Sparrow - চড়ুই

Sparrow - চড়ুই No lies, No cheating, No breakup..💝
we fight, we fix, we stay.💙😇

02/11/2025

#শেষ_চৈত্রের_ঘ্রাণ
#নূরজাহান_আক্তার_আলো
[৬৬]

বাজাও শিষ মারো তালি
নিঃশব্দে মুছে যাক গোপন কালি।
এসেছে রে, এসেছে চৌধুরী এসেছে__
হবে নাকি চুক্তি? দেবো নাকি উক্তি?
চোর-পুলিশ ভাই ভাই
চলো এসো হাত মিলাই?

উৎফুল্ল স্বরে উক্ত কথাটি বলতে বলতে ইগর এসে বসল শুদ্ধর সামনে। যদিও সুস্পষ্টভাবে বাংলা কথা বলতে পারেন না তিনি। ঐশ্বর্যের মায়ের বদৌলতে একটু আধটু শিখেছিল এই যা! তবে এই একটু আধটু দিয়েই বাঙালিদের খোঁচানোর কাজ ঠিকভাবে হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, নড়বড়ে উচ্চরণ দিয়ে সামনে ব্যাক্তিকে আপমান করতে এক্সপার্ট৷ এখন যেমন ভাবছেন শুদ্ধকে খোঁচাবেন। কারণে অকারণে খুঁচিয়ে শুদ্ধ রেগে উনার গায়ে হাত তুললে কোনো অঘটন সৃষ্টি করবে। বাইরের দেশ থেকে এসে উনার গায়ে হাত তোলার অপরাধে পুলিশের হাত তুলে দিলেও মন্দ হয় না। বাঙালি জাতি, বিদেশি জেলের ভাত কেমন জানে না। এই সুযোগে
নাহয় জেল থেকে ঘুরে আসুক। মানুষের জীবনে সব রকমের অভিজ্ঞতা থাকা জরুরি। তাছাড়া কোথাও লেখা নেই সাইন্টিস্ট হলে জেলে যেতে পারবে না। উনার হাসি হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে আছে শুদ্ধ। বয়সটা থেমে না থাকলেও এখনো ইগরের শারীরিক গঠন যথেষ্ট স্ট্রং। পোশাক পরে রুচি সম্মত। তাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ইগর ওয়াইনের বোতল দেখিয়ে জানতে চাইল হোয়াইট নাকি রেড ওয়াইন নেবে। শুদ্ধ
কোনো জবাব না দিলে নিজে থেকেই রেড ওয়াইনের গ্লাস এনে ধরল শুদ্ধর সামনে। শুদ্ধ এবারও ধরল না দেখে ইগর বলল,

-'রাগ করে না ইয়াং ম্যান।'

শুদ্ধ হাসল। ঠোঁটের কোণে হাসি এঁটে খোঁচা মেরে বলল,

-' কেমন আছেন, স্যার.. উফ! বিগ মিসটেক চোর মহাশয়। '

মুখের উপর চোর বলায় ইগরের ভীষণ রাগ হলো। তবে রাগটুকু প্রকাশ না করে হাসি মুখে বলল,

-'কী জন্য এসেছো?'

-' ভয় পাচ্ছেন বুঝি?'

-'তুমি বাঘ নাকি ভাল্লুক যে ভয় পাব?'

-' আমি কী আপনার থেকে ভালো কে জানে?'

-'ওটা আর পাবে না শোয়াইব।'

-' কে বলল?'

-'আমি।'

-' আমার জিনিস হজম করার ক্ষমতা আপনার আছে?'

কথা বলতে বলতে আশেপাশে তীক্ষ্ণ নজর বুলিয়ে দেখে নিলো নির্জন জায়গাটা। এখন মধ্যেদুপুর। সুনশান এরিয়া। কাছে কোথাও একটা দ্বীপ আছে। এদিকটা পরিত্যক্ত এরিয়া বলা চলে। এজন্য আকাম কুমার সব
এই এরিয়ার মধ্যে হয়ে থাকে। তবে এই জায়গার কথা ঐশ্বর্য ছাড়া কেউ জানত না কারণ ঐশ্বর্যকে বেশিরভাগ সময় এখানেই আঁটকে রাখতেন।
ছোট্ট একটা রুমে বন্দী রেখে কষ্ট দিতেন। শুদ্ধ সুইডেনে এসেছে দুদিন হলো। তিনদিনের দিন এসেছে ইগরের সাথে দেখা করতে। হতেও পারে এটাই শেষ দেখা। শুদ্ধ কিয়ৎকাল চুপ থেকে ঠান্ডা চাহনি ছুঁড়ে ইংলিশে বলল,

-' ফর্মূলা কাজে লাগাতে পারলেন না, পারার কথাও না, তাহলে শুধু শুধু চুরি করলেন কেন?'

-' কোটি টাকা পেলাম। তোমাকে হারাতে পারলাম। অপমানের শোধ নিতে পারলাম।'

-' আমাকে হারালেন? কিভাবে?'

-'তুমি জিনিয়াস আমি মানি। এটাও জানি সামনে আরো চমকপ্রদ কাজ করবে। কথা হচ্ছে, টাকা অফার করেও যখন আমার হয়ে কাজ করলে না তখন রাগ হচ্ছিল। এই কারণে আমি ঐশ্বর্যকে পাঠিয়েছিলাম তোমার কাছে, যাতে তোমাদের মাঝে কিছু ঘটে। নারীর সৌন্দর্যের কাছে পুরুষ কাবু। আর ঐশ্বর্যের রুপ ছিল ওইরকমই। ওর মায়ের জন্য বারবার বেঁচে গেছে আমার হাত থেকে নয়তো ওর ভার্জিনিটি আমিই..!'

-'সে আমার ছোটো ভাইয়ের হবু বউ তাকে জড়িয়ে কোনো নোংরা কথা শুনতে ইচ্ছুক নই। কথা হচ্ছিল চুরি নিয়ে।'

-' সেটা নিয়েও কথা বাড়িয়ে লাভ নেই ফিরে যাও।'

-' স্কটল্যান্ডের সাইন্টিস্ট শেফার্ড ফ্লেমিং এর কাছে ফর্মূলা বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। ফ্লেমিং সন্দেহ করায় তাকে না দিয়ে ডিসুশ বিনের কাছে চার কোটি তিপ্পান্ন লক্ষ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করেছেন ৷ ভেবেছিলেন আজ রাতে অন্যদেশে পাড়ি জমাবেন যাতে আমার মুখোমুখি হতেও না হয়।'

-'এসব কথা তুমি জানলে কিভাবে? সে আমাকে কথা দিয়েছিল ভুলেও তোমাকে জানাবে না।'

-' কিন্তু জানিয়েছে তো। শুধু জানাই নি, আপনার বিরুদ্ধে সাক্ষীও দেবে। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে, আমার জিনিস এখন আমার কাছে সুরক্ষিত। বিশ্বাস হচ্ছে না?'

ইগর থমথমে মুখে তাকিয়ে রইল শুদ্ধর মুখের দিকে। কাট কাট চেহারার সুদর্শন পুরুষটা আবারও তাকে ঘোল খাইয়ে ছাড়ল। সব কথা সে জানে, এর মানে এতদিন সিঙ্গাপুর থাকলেও তার নজর ছিল উনার গতিবিধির দিকে। অথচ উনি ভেবেছিলেন একের পর এক বিপদে পড়ে চৌধুরী পুত্র
এসব নিয়ে ভাবার সময় পাবেন না। আর যতদিনে বিপদ কাটিয়ে উঠবে ততদিনে ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে যাবেন। কিন্তু শেষ চালটা দিয়ে শুদ্ধই যে চেকমেট দেবে সেটা কল্পনাও করেন নি। পুলিশের গাড়ির হর্ণ কানে পৌঁছাতেই বুঝতে বাকি রইল না ঘটনা। সাইলেন্স করা পিস্তলটা নিজের
কাছে না থাকায় উঠে দাঁড়াতেই কোথা একটা বুলেট এসে বিঁধল উনার বুকের বাঁ পাশে। চোখের পলকে লাল রক্তে ভিজে গেলে পরনের সবুজ
টি- শার্ট। তখনই পুলিশের গাড়ি থেমে ধপধপ শব্দ তুলে একদল পুলিশ ভেতরে প্রবেশ করল। ইগর ততক্ষণে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে লুটিয়ে পড়েছে শুদ্ধর পায়ের কাছে। শুদ্ধ ব্যাতীত এখানে আর কাউকে না দেখে পুলিশ ইগরের লাশের সঙ্গে সঙ্গে শুদ্ধকেও যেতে ইশারা করল।
শুদ্ধ যেতে যেতে পাথিমধ্যে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে একবার তাকাল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে রইল জঙ্গলের দিকে। কিন্তু কাউকে নজরে না পড়লে
চলে গেল পুলিশের সঙ্গে। পুলিশের গাড়ির শব্দ শোনা না গেলে ইয়াসির বের হয়ে এলো। হেসে হাততালি দিতে দিতে বিরবির করল,

-'তোমার বিশুদ্ধ পুরুষ সাধু নয় চড়ুইপাখি। সে নির্মমভাবে আহনাফকে মেরেছে। এমনভাবে মেরেছে চেনা মুশকিল। তার হাতে খুনের রক্ত লেগে আরো আগে থেকে লেগেছে। কিন্তু প্রমাণের ভিত্তিতে কখনো তা সামনে আসে নি। কিন্তু এবার ঘটা করে তোমার শুদ্ধর গায়ে খুনীর ট্যাগ লাগবে। আমি খারাপ, মাফিয়া বলে রিজেক্ট করেছিলে, এবার? এবার কি করবে শীতলরাণী? এবার মানতে পারবে খুনী স্বামীকে? ভালোবাসা ওইরকমই থাকবে তো?'

একথা বলে ইয়াসির দুই পকেটে হাত গুঁজে শিষ বাজাতে বাজাতে হাঁটা ধরল বিপরীত পথ ধরে। এখানকার কাজ আপাতত শেষ। কিন্তু ইয়াসির হয়তো এটা জানত না, শুদ্ধ এখানে এসেছিলই প্ল্যান করে আর পুলিশরা
ছিল ফেইক। প্ল্যান ছিল ইগরকে থার্ড ডিগ্রি দিয়ে আরো কিছু কথা বের করার, কিন্তু হলো না। হলোই না যখন তখন আফসোস করে লাভ নেই।
তাছাড়া মানুষের জন্য কষ্ট পেলেও অমানুষের জন্য শোক পালন করার প্রশ্নই আসে না। ইগরের ঘটনা জানার জন্য রুবাব কল দিলো শুদ্ধকে। শুদ্ধ সেখানে একা যাওয়ায় রুবাব, সায়ন চিন্তাতেই ছিল। তাদের চিন্তা দ্বিগুন হলো যখন শুদ্ধ কল ধরছিল না। কয়েকবার কল করার পর কল রিসিভ হলে ফোনের ডিসপ্লেতে শুদ্ধর মুখটা ভেসে উঠল। সদ্য শাওয়ার
নিয়ে এসেছে শুদ্ধ। তাকে দেখে রুবাব বলল,

-'কাজ হয়েছে?'

-'হুম।'

-'খোসা (লাশ)?'

-'গায়েব।'

-'আলহামদুলিল্লাহ। '

রুবাব 'আলহামদুলিল্লাহ' বলায় সায়ন ভ্রুঁজোড়া কুঁচকে তাকাল। বলল,
-'ওই শালা তোর শশুর মারা গেছে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলিস কোন হুঁশে? কান্না কর। দু'মিনিট মন খারাপ করে থাক।'

-' জাতের শশুর হলে কান্না করতাম কিন্তু ওইটা ছিল অজাতের শশুর।
অবশেষে পথের কাঁটা সরলো ভেবে খুশি লাগছে।'

-'তবুও মন খারাপ কর। এ্যাই শুদ্ধ তুইও কর।'

সায়নের কথা শুনে শুদ্ধ মাথা মুছতে মুছতে জবাব দিলো,

-'তোমরা শুরু করো আমি খেয়ে এসে শোকে জয়েন হচ্ছি।'

-'আচ্ছা।'

এই নিয়ে কথা বলতে বলতে শুদ্ধ অন্য প্রসঙ্গে কথা উঠাল। তার কথায়
রুবাব আর সায়ন হো হো করে হেসে ফেলল। এরপর প্রসঙ্গ এলো তিন ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে। বিয়ের কার্ড ছাপাতে দেওয়া হয়ে গেছে।
কার্ডটা নাকি ভীষণ সুন্দর। কার্ডের ডিজাইন সিলেক্ট করেছেন সিঁতারা।
শাহাদত চৌধুরী আগামী মাসে ছুটিতে আসবে তখনই শুভকাজ সম্পূর্ণ করা হবে। অথচ এখন থেকেই বাড়িতে বিয়ের তোড়জোড় লেগে গেছে।
বোনেরা কে কী করবে, কে কী পরবে, সেটার প্ল্যানও ডান। এমন আরো কিছু কিছু ব্যাপারে কথা বলতে বলতে তিনভাই খুব হাসল, মজা করল,
এরপর কল কাটল। শুদ্ধ খেয়ে পুনরায় বের হলো। কারণ যাদের দিয়ে কাজটা করিয়েছে তাদেরও পাকাপোক্ত একটা ব্যবস্থা করে যেতে হবে। নয়তো এখান থেকে আবার ঝামেলার ডালপালা গজাবে। এই ভুল তো বারবার করা যাবে না।

অতঃপর আরো কিছু জরুরি কাজ সেরে পরদিন শুদ্ধ সিঙ্গাপুর ফিরল।
রুবাব ঐশ্বর্যকে নিয়ে চেকআপ করিয়ে আনল আরেকবার। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় সবকিছু গুছিয়ে রাখল। শতরুপা চৌধুরীকে নিয়ে টুকটাক শপিং সারল। বাড়িতে ছোটো ভাই বোনরা আছে। তাদের জন্য কিছু নিতে হবে। বাড়িতে পা দিলেই ধরবে কী এনেছে জানার জন্য।
অগত্যা টুকটাক কেনাকাটার কাজে শুদ্ধকে আর টানে নি কেউ। কারণ এখানে আসার পর থেকে বিশ্রাম পায় নি ছেলেটা। এসে খেয়ে ঘুমাচ্ছে।
আগামীকাল তাদের ফ্লাইট একটানা বাইরে থেকে দেশের জন্য সবারই র মনটা আকুপাকু করছে। শারাফাত চৌধুরী জানিয়েছেন বাড়িতেই যেন উঠেন। ভাইয়ের মুখের উপর শতরুপা কিছু বলেন নি। দেখতে দেখতে
সময় কাটতে লাগল নিজের মতো। ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে রাতটাও পার হলো। পরেরদিন সকাল হলো, দুপুরটা পেরিয়ে বিকালে রেডি হয়ে সকলে নিজ দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
_________

আগে প্রতি সপ্তাহে চারদিন করে একজন মহিলা আসত সাম্য, সৃজনকে পড়াতে। উনি একটা স্কুলের ইংলিশ টিচার। নাম সুলতানা। উনি নিজেও
পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষকতা করেন। বলা বাহুল্য, ভালো পড়ানও। সাম্য, সৃজনের সাথে বর্তমানে শীতলকে পড়াচ্ছেন, ইংলিশ সাবজেক্টটাই পড়ে শীতল। শীতলকে পড়ার চক্করে ফেলে গেছে শুদ্ধ। আগে বিকেলে কত সুন্দর ঘুরে বেড়াত, সাইকেল চালাত, গাছে উঠে ফল পাকড় পেড়ে খেতো, আহা, সেই দিনগুলো কত সুন্দর ছিল। আর এখন বিকেল হলেই বই খাতা নিয়ে বসে পড়তে হয়। তবে আজ অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও
ম্যম আসছে না। তাই তিনজনে মিলে শুয়ে বসে চিৎ কাত হয়ে গল্প করে সময় কাটাল। আজকে পড়া নেই তাই তিনজনে খুশিতে হইহই করে বের হলো। অনেকদিন পর শীতল গাছে উঠে পেয়ারা, তেতুঁল, আমড়া পেড়ে মাখামাখি করে খেলো। পুরো বাগানে কিছুক্ষণ তার সাইকেল চালাতো।
সন্ধ্যার আজানের পর তার উসকোখুসকো চুল দেখে সিমিন বকতে শুরু করল। শীতল মায়ের বকা শুনে ফুলোরাণী হয়ে মুখ ফুলিয়ে তেল নিয়ে বসল সিঁতারার কাছে। চুলে তেল দিতে একদমই ইচ্ছে করে না। কেমন মরা মরা লাগে। সিঁতারা ড্রয়িংরুমে বসেই যত্ন করে শীতলের লম্বা চুলে তেল দিয়ে দুপাশে দুটো বিনুনী করে দিলো। তার দেখে স্বর্ণ বসল। শখ পড়ছিল তাকেও ধরে চুল তেল দিয়ে চুল বেঁধে দিলেন সিঁতারা। এরপর
সন্ধ্যার নাস্তা সেরে শুদ্ধর রুমে গিয়ে বিছানায় কিছুক্ষণ গড়াগড়ি খেল।নিজের ফোন চেক করে দেখল শুদ্ধর মেসেজ এসেছে, ' রুমে যেন পাই।'
মেসেজটা নিয়ে কিছুক্ষণ গবেষণা করে বুঝল মহারাজ তারমানে বাড়ি ফিরছে৷ তবুও সিওর হওয়ার জন্য ছুটতে ছুটতে গেল সিঁতারার কাছে।
কোনোমতে আকাশ সমান আনন্দটুকু কোনোমতে গোপন করে সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞাসা করল,

-'বড় মা রুবাব ভাইয়ারা কি দেশে ফিরছে?'

-'হ্যাঁ।'

-'কবে?'

-'আজ রাতের ফ্লাইটে। '

-'সবাই আসছে।'

-'হুম।'

-'আচ্ছা। '

একথা বলে শীতল সিঁড়ি থেকে সরে নেচে উঠল। ইস, এত খুশি লাগছে কেন? লজ্জাও লাগছে। মহারাজ আসছেন তাহলে। তিন সপ্তাহের নামে কত্তগুলোদিন সে বাড়িতে নেই। কত্তদিন ছুঁয়ে দেখে নি। দেশের বাইরে গিয়ে যেন ভুলেই বসেছে তারও একটা বউ আছে। বউটা তাকে খুব মিস করে। ঘুমের ঘোরে বিছানা হাতড়ে না পেলে ফুপিয়ে কাঁদে। তার বেলায় লবডঙ্কা অথচ নিজের বেলা ষোলোআনা বুঝে নিতে ওস্তাদ। নয়তো কি
ফেরার আগে ঠিকই হুমকি দিয়ে রেখেছে, রুমে যেন পাই। বললেই হবে নাকি? এসব নানান কথা ভাবতে ভাবতে লাজুক হাসল। গালদুটো লাল হয়ে উঠল একরাশ লজ্জায়।প্রবাসীর বউদের আনন্দটুকু আজ উপলব্ধি করতে পারছে। এই আনন্দটুকু যেন ঈদের সামিল। এসব ভেবে লাজুক হেসে দুই হাতে মুখ ঢাকতে যাবে তখন দেখে স্বর্ণ রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে হাসি চওড়া হলো শীতলের। দ্রুত গিয়ে স্বর্ণকে বলল,

-'আপু রুবাব ভাইয়া আসছে।'

বোনের মুখ দেখে বহুকষ্টে হাসি আঁটকাল স্বর্ণ। জবাব দিলো,

-'হুম। সঙ্গে শুদ্ধ ভাইও।'

শীতল হঠাৎ মুখটা থমথমে করে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,

-' কারো খোঁজ নিতে আমার বয়েই গেছে।'

একথা বলে শীতল নিজের রুমে ঢুকে গেল আর তাকে যেতে দেখে স্বর্ণ হেসে ফেলল। যার আগমনে তার চঞ্চলতা বেড়ে গেছে, লজ্জা পাচ্ছে, ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি ভেসে উঠেছে তার খোঁজ নিতে নাকি বয়ে গেছে, ভাবা যায়!
_________

_'আপনাকে আমি স্বামী হিসেবে মানি না। ছুঁবেন না আমায়। আপনার ছোঁয়া লাগলে গা গুলিয়ে আসে আমার। ঘৃণা হয়। আপনি আস্ত একটা জানোয়ার।'

চিৎকার করে বলা কিয়ারার কথা শুনে বুরাকের মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা দিলো না। কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে কান ঘুঁচিয়ে নিলো। হাতের জ্বলন্ত সিগারেটে কয়েকটা টান মেরে অ্যাশট্রেই ঘঁষে নিলো। তারপর চট করে উঠে গায়ের শার্ট খুলে ছুঁড়ে মারল রুমের এক কোণে, প্যান্টের বেল্টটাও ছুঁড়ল আরেক দিকে। তার মনোভাব বুঝে কিয়ারা পালাতে গেলে বুরাক তাকে ধরে ফেলল। ফিচেল হেসে কানে কানে বলল,

-'লুকোচুরি পরে খেলব ডালিং। আগে আদর আদর খেলার পর্বটা শেষ করি? আমরা হলাম ভিলেনের জাত; জোর করা, ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে আমাদের ধর্ম। ভালো মানুষি আমাদের রক্তেও নেই। আমার ছোঁয়াতে গা গুলালে বমি করো সমস্যা নাই। সত্যি বলতে, তোমার বমির কারণ হতে পেরে আমার বরং ভালোই লাগবে।'

-'যেতে দিন না আমায়? কেন করছেন এমন?'

-'ভালো লাগে তাই।'

-'আমি তো আপনাকে চিনতামও না, তবে?'

-'আমি চিনতাম। শীতলের কাছের মানুষের সন্ধান করতে গিয়ে তোমায় পেয়েছি। কবুল যখন বলেছো এভাবেই নিজেকে মানিয়ে নাও। পারলে কনসিভ করো। বাবা ডাক শোনাও। নিজের সংসার সাজাও। তবে মুক্তি পাবে না।'

একথা বলে কিয়ারাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ছুঁড়ে পুরুষালি শক্ত দেহের ভার ছেড়ে দিলো বুরাক। ধীরে ধীরে গাঢ় থেকে গাঢ়তরও হলো স্পর্শ।
অসহায় কিয়ারা শব্দ করে কাঁদতে লাগল। মনের মিল না থাকলে বরের ছোঁয়াও বোধহয় বিষের মতো লাগে। ঘৃণা হয়। বুরাক যখন তার পোশাক খুলতে ব্যস্ত তখনও নিজেকে বাঁচাতে কিল, ঘুষি, খামচি, আঁচড় কেটে নিজের বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাল। করুণ সুরে বারবার ডাকল তার প্রিয় বাবাকে, ডাকল মমতাময়ী মাকে, অশ্রুভেজা চোখেও ভাসল মন কুঠুরিতে লুকিয়ে রাখা প্রিয় পুরুষের মুখ। দুঃভাগ্যবশত কেউ শুনল না বিধায় বাঁচাতেও এলো না। প্রতিবারের মতো এবারও ছাড়া পেলো না সে। মনের দখল না পেলেও জোরপূর্বক শরীরের দখল ঠিকই আদায় করে নিলো। পুরুষত্বের জোর দেখিয়ে নিজের কাজ সেরে পাশে শুয়ে পড়ল বুরাক। ক্লান্ত দেহে ঘুমিয়েও পড়ল কিছুক্ষণের মধ্যেই। কিয়ারা নীরবে চোখে জল ফেলতে ফেলতে কষতে লাগল নিজের হিসাব। তবে আজ সে মানতে বাধ্য যারা সুইসাইড করে তারা সত্যিই সাহসী। নয়তো
কিভাবে সুইসাইড করতে পারে তারা? সে তো পারে না। সে তো ভীতু! কতবার মরতে গিয়েও পারে নি অথচ এভাবে বন্দিনী জীবনে বাঁচতেও তার ভয় আবার মরতেও।
_____________

পরেরদিন সকালে মিষ্টি একটা সকালের সূচনা হলো। রোজকার মতো চৌধুরীর গিন্নিরা রান্নাঘরে ব্যস্ত। শীতল সিমিনের রুমে এখনো ঘুমাচ্ছে।
গতরাতে খাবার খেয়ে মায়ের রুমে শুয়ে বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলেছিল। সেখানে শুয়েই ফোন টিপতে টিপতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে।
ঘুম ভেঙেছে ফজরের আজানের অনেক পর। তখনই উঠে নিজের রুমে ফ্রেশ হয়ে একবার শুদ্ধর রুমে উঁকি মেরে দেখে শুদ্ধ রুমে নাই। বিছানা ফাঁকা। তারমানে হাঁটতে বেরিয়েছে তার দেখা পেতে নিচে থাকতে হবে।
ফাঁকা রুমে একা পেলে তাকে পানিশমেন্ট দিবেই দিবে। একথা ভেবে সে ধীরে সুস্থে নিচে নামল। বাগানে কিছুক্ষণ হাঁটল তবুও শুদ্ধ আসছে না দেখে রান্নাঘরে গেল। মা-চাচীদের ব্যস্তহাতে কাজ করে দেখে পুনরায় ডয়িংরুমের দিকে যেতেই শুদ্ধর মুখোমুখি হলো। চোখাচোখিও হলো।
শুদ্ধ রান্নাঘরে মা-চাচীদের দেখে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে নিচু স্বরে বলল,
-'রুমে আসুন মিসেস শোয়াইব, এক্ষুণি!'
হঠাৎ তাকে 'আপনি' সম্বোধন করায় চোখ বড় বড় করে তাকাল শীতল।
এত সন্মান হজম হলো না তাই শুদ্ধর দেখাদেখি সেও ফিসফিস করে বলল,
-'কেন?'
শুদ্ধ ফিচেল হেসে বলল,
-'মিষ্টি খেতে।
একথা শুনে ঘটনা বুঝতে বাকি রইল না তার। তবে সকালবেলা শুদ্ধকে জ্বালানোর সুযোগ হাতছাড়া করল না সে। মুহূর্তেই শয়তানি বুদ্ধি খেলে গেল তার মাথায়। শুদ্ধর পেছন পেছন সিঁড়ি অবধি গিয়ে লাজুক মুখে বলল,
-'স্বামী বলছিলাম যে, বিয়ে হয়েছে অনেকদিনই তো হলো বাপের বাড়ি যাওয়া হয় নি। মনটাও খুব একটা ভালো নেই। যদি পাঁচ কেজি কিনে দিতেন ঘুরে আসতাম।'
-' কদিন ধরে পিঠে মার পড়ে তাই না? রুমে চল মিষ্টি নিতে।'
-'সাইন্টিস্টকে বিয়ে করেছি। তার এত এত টাকা। মিষ্টি ছাড়া বাপের বাড়ি গেলে কেমন দেখায় না? আপনি বরং মিষ্টিটা এখানেই দিয়ে দেন।'
তার শয়তানি মতিগতি বুঝে শুদ্ধ এবার প্রচন্ড বিরক্ত হলো। রাতে ফিরে শীতলকে রুমে না পেয়ে রেগে আছে যদিও। এখন আবার সকাল সকাল জ্বালাতে শুরু করেছে। তবে রান্নাঘরে মা চাচীদেরকে দেখে কিছু বলতে পারছে না। তবুও ধমকে বলল,
-'সকালবেলা পড়তে বসা যায় না? এখানে কি, যা পড়তে বস।'
সিঁড়ির কাছে ওদের ঝগড়া করতে দেখে সিঁতারা খেয়াল করলেন। তিনি সিদ্ধ ডিমের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বললেন,
-'কি রে শুদ্ধ সকালবেলা ধমকাচ্ছিস কেন মেয়েটাকে?'
পালানোর পথ পেয়ে শীতল সিঁতারার কাছে গিয়ে মলিন মুখে বলল,
-'বড় মা তোমার ছেলেকে মিষ্টি কিনে দিতে বলো।'
-' সকালবেলা মিষ্টি কি করবি?'
-' বাপের বাড়ি বেড়াতে যাব। নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে খালি হাতে যাওয়া যায় নাকি? মান-সন্মানের একটা ব্যাপার না? '
একথা শুনে সিমিন পরোটা বেলতে বেলতে থেমে গেলেন। শুদ্ধর দিকে একবার তাকিয়ে পুনরায় তাকালেন শীতলের দিকে। না চাইতেও হেসে ফেললেন তিনি। উনাকে হাসতে দেখে শুদ্ধ তাকালে চোখাচোখি হলো।
মুখে না বললেও উনার হাসির মানে শুদ্ধ ঠিকই বুঝল,
-' বাঁধা দিয়েছিলাম বলে ভিলেন বানিয়েছিলে না? বেশ হয়েছে। পাজি মেয়েকে করো বিয়ে, আরো করো, আর সারাজীবন জ্বলতে থাকো।' শুদ্ধ আর দাঁড়ালোই না গটগট করে সিঁড়ি বেয়ে রুমের দিকে হাঁটা ধরল।
তবে তার কানে ঠিকই পৌঁছাল মা-চাচীদের খিলখিল হাসির শব্দ। সেও বোধহয় মুচকি হাসল। অতঃপর শাওয়ার নিয়ে বের হতেই দেখে রুমের দুষ্টু মালকিন এসে হাজির। হাতে কফির মগ। সে তোয়ালে মেলে দিয়ে হাত বাড়িয়ে মগটা নিয়ে সেন্টার টেবিলের উপর শব্দ করে রেখে দিলো।
তারপর দুকদম এগিয়ে বিনাবাক্যে শীতলকে বাহুডোরে জড়িয়ে নিলো।
কতদিন পর! মনে হচ্ছিল এক একটা দিন নয় বছর কাটাচ্ছে। বুকটাও যেন খাঁ খাঁ করা শূন্য মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এইটুকু দেহের মেয়েটা
দেশের বাইরে গিয়েও তাকে শান্তি দেয় নি। চারিদিকে সবই ছিল অথচ শান্তি ছিল না। কেমন শূন্যতা ভাব। এখন যেমন শান্তিতে বুক ভরে গেছে এই শান্তিটাই খুঁজে মরছিল। ভেতর ভেতর পাগলপ্রায় হয়ে উঠেছিল এই
ছোঁয়াটুকু পাওয়ার জন্য। শীতলের কম্পিত হাতটাও তখন উঠে এসেছে শুদ্ধর পিঠে। তখন হাতের বাধনটা দ্বিগুন শক্ত করে বুকের সাথে পিষে ফেলার পরিকল্পনা করল যেন বুকের মালিক। ব্যথা পেলেও শীতল চুপ করে রইল। ঠোঁটে লাজুক হাসি। চোখে একরাশ খুশি। এত ভালোলাগা, আনন্দ, কখনোই লাগে নি বিশেষ করে এই মানুষটার আগমনে। আগে বহুবার দেশের বাইরে গেছে এমনটা লাগে নি। তবে কী বৈধ সম্পর্কের টান নাকি এটা? নাকি তীব্র ভালোবাসার ফল? তাকে চুপ থাকতে দেখে সেভাবেই দাঁড়িয়েই শুদ্ধ বলল,
-'এভাবে চেপে ধরে মেরে ফেলি?'
-'আপনার বুকে মাথা রেখে যদি মরতে পারি তবে আমার মরণ সই।'

To be continue........!!

02/11/2025

#শেষ_চৈত্রের_ঘ্রাণ
#নূরজাহান_আক্তার_আলো
[৬৫]

-
সময় চলমান স্রোত! চোখের পলকে কখন যে দিন পেরিয়ে যায় বোঝায় যায় না। নিত্যদিনের দৈনন্দিন কাজের চাপে দেখতে দেখতে কেটে গেছে আরো একটি সপ্তাহ। শুদ্ধ চলে গেছে সিঙ্গাপুর। ঐশ্বর্যের অপারেশনটাও সে যাওয়ার পরপরই করা হয়েছে। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে গলার নিচ থেকে বুক অবধি ঝলসানো দাগটা পুরোপুরি ঠিক হয় নি, হবেও না।
সে যতদিন বাঁচবে ততদিন এই দাগ তাকে বয়ে বেড়াতে হবে। মেনে নিতে
হবে তার নিয়তি, তার পরিস্থিতি। তবে মুখে এসিড/ কেমিক্যাল জাতীয় কিছু পড়ে টুকরো টুকরো ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল সেটাও প্রায় ঠিক হয়েই এসেছে। ডাক্তাররা যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।
শুদ্ধ আর রুবাব টাকার মায়া কখনো কেউ করে নি। যা বেস্ট তারা সেটা করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এসব নানান ঝামেলার মধ্যে সিঙ্গাপুর কেটেছে
আরো তিন সপ্তাহ মানে শুদ্ধ যাওয়ার একমাস পেরিয়ে গেছে। সে মাত্র দুই সপ্তাহের কথা বলে আসলেও সব ঠিকঠাক করতে কেটেছে একমাস।
তাছাড়া চিকিৎসা জিনিসটা তো আর দিনগুনে কিংবা মর্জিমতো হয় না।
তবে শুদ্ধ আসায় রুবাব যেন শক্তি পেয়েছে। সাহস পেয়েছে। একা একা
খুব বেশি কষ্ট হয়েছে তার। দুটো মেয়েকে নিয়ে ঠিকঠাক ঘুমাতে অবধি পারে নি। এরিমধ্যেই ঐশ্বর্যের পাগলামিতে আরো ঘুম-খাওয়া সব যেন উঠে গিয়েছিল। শুদ্ধ যখন প্রথমবার ঐশ্বর্যকে দেখতে হসপিটালে আসে
তখন থমকে গিয়েছিল। ফুপি, রুবাব, ঐশ্বর্যের অবস্থা দেখে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিল। রোগীর দেখভাল করা এত সোজা না। রোগী টানতে রোগীও হতে হয় সেটা রুবাবকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল। সেসব কাউকে বুঝতে না দিয়ে স্নেহের সুরে ঐশ্বর্যকে বলেছিল,

-'আমার জন্য তোমার যে ক্ষতি হয়েছে সেই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। তবে তোমার ভালোর জন্য যতটুকু করা যায় আমি করব।
সারাজীবন করব। আর অনুরোধ বলো কিংবা রিকুয়েষ্ট রুবাবকে আর পুড়িও না। তোমার সাথে সাথে সেও যথেষ্ট পুড়েছে। হ্যাঁ কোনো পুরুষই সাধু নয় আবার সব পুরুষের ভালোবাসা সমানও নয়।'

অল্প কয়েকটা কথায় ঐশ্বর্যের মনোবল শক্তি আরেকটু বেড়েছিল।গিল্টি ফিলও হচ্ছিল। সে শতরুপা ও রুবাবের কাছে মাফও চেয়েছে। তার এই গুনটা বেশ। ভুল করলে মাফ চাইতে দ্বিধা করে না। অকপটে স্পষ্টসুরে সেটা স্বীকার করে। এরপর আর কিছুদিন হসপিটালে থেকে তারা এবার অর্কদের বাসায় উঠল। এতদিন পর বাসার পরিবেশে ঐশ্বর্যের মানসিক চাপ অনেকটাই কমে আসছিল। স্বাভাবিক হচ্ছিল। তবে আয়না দেখলে
ভেতর থেকে কান্না ঠেলে আসত। কিন্তু রুবাবের কাছে দেওয়া ওয়াদার কারণে কান্না সামলে নিতো। কষ্ট করে হলেও হাসত। অর্কদের বাসাতে সদস্য বলতে তারা চারজনই ছিল। বাকিরা আসে কাজ করে চলে যায়।
ওর রেগুলার চেকাপ, মেডিসিন,সেবাযত্নের প্রতি নজর রাখছিল সবাই।
যে যেভাবে পারছিল তাকে ভালো রাখার চেষ্টা করছিল। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, গোটা চৌধুরী পরিবার। রোজ সন্ধ্যায় সবার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়। তবে ঐশ্বর্য লেপটপের সামনে যায় না ফোন কিংবা লেপটপের রশ্নির কাছে তার যাওয়া বারণ। আড়ালে বসেও সবার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে উঠেছে। যে সময় টুকু কথা হয় একেক জনের কথা আর কাজ দেখে না হেসে পারা যায় না। বিশেষ করে সব ভাই-বোনদের খুনশুটি দেখে মনটা ভরে যায়। এই যেমন আজই কথা বলতে বলতে সৃজন দুষ্ট হেসে শুদ্ধকে বলল,

-' জানো ভাইয়া আজ কি হয়েছে?'

শুদ্ধ কফির মগে সিপ নিয়ে তাকাল লেপটপের দিকে। সবাইকে দেখা গেলেও শীতলকে দেখা যাচ্ছে না। তবে সে আশেপাশেই আছে সেটা খুব ভালো করে জানে। রাগ দেখাতে ইচ্ছে করে মেসেজ সিন করছে না, কল ধরছে না, ভিডিও কল দিলে সামনেও আসছে না। তাকে তাকাতে দেখে
সৃজন একবার ডানে তাকিয়ে ফিক করে হেসে বলল,

-' স্কুল থেকে ফিরে দেখি শীতল আপু ড্রয়িরুমে বসে বসে ফুসফুস করে কাঁদছে। এত কাঁদছে কাঁদতে কাঁদতে নাক দিয়ে পানি বের হচ্ছে সেটা সুড়ৎ করে ভেতরে টেনে নিচ্ছে আবার বের হচ্ছে আবার টেনে নিচ্ছে।'

-'তা কাঁদছিল কেন?'

-' কতবার করে জিজ্ঞাসা করলাম বললোই না তো। বলল না যখন আমি আর না জ্বালিয়ে খেতে বসলাম। খেয়ে না উঠতেই একটু পরে এসে বলে সৃজন রে শুদ্ধ ভাইকে কল দিয়ে জিজ্ঞাসা কর তো কবে ফিরবে। আমি যে শিখিয়ে দিয়েছি বলবি না খবরদার।'

সৃজনের এইটুকু বলতে দেরি পাশ থেকে তার পিঠে কিল বসাতে দেরি হলো না শীতলের। সে কোনোমতে নিজের দোষ সৃজনের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে রাগ দেখিয়ে বলল,

-'মোটেও কাঁদছিলাম না আমি। আসলে তখন আমার চোখে কি যেন পড়েছিল। তাছাড়া যার তার জন্য কাঁদার সময় নেই আমার, হুহ্।'

তার কথা শুনে সকলে একে অপরকে দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসল। কারণ শুদ্ধর যাওয়ার পরপর শীতলের অস্থিরতা সবার নজরে পড়েছে।
এর আগেও শুদ্ধ বহুবার বাইরের দেশে গেছে দিনের পর দিন এ বাড়ির বাইরে থেকেছে। কিন্তু তার থাকা না থাকা নিয়ে শীতলের মাঝে কোনো
ভ্রুক্ষেপ ছিল না। তবে এবার বাড়ির অনেকের চোখে অনেককিছু চোখে পড়ছে। হতে পারে বিয়ের কারণে। সম্পর্কের বৈধতার কারণে। নিজের অনুভূতি বোঝার কারণে। ভালোবাসা উপলব্ধি করার কারণে। তবে যার জন্য এত অস্থিরতা দূরে থেকে ভীষণ মজা পাচ্ছে। সে মূলত চাচ্ছিলই তার উপস্থিতিতে শীতল যেন তাকে ভাবে। তাকে নিয়ে অস্থির থাকে, চিন্তা করে। বিশেষ করে এজন্যই সম্পর্কের গভীরতা একটু দ্রুত টেনেছে সে। সে জানত এমন কিছু হবে। এতদিন নিজের অনুভূতি গোপন রেখে একা একা অনেক তড়পেছে এখন সময় এসেছে সেসব উসুল করার।
শুদ্ধ ঠোঁটের কাছে হাত রেখে আপাতত হাসি আড়াল করল। ততক্ষণে কথাটা বলে শীতল চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছে। তখন সিরাত ফট করে বলে বসল,

-'তাই বলে কোথায় যাচ্ছিস তুই? এখানে আয় বস। আরে আমরাও বুঝি স্বামী দেশের বাইরে গেলে চোখে ঘনঘন কি যেন পড়ে। আমাদেরও কত পড়েছে।'

বাকিরা এতক্ষণ হাসি আঁটকে রাখলেও এবার কেউই হাসি আঁটকাতে পারল না। বড়-ছোট সবাই শব্দ করে হেসে ফেলল। শুদ্ধও ঠোঁটের কাছে হাত রেখে মুচকি হাসল। আর সবাইকে হাসতে দেখে শীতল রাগে দুঃখে
হনহন করে রুমের দিকে চলে গেল। সবাই ডাকল শুনলোই না। এভাবে লজ্জা দেওয়ার মানে হয়? একটু কেঁদেছে নাহয় তাই বলে সবাই এভাবে লজ্জা দেবে? তার কষ্ট কেউ বুঝে নাকি? শুদ্ধ যাওয়ার পর ঘুমাতে পারে না, বুকের উপর ঘুম পাড়িয়ে বদ অভ্যাস করে গেছে বিশুদ্ধ পুরুষ। আর নরম বালিশে ঘুম আসে না, আসবে কিভাবে? বালিশের গায়ে তো তার প্রিয় গন্ধটা নেই। খেতে পারে না, খেতে বসলে পাশের চেয়ারটার দিকে নজর যায়। তার রুমে এখন কম থাকে শুদ্ধর রুমেই বেশি থাকবে। তবে শুদ্ধর রুমটাও ভালো লাগে না কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে তাহলে কাঁদবে নাতো কি করবে? এভাবে থাকা যায় নাকি?

সে চলে যেতেই রুবার দৃষ্টি সরিয়ে ঐশ্বর্যের দিকে তাকাল। তার দৃষ্টি যেন বলেছে, দেখো বলেছিলাম না ভালোবাসতে জানলে ভালোবাসা সুন্দর। আর ভালোবাসা সুন্দর বলে এরা দুজনই ভেতর ভেতর অস্থির, অশান্ত।
এবং দু'জন দুজনকে মিস করছে বলে কেউ দেশে বসে তড়পাচ্ছে আর কেউ দেশের বাইরে বসে আকাশপানে তাকিয়ে দিন গুনছে। ঐশ্বর্য দৃষ্টি ফিরিয়ে একবার শুদ্ধর দিকে তাকাল। তারপর রুবাবের দিকে। আসলে ভালোবাসতেই জানতে ভালোবাসা সুন্দর। এরপর আর কিছুক্ষণ কথা বলে শুদ্ধ তার লেপটপ নিয়ে রুমে চলে গেল। ঐশ্বর্যের এদের সকলের বন্ডিং দেখে আজকাল লোভ হয় ;এমন একটি সুখী পরিবারের লোভ। সে মনে মনে কিছু ভেবে শতরুপা চৌধুরী কোলে মাথা রাখল। শতরুপা
তার চুলে বিলি কাটতে কাটতে চৌধুরী নিবাসের সদস্যদের নিয়ে পুরনো গল্প তুলল। ঐশ্বর্য মন দিয়ে শুনতে লাগল সেসব গল্প।

এভাবে কেটে গেল আরো কয়েকটাদিন। একদিন রাতের খাবারের পরে শুদ্ধ জানাল, সে কিছুদিনের জন্য সুইডেন যাবে। সেখানে কিছু কাজ সেরে একেবারে সবাই মিলে দেশে ফিরবে। এই নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গেও কথা হয়েছে তার। শুদ্ধ কাজের মানুষ কাজ থাকতে পারে ভেবে কেউ বাঁধা দিলো না। তবে ঐশ্বর্য মলিন হাসল কথাটা শুনে। কারণ শুদ্ধ যে ইগরের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে বুঝতে বাকি নেই। কিছু বলারও নেই আর এসব নিয়ে। কি বলবে? শুদ্ধকে বারণ করা কিংবা কিছু বলার মুখ নেই তার। কারণ ইগর শুদ্ধর অনেক বড় ক্ষতি করেছে। যে ক্ষতি পূরণ সে কখনো দিতে পারব না। কেউ না জানুক সে তো জানে শুদ্ধর কত কষ্টের ফর্মূলা হাত ছাড়া হয়ে গেছে। শুধু শীতলের সুস্থতার কথা ভেবে এতদিন চুপ ছিল। তার অবস্থা দেখে কিছু বলতে পারছিল না। কিন্তু এখন আর তাকে থামানো যাবে না। ফর্মূলা ফেরত পাওয়া না পাওয়ার আশা রাখে না তবে ইগরকে একটা শিক্ষা না দিলেই নয়। তাছাড়া শুদ্ধর সঙ্গে কাজ
করে খুব ভালো করে বুঝেছে শোয়াইব শুদ্ধর অসংখ্য গুনের মধ্যে একটি বিশেষ গুন সে উপকারী অপকারী কাউকেই ভোলে না।
_______________

এখন দুপুর একটা। ঘন কালো মেঘে ঢেকে আছে আকাশ। ঝমঝমিয়ে
বৃষ্টি নামতে পারে যখন-তখন। বাসা থেকে বের হওয়ার পর আবহাওয়া দেখে শখের মনে পড়ল সঙ্গে ছাতা নেই। মেজো মাকে দিয়েছিল তারপর ব্যাগে ঢুকাতে ভুলে গেল। কথা হচ্ছে,বৃষ্টি নামার আগের ভালোই ভালোই
বাড়ি পৌঁছাতে পারলেই বাঁচে। মনে মনে এসব ভেবে সে দুটো ক্লাস করে
মেডিকেল কলেজ গেটের কাছে আসতেই হঠাৎ দেখা হলো আহনাফের বোনের সাথে, সঙ্গে আহনাফের বাবা-মা ছিল। তাকে দেখে উনারাও থম মেরে দাঁড়িয়ে গেলেন। মলিন মুখ আরো মলিন হলো। চোখাচোখি হলে শখ বিনয়ী স্বরে সালাম দিলে উনারা সালামের জবাব দিলেন। টুকটাক কথা বলতে বলতে কেঁদেই ফেললেন। আহনাফ বেঁচে থাকলে এতদিনে শখ উনাদের বাড়ির একমাত্র পুত্রবধূ হতো। কিন্তু সেসব কিছুই হলো না।
ছেলেটাকে কারা যেন তুলে নিয়ে গিয়ে মারতে মারতে মেরেই ফেলেছে।
এত পরিমান মেরেছে যে তাকে চেনা মুশকিল হয়ে যাচ্ছিল। কে বা কারা যে উনাদের এতবড় সর্বনাশ করেছে আল্লাহ জানে। তবে আহনাফের কেস চলমান। পুলিশ নাকি এখনো খুঁজে বেড়াচ্ছে অপরাধীকে কিন্তু ক্লু পাচ্ছে না। তবে উনারা আশাবাদী ছেলের খুনীদের একদিন খুঁজে বের করবেন।

এমন টুকটাক কথা হতে হতে মেঘ ডেকে উঠল। আকাশের অবস্থা দেখে উনারা চলে গেলেন হসপিটালের ভেতরে আর শখ এসে দাঁড়াল রাস্তার এপাশে। পাঁচ মিনিট দাঁড়ালে একটা রিকশা পেলে উঠে বসল। কাঁধের ব্যাগটা কোলের উপর নিয়ে চুপ করে বসে রইল। রিকশা চলতে লাগল
নিজ গতিতে। আপনাআপনি আহনাফের মুখটা মনে পড়ল। খুব খারাপ
লাগে মানুষটার জন্য। কিন্তু কিছু করার নেই মাকাল ফলের মতো কিছু মানুষ আছে যারা দেখতেই সুন্দর, কোনো কাজের না। মনুষ্যবোধটুকু যার মধ্যে নেই তাকে অবশ্য মানুষ বলাও চলে না। আজ খুন হয়েছে বলে কষ্ট লাগছে। কিন্তু মানুষ ওদের সঙ্গে যা করেছে সেটা ক্ষমা করার মতো না।

এসব ভাবতে ভাবতে দুঃভাগ্যবশত সেই রিকশা কিছদূর গিয়েই নষ্ট হয়ে গেল। রিকশা ওয়ালা মুখ কাঁচুমাচু করে জানালেন রিকশা ঠিক করাতে
নিয়ে যেতে হবে। কি আর করার শখ আশেপাশে তাকিয়ে রিকশা থেকে নামল। এইটুকু আসার পথের ভাড়া মিটিয়ে হাঁটা ধরল ফুটপাতের রাস্তা ধরে। হাঁটতে অবশ্য মন্দ লাগছে না। সমস্যা হচ্ছে ছাতা নেই বৃষ্টি নামলে আরেক বিপদ। একথা ভাবতে ভাবতে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। বড় বড় বৃষ্টিরফোঁটা আছড়ে পড়ল পিচঢালা রাস্তায়। ভিজিয়ে দিলো তাকেও।
আশেপাশেও দোকান নেই যে দৌড়ে গিয়ে গা বাঁচাবে। ততক্ষণে ভিজেও একশা অগত্যা হাঁটতে হাঁটতে ভিজতে থাকল। তখনই একটা গাড়ি এসে
ব্রেক কষল তার পাশে। চমকে উঠে সরে দাঁড়াতেই গাড়ির মালিক দ্রুত জানালা খুলে তাকাল। কৌতুহলী কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল,

-'আরে শখ না? ভিজছো কেন জ্বর আসবে তো?'

শখ এখন এখানে অর্ককে দেখে শখ সালাম দিলো। ভাইয়ের বন্ধুদের সে যথেষ্ট সমীহ করে চলে। যতটুকু কথা না বললে নয় ততটুকুই বলে নতুবা এড়িয়ে চলে। শখ জবাব দেওয়ার আগে গাড়ির এ পাশের জানালাটাও তুলে অর্কের মা বললেন,

-'মামনি ভিজছো কেন?'

-'রিকশা পাচ্ছিলাম না তাই..!'

-'এসো এসো গাড়িতে উঠে বসো। এই বৃষ্টিতে ভিজলে জ্বরে পড়বে।'

-'না আন্টি সমস্যা নাই আর একটু এগোলেই রিকশা পেয়ে যাব। তাছাড়া আমার ড্রেস ভিজে গেছে গাড়িতে আর না উঠি।'

-'আরে কিছু হবে না উঠো তো তুমি।'

উনার একপ্রকার জোরাজোরিতে শখ পিছনের সিটে বসল। কথা বলতে বলতে চৌধুরী নিবাসের গেট দিয়ে ডুকল গাড়ি। শখ নামলে উনারা চলে গেলেন। শখ এত করে ভেতরে যেতে বলল শুনলেনই না। আসলে উনারা
জরুরি কাজে বেরিয়েছিলেন বসলে আরো দেরি হবে আরেকদিন এসে ঘুরে যাবে বলে বিদায় নিলেন।
________________

-'ভাই আপনের বিয়াতে আমারে নতুন পাঞ্জাবি কিইন্না দিবেন।'

-'বর তুই না আমি?'

-'আপনে।'

-'তাহলে তুই কোন দুঃখে নতুন পাঞ্জাবি পরবি?'

-'আমার ভাইয়ের বিয়া আমি না পরলে কেডা পরবো কন?'

-'শালা তুমি আমার বউ হারাইয়া দিসিলা মনে নাই? তোমারে দিবো নতুন পাঞ্জাবি? ওয়েলকাম ড্রিংকস খাবা না? চট্টগ্রামের কথা মনে নাই, হুম?
পাঞ্জাবি না তোমারে তো ওয়েলকাম ড্রিংকস গেলাব পাখি, কাছে এসো দেখি।'

আজম মুখ কাঁচুমাচু করে দুপা পেছনে সরে দাঁড়াল। এই নিয়ে কতবার যে একই খোঁচা শুনল হিসাব নাই। পার্টি অফিসের রুমে বসে আজম আর সায়ন কথা বলছিল। তখন একটা ছেলে এসে বলল,

-'ভাই আপনের বুইন আইছে।'

সায়ন ভ্রুঁজোড়া কুঁচকে আজমকে বলল,

-'বুইড়া বয়সে বোন কোথায় কুড়িয়ে পেলি?'

সায়নের কথা শুনে ছেলেটি ভুল শুধরে দিয়ে বলল,

-'আজম্যের না আপনের ছুডু বইন আইছে। রাস্তায় কানতে কানতে যাইতেছিল আমি দেইখা দাঁড় করাইছি।'

সায়ন এবার তড়াক করে উঠে বাইরে গেল। শীতল বাইরে দাঁড়িয়ে চোখ মুছছে ঘনঘন। কাঁদতে কাঁদকে চোখ মুখ লাল করে ফেলেছে। এইরে কী হলো আবার? শুদ্ধ সারাদিনে তাকে কতশতবার ফোন করে। তার ঘুরে ফিরে ওই একটায় কথা ',ভাইয়া চোখ-কান খোলা রেখো। আমি যতবার দেশের বাইরে আসি ততবারই কিছু না কিছু ঘটে। শীতলের দিকে নজর রেখো। ওকে একা ছেড়ো না। ' শুদ্ধর কথা শুনে সে আজ সকালে নিজে শীতলকে কলেজে রেখে রেখেছে। আনতেও যেতো কিন্তু শীতল আগেই চলে এলো কেন? তার কলেজ তো ছুটি দিবে আরো আধাঘন্টা পর। সে দ্রুত শীতলের কাছে যেতে শীতলের চোখের পানি বাঁধ ভাঙল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। শুদ্ধর জন্য কাঁদছে দেখে সায়ন তার মাথায় হাত রেখে আদুরে সুরে বলল,

-'শুদ্ধ সামনে সপ্তাহেই চলে আসবে। কাঁদে না বোন। আইসক্রিম খাবি?'

শীতল না বোধক মাথা নাড়িয়ে হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,

-'কিয়ারাকে খুঁজে দাও ভাইয়া।'

-' কোন কিয়ারা? কি হয়েছে তার?'

-'আমার বান্ধবী।'

-'রুবাব এলে ঘনঘন আসত ওই মেয়েটা?'

-'হুম।'

-'কি হয়েছে তার?'

-' ওকে চাঁদরাত থেকে খুঁজে পাওনা যাচ্ছে না। আমি জানি ওর কারো সাথে সম্পর্ক নেই। সে পালিয়ে যায় নি। ও ওইরকম মেয়েই না। আমার মন বলছে সে বিপদে পড়েছে। তুমি কিছু একটা করো ভাইয়া।'

-'সে নাহয় করলাম। কিন্তু তুই কাঁদছিস কেন? এ খবর তোর প্রতিদেবের কাছে পৌঁছালে আমাকে যে শূরে চড়াবে। থাম বোন, কাঁদে না, আচ্ছা দুদিন সময় দে আমি খুঁজে দেবো তোর বান্ধবীকে।'

এমন টুকটাক কথা বলতে বলতে সায়ন দোকান থেকে আইসক্রিম নিয়ে
শীতলের হাতে ধরিয়ে দিলো। আজমকে কাজ দিলো কিয়ারার বাড়ির খোঁজ নিতে। তারপর নানান কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেল বাড়ির দিকে।

শুদ্ধ যাওয়ার আগে শীতলকে নিয়ে নিজে গিয়েছিল শীতলের কলেজে।
এতদিন ক্লাস না করায় কথা বলে এসেছিল। এখন রেগুলার তাকে ক্লাস করতে হয়। কিন্তু আগে কলেজে যেতে যতটুকু ইচ্ছে করত এখন তাও করে না। কিয়ারাকে ছাড়া ভালো লাগে না। কিয়ারা কলেজে আসে না দেখে কিয়ারার খোঁজ করে জানতে পারে সে এক খ্রিষ্টান ছেলের সঙ্গে নাকি পালিয়েছে। ধর্মও চেঞ্জ করে ফেলেছে। একথা বিশ্বাস না করতে পারে নি সে তাই আজ তাড়াতাড়ি কলেজ ছুটি হওয়ায় একাই গিয়েছিল কিয়ারাদের বাসায়। এর আগেও গিয়েছিল তবে বাড়িতে কেউ ছিল না।
কিন্তু আজ কিয়ারার বাবা- মা কে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই উনারা
যা নয় তাই বলে অপমান করেছে। বাড়ির মেয়েরা পালালে বাড়ির লোক ভাবে বান্ধবীরাই যত নষ্টের গোঁড়া। বান্ধবীরাই ভদ্র মেয়েদের মাথা খায়।
প্রেম টেম করার জন্য এরাই বখাটে, নেশাখোর ছেলেদের দিকে লেলিয়ে দেয়। কিন্তু এটা দেখে না সবসময় বান্ধবীদের দোষ থাকে না। বান্ধবীর মতো বান্ধবী হলে তারা কখনো ভুল কাজে প্রশ্রয় দেয় না। তাকে অযথা ভুল বুঝছে দেখে কিছু বলার সুযোগও দিলেন না উনারা নিজেদের কথা শেষ করে মুখের উপর দরজা আঁটকে দিয়েছে। এভাবে কখনোই কারো কাছে অপমানিত হয় নি শীতল। তাই কাঁদতে কাঁদতে এসেছে সারাপথ।
তবে মনের ভেতর কিছুটা অভিমানও জমে কিয়ারার উপর। তাকে খুঁজে পেলে সব অভিমান উগলে দেবে।

To be continue.….!!

02/11/2025

# #শেষ_চৈত্রের_ঘ্রাণ
#নূরজাহান_আক্তার_আলো
[৬৪]

টানা একমাস ধৈর্য্য ধরে থাকতে পারলেও আজকে রুবাব খুব অসহায় বোধ করছে। পাগল পাগল লাগছে নিজেকে। বুকের ভেতর এত জ্বলছে যে জ্বালাপোড়ার তীব্রতা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাচ্ছে,সে আর না পেরে
মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে কেঁদে ফেলল। শতরুপা চৌধুরীও পাথর হয়ে চুপ করে বসে আছেন। মেয়েটাকে এত করে বোঝানোর পরও মেয়েটা একই ভুল করল। আচ্ছা, সুইসাইড কি সব সমস্যার সমাধান হতে পারে?যে ছেলেটা তার জন্য চাকরির পরোয়া না করে দিনের পর এখানে পড়ে আছে।
এত ভালোবাসছে। আগলে রাখছে। প্রতি মুহূর্তে মনোবল শক্তি বাড়াতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যে চেহারা দেখে মানুষ ভয়ে দুই পা পিছিয়ে যাবে সেই চেহারাতে সে অনবরত চুমু খেতে দ্বিধা করে না। সেই ছেলের কি এই প্রাপ্প্য? এই তার ভালোবাসার মূল্য? ঐশ্বর্য কেন বিবেকের কথা শুনছে না? এতদিন এই চিনলো রুবাবকে? রুবাব চাইলে কি ছাড়তে পারত না? গতদিনগুলোতে কী কম অশান্তি করেছে ঐশ্বর্যের সৎ বাবা?
উনি নিজেও রাগ করে ছেলের সঙ্গে কথা বলায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন!
তখন কি রুবাব অজুহাত দেখাতে পারত না? অবশ্যই পারত কিন্তু করে নি। কারণ ছেলেটা ভালোবাসে আর ভালোবেসে আগলে রাখতে জানে।
তবুও কেন এত পাগলামি? কেন বার বার সুইসাইড করতে চাচ্ছে সে?
সিঙ্গাপুর আসার পর থেকে তিন তিনবার সুইসাইড করতে চেয়েছে সে।
সুইসাইডই যদি করে তাহলে এখানে পড়ে থেকে অযথা কার জন্য এত কষ্ট করছে? আগের দুইবারের কথা নাহয় বাদ আজ সকালে সুইসাইড করার ব্যাপারটা মানতে পারলেন না শতরুপা চৌধুরী। কেন জানি খুব রাগ হলো। সচারাচর বাইরের কারো সামনে রাগ দেখান না তিনি। তবে আজ মনে হলো মেয়েটাকে কিছু বলা দরকার। তাই তিনি ছেলের মাথা সরিয়ে উঠতে গেলে রুবাব উনার পা ধরে ফেলল। হাঁটুতে মাথা ঠেঁকিয়ে কান্না ভেজা কন্ঠে বলল,
-' প্লিজ ওকে কিছু বোলো না আম্মু। ওর মাথা ঠিক নেই।কি করতে চাচ্ছে,ও নিজেই জানে না। বোকাটা আমার ভালোর জন্যই আমার থেকে দূরে পালাতে চাচ্ছে। অথচ একবারও ভাবছে না তার মধ্যে আমার সব ভালো থাকা। ওর কিছু হলে আমি মরে যাব একেবারে শেষ হয়ে যাব।'
শতরুপা চৌধুরী শক্ত মুখে ছেলের দিকে তাকিয়ে আচমকা এক থাপ্পড় মেরে দিলে রুবাবের বা গালে। তারপর রুবাবের হাত ধরে টেনে কেবিনে
প্রবেশ করলেন। ঐশ্বর্য তখন চোখ বুঝে শুয়েছিল। কারো আসার শব্দে চোখ খুলে উনাদের দেখে উঠে বসল। গায়ে ওড়না টেনে মুখের ঝলসে যাওয়া অংশটুকু ঢেকে ফেলল। আরো ছিল তবে সার্জারি করে অনেক অংশ স্বাভাবিক রুপে ফিরে এসেছে। তবে চোয়াল থেকে গলার শেষ অবধি কেমিক্যাল ঝলসানো। এখানেই একটু বেশি ক্ষতি হয়েছে। তবে ডাক্তার হাল ছাড়ে নি বরং উনারা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। শতরুপা চৌধুরী ঐশ্বর্যের সঙ্গে কখনো কড়া সুরে কথা বলেন নি। কটুবাক্য কিংবা খোঁচা দেন নি। তবে আজ রাগের মাত্রা এতটাই প্রখর যে আজ উনি নিজের
সত্তা থেকে সরে গেলেন। কঠিন স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,
-' সুইসাইড করবে? মৃত্যু এত সহজ! মরার আগে গ্যারান্টি দিয়ে যাও তোমার কারণে আমার বুক খালি হবে না। যদি তোমার কারণে আমি সন্তানহারা হই তাহলে তুমি আমার অভিশাপ থেকে একচুলও মাফ পাবে না।'
ঐশ্বর্য নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুনে গেল উনার কথা। শতরুপা চৌধুরী এতদিন রুবাবের সামনেও কখনো কাঁদে নি। বোঝান নি উনার বুকের অদৃশ্য দহন। তবে আজ পারলেন না কেঁদে ফেলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
-' ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট তোরা বুঝিস? আমি বুঝি; আমি। আমিও কাউকে ভালোবেসেছি। এতগুলো দিন সংসার করেছি। একটা সন্তানের মা হয়ে বিধবা হয়েছি। সে আমাকে রেখে একাই চলে গেছে। এত ভালোবেসেছি তবুও সঙ্গে নেয় নি। সে নেয়নি বলে কি আমি মরে গেছি? হ্যাঁ, ভেতরে ভেতরে ঠিকই মরেছি তবে উপর উপর ঠিকই তো বেঁচে আছি। কেন বেঁচে আছি? আমার সন্তানের জন্য। আমার রুবাবের জন্য। আজ সেই রুবাব বলে কী না তোমাকে না পেলে মরে যাবে। একজন চলে গিয়ে আমাকে অর্ধেকটা শেষ করেই দিয়েছে এখন আরেকজন যাওয়ার সুর তুলেছে।'
এইটুকু বলে শতরুপা থামলেন। জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে পুনরায় বললেন,
-'ভালোবাসা! ছেড়ে যাওয়া! কষ্ট! বিচ্ছেদ এগুলো কী তোমরাই বুঝো? আমরা বুঝি না? আমরা সেকেলে? নাকি ভালোবাসা শুধু তোমাদের জন্যই তৈরি? রুবাবের সাথে আমিও ছুটে এসেছি কেন এসেছি, বলতে পারো? কি ভাবো আমার ছেলের প্রতি নজর রাখতে? তাকে যেন বশ করতে না পারো খেয়াল রাখতে? তাহলে বলব মোটেও তা নয়! তোমার ভাবনা উন্নত করা প্রয়োজন। সত্য কথা সবসময়ই অপ্রিয়ই হয়। তবুও আমি সত্য কথা অকপটে বলতে পছন্দ করি। এবং বলছি যে শুনতে খুব খারাপ লাগছে তুমি এতিম! পৃথিবীতে তোমার কেউ নেই। তোমার বিপদ যে একবার কেউ দেখে যাবে সেই মানুষটাও তোমার নেই। অথচ আমরা যখন তোমার জন্য লড়ে যাচ্ছি তখন তুমি সুইসাইড করার চিন্তা মাথায় গেঁথে রাখছ! কেন? বলো? সেই কারণ বলার সৎ সাহস আছে তোমার? নাকি সেই একই বুলি আওড়াবে, আমার ছেলে আবেগে ভাসছে। আফসোসে পুড়ে মরবে, হ্যান-ত্যান। তোমায় ছেড়ে দিলে আরো আগেই দিতো আর ছাড়ার অনেক রিজন ছিল। বাংলাদেশ থেকে আসার পর তোমার ছোট ছোট সার্জারি হয়েছে। সার্জারির জন্য নিয়ে যাওয়ার পর রুবারের কান্না দেখেছো? ছোটো বাচ্চারা প্রিয় মানুষ হারালে যেভাবে কাঁদে ও সেভাবে কাঁদে। আর আমি মা হয়ে সব দেখি সব সহ্য করি। আমাকে দেখছো না, আমি একজন বিধবা নারী; আমি মা; আমার সন্তান জন্ম দিয়েছি। হাতে বুকে পালন করেছি। আমার এই জার্নি মোটেও সহজ ছিল না। ছেলেকে মানুষ করতে আমাকে কত সাফার করতে হয়ছে। অথচ সেই ছেলেটাকে বিয়ে করানোর জন্য এত চেষ্টা করেও পারি নি৷ কেন পারি নি কারণ সে তোমাকে ভালোবাসে, তোমাকে চায়। এরপর আমি তোমাদেরকে মেনে নিয়েছি অথচ তুমিই বেঁকে বসেছিলে। আমার আরেকটা ছেলের শুদ্ধর তৈরি করা ফর্মূলা বাঁচাতে তোমার এই হাল। তুমি আমার ছেলের হাসির কারণ। তোমার বিপদে আমি ছেড়ে দিতে পারি না। তোমার প্রতি আমার দায়িত্ব আছে। মোদ্দাকথা, তোমার প্রতি আমার সফ্ট কর্ণার আছে আর সেইজন্য আমি তোমার মা হতে এখানে এসেছি। অথচ তুমি ভুল করেও আমায় মা বলে ডাকো নি। আজ কথা বলো। সরাসরি বলো তোমার কী সমস্যা? সমস্যা যদি তোমার রুপই হয় তাহলে আবারও বলছি তাতে আমি কিংবা আমার ছেলের কোনো সমস্যা নেই। আর যদি অন্য কোনো সমস্যা হয় তো সেটাও খুলে বলো। দুদিন পরপর একজন সিরিয়াস হও তো আরেকজন বেঁকে বসো। এভাবে কোনো সুস্থ সম্পর্ক হতে পারে না।
যে বুঝ নেয় তাকে বোঝানো যায় কিন্তু তুমি বুঝেও বুঝছো না ঐশ্বর্য।
আমরা বোঝাতেই আছি তুমি তোমার ভাবনা ধরে সুইসাইডের ধান্দায় থাকছো, এভাবে কতদিন? কতবার? বার বার ভাগ্য সহায় হবে না। মুখ খুলে বলো কেন সুইসাইড করতে চাচ্ছো? কি সমস্যা তোমার? '
ঐশ্বর্য মাথা নিচু করে নীরবে কাঁদছে। রুবাবও পাথরের মতো স্থির হয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। মায়ের একাকিত্ব নিয়ে এভাবে কখনোই ভাবে নি সে। হ্যাঁ মা অনেকদিন বলেছে চাকরি ছেড়ে চলে আসতে। এই চাকরির কারণে দেখা যাবে মায়ের জানায়া পড়াতে পারবে না। মায়ের কথা শুনে রুবাব রাগ দেখালেও কখনো সিরিয়াসভাবে ভাবে নি। ভীষণ শখ করে এই চাকরিতে জয়েন করেছিল সে। আজকে মায়ের কথা শুনে নিজেকে খুব ছোট লাগছে। আগে ভাবত সে ভালো আর যাই হোক সে মায়ের কাছে ভালো ছেলে। কিন্তু না সে মায়ের কাছে ভালো ছেলে হতে পারে নি। ভালো প্রেমিক হতে পারে নি। আচ্ছা এই আফসোসটুকু রাখবে কোথায়? এতদিন ভাবে নি বিধায় কিছু মনে হয়নি, আজকে থেকে বুকের গহীনে জমানো এই আফসোসটুকুই তার বুক পাঁজর ঝাঁঝরা করতে থাকবে। মৃত বাবার কাছে হাশরের ময়দানে জবাব দেবে কি? যে মা তাকে এত কষ্ট করে মানুষ করেছে ভালোবাসার মানুষকে পাওয়ার বাসনায় মায়ের কথায় গুরুত্ব দেয় নি সে। কখনো ভাবে নি শক্ত খোলসে আবৃত করা মা,তার সঙ্গ চায়। সুন্দর কিছু মুহূর্ত চায়! মনে মনে এসব ভেবে রুবাব লাল বর্ণ চোখে তাকাল ঐশ্বর্যের দিকে। মায়ের সামনে সরাসরি প্রশ্ন ছুঁড়ল,
-'কি চাও ঐশ্বর্য?'
তিন শব্দের একটি বাক্য তবুও বলতে অনেক কষ্ট হলো রুবাবের। বুকটা ভার হয়ে আছে। ঐশ্বর্য নীরবে কাঁদলেও রুবাবের কথা শুনে শব্দ করে কেঁদে ফেলল। তাকে কাঁদতে দেখেও রুবাব এগিয়ে এলো না। পূর্বের মত
উতলা হয়ে কিছু জিজ্ঞাসাও করল না। তবে মলিন মুখে তাকিয়ে দেখল ওর কান্না। ঐশ্বর্য অঝরে ঝরে যাওয়া অশ্রুসিদ্ধ চোখে দিকে তাকিয়ে রুবাব বলল,
-' আমার দেখা বেস্ট জুটি কে জানো? আমাদের শুদ্ধ- শীতল। ওদের ভালোবাসা দেখেছো? ঝগড়া-মারামারি, খুনশুঁটি, ভালোবাসা কোনো কিছুর কমতি নেই। শুদ্ধ বুঝদার আর শীতল চঞ্চল, অবুজপণা, জেদী। শীতল যত ভুলই করুক সেই ভুলের বিচার শুদ্ধ করে। যা শাস্তি দেওয়ার সে দেয়। বাড়ির কেউ যদি মারে বা বকে শুদ্ধ রেগে যায়। আবার শুদ্ধের পাশে বসলে বা শুদ্ধর জিনিস বাইরের কেউ নিলে শীতলের মুখের দিকে তাকানো যায় না। বাঁধা বিপত্তির পর শীতল মাঝরাতে আবদার করেছে বিয়ে করবে শুদ্ধ মাঝরাতেই বাড়ির সবাই হাজির করেছে। হাসপাতালে বিয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে গেছে। কারণ তার হারানোর ভয় নেই।
তুমি মাঝে মাঝে শীতলের মতো অবুজ কেন হওনা ঐশ্বর্য? কেনো কারনে অকারণে আবদার করো না? কেনো জেদ করে বলো না বিয়ে করার কথা?
তুমি ম্যাচিউর, স্বর্ণ ম্যাচিউর, তোমরা আগে-পিছে শতশত বার ভাবো।
এত ভাবতে বলে কে তোমাদের? তোমরা ম্যাচিউর বলেই আমায় আর সায়ন ভাইকে শুদ্ধ গোঁ হারান হারিয়ে দিয়েছে। চোখে আঙুল দিয়ে বার বার দেখিয়ে দিয়েছে ম্যাচিউর হলেই হয় না অধিকার খাটিয়ে চাইতেও জানতে হয়। যেটা শীতল তোমাদের ছোটো হয়েও খুব ভালো পারে। সে দুনিয়াদারী সম্পর্কে বুঝে কম তবে তার ছোট্ট পৃথিবীতে শুদ্ধ সবকিছুর আগে।'
রুবাব থামল। হাতের কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে চোখের কোণা মুছে পুনরায় বলল,
-'আমি তোমাকে চাই ঐশ্বর্য। এই এক্সিডেন্টের আগে যেভাবে চাইতাম।ঠিক সেভাবেই চাই। তোমার ঝলসানো চেহারা নিয়ে আমার আক্ষেপ নেই। অভিযোগ নেই। মন খারাপও হয় না। তবে তোমাকে কষ্ট পেতে দেখলে কষ্ট পাই। স্বাভাবিক হও! তুমি বুঝদার হয়ে কেন পাগলামি করছো ঐশ্বর্য? শীতল অসুস্থ হয়ে শুদ্ধকে ছিনিয়ে নিয়েছে। আর তুমি অসুস্থ হয়ে আমার থেকে পালাতে চাচ্ছো! আমি তুলনা করছি না তবে আজকে না বলেও পারছি না।'
এইটুকু বলে রুবাব শার্টের হাতায় চোখ মুছল। পকেট হাতড়ে ফোন বের করে সময় দেখে পানির গ্লাস আর ওষুধ এগিয়ে দিলো ঐশ্বর্যের দিকে।
ঐশ্বর্য ওষুধ নিলো না বরং রুবাবের হাতে কপাল ঠেকিয়ে কাঁদতে থাকল কান্না জড়িত সুরে বলতে লাগল,
-'মা সরি! আর করব না! আর হবে না। নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়।
মাথায় ঘুরপাক খায় তুমি আমাকে দয়া দেখাচ্ছো।'
এইটুকু বলে ঐশ্বর্য মাথা তুলে এদিক ওদিক তাকালেও শতরুপা চৌধুরী কে দেখতে পেল না। বেড থেকে নামতে গেলে রুবাব তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
-'শান্ত হও আমাকে ইশারা করে জানিয়ে বাইরে গেছে। বুঝেছে আমাদের প্রাইভেসি দেওয়া দরকার।'
-'মাকে ডাকো রুবাব। সরি বলতে হবে মাকে।'
-'সরিতে কিছু যায় না। তুমি যদি ভুলভাল সিদ্ধান্ত না নাও দেখবে সরিও বলতে হবে না।'
ঐশ্বর্য একবার তাকিয়ে চট করে রুবাবকে জড়িয়ে ধরল। এতশক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রুবাব ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আঁটকাতে চেয়েও পারল না। এই একটা মাস চেয়েও ঐশ্বর্যকে বুকে নিতে পারে নি। চেষ্টা করেছে তবে ঐশ্বর্য ছিঁটকে সরে সরে গেছে। অবশেষে বুকের মানুষটি বুকে ফিরে শান্তি মিলেছে।
______________
ঘড়িতে বিকাল সাড়ে চারটা। দুপুরে খেয়ে ভাতঘুম দিয়ে কেবল উঠেছে সায়ন। সিরাত আর সিঁতারা কিছু কাজে বাইরে যাবেন। সিমিন বাড়িতে থাকবেন। সায়ন নিচে নেমে উনাদের তাড়াহুড়ো করে বের হতে দেখে
জিজ্ঞাসা করল,
-'কোথায় যাচ্ছো তোমরা?'
-'একটু কাজ আছে বাইরে যাব। তুই কি এখনই বের হবি? সিমিন বিকেলের নাস্তা বানাচ্ছে খেয়ে বের হবি।'
-'একা একা যাবে?'
-'কই একা দুজন যাচ্ছি তো।'
-'খুব বেশি পারসোনাল কাজ আমি গেলে কিছু হবে?'
-'তুই গেলে তো ভালোই হবে।'
-'একটু দাঁড়াও ড্রেস চেঞ্জ করে আসি।'
একথা বলে সায়ন রুমে গিয়ে ড্রেস বদলে স্বর্ণের রুমের একবার উঁকি মারল। স্বর্ণ পেছনে ঘুরে চুলে বিনুনি করছে দেখে দৌড়ে গিয়ে আচমকা দুই গাল চেপে ধরে ঠোঁটে একটা শক্ত কামড় দিয়ে পুনরায় চুমু খেয়েই দৌড়। ঘটনা কি ঘটনা সেটা বুঝতে স্বর্ণ কয়েক সেকেন্ড লাগল। এদিকে সায়নের টিকিটুকুও চিহ্ন নেই। স্বর্ণ পুনরায় বাকি বিনুনি গেঁথে রাবার পেঁচিয়ে নিলো। তারপর নিচে গিয়ে দেখল সায়ন ভদ্রবেশে মা-চাচীর পাশে দাঁড়িয়ে আছে। কে বলবে নিচে নামার সময় কি কাজটা করেছে সে। স্বর্ণ মাকে রান্নাঘরে দেখে সেদিকে গেল আর সায়ন মায়ের সাথে বেরিয়ে গেল। ভালো মুডে আসলেও উনাদের কিসব কেনাকাটা আর দামাদামির বহর দেখে মনে হচ্ছে জীবনের দেখছে। উনাদের ঢিলেমি দেখে সায়ন বলল,
-'আম্মু এদিকে ঢুকলে কেন শপিং মল তো ওইদিকে?'
-'এদিক থেকে কিছু জিনিস কিনে মলে যাব। এ্যাই সায়ন খবরদার বলছি তাড়া দিবি না। আমরা তোকে ডাকি নি বরং তুই নিজে থেকে এসেছিস।'
-'এসেছি কি সাধে? বাবা চাচারা শেষ বয়সে বউ হারিয়ে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে যেন কাঁদা না লাগে এজন্যই তো এলাম।'
ছেলের কথা শুনে সিঁতারা ছেলের পিঠে একটা মেরে হেসে ফেললেন। তখন কোথা থেকে তিনজন মহিলা উপস্থিত হলো। মুহূর্তে জানা গেল, উনারা সিঁতারার বাপের বাড়ির প্রতিবেশী। এরপর শুরু হলো মহিলাদের গল্প। কার মেয়ে পালিয়েছে, কার কে মারা গেছে, কার স্বামী কবে বিয়ে করেছে, কার বউ কোন কল মিস্ত্রির সাথে পালিয়েছে মিনিটের মধ্যেই এসব কাহিনি বলাও শেষ ; শোনাও শেষ। উনাদের গল্পের ধরণ দেখে
সায়নের মনে হলো এ গল্প ইহজীবনে শেষ হওয়ার নয়। তাই সে ধীরে ধীরে ফোন স্কল করতে করতে সরে দাড়াল। তবে উপলব্ধি করল সেই প্রতিবেশী মহিলার সঙ্গে থাকা উনার ছোট পুত্রবধূ তার আপাদমস্তক দেখছে। বারবার দেখছে। ব্যাপারটা তেমন আমলে না নিলে পরে বুঝল ছ্যাচড়া মেয়ের বদনজরে পড়ে গেছে। সে হাতে থুথু নিয়ে বুকের এদিক ওদিক মুছল। তারপর পালিয়ে বাঁচতে মাকে তাড়া দিলে ওই মহিলার পুত্রবধূ সিঁতারাকে বলল,
-' মামনি আপনার ছেলের বিয়ে দিবেন না?'
সিঁতারা উত্তর দেওয়ার আগেই সায়ন মায়ের হাতটা বগলদাবা করে টানতে টানতে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
-' উদ্দেশ্য বুঝে ভালো লাগল। দোয়া করি, আল্লাহ আপনার ভালো করুক আপনার স্বামীর বউ মরুক। ভালো থাকবেন, দূরে দূরে থাকবেন, ধন্যবাদ।'
এ কথা বলে সায়ন কোনোমতেই দাঁড়াতেই দিলো না। জোর করে টেনে ঠেলে শপিং মলে ঢুকল উনাদের নিয়ে।
To be continue........!!

Address

Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Sparrow - চড়ুই posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share