10/03/2026
#আড়ালে_ভালোবাসি_ ৩
#মাশরিফা_সুলতানা
বৃষ্টি তখনও থামেনি পুরোপুরি।
আকাশের কালো মেঘগুলো যেন এখনো বিদায়ের আগে শেষ কান্নাটা ঝরিয়ে নিতে চাইছে। টিনের চালা ছেড়ে যখন সাকিব আর ইলা রাস্তায় নামল, তখন চারদিক ভিজে একাকার। মাটির পথটা কাদায় নরম হয়ে গেছে, ছোট ছোট পানির ধারা পথের পাশে গড়িয়ে যাচ্ছে।
দুজনেই পাশাপাশি হাঁটছে।
কিন্তু তাদের মাঝে যেন এক অদৃশ্য নীরবতা।
ইলা মাথা নিচু করে হাঁটছে। তার ভেজা চুল কপালে লেগে আছে, নীল–সাদা স্কুল ড্রেসটা বৃষ্টিতে ভারী হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে সে চুপচাপ সাকিবের দিকে তাকাচ্ছে, আবার দ্রুত চোখ সরিয়ে নিচ্ছে।
সাকিবও কিছু বলছে না।
তার মুখে কঠোর ভাব থাকলেও মাঝে মাঝে তার দৃষ্টি ইলার দিকে চলে যাচ্ছে। যেন সে নিশ্চিত হতে চাইছে—ইলা ঠিক আছে কি না।
বৃষ্টির ফোঁটা পাতলা হয়ে এলেও বাতাসে ঠান্ডা একটা শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে আছে।
হঠাৎ দূরে কোথাও বজ্রের গর্জন শোনা গেল।
ইলা থমকে একটু আকাশের দিকে তাকাল।
কালো মেঘের বুক চিরে হঠাৎ একটা তীব্র আলো ঝলসে উঠল—
পরের মুহূর্তেই আকাশ কাঁপিয়ে বাজ পড়ার শব্দ।
“ধড়াম!”
শব্দটা যেন চারদিকে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল।
ইলা হঠাৎ ভয় পেয়ে উঠল।
তার বুকটা কেঁপে উঠল যেন।
অজান্তেই সে সাকিবের দিকে ঝুঁকে পড়ল—
আর মুহূর্তের মধ্যে সাকিবকে জড়িয়ে ধরল।
সবকিছু যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল।
বৃষ্টি ঝরছে।
দূরের গাছগুলো বাতাসে দুলছে।
আর সেই ভেজা পথের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে দুজন মানুষ।
ইলার হাত শক্ত করে সাকিবের শার্ট আঁকড়ে আছে।
তার চোখ বন্ধ।
সে কাঁপা গলায় বলল—
“আমি… আমি খুব ভয় পাই বাজ পড়লে…”
সাকিব প্রথমে যেন একটু অবাক হয়ে গেল।
তার বুকের কাছে ইলার মাথা, ভেজা চুলের গন্ধ বাতাসে মিশে আছে।
তার হৃদয়টা হঠাৎ অদ্ভুতভাবে ধক করে উঠল।
সে ধীরে ধীরে বলল—
“ভয় পাস কেন?”
ইলা চোখ না খুলেই বলল—
“ছোটবেলা থেকেই ভয় লাগে…”
সাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর খুব ধীরে, খুব কোমলভাবে বলল—
“আমি আছি তো।”
কথাটা খুব সাধারণ।
তবু সেই মুহূর্তে যেন শব্দগুলো অন্যরকম হয়ে উঠল।
ইলার বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল।
সে ধীরে ধীরে চোখ খুলল।
তারপর বুঝতে পারল—সে এখনো সাকিবকে জড়িয়ে ধরে আছে।
মুহূর্তের মধ্যে তার গাল লাল হয়ে উঠল।
সে দ্রুত সরে গেল।
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
বৃষ্টি তখন হালকা হয়ে এসেছে।
আকাশে দূরে কোথাও আবার বিদ্যুৎ চমকালো, তবে এবার আর শব্দটা ততটা ভয়ংকর লাগল না।
সাকিব মৃদু গলায় বলল—
“এত ভয় পেলে একা একা হাঁটিস কেন?”
ইলা লাজুক কণ্ঠে বলল—
“আমি তো ভাবিনি বৃষ্টি হবে…”
তারপর একটু থেমে আবার বলল—
“আর… তুমি আসবে সেটাও ভাবিনি।”
সাকিব মুচকি হেসে ফেলল।
হাসিটা খুব ছোট, কিন্তু সত্যি।
ইলা সেটা দেখে অবাক হয়ে গেল।
কারণ সাকিবকে এভাবে হাসতে সে খুব কমই দেখেছে।
কিছুক্ষণ পর তারা আবার হাঁটা শুরু করল।
ভেজা পথ ধরে দুজন পাশাপাশি হাঁটছে।
চারদিকে বৃষ্টির গন্ধ, ভেজা মাটির সুবাস।
কিন্তু ইলার মনে হচ্ছিল—
আজকের এই পথটা যেন অন্যরকম।
কারণ এই বৃষ্টির মধ্যে, সেই আকস্মিক ভয় আর অজান্তে জড়িয়ে ধরা মুহূর্তটা—
তার হৃদয়ের ভেতরে অদ্ভুত এক অনুভূতির জন্ম দিয়েছে।
আর সাকিব?
সে বাইরে থেকে শান্ত থাকলেও ভেতরে ভেতরে অনুভব করছে—
ইলা যখন তাকে জড়িয়ে ধরেছিল,
তার হৃদয়ের ভেতরে যেন কিছু একটা বদলে গেছে।
সম্ভবত এই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যাই
তাদের জীবনের গল্পটাকে ধীরে ধীরে এমন এক দিকে নিয়ে যাচ্ছে—
যেখানে দুষ্টুমি আর ঝগড়ার আড়ালে
চুপচাপ জন্ম নিচ্ছে এক অদ্ভুত অনুভূতি।
চলবে......💝