28/08/2026
নবীজি হযরত মুহাম্মদ ﷺ কেমন মানুষ ছিলেন? মানবতার জন্য তাঁর জীবন ছিল ভালোবাসা, দয়া, ক্ষমা ও উত্তম চরিত্রের এক অনন্য ইতিহাস
নবীজি ﷺ-এর সংক্ষিপ্ত কিন্তু হৃদয়স্পর্শী ইতিহাস
হযরত মুহাম্মদ ﷺ ছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসূল। তিনি আরবের মক্কা নগরীতে কুরাইশ বংশের সম্মানিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন এবং তাঁর মা আমিনা তাঁকে ছোটবেলায় অত্যন্ত স্নেহে লালন-পালন করেন। শৈশবেই তিনি পিতা-মাতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হন। পরবর্তীতে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং চাচা আবু তালিব তাঁর দেখাশোনা করেন।
শৈশব থেকেই মুহাম্মদ ﷺ ছিলেন অত্যন্ত সত্যবাদী, বিশ্বস্ত ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী। মক্কার মানুষ তাঁর সততা ও আমানতদারির কারণে তাঁকে আল-আমিন অর্থাৎ বিশ্বস্ত ব্যক্তি এবং আস-সাদিক অর্থাৎ সত্যবাদী বলে ডাকত। মানুষ তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র তাঁর কাছে আমানত রাখত, কারণ তাঁরা জানত—মুহাম্মদ ﷺ কখনো আমানতের খেয়ানত করবেন না।
যৌবনে তিনি ব্যবসা করতেন এবং তাঁর সততা ও সুন্দর ব্যবহারের কারণে সবাই তাঁর প্রতি আস্থা রাখত। পরবর্তীতে তিনি খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিবাহ করেন। তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল ভালোবাসা, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানে পরিপূর্ণ।
৪০ বছর বয়সে মক্কার হেরা গুহায় অবস্থানকালে তাঁর কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম ওহি আসে। ফেরেশতা জিবরাইল আলাইহিস সালাম তাঁকে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেন। এভাবেই শুরু হয় তাঁর নবুয়তের মহান দায়িত্ব।
তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করলেন এবং মূর্তিপূজা, অন্যায়, জুলুম, অহংকার ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকতে বললেন। তিনি শিক্ষা দিলেন—মানুষের মর্যাদা তার সম্পদ, বংশ বা ক্ষমতায় নয়; বরং তার তাকওয়া ও চরিত্রে।
মক্কার অনেক মানুষ তাঁর এই দাওয়াত গ্রহণ করলেও অনেকেই তাঁর বিরোধিতা শুরু করে। তাঁকে ও তাঁর সাহাবিদের নানা নির্যাতন সহ্য করতে হয়। কিন্তু এত কষ্টের মধ্যেও নবীজি ﷺ প্রতিশোধপরায়ণ হননি। তিনি ধৈর্য ধারণ করেছেন এবং মানুষের হেদায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন।
পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে তিনি মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় তিনি একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে মুসলিমদের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি ছিলেন একজন নবী, শিক্ষক, নেতা, বিচারক, স্বামী, পিতা এবং সমাজের অভিভাবক—প্রতিটি ভূমিকায় তাঁর চরিত্র ছিল অনন্য।
নবীজি ﷺ মানুষের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ছিলেন। তিনি এতিম, দরিদ্র, অসহায় ও দুর্বল মানুষের প্রতি বিশেষ যত্নবান হতে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি প্রতিবেশীর অধিকার, নারীর সম্মান, এতিমের সম্পদ রক্ষা, শ্রমিকের অধিকার এবং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন, তাদের সালাম দিতেন এবং স্নেহ করতেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তিনি কোমল আচরণ করতেন। তিনি কখনো অহংকার করতেন না। নিজের কাজ নিজে করতেন এবং সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করতেন।
মক্কা বিজয়ের দিন তাঁর সামনে এমন অনেক মানুষ ছিল যারা বছরের পর বছর তাঁকে ও তাঁর সাহাবিদের নির্যাতন করেছিল। তখন তাঁর হাতে প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা ছিল। কিন্তু তিনি সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে ক্ষমার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর চরিত্রের এই দিকটি দেখায় যে ক্ষমতা পাওয়ার পর প্রতিশোধ নেওয়া নয়, বরং ক্ষমা করা কত মহান গুণ।
নবীজি ﷺ-এর জীবনের শেষ সময়েও তাঁর চিন্তা ছিল তাঁর উম্মতকে নিয়ে। তিনি মানুষকে আল্লাহকে ভয় করতে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করতে, একে অপরের অধিকার রক্ষা করতে এবং পরস্পরের প্রতি ভালো আচরণ করতে উপদেশ দিয়েছেন।
৬৩ বছর বয়সে মদিনায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালে সাহাবিগণ গভীরভাবে শোকাহত হন। তিনি আমাদের জন্য কুরআন ও তাঁর সুন্নাহর মাধ্যমে এমন একটি জীবনাদর্শ রেখে গেছেন, যা মুসলমানদের জন্য পথনির্দেশের উৎস।