27/07/2025
এসআলমের ব্যাংক সমূহ থেকে ছাটাইকরণে জামায়াত সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিহীন অভিযোগ, কিছু সাধারণ জিজ্ঞাসা ও জবাব।
বিগত ফ্যাসিবাদী রেজিমের দীর্ঘ ১৭ বছর যাবত ইসলামী ধারার ৫ টি ব্যাংক সহ মোট ৬ টি ব্যাংকে চট্টগ্রাম ভিত্তিক শিল্পগ্রুপ এসআলমের নিয়ন্ত্রাধীন ছিল এবং সেসময় দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে সেসব ব্যাংকে ব্যাপক হারে লোকবল নিয়োগ দেয় তারা।
ব্যাংকগুলোতে একচ্ছত্র আধিপত্যকে পুঁজি করে ব্যাপক লুটপাটের কারনে ফ্যাসিবাদী সময় থেকেই তীব্র তারল্য সংকট দেখা দেয় এবং কয়েক দফায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে ব্যাংগুলো টিকিয়ে রাখে, সে বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ওই সময়েই ব্যাপক সমালোচনা ও লেখালেখি হয়।
২৪ এর গণ অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হলে তাদের মদদপুষ্ট এসআলম গ্রুপের মালিকও দেশ থেকে পালিয়ে যান এবং ব্যাংকগুলোতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্টা করে।
একে একে সব কটা ব্যাংকের লেনদেনে স্থবিরতা নেমে আসে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের বিদ্যমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙ্গে নতুন পর্ষদ নিয়োগ দেয়।
সেই থেকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি সহ এসআলম মালিকানাধীন সব কটা ব্যাংক চলছে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া পরিচালনা পর্ষদের অধিনে।
এখানে কোন রাজনৈতিক দল বা গোষ্টির হস্তক্ষেপের কোন সুযোগ বাংলাদেশ ব্যাংক যেমন রাখেনি, তেমনি ব্যাংগুলোর অতীত অবৈধ কার্যক্রমের কারনের এসব কেলেঙ্কারি নিজের ঘাড়ে নিতে কেউ প্রস্তুত না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নিজস্ব এজেন্ডায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুশাসন প্রতিষ্টার কাজ করছে, সেই কাজে হস্তক্ষেপ করা কোন রাজনৈতিক দলের কাজের মধ্যেও পড়েনা। সেই কাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফলপ্রসূ সমাধান দিতে না পারলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক দলগুলো জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা এবং চাপ প্রয়োগের কাজ করতে পারবে, এবং সেটা দেশের প্রতিটা দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দলই করবে সময় হলে।
১. এখন পশ্ন হলো, এখানে জামায়াতে ইস্লামীর সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিহীন গুজব আসলো কিভাবে?
পটিয়া সহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের বড় একটা এলাকায় মাজার পন্থী এবং জামায়াত বিদ্ধেষী লোকদের আধিপত্য থাকায় এসআলমের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্তদের একটা বড় অংশ জামায়াত বিদ্ধেষী এবং আওয়ামীপন্থী। ২৪ এর ৫ আগষ্টের ঘটনাকে হাসিনা ও তার দোসররা যেভাবে জামায়াত-শিবিরের ম্যাটিকুলাস ডিজাইনের অংশ হিসেবে দেখে, এরাও ব্যাংকিং খাতের স্থবিরতা এবং অস্থিতিশীলতার জন্য জামায়াতকে দায়ী ভাবতে এবং প্রচার করতে শুরু করে। এদের মধ্যে বড় একটা অংশ দেশের রাজনীতি, ব্যাংকিং নীতিমালা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাংশনালিটি সম্পর্কে জ্ঞাত নয়।
২. জামায়তই কেন? অন্য কোন দল নয় কেন?
জামায়াতে ইসলামীর কনসেপ্ট ও তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত দেশের সর্ববৃহৎ ইসলামী ধারার ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি এসআলম কর্তৃক বেদখল হয়ে যাওয়ার পর থেকেই মূলত সারাদেশে জামায়াত শিবিরের লোকজন ক্ষুব্ধ। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে দখলমুক্ত হওয়ার সারাদেশে জামায়াত-শিবিরের সমর্থক ও কর্মীরা ব্যাংক তাদের নিয়ন্ত্রণে এসেছে এমন প্রচারণা চালাতে থাকে। ইসলামী ব্যাংকও শাখা পর্যায়ে সরকার পতন পরবর্তী তৈরী হওয়া তাদের নেগেটিভ ইমেজ পুনরুদ্ধারে জামায়াতের লোকজনদের দ্বারা মার্কেটিং ও প্রমোশন চালাতে থাকে গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে।
অথচ পরিচালনা পরিষদ কিংবা নীতিনির্ধারণী কোন যায়গায় জামায়াত সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে কোন লোক বসায়নি।
কিন্তু দৃশ্যমান বাস্তবতা দেখে পটিয়া ও আশপাশের এলাকার চরম জামায়াত বিদ্ধেষী এমপ্লয়িরা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে জামায়াত ব্যাংক দখল করে ফেলেছে এমন প্রচারণা চালাতে থাকে।
৩. সবাই কি জামায়াত বিদ্ধেষী?
না। সবাই জামায়াত বিদ্ধেষী না। কিন্তু ব্যাংকগুলোতে প্রায় এক বছর ধরে চলমান অস্থিরতা, চাকরীচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার কারনে হতাশ লোকজন নিজেদের শান্তনার জন্য হলেও জানায়, অজানায় তৈরী হওয়া ন্যারেটিভের কিছু কিছু বিশ্বাস করা শুরু করে দিয়েছে।
ইতোমধ্যে প্রথম ধাপে এসআইবিএল থেকে চাকরীচ্যুত হওয়া সাবেক শিবিরের অনেক জনশক্তি দক্ষিণ জেলার বিভিন্ন জামায়াত নেতাদের কাছে এই বিষয়ে প্রতিকার প্রত্যাশা করেন এবং যেহেতু এখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ নাই, সেহেতু তারা এখান থেকে কোন আশার বানী শুনেননি।
যার কারনে হঠাৎ চাকরী হারিয়ে বেকার হয়ে পড়া লোকজনের হতাশায় কিছুটা ক্ষোভের মিশ্রণ তৈরী হয় এবং জামায়ায়াত বিদ্ধেষী ন্যারেটিভ তাদের মধ্যে আরো চাউর হয়।
৪. জামায়াত এই বিষয়ে বিবৃতি দেয়না কেন?
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জামায়াতের বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা এই নিবর্তনমূলক ছাটাইয়ের পক্ষে না। এবং এসব এড়াতে তাদের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য করণীয় বিষয়ে তারা সচেতন ও এক্টিভ। কিন্তু তাদের সাথে বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্ট নয় এমন একটা বিষয়ে বিবৃতি দেয়া নিছক অযৌক্তিক বলে তারা মনে করেন।
বাছবিচারহীন ছাটাইয়ের মাধ্যমে শতশত পরিবারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়া কোনভাবেই কাম্য নয়। এই বিষয়ে সকল রাজনৈতিক দল ও প্রেশার ক্রিয়েটিং গ্রুপগুলোর এক্টিভ ভুমিকা ও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। এভাবে গণহারে ছাটাই না করে সবার জন্য কল্যাণকর এমন একটা পন্থায় চলমান ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংকট থেকে বের হয়ে আসার কার্যকর পন্থা তৈরী করা প্রয়োজন।
কিন্তু বিদ্ধেষপরায়ণ হয়ে অযৌক্তিকভাবে একটা নির্দিষ্ট দলকে অভিযুক্ত করা নিন্দনীয় ও অত্যান্ত গর্হিত।