কঠোর ভাবে নিষেধ 🚫❌
রাত তখন গভীর।
বাইরে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি চলছে।
আকাশে একের পর এক বজ্রপাত হচ্ছে, যেন প্রকৃতিও অস্থির হয়ে উঠেছে।
নিজের ফোনের স্ক্রিনে ভেসে থাকা ছবিটার দিকে কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাজ।
তার চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল।
মুঠো করে ধরল ফোনটা।মাথার ভেতর হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।যে ভালবাসার মানুষটার জন্য সেতার পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়েছে ,, সে ভালোবাসার মানুষটাই নাকি শেষে বিশ্বাসঘাতক বের হলো। সাথী কে ধোঁকা দিবে এইভাবে এটা সে কল্পনা করতে পারে না।
অবশেষে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না তাজ
তাড়াহুড়ো করে গাড়ির চাবি তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আজ সাথী নামের চরিত্রহীন মেয়েকে একটা চরম শিক্ষা দিবে তা আজ।
(প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে প্রথম প্রেম আসে বসন্তের মত,, প্রথম ভালোবাসা হয় সকালের স্নিগ্ধ সূর্যের মতো,,, চকচাকে সোনালী সূর্যের দিকে যেমন অনেকক্ষণ যাবৎ তাকিয়ে থাকা যায় না তেমনি জীবনে প্রথম আসে ভালোবাসার মানুষটাকে চিরকাল নিজের কাছে রাখা যায় না। আমরা বরাবরই প্রথম ভালবাসি ভুল মানুষকে। নিজেদের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসার পরেও যদি সে মানুষটা আমাদের দুঃখ দেয়, প্রতারণা করে, আমাদের ভালো মানুষের সুযোগ নেয় তখন সেটা হয়ে যায় আমাদের কাছে মৃত্যু সম কষ্ট। এই কষ্টের পার বহন করা যে খুবই কষ্টের।))
তাজ কাউকে কিছু না বলে বেড়িয়ে যায় খান বাড়ি থেকে। বাহিরে প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু তার সবকিছু উপেক্ষা করে ছুটলো নিজের প্রিয়সির কাছে। যে প্রিয়সী তাকে চরমভাবে ঠকিয়েছে, প্রতারকনা করেছে তার সাথে। ভালোবাসার নামে ছলনা করেছে এতগুলো দিন, মাস,বছর।। কাজ ভালবাসা অন্ধ হয়ে তা বুঝতে পারেনি।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাজের গাড়ির শব্দ মিলিয়ে গেল ঝড়-বৃষ্টির গর্জনের মাঝে।
---
এদিকে খান বাড়িতে তখন অন্য এক ঝড় নেমে এলো।
তাজ বেরিয়ে যাওয়ার মাত্র কয়েক মিনিট পর রেখা বেগমের ফোন বেজে উঠল।
ফোনটা করেছে রেখা বেগম এর ভাই।
কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কান্নাভেজা কণ্ঠ শোনা গেল।
কথাগুলো শুনে রেখা বেগমের হাত থেকে ফোন প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
— না... না... এটা হতে পারে না...
পরের মুহূর্তেই তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।
তার কান্নার শব্দ শুনে বাড়ির সবাই ছুটে এলো।
কোহিনুর বেগম আঁতকে উঠে বললেন,
— কী হয়েছে রে?
রেখা বেগম কান্নার মাঝেই বলতে লাগলেন,
— মা... আমার মা আর নেই...
কথাটা শুনে পুরো বাড়ি স্তব্ধ হয়ে গেল।
কেউ যেন প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
রেখা বেগম মেঝেতে বসে পড়লেন।
বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগলেন।
— আমি আমার মাকে আর দেখতে পাব না...
অনন্যা বেগম, লিপি বেগম আর সালমা বেগম তাকে জড়িয়ে ধরে সামলানোর চেষ্টা করলেন।
রেজা খান, কবির খান, বেল্লাল খান, জিহাদ খান —সবার মুখ ভার হয়ে গেল।
মায়ের মৃত্যু সংবাদ পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন সংবাদগুলোর একটি।
কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত যে বাড়িতে স্বাভাবিক পরিবেশ ছিল, সেখানে মুহূর্তেই শোকের ছায়া নেমে এলো।
কোহিনুর বেগম নিজেও চোখ মুছলেন।
এদিকে আনিকা, রাহা, হিয়া,, টুম্পা,, রুম্পা, ছোট টিয়ান সবারি মন খারাপ হলো ।
রেখা বেগমকে এমন অসহায় অবস্থায় তারা কখনও দেখেনি।
কিছুক্ষণ পর কবির খান নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,
— আমাদের দ্রুত যশোর যেতে হবে।
রেজা খান মাথা নাড়লেন।
— ঠিক বলেছো ভাইজান।
সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় লাগল না।
খান পরিবারের সবাই একসঙ্গে যশোর যাবে।
প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়া হলো।
তবে সব প্রস্তুতির মাঝেই হঠাৎ ধূসরের মনে প্রশ্ন জাগল।
সে চারপাশে তাকিয়ে বলল,
— বড় ভাই কোথায়?
কথাটা শুনে সবাই থমকে গেল।
ঈশান বলল,
— কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত তো বাড়িতেই ছিল।
রাহা ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকাল।
— আমি তো তাকে গাড়ি নিয়ে যেতে দেখেছি অনেকক্ষণ আগে। হয়তো বাহিরে গিয়েছে।
এই ঝড়-বৃষ্টির রাতে তাজের গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার স্পষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না বাড়ির কেউই। কাউকে কিছু বলেও যায়নি তাজ।
রাজ ফোন বের করে তাজকে কল দিল।
একবার...
দু'বার...
তিনবার...
কিন্তু প্রতিবারই একই উত্তর ভেসে এসেছে—
"The number you are trying to reach is switched off."
ধীরে ধীরে সবার উদ্বেগ বাড়তে লাগল।
এমন সময়ে তাজের ফোন বন্ধ থাকা স্বাভাবিক নয়।
কিন্তু রেখা বেগমের মায়ের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর আর অপেক্ষা করার সুযোগও ছিল না।
শেষমেশ অনেকটা বাধ্য হয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো—
তাজকে ছাড়াই সবাই যশোর যাবে।
রাত গভীর হওয়ার আগেই একের পর এক গাড়ি খান বাড়ির বিশাল গেট পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।
মুহূর্তের মধ্যেই হাসি-কোলাহলে ভরা বাড়িটা অদ্ভুতভাবে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল।
---
বাড়িতে রয়ে গেল শুধু আনিকা আর রাশেদা খালা।
রাশেদা খালা রাতের খাবার খেয়ে যথারীতি নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েছেন।
মহিলার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে।একবার ঘুমিয়ে গেলে পৃথিবী উল্টে গেলেও তার ঘুম ভাঙে না।
বাইরে ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত—কিছুই যেন তার কানে পৌঁছায় না।
---
অন্যদিকে নিজের ঘরের জানালার পাশে বসে ছিল আনিকা। সামনে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে।
জানালার কাঁচ বেয়ে টুপটাপ করে পানির ফোঁটা গড়িয়ে নামছে।ঘরজুড়ে মৃদু হলুদ আলো।
চারপাশে এক গভীর নীরবতা।অনেকদিন পর আজ বাড়িতে সে একা।অন্য কোন দিন হলে হয়তো তার ভয় লাগতো কিন্তু এখন আর তার ভয় লাগে না।
কেউ বকাঝকা করার নেই।
কেউ জোর করে ওষুধ খাওয়ানোর নেই।
কেউ বারবার জিজ্ঞেস করছে না—
"কেমন লাগছে?"
"শরীর খারাপ করছে না তো?"
আজ যেন সবাই থেকে একটু দূরে, শুধুই নিজের সঙ্গে থাকার একটা সুযোগ পেয়েছে।
আনিকা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। আজ তার প্রচন্ড বৃষ্টি বিলাস করতে মন চাইছে। আজ বৃষ্টিতে ভিজবে বৃষ্টির পানিতে মুছে দিবে অতীতের তিক্ত স্মৃতি। চিরদিনের জন্য ভুলে যাবে অতীতের নিজের সাথে হাওয়া ঘটনা।
তার দৃষ্টি গিয়ে থামল আলমারির ভেতরে রাখা একটা প্যাকেটের উপর।
মেরুন রঙের শাড়ি।আনেক দিন আগে কিনেছিল।
কিন্তু কখনো পরা হয়নি।
আঙুলের ডগা দিয়ে শাড়িটার কাপড় ছুঁয়ে দেখল সে।
অদ্ভুত এক ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়ল বুকের ভেতর।
আজ হঠাৎ করেই তার খুব ইচ্ছে হলো—
নিজেকে সাজাতে।
কোনো অনুষ্ঠানের জন্য নয়।
কাউকে দেখানোর জন্যও নয়।
শুধু নিজের জন্য।
অনেকদিন পর নিজের মুখে হাসি দেখার জন্য।
---
ধীরে ধীরে শাড়িটা পরে নিল আনিকা।
গভীর মেরুন রঙটা তার গায়ের রঙের সঙ্গে অপূর্বভাবে মানিয়ে গেল।
তারপর আয়নার সামনে বসে গেল।
খুব যত্ন করে চোখে হালকা কাজল টানল।
ঠোঁটে মৃদু রঙ ছোঁয়াল।
লম্বা চুলগুলো খুলে দিল।
ঘন কালো চুল কোমর ছাড়িয়ে নেমে এলো।
কানে ছোট মুক্তোর দুল।
হাতে কয়েকটা মেরুন কাঁচের চুড়ি।
টুকটুক শব্দ করে চুড়িগুলো নড়ে উঠল।
সবশেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল সে।
এক মুহূর্তের জন্য নিজেই যেন অবাক হয়ে গেল।
এ কি সত্যিই সে?
সেই ভাঙা, ক্লান্ত, হারিয়ে যাওয়া আনিকা?
নাকি বহুদিন আগের প্রাণবন্ত, হাসিখুশি আনিকা?
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
অনেকদিন পর।
---
ঠিক তখনই বাইরে একটা প্রবল বজ্রপাত হলো।
আকাশ কেঁপে উঠল।
আনিকা জানালার দিকে তাকাল।
বৃষ্টি আরও বেড়ে গেছে।
ঝমঝম শব্দে পুরো পৃথিবী ভেসে যাচ্ছে যেন।
হঠাৎ তার খুব ইচ্ছে হলো বৃষ্টি দেখতে।
একদম কাছ থেকে।
অনুভব করতে।
সে ধীরে ধীরে রুমে থেকে বেরিয়ে সাদের দিকে হারা দরলো।ছাদে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে,,,
মুহূর্তেই ঠান্ডা বাতাস এসে মুখে লাগলে।
মেরুন শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ে উঠল।
চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গাল ছুঁয়ে গেল।
আনিকা চোখ বন্ধ করল।
ভেজা মাটির গন্ধ।
বৃষ্টির শব্দ।
শীতল বাতাস।
সব মিলিয়ে যেন এক অদ্ভুত শান্তি।
অনেকদিন ধরে জমে থাকা ভারী অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছে।
সে হাত বাড়িয়ে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির পানি ধরল।
ঠান্ডা পানির স্পর্শে তার মুখে শিশুসুলভ হাসি ফুটে উঠল।
আজ যেন বৃষ্টিটা শুধু আকাশে নয়—
তার মনেও নামছে।
সব কষ্ট ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে।রাতটা যেন শুধুই বৃষ্টির জন্য তৈরি হয়েছিল।
আকাশভরা কালো মেঘ, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি, আর অবিরাম ঝরে পড়া বৃষ্টি—সব মিলিয়ে চারপাশে এক অন্যরকম মায়াবী পরিবেশ।
আজ অনেকদিন পর আনিকার মনটা হালকা লাগছে।
বুকের ভেতর জমে থাকা ভারী পাথরটা যেন একটু একটু করে সরতে শুরু করেছে।
আনিকার খোলা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ে উঠল বাতাসে।দূরে কোথাও বজ্রপাত হলো।
এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে গেল।
আনিকা ছাদের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল।মাথার উপর উন্মুক্ত আকাশ।
চারপাশে শুধু বৃষ্টির শব্দ।
প্রথমে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি এসে তার মুখ ছুঁয়ে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে ভিজতে শুরু করল সে।
মেরুন শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে।
কপালের পাশে লেগে থাকা চুলের গোছা বৃষ্টির পানিতে ভিজে গাল ছুঁয়ে নেমে এসেছে।
কিন্তু আজ সেসব নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই।
আজ অনেকদিন পর সে নিজেকে মুক্ত মনে করছে।
আনিকা দু'হাত ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করল।
বৃষ্টির ঠান্ডা ফোঁটাগুলো মুখে, হাতে, চুলে এসে পড়ছে।
মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতি নিজ হাতে তার সমস্ত কষ্ট ধুয়ে মুছে দিতে চাইছে।
তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
ছোট্ট, শান্ত, প্রশান্ত এক হাসি।
সে ধীরে ধীরে ছাদের এক প্রান্তে গিয়ে দাঁড়াল।
নিচের রাস্তার দিকে তাকাল।
চারপাশ নিস্তব্ধ।
দূরের লাইটগুলো বৃষ্টির পর্দার আড়ালে ঝাপসা হয়ে আছে।
আনমনে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি ধরতে লাগল সে।
তার মনে পড়ল শৈশবের কথা।
কতবার বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়ে বকা খেয়েছে।
কতবার লুকিয়ে ছাদে উঠে এসেছে।
আজও যেন সেই ছোট্ট মেয়েটাই ফিরে এসেছে।
যার সুখের জন্য বড় কোনো কারণ লাগত না।
শুধু এক পশলা বৃষ্টিই যথেষ্ট ছিল।
বৃষ্টির মাঝে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ নিজের অজান্তেই হেসে উঠল আনিকা।
সেই হাসিটা ছিল একদম প্রাণখোলা।
কৃত্রিমতা ছাড়া।
ভান ছাড়া।
শুধু নিখাদ ভালো লাগা।
আজকের এই মুহূর্তে কোনো দুঃখ নেই।
কোনো ভয় নেই।
কোনো চাপ নেই।
শুধু আছে বৃষ্টি, রাত আর নিজের সঙ্গে কাটানো কিছু শান্ত সময়।
আর সেই মুহূর্তে আনিকার মনে হলো—
হয়তো জীবন এখনও তাকে পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি।
হয়তো অন্ধকারের পর সত্যিই কোথাও না কোথাও আলো অপেক্ষা করে থাকে। 🌧️❤️✨বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আনিকা সম্পূর্ণ অন্য এক জগতে হারিয়ে গিয়েছিল।
মেরুন শাড়িটা বৃষ্টির পানিতে ভারী হয়ে উঠেছে।
খোলা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পিঠজুড়ে ছড়িয়ে আছে।
ঠান্ডা বাতাস আর বৃষ্টির ছোঁয়ায় তার মনটা অদ্ভুতভাবে হালকা লাগছে।
অনেকদিন পর সে হাসছে।
মন খুলে হাসছে।
তাই খেয়ালই করেনি—
ছাদের দরজার কাছে একজন মানুষ নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।
অন্ধকারে তার অবয়ব স্পষ্ট নয়।
কিন্তু তার চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে আনিকার উপর।
সেই মানুষটা তাজ।
মাত্র দশ মিনিট আগে বাড়ি ফিরেছে সে।
কিন্তু যেভাবে ফিরেছে, আগে কখনও এমন ফিরেনি।
তার শার্ট ভেজা।
চুল এলোমেলো।
চোখ দুটো লালচে।
মুখভর্তি ক্লান্তি আর ভাঙনের ছাপ।
আজকের রাতটা তার জীবনের সবচেয়ে নির্মম রাতগুলোর একটি।
যে মানুষটাকে সে নিঃশর্ত বিশ্বাস করেছে, বছরের পর বছর ভালোবেসেছে, আজ নিজের চোখে তার অন্য এক রূপ দেখেছে।
একটা হোটেল রুম।
একটা বন্ধ দরজা।
আর দরজার ওপাশে এমন এক সত্য, যা সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি।
সেই দৃশ্য এখনও বারবার ভেসে উঠছে তার চোখের সামনে
তার সমস্ত বিশ্বাস, সমস্ত স্বপ্ন যেন মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
তাজ দুহাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার ভেতরে রাগ আছে।
কষ্ট আছে।
কিন্তু এই মুহূর্তে ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা আনিকাকে দেখে সবকিছু যেন কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল।
অনেকদিন পর সে আনিকাকে এতটা স্বাভাবিক দেখছে।
মেয়েটা হাসছে।
বৃষ্টির সঙ্গে খেলছে।
যেন পৃথিবীর কোনো দুঃখ তাকে ছুঁতে পারছে না।
তাজের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জন্ম নিল।
সে বুঝতে পারল না সেটা কী।
ঠিক তখনই আকাশ কাঁপিয়ে প্রচণ্ড বজ্রপাত হলো।
চমকে উঠে আনিকা ঘুরে দাঁড়াল।
আর সঙ্গে সঙ্গে তার হাসি মিলিয়ে গেল।
কারণ কয়েক হাত দূরে তাজকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সে।
তাজও স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন নেশালো দৃষ্টি তাতে।
দুজনের মাঝে শুধু বৃষ্টির পর্দা।
কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না।
বাতাসে অদ্ভুত এক নীরবতা।
শেষ পর্যন্ত আনিকাই প্রথম বলল,
— আপনি... এখানে?
তার কণ্ঠে বিস্ময় স্পষ্ট।
তাজ ধীরে ধীরে চোখ সরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল।
— হুম। আমি এখানে। কেন আসতে পারি না আমি।
— না মানে সবাই তো যশোর চলে গেছে?
—কেন..??
আনিকা ইতস্তত করে বলল --
— আপনার নানি মারা গিয়েছে। আপনাকে সবাই কতো কল দিলো ফোনটা বন্ধ ছিল তাই আপনাকে জানাতে পারিনি তাই সকালে চলে গিয়েছে। আ আপনি যাবেন না।
—তাজ নেশার ঘোরে শুনলো নানীর মৃত্যুর কথা। বুকের মাঝে কেমন চিনচিনে ব্যথা অনুভব করলো সে। নেশা নেশা কন্ঠে বলল
— বাড়িতে তুমি একা?
আনিকা মাথা নাড়ল।
আবার নীরবতা।
বৃষ্টির শব্দ যেন আরও জোরে শোনা যাচ্ছে।
আনিকা এবার খেয়াল করল—
তাজের চেহারা অস্বাভাবিক।
চোখ লাল।
মুখ শক্ত।
মনে হচ্ছে ভেতরে ভেতরে কোনো ভয়ংকর যুদ্ধ লড়ছে সে।
আনিকার ভ্রু কুঁচকে গেল।
— আপনার কী হয়েছে?
তাজ কিছুক্ষণ উত্তর দিল না।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
— আজ একটা সত্য জেনেছি।
((( তার চোখের সামনে ভেসে উঠল কিছুক্ষণ আগের ঘটনা। তাজ নির্ধারিত হোটেলে গিয়ে সাথী কে একটা ছেলের সাথে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দরেছে।ছেলেটাকে তার চেনে।সাথীর ফেনে এই ছেলে অনেক ছবি রয়েছে। তাজ যতবার এই ছেলের সম্পর্কে জানতে চেয়েছে সাথী একটাই উত্তর দিয়েছে ছেলেটা তার ফ্রেন্ড। টাকার লোভে সাথী আর তার সে ফ্রেন্ড মিলে তাজকে প্রেমের জালে ফাসিয়েছিল।
তাজ পুলিশ নিয়ে হোটেলে গিয়ে সাথী কে আর সাথীর বয়ফ্রেন্ডকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে।
মনের কষ্টে, তাজ সেখন থেকে একটা ভারে গিয়ে ড্রিংক করে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরেছে.... ))
আনিকা প্রশ্ন সূচক বৃষ্টিতে তাজের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তাজ নিশ্চুপ ,, কেমন ঠলে পড়ছে,,,
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তখনও নীরবে ঝরে পড়ছিল।
আর ছাদের সেই নির্জন রাতের বাতাসে জমে উঠছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।
#চলবে,,,