01/09/2024
বিএনপি আর আওয়ামী লীগ কি সত্যিই এক রকম দল?
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ, ১ সেপ্টেম্বর। ১৬ বছর ধরে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে বিএনপির প্রায় ৬০ লাখ নেতাকর্মী নিরন্তর আত্মত্যাগ করেছেন। তারা মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন, রাজপথে রক্ত দিয়েছেন। গণমানুষের অধিকার ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, গুম হয়েছেন; পঙ্গু ও নিঃস্ব হয়ে পড়েছে অসংখ্য ব্যক্তি ও পরিবার।
তবু নজিরবিহীন এ সংগ্রামের পরও অনেকেই আক্ষেপ করেন, বিএনপি আর আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে অনেকটা একই রকম। কিন্তু আসলেই কি তাই? আসুন দেখি, দল দুটির রাজনৈতিক ঐতিহ্য, অর্জন ও আদর্শ কী বলে?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিএনপির অবদান আলোচনা করলে প্রথমেই উঠে আসে পোশাকশিল্পের প্রসার এবং প্রবাসে শ্রমিক রপ্তানির গৌরবময় অধ্যায়; যা জিয়াউর রহমানের হাত ধরে সত্তরের দশকে শুরু হয় এবং আজও বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। আর খালেদা জিয়া অনন্য হয়ে আছেন প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশ ও শিল্পবিপ্লবের বহুমাত্রিক নীতিমালা প্রণয়নে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ আমলে দেশের অর্থনীতিতে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, একের পর এক শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, ব্যাংকিং খাতে লোপাট, জনগণের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্সের চাপ ও বৈদেশিক ঋণের লাগামহীন বোঝা।
স্বাধীনতার পর ভারত ও সোভিয়েতনির্ভর যে পররাষ্ট্রনীতি গৃহীত হয়েছিল, তার বদলে জিয়াউর রহমান সার্ক গঠনের পাশাপাশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন পশ্চিমা বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে। আধুনিক পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন বাংলাদেশে উন্মুক্ত করেছিলেন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, আইডিবি ও জাইকার দ্বার; বয়ে এনেছিলেন দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের অবারিত সুযোগ।
আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলে যুগের পর যুগ ধরে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে গেছে; মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে বিভাজন ও বৈষম্য তৈরির নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছে। অন্যদিকে বিএনপি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শ লালন করে এসেছে। নিশ্চিত করেছে সব শ্রেণি, পেশা, ধর্ম ও মতের মানুষের সমান অধিকার, সুযোগ ও নিরাপত্তা।
একের পর এক সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধের আওয়ামী প্রবণতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিএনপির প্রতিটি সরকার প্রেরণা জুগিয়েছে মত প্রকাশের স্বাধীনতায়; কখনও হস্তক্ষেপ করেনি গণমাধ্যমের স্বকীয়তায়। আওয়ামী লীগের মতো অর্থ দিয়ে ভুয়া-ভুঁইফোঁড় লেখক বানিয়ে নয়; বিএনপি আস্থা রেখেছে দেশ-প্রবাসের বিশ্লেষকদের ওপর, তাদের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবেদনের প্রতি।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আওয়ামী লীগ বারবার গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে এবং জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি প্রতিবার জনগণের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছে, লুণ্ঠিত ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার করেছে। আর তাই আওয়ামী লীগের বাকশাল ও ফ্যাসিবাদের বিপরীতে বাংলাদেশে গণআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে বিএনপির বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সংসদীয় গণতন্ত্রে।
খালেদা জিয়ার সরকারের সময় মেয়েদের শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং প্রথমবারের মতো দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর ফলে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সবার জন্য পাবলিক ও প্রাইভেট সেক্টরে সমভাবে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। মেধাবী নতুন প্রজন্মই দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে, অন্যায়ের প্রতিবাদে রুখে দাঁড়াচ্ছে। অথচ পরিবর্তনকামী এসব শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে নির্মম সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন চালিয়েছে গণবিরোধী আওয়ামী লীগ সরকার।
এটি আজ প্রমাণিত, অগণিত ছাত্র, জনতা ও রাজনৈতিক কর্মী মেরে, আয়নাঘর তৈরি করে ফ্যাসিজমকে চিরস্থায়ী রূপ দিতে চেয়েছিল আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন, পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ বাতিল করা হবে। শুধু তাই নয়, শেখ হাসিনার দ্বারা সুশীল সমাজ ও বরেণ্য ব্যক্তিরা ক্রমাগত অপমানিত হলেও, রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ত করতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন তারেক রহমান। নতুন বাংলাদেশে তিনি নিশ্চিত করতে চান ক্ষমতার ভারসাম্য, রাষ্ট্র পরিচালনার জবাবদিহি ও জনগণের সত্যিকার মালিকানা।
স্পষ্টতই বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ একে অন্যের পরিপূরক নয়। বিএনপি দেশের উন্নয়ন, আইনের অনুশাসন এবং জনগণের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নিবেদিত; যেখানে আওয়ামী লীগ বারবার গণতন্ত্রের প্রতি আঘাত হেনেছে, ভোটের অধিকার হরণ করেছে এবং সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করেছে। দুটি দলের আদর্শ ও ইতিহাসে বিশাল পার্থক্য রয়েছে এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও আন্তরিকতায়ও রয়েছে বিস্তর ফারাক। তাই আওয়ামী লীগের মতো সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে বিএনপির মতো একটি ত্যাগী দলকে এক করে দেখা কিছুটা অবিচারই বলা চলে।
বাংলাদেশের জনগণ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে, যেখানে ১২ কোটি ভোটারের ভোটে নির্বাচিত সরকার হবে সহিষ্ণু, জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক। সর্বজনীন এ আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে তারেক রহমানেরও লক্ষ্য এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে জনগণের ইচ্ছার মূল্যায়ন হবে এবং আর কখনও ফ্যাসিবাদ সৃষ্টি হবে না। তিনি বিশ্বাস করেন, তরুণদের সম্পৃক্ততা, তৃণমূলের ক্ষমতায়ন এবং সব শ্রেণি-পেশা-ধর্ম-মতের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণেই সম্ভব একটি ঐক্যবদ্ধ, সমৃদ্ধ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
ড. মাহ্দী আমিন: রাজনৈতিক বিশ্লেষক