15/04/2026
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালী জাতিকে নের্তৃত্ব শুন্য করে গ্রেফতার হলে মুজিবনগর সরকার কিভাবে গঠিত হয়েছিল?
---------------------
১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে গ্রেফতারের আগে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং যে কোন মূল্যে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান (তথ্য সূত্র: জেনারেল নিয়াজীর জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক তার 'উইটনেস টু সারেন্ডার' গ্রন্থের ৭৫ নম্বর পৃষ্ঠায় বর্ণিত)।
বঙ্গবন্ধু কেন ২৫ মার্চে ৩২ নম্বরে থেকে গিয়েছিলেন, কেন তাজউদ্দীন আহমদের পরিকল্পনায় স্বাধীনতার ঘোষণার রেকর্ড করেননি, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা তাজুদ্দিন আহমদ মেয়ে শারমিন আহমদের লেখা 'তাজউদ্দীন আহমদ: নেতা ও পিতা' বইয়ে আছে। শারমিন তাঁর বইয়ের ১৪৭ পৃষ্ঠায় তথ্য দেন যে তাঁর আব্বুকে ‘নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে’ বললেও বঙ্গবন্ধু গোপনে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তার প্রমাণ শহীদ ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হককে তিনি ট্রান্সমিটার জোগাড় করতে বলেছিলেন। ডেইলি টেলিগ্রাফ-এর সাংবাদিক ডেভিড লোসাক লিখেছেন, ‘২৬ মার্চে প্রচারিত মুজিব তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণাটি আগেই রেকর্ড করেছিলেন।’
বঙ্গবন্ধু কেন ২৫ মার্চ তাজুদ্দিন আহমদ এর কাছে স্বাধীনতা ঘোষণা রেকর্ড করেননি, তার উত্তর মিলে তোফায়েল আহমেদ লেখনীতে, বঙ্গবন্ধু জানতেন ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না এবং তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করবে। সেজন্য বঙ্গবন্ধু নিয়মতান্ত্রিকভাবে এগিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু সবসময় চেয়েছেন তিনি আক্রান্ত হবেন, কিন্তু আক্রমণকারী হবেন না।
৭০ এর নির্বাচনে যদি বঙ্গবন্ধু অংশগ্রহণ না করতেন বা যদি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা (সংরক্ষিত নারী আসন ছাড়া সরাসরি ভোটে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০ টি আসন) না পেতেন, তাহলে স্বাধীনতা ঘোষণা করার সুযোগ এত দ্রুত পেতেন না।
৭১ এর ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত এই ঘোষণাটিই পরে ১০ এপ্রিল তাজুদ্দিন আহমদ এর নের্তৃত্বে মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত 'বাংলাদেশ গণপরিষদ' কর্তৃক গৃহীত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ৬ নম্বর প্যারায় অনুমোদিত হয়ে সাংবিধানিক বৈধতা অর্জন করেছে। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট পরবর্তী কোন সরকার তা মিথ্যা প্রমাণ করে বাতিল করতে পারেনি।
এই ঘোষণাটি ওয়ারলেস ও ইপিআরের ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর পর পরই বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হন। এটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা। ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রাম বন্দরে অবস্থানকারী বিভিন্ন বিদেশি জাহাজের ওয়্যারলেস থেকে স্পষ্ট শোনা গিয়েছিল। এ সময় চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করা পাকিস্তানি বাহিনীর সমরাস্ত্রবাহী জাহাজ এম. ভি হরমুজ (MV Hormuz) এবং এম. ভি আল-আব্বাস (MV Al-Abbas)-এর ওয়্যারলেস থেকেও এই ঘোষণা শোনা গিয়েছিল, যা পরে পাক গোয়েন্দাদের ওয়্যারলেস মারফত তাদের সদর দপ্তরে পৌঁছায়।
বঙ্গবন্ধুর এই স্বাধীনতার ঘোষণাই ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতার থেকে এম এ হান্নানের কণ্ঠে কয়েক বার প্রচারিত হয়েছে। তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান, মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের (Our Great Leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman) পক্ষে ২৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন (তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান এর ভাষণ গুগলে আছে)। মেজর জিয়াউর রহমান অন্য সকল বড় নেতার নাম বাদ দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা কেন দিয়েছিলেন? সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কখনও নিজেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে বঙ্গবন্ধুর চেয়ে বড় নেতা হিসেবে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করেননি।
তোফায়েল আহমেদ আরও লিখেছেন '২৬ তারিখ তো যুদ্ধ শুরু হয়েছে। জেনারেল শফিউল্লাহ, খালেদ মোশাররফ, মেজর রফিক ইতোমধ্যে পক্ষ ত্যাগ করে যুদ্ধ শুরু করেছেন।'
আজ ঐতিহাসিক ১০ এপ্রিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের ১ম সরকার গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে গঠিত মুজিবনগর সরকারে উপরাষ্ট্রপতি পদে নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদকে নির্বাচিত করা হয়। মুজিবনগর সরকার গঠনের এক সপ্তাহ পর ১৭ এপ্রিল তৎকালীন কুষ্টিয়ার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার (বর্তমান মুজিবনগর) নিভৃত এক আমবাগানে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেয় স্বাধীন বাংলাদেশের এই অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার।
এই মুজিবনগর সরকারে তাজুদ্দিন আহমদ সহ জেল হত্যায় নিহত চার জাতীয় নেতার অভূতপূর্ব বিচক্ষণতা, সাহসিকতা ও ত্যাগের মাধ্যমে খন্দকার মোশতাক আহমেদ সহ দেশি-বিদেশি চক্রান্ত প্রতিহত করে মুক্তিযুদ্ধ চূড়ান্ত বিজয়ের পথে এগিয়ে যায়। খন্দকার মোশতাক - তাজুদ্দিন আহমদ কে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হতে বাধা দিয়ে চক্রান্ত করে সফল হয়নি, শুধুমাত্র জেল হত্যায় নিহত নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানের ত্যাগ ও স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার অদম্য আগ্রহের কারণে। বাঙালির নিজস্ব আবাসভূমি হিসেবে স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নেয়।
প্রফেসর মু. আলী আসগর পিএইচডি,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
ছবি কৃতজ্ঞতা: বাংলাদেশের দুস্পাপ্য ছবিসমগ্র।