22/05/2026
#শ্রাবণ_ধারা
#লেখক_নিশু
#পর্ব_১৬
সৈয়দ ভিলার আবহাওয়া বরাবরের মতোই শান্ত, স্থির। সকালের রোদ জানালার কাঁচ ভেদ করে ডাইনিংয়ের সাদা মার্বেল মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে গরম পরোটার ঘ্রাণ, মাংসের ঝোলের মশলাদার সুবাস। বাড়ির সবাই যার যার মতো নাস্তা নিয়ে ব্যস্ত।
আসিফ ফোনে কথা বলতে বলতে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছিল। গলায় সেই চিরচেনা গাম্ভীর্য, চোখেমুখে ক্লান্ত অথচ নিয়ন্ত্রিত একটা ভাব। ডাইনিং টেবিলে ইতোমধ্যেই বসে আছে সাজিদ, সুজন আর আফিফা। আফিফা পরোটার সাথে মাংসের ঝোল মিশিয়ে তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে, মাঝে মাঝে ঝাল লেগে মুখ ছোট করে পানি খাচ্ছে।
আজ সবাইকে খাওয়ানোর দায়িত্বে বর্ষা। ভার্সিটি বন্ধ থাকায় সকাল থেকেই সে পুরো বাড়ি সামলাচ্ছে। কার প্লেটে কী কম, কার কী প্রয়োজন সবদিকে তার খেয়াল। এই বাড়ির একটা অলিখিত নিয়ম আছে; রাতের খাবার সবাই একসাথে খেলেও দিনের বেলা যার যখন ইচ্ছে, তখনই এসে খেয়ে যায়। ফলে বাড়ির মেয়েদের বিশ্রাম বলতে কিছু নেই।
আসিফ এসে চুপচাপ চেয়ার টেনে বসল। ফোনটা অফ করে টেবিলের পাশে রাখতেই বর্ষা এগিয়ে এলো। পরোটা, ডিম, তরকারি একে একে সাজিয়ে দিল তার সামনে। কিন্তু আসিফ বরাবরের মতোই তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে গেল। একটা পাউরুটিতে ধীরে ধীরে জ্যাম মাখাতে লাগলো।
ঠিক তখনই বর্ষা আফিফার দিকে তাকিয়ে হেসে বললো,
— তাহলে দুই বান্ধবীর মধ্যে এবার কার বিয়ে আগে হয়, সেটাই দেখার বিষয়!
আফিফা খেতে খেতে থেমে গেল। বিস্মিত চোখে তাকালো বর্ষার দিকে।
— কার বিয়ে ভাবি?
বর্ষা এবার অবাক হলো।
— আরে! সুজন, তুমি এদের কিছু বলোনি নাকি?
সুজন মুখ তুলে তাকালো, কিন্তু কিছু বলার আগেই বর্ষা নিজেই বলে উঠলো,
— শ্রাবনীর বিয়ে ঠিক হয়েছে। আমাদের গ্রামের চেয়ারম্যান চাচার ছেলে তাহমিদের সাথে। তোমরা তো চেনোই সাজিদের বন্ধু। প্রায়ই আসে এখানে। দুই পরিবারের কথাবার্তা সব শেষ। আজ থেকেই তো শ্রাবনীর এসএসসি পরীক্ষা শুরু। পরীক্ষা শেষ হলেই বিয়ে।
কথাগুলো যেন সময়কে থামিয়ে দিল।
আসিফের হাতে ধরা পাউরুটিটা আর মুখ পর্যন্ত উঠলো না। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে স্থির হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য পুরো ডাইনিং নিস্তব্ধ।
আফিফা পাশ ফিরে তাকাতেই বুঝলো কিছু একটা ভুল বলে ফেলেছে সে। আসিফ ধীরে ধীরে পাউরুটিটা প্লেটে নামিয়ে রাখলো। তারপর আচমকা চেয়ার ঠেলে দাঁড়িয়ে গেল। চোখে তখন অদ্ভুত এক আগুন। চোয়াল শক্ত। হাতের শিরা ফুলে উঠেছে।
সাজিদ ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আসিফ নিচু, ভারী গলায় বলে উঠলো..
— গাড়ি বের কর, সাজিদ।
ডাইনিং টেবিলে হঠাৎ অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো।
সাজিদ কিছু বলার আগেই আসিফ আবার বললো,
— আসিফের ভালোবাসাকে পছন্দ করার দুঃসাহস কে দেখিয়েছে, সেটা নিজের চোখে দেখে আসি।
আসিফের কথা শুনে বর্ষা হতবাক হয়ে দাড়িয়ে রইলো।
★★★
শ্রাবনীদের গ্রামে পৌঁছাতে সাধারণত বেশ অনেকটা সময় লাগে। কিন্তু আজ সময় যেন আসিফের গাড়ির গতির কাছে হার মেনে বসেছে। কালো গাড়িটা পাগলের মতো ছুটে চলেছে ফাঁকা হাইওয়ে পেরিয়ে, ধুলোমাখা গ্রামীণ রাস্তা কাঁপিয়ে।
শুরুর দিকে সাজিদ ড্রাইভ করছিল। কিন্তু কিছুদূর আসতেই আসিফ কোনো কথা না বলে স্টিয়ারিং নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে। তারপর থেকে গাড়ির ভেতর ভয়ংকর এক নীরবতা।
সাজিদ পাশে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু আসিফের দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। তার বুকের ভেতর তখন হাজারটা প্রশ্ন পাক খাচ্ছে।
আচ্ছা… আসিফ ভাই কি সত্যিই শ্রাবনীকে ভালোবাসে?
এই শালা তাহমিদ আর কোনো মেয়ে পেল না? ঘুরে ফিরে ভাইয়ার পছন্দ করা মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে?
আর যদি সত্যিই ভাইয়া শ্রাবনীকে ভালোবেসে থাকে… তাহলে কি তাহমিদকে এক আনা ছাড় দেবে?
অসম্ভব।
সাজিদ তাহমিদকে খুব ভালো করেই চেনে। ছেলেটা হাসিখুশি, মিশুক কিন্তু জেদি। ভয়ংকর রকমের ঘাড়ত্যাড়া। আর আসিফ?
সে তো নিজের জিনিসে অন্য কারো অধিকার সহ্যই করতে পারে না। দুজন যদি মুখোমুখি দাঁড়ায়—
মাঝখান দিয়ে মরবে সাজিদই। কার পক্ষ নেবে সে?
জানের বন্ধু তাহমিদ? নাকি বড় ভাই আসিফ?
এইসব ভাবতে ভাবতেই সাজিদের মাথা গুলিয়ে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই আসিফ হঠাৎ এত জোরে ব্রেক কষলো যে সাজিদ সামনের দিকে হেলে পড়লো প্রায়।
বুক ধড়ফড় করতে করতে সামনে তাকাতেই সে জমে গেল। রাস্তার ঠিক মাঝখানে একটা বাইক দাঁড়িয়ে।
আর বাইকে শ্রাবনী আর তাহমিদ। সাজিদের মাথায় যেন বাজ পড়লো। সর্বনাশ, ওরা একসাথে কোথায় যাচ্ছিল? আসিফ কোনো কথা না বলে গাড়ির দরজা খুলে নেমে গেল। তার চলার ভঙ্গিতে এমন কিছু ছিল, যা দেখে বাতাসও থমকে যেতে পারে। তাহমিদও বাইক থামিয়ে ধীরে ধীরে নামলো। চোখে স্পষ্ট বিস্ময়। এই সময়, এই জায়গায় আসিফ আর সাজিদকে দেখার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
আর শ্রাবনী? সে যেন বাস্তবতা আর অবাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইলো আসিফের দিকে। নিঃশ্বাস পর্যন্ত নিতে ভুলে গেছে যেন। সে কি ঠিক দেখছে?
আসিফ সত্যিই তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে?
কিন্তু আসিফ একবারও শ্রাবনীর দিকে তাকালো না।
একবারও না। তার সমস্ত দৃষ্টি স্থির ছিল তাহমিদের চোখে। দুই পুরুষের মাঝখানে তখন নীরব, অদৃশ্য একটা যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
সাজিদের মস্তিষ্ক একনাগাড়ে বিপদ সংকেত পাঠাচ্ছিল। পরিস্থিতি এখনই সামলানো না গেলে এখানে রক্তারক্তি পর্যন্ত হতে পারে।
সে দ্রুত জোর করে হাসি এনে বলে উঠলো..
— এমা শ্রাবনী! তুমি এখানে? আমরা তো তোমাদের বাড়িতেই যাচ্ছিলাম। ভালোই হলো রাস্তায় দেখা হয়ে গেল! শ্রাবনী ধাতস্থ হওয়ার চেষ্টা করলো।
— জ্বী ভাইয়া… আমার তো পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষা দিয়ে এখন বাড়ি ফিরছি।
— ও আচ্ছা আচ্ছা! পরীক্ষা কেমন হয়েছে?
সাজিদ নিজেই আবার কথা কেটে দিল।
— থাক, সেসব পরে শুনবো। আগে এসো তো আমার সাথে। আমরা বাড়ির দিকে যাই। ভাইয়ার তাহমিদের সাথে রাজনৈতিক কিছু কথা আছে। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই।
সাজিদ প্রায় জোর করেই তাকে নিয়ে হাঁটা শুরু করলো। বাড়ি খুব কাছে হওয়ায় তারা পায়ে হেঁটেই রওনা দিল। শ্রাবনী একবার পেছনে তাকিয়েছিল।
আসিফ তখনও দাঁড়িয়ে। নিশ্চুপ,কঠিন।
আর তাহমিদও তার সামনে সমান দৃঢ়তায়।
দুজনকে দেখে মনে হচ্ছিল ঝড় শুরু হওয়ার আগের মুহূর্ত এটা। ওরা চোখের আড়াল হতেই তাহমিদ প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকালো আসিফের দিকে।
তখনই আসিফ ধীরে, ভারী কণ্ঠে বললো
— শাহারিয়ার তাহমিদ শেখ, শুনলাম বিয়ে ঠিক হয়েছে। জানালে না?
তাহমিদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসলো।
— আজ নয় কাল জানাতামই। সবে তো কথাবার্তা চলছে।
আসিফের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো।
— এভ্রিথিং ইজ ফাইন বাট বড় ভাইয়ের পছন্দের দিকে হাত বাড়ালে কেন? দিস ইজ নট ফেয়ার তাহমিদ।
কথাটা শুনে তাহমিদ এবার শব্দ করে হেসে উঠলো।
কারণ সে জানে। একটু আগেই সে জেনেছে সব।
শ্রাবনীর হাতে ধরা সেই নীল চিরকুটটা পড়ে।
আসিফের দেওয়া চিঠি। শ্রাবনী ইংরেজিতে দুর্বল হলেও তাহমিদ খুব ভালোভাবেই বুঝেছিল চিঠির প্রতিটা শব্দে লুকিয়ে থাকা অনুভূতি।
সে এবার শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বললো
— ভালোবাসা এত ভেবেচিন্তে হয় না, সৈয়দ আসিফ সাইফ।
এক সেকেন্ডও দেরি করলো না আসিফ। প্রতুত্তর করলো — ভাবা উচিত ছিল। শ্রাবনীর দিকে তাকানোর আগেই ভাবা উচিত ছিল, তাহমিদ শেখ।
তাহমিদের চোখে এবার চ্যালেঞ্জের ঝিলিক ফুটে উঠলো।
— শ্রাবনীকে দেখার পর ভাবতে ভুলে গিয়েছিলাম। এখন করণীয় কী? সম্মুখযুদ্ধে নামবেন ছোট ভাইয়ের বয়সী কারো সাথে?
আসিফ ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।
চোখদুটো ভয়ংকর শান্ত।আর সেই শান্তির ভেতরই সবচেয়ে বেশি ঝড়।
— যে যুদ্ধে নামার প্রয়োজন হবে, তাতেই নামবো। শ্রাবনীর জন্য আমি সব করতে পারি।
তাহমিদ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তার দিকে। তারপর ধীরে বললো—
— তা শ্রাবনী কী চায়, সেটা জানতে ইচ্ছে করে না? নাকি তাতে কিছুই যায় আসে না আপনার?
আসিফের কণ্ঠ এবার নরম হলো। কিন্তু সেই নরম স্বরেও ভয়ংকর আত্মবিশ্বাস।
— শ্রাবনী আমাকেই চায়। আমি তার চোখের ভাষা বুঝতে পারি।
তাহমিদ মৃদু হাসলো।
— তাই বুঝি? তাহলে তো নিশ্চয়ই শ্রাবনী এই বিয়ে করবে না। এত চিন্তার কী আছে? শহর থেকে ছুটে আসারও দরকার ছিল না।
সে একটু থেমে আবার বললো—
— প্রমাণ করুন নিজের ভালোবাসা। প্রমাণ করুন, শ্রাবনী আপনাকে ভালোবাসে। আমি কথা দিচ্ছি— শ্রাবনী যদি একবার আমার কাছে এসে বলে সে আপনাকে ভালোবাসে… আমি নিজে সরে দাঁড়াবো।
বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠলো।
আসিফ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তাহমিদের দিকে।
তারপর ধীরে বললো—
— তবে তাই হোক। শ্রাবনী নিজেই তোমার কাছে আমার প্রতি তার ভালোবাসা স্বীকার করবে।
তাহমিদ মাথা নেড়ে বললো—
— সেদিন আমি নিজে গিয়ে শ্রাবনীকে আপনার হাতে তুলে দিয়ে আসবো। কিন্তু যদি তা না হয় তাহলে আমাদের বিয়েতে কোনো বাধা সৃষ্টি করবেন না।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে আসিফ উত্তর দিল—
— করবো না।
দুজন মানুষ তখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল।
একজন নিজের ভালোবাসার প্রতি অটল বিশ্বাস নিয়ে। আরেকজন নিজের প্রাপ্তির অধিকার নিয়ে।
শ্রাবনী আর সাজিদ ধীরে ধীরে গ্রামের সরু রাস্তা ধরে হাঁটছিল। বিকেলের আলো তখন নরম হয়ে এসেছে। দুপাশের সবুজ ধানক্ষেতের উপর হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে, দূরে কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ ভেসে আসছে। অথচ এই শান্ত বিকেলের মাঝেও দুজনের মনেই অদ্ভুত এক অস্থিরতা। সাজিদ পথ চলতে চলতে ইচ্ছে করেই হালকা বিষয়ে কথা তুলেছিল। নিজের আর আফিফার বিয়ে নিয়ে টুকটাক মজা করছিল, যাতে পরিবেশটা একটু স্বাভাবিক হয়। কিন্তু শ্রাবনী আজ অস্বাভাবিক চুপ। তার চোখেমুখে এক ধরনের ক্লান্ত বিষণ্নতা। বাড়ির রাস্তা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ঠিক তখনই সাজিদ হঠাৎ থেমে গেল। শ্রাবনীও অবাক হয়ে তাকালো তার দিকে। সাজিদ কিছুক্ষণ দ্বিধায় থেকে ধীরে জিজ্ঞেস করলো—
— তুমি কি মন থেকে অন্য কাউকে চাও, শ্রাবনী?
প্রশ্নটা শুনে মেয়েটা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো।
তারপর ঠোঁটে খুব মলিন একটা হাসি ফুটলো।
সে নিচের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো
— যারে চাওয়া যায়,
তারে পাওয়া যায় না…
আর যারে পাওয়া যায়,
তারে চাইতে আমাদের মনের সাথে মনের যোজন যোজন দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়।
কথাগুলো বলে শ্রাবনী আর দাঁড়ালো না। ধীরে ধীরে সামনে হাঁটতে শুরু করলো। আর সাজিদ?
সে যেন জায়গাতেই জমে গেল। মাথার ভেতর শব্দগুলো বারবার প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো।
“যারে চাওয়া যায়… তারে পাওয়া যায় না…”
তাহলে কি! শ্রাবনীও আসিফ ভাইয়াকে ভালোবেসে ফেলেছে? বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো সাজিদের। পরিস্থিতিটা তার কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি জটিল। বাড়িতে পৌঁছাতেই নিধি বেগম সাজিদকে দেখে খুশিতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। গ্রামের বাড়ির সেই চিরচেনা আতিথেয়তা পানি, নাস্তা, বসার আয়োজন সব একসাথে শুরু হয়ে গেল।
কিন্তু ঠিক তখনই উঠোনের বাইরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।সবাই তাকিয়ে দেখলো আসিফকে। তার পেছনেই বাইক নিয়ে এসে থামলো তাহমিদ।
তাহমিদের আজ এখানে আসার কথা ছিল না। কিন্তু সে এসেছে। নিধি বেগম প্রথমবারের মতো আসিফকে দেখলেন। আর দেখেই কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইলেন।
লম্বা, প্রশস্ত কাঁধ, গাঢ় রঙের শার্টে পরিপাটি ব্যক্তিত্ব। ছেলেটাকে যেন গ্রামের কারো সাথে মানায় না। একেবারে শহুরে, সাহেবদের মতো। তিনি অবাক হয়ে শুধু একটা কথাই ভাবলেন দুই ভাইয়ের মাঝে এত পার্থক্যও হয়?
সুজন যেখানে চঞ্চল আর এলোমেলো, সেখানে আসিফ ভীষণ নিয়ন্ত্রিত, গম্ভীর আর ভয়ংকর রকম ব্যক্তিত্বময়। ঘরে ঢুকেই কোনো ভণিতা করলো না আসিফ।সরাসরি বললো..
— সাজিদ আর আফিফার বিয়েটা শ্রাবনীর মাধ্যমিক শেষ হওয়ার পরপরই হবে। আপনারা সবাই যেন উপস্থিত থাকেন। বিশেষ করে শ্রাবনী আফিফার এত কাছের বন্ধু, ওকে আমরা একটু আগেই নিয়ে যেতে চাই।
কথাগুলো শুনে সাজিদ প্রায় তব্দা খেয়ে গেল।
কি?! তার বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গেছে?
সে তো জানতো নির্বাচন শেষ হলে পরে কথা হবে! কিন্তু কবে তারিখ ঠিক হলো? আর তাকে কেউ জানালো না কেন? এটা তার নিজের বিয়ে! অথচ সে নিজেই কিছু জানে না!
মুখ গোমড়া করে দাঁড়িয়ে রইলো সাজিদ। ছোট হওয়াটাও এক আজব যন্ত্রণা, কেউ কিছু জানানোর প্রয়োজনই মনে করে না।
ওদিকে নিধি বেগম অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। ইতস্তত করে বললেন..
— তা ঠিক আছে বাবা, কিন্তু শ্রাবনীর তো বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলের বাড়ি থেকে এসব মেনে নিবে তো?
কথাটা শেষ হতেই ঘরের বাতাস বদলে গেল।
আসিফ ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে তাকালো তাহমিদের দিকে। তার ঠোঁটের কোণে তীর্যক একটা হাসি ফুটে উঠলো। চোখে স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ।
— কী শাহারিয়ার তাহমিদ শেখ? বউ দিতে সমস্যা আছে নাকি?
একটু থেমে আবার বললো—
— নাকি, বউ হারানোর ভয় পাচ্ছো?
ঘরের সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে রইলো। তাহমিদও তাকিয়ে রইলো আসিফের চোখে।
দুজনের মাঝখানে আবার সেই অদৃশ্য সংঘর্ষ। তবে এবার তাহমিদ নিজেকে হারালো না। গাম্ভীর্য বজায় রেখেই ধীর গলায় বললো..
— শ্রাবনী চাইলে যেতে পারে। আমার কোনো সমস্যা নেই।
আসিফের চোখদুটো চিকচিক করে উঠলো।
কারণ এই কথার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস। তাহমিদ বিশ্বাস করে শেষ পর্যন্ত শ্রাবনী তার কাছেই ফিরবে।আর আসিফ? সে বিশ্বাস করে শ্রাবনী কোনোদিন তার চোখের ভাষা অস্বীকার করতে পারবে না।
ঘরের ভেতর তখন নীরবতা।
কিন্তু সেই নীরবতার আড়ালে শুরু হয়ে গেছে এক ভয়ংকর প্রতিযোগিতা ভালোবাসার, অধিকারের, আর অপেক্ষার!
#চলবে...
#গল্প #বই #শ্রাবণ_ধারা #আসিফ #শ্রাবণী #নতুন #লেখক_নিশু