20/03/2026
অচেনা স্টেশনের সেই মেয়েটি
নীলাভ একজন তরুণ ফ্রিল্যান্সার। কাজের চাপে মাঝেমধ্যেই সে শহর ছেড়ে দূরে কোথাও হারিয়ে যেতে পছন্দ করে। গত সপ্তাহে সে সিদ্ধান্ত নিল উত্তরবঙ্গের এক নিভৃত গ্রামে যাবে, যেখানে নেটওয়ার্কের চেয়ে পাখির কিচিরমিচির বেশি শোনা যায়।
ট্রেনটা যখন মাঝপথে একটা ছোট স্টেশনে থামল, তখন রাত প্রায় দশটা। স্টেশনের নামটা নীলভ আগে কখনো শোনেনি—'মায়াপুর'। কুয়াশায় ঢাকা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে খুব একটা আলো নেই। হুট করে নীলভর মনে হলো, এই স্টেশনেই তাকে নামতে হবে। এক অদ্ভুত টানে সে ব্যাগ গুছিয়ে নেমে পড়ল।
ট্রেনটা চলে যাওয়ার পর স্টেশনে নেমে সে দেখল, দূরে একটা বেঞ্চে বসে আছে একটি মেয়ে। পরনে হালকা নীল রঙের জামদানি, হাতে একটা পুরনো দিনের বই। নীলভ খানিকটা অবাক হয়ে এগিয়ে গেল।
"ক্ষমা করবেন, এখানে থাকার মতো কোনো জায়গা কি আশেপাশে আছে?"
মেয়েটি মুখ তুলল। তার চোখে এক বিষণ্ণ মায়া। মৃদু হেসে বলল, "এই স্টেশনে যারা নামে, তারা থাকার জায়গা খোঁজে না, তারা নিজেদের খুঁজে বেড়ায়।"
নীলভ কথাটার মানে বুঝল না। মেয়েটি নিজের নাম বলল 'অরণী'। সারা রাত তারা স্টেশনের সেই পুরনো বেঞ্চে বসে গল্প করল। অরণী তাকে শোনাল এই স্টেশনের ইতিহাস, শোনাল কেন মানুষ এখানে এসে থমকে দাঁড়ায়। নীলভর মনে হচ্ছিল, সে অরণীকে অনেক আগে থেকেই চেনে। তার প্রতিটা কথা যেন নীলভর মনের কোনো এক গোপন কোণে গিয়ে বিঁধছিল।
ভোর হওয়ার ঠিক আগে অরণী বলল, "এবার তোমার যাওয়ার সময় হয়েছে নীলভ। ওই যে দেখো ফিরতি ট্রেন আসছে।"
নীলভ কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলল, "তোমার সাথে কি আবার দেখা হবে না?"
অরণী শুধু হাসল। সে হাসিতে ছিল বিদায়ের করুণ সুর। সে নীলভর হাতে একটা শুকনো বকুল ফুল দিয়ে বলল, "সময় হলে সব উত্তর পাবে।"
নীলভ ট্রেনে উঠে বসল। ট্রেন ছাড়ার পর সে জানালা দিয়ে পেছনে তাকাল, কিন্তু আশ্চর্য! স্টেশনে কেউ নেই। এমনকি যে বেঞ্চে তারা বসে ছিল, সেখানেও জনমানবের চিহ্ন নেই।
শহরে ফিরে এসে নীলভ মায়াপুর স্টেশন সম্পর্কে খোঁজ নিতে শুরু করল। ইন্টারনেটে পুরনো নথিপত্র ঘেঁটে সে চমকে উঠল। মায়াপুর স্টেশনটি প্রায় বিশ বছর আগে এক ভয়াবহ বন্যায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর সেই বন্যায় এক তরুণী হারিয়ে গিয়েছিল, যার নাম ছিল অরণী।
নীলভ তার হাতের তালুর দিকে তাকাল। সেই শুকনো বকুল ফুলটা এখনও তার হাতে। সে বুঝতে পারল, ভালোবাসা আর স্মৃতি কখনো মরে যায় না; তারা সময়ের কোনো এক বাঁকে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে।
HK Habib R