15/07/2026
যখন ভর দুপুরে তৃষ্ণা আর ক্লান্তিতে শরীর জুড়িয়ে আসে, বুকে হাহাকার ওঠে অকারণে, তখন ফিরে যাই ছোট বেলায়। ক্লান্তিহীন শৈশব আমার! আমার পুরো শৈশব কেটেছে আমার দাদা দাদীর সাথে, আমার আব্বা আম্মার চেয়েও আপনজন ছিলেন যারা। আমার দাদী কোথাও বেড়াতে গেলে অবশ্যই আমার সাথে যাওয়া চাই। মাঝেমধ্যে এমন হতো স্কুল বাদ দিয়ে আমি দাদীর সাথে চলে যেতাম। আব্বা যখনই মারমুখী হয়ে তেড়ে আসতেন, দাদী নানান ছলে আমাকে আড়াল করে নিতেন। আমার দাদী, আমার দাদু, আমি আর আমার ভাই ডাকতাম দাদু আর দিদি বলে। গ্রামের মানুষ হাসতো, টিটকারি দিতো। মোসলমান ঘরের কেউ দিদি ডাকেনা, দিদি ডাকে হিন্দুরা! আমি কাঁদতে কাঁদতে দাদু আর দিদিকে এসে বিচার দিতাম। দিদি হেসে বলতেন, ডাকের মধ্যে ধর্ম নেই। আমি চুপ মেরে যেতাম, জায়নামাজে বসা দিদি বাকি নামাজ শেষ করতেন। তারপর তসবি যপতেন, তারপর অনেক্ষণ সময় নিয়ে, প্রশান্ত মন নিয়ে দোয়া পড়তেন। ততক্ষণে আমার দাদু মসজিদ থেকে ফিরতেন। আর আমার ভিতরের রাগ ততক্ষণে উড়ে যেতো কর্পূরের মতন। আমার কাছে আমার দাদু দিদি সব ছিলো, সব মানে সব! এক পৃথিবী সমান! কিংবা বলা চলে আমার দাদু দিদির সমান ছিলো আমার পৃথিবী। মাঝরাতে ঘুম ভেংগে মনে হতো আমার হাতে মেহেদি দেওয়া দরকার। আমি জানিনা কেনো আমার এমন উদ্ভট খেয়াল হতো। রাত্তিরের অন্ধকার ছিড়ে হারিকেনের নিভুনিভু আলোর মতো চলতো আমার বিরক্তিকর আর ঘ্যানর ঘ্যানর কান্না। আমার ছোট ফুপু বিরক্ত হতেন, চুপ করাতে চাইতেন, আমার জেদ চেপে যেতো। তাহাজ্জুদ পড়তে ওঠে দাদু শুনতেন আমার কান্না। ফুপুকে ডেকে তুলে হারিকেনের আলো জ্বালিয়ে অন্ধকার ভেংগে গাছ থেকে তুলে আনা হতো মেহেন্দি পাতা। আমি ঢুলুঢুলু চোখে অপেক্ষা করতাম! মেহেন্দি বাটা শেষ হবে, আমার হাতের তালুতে দেওয়া হবে মেহেন্দি। মেহেন্দি পাতা সুগন্ধ আর ফযরের আগে আগে তাহাজ্জুদরত আমার দাদু দিদির দোয়ার আবহ, আমার মনে হতো এইটাই জগৎ, এটাই সত্য! ভোররাতে গাছ থেকে মেহেন্দি পাতা তুলে এনে বেটে হাতে লাগানোই যেন খুব সাধারণ ব্যাপার।
আমি বড় হতে থাকি সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে। পৃথিবী থেকে যাওয়ার সময় কমে আসতে থাকে আমাদের। আমাদের? নাকি শুধু আমার দাদু আর দিদির? নাকি আমার পুরা পৃথিবীর? আমার দাদু চলে যাওয়ার পরে কি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকতেন আমার দিদি। কবে যাবেন প্রিয় মানুষটার কাছে! এতো আকুলতা! আমার দাদু দিদি কি নির্মল এক আবেগ দিয়ে আমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিলেন! আমার দিদি যখন চলে গেলেন তখন আমার বয়স ১৫/১৬। অথচ এই মধ্য তিরিশে এসেও আমি অনুভব করি আমার দাদু দিদিকে, তাদের ভালোবাসা কে, তাদের নির্মল আবেগকে। আমিও কি কম অপেক্ষায়?
আমার দাদু দিদি ছিলেন হাজার হাজার বছর ধরে স্থির আর সমুন্নত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বট বৃক্ষের মতোন। ঠিক যে বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে আমার দিদির বাবার বাড়ির সামনে। যতবার আমি দিদির সাথে তাঁর বাবার বাড়ি (বাবা মা মারা গেছেন আমার দিদি যখন কিশোরী) যেতাম, ততবারই দিদিকে জিজ্ঞেস করতাম সেই বটবৃক্ষের বয়স! আমার দিদি কখনো বিরক্ত হতেন না। প্রতিবারই একই উত্তর দিতেন, এই বট গাছ আমার বাবার আমল থেকে একই রকম আছে, আমার বাবা ও তার বাবার মুখে একই কথা শুনছেন। তার মানে এই বট গাছ শত শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে। দিদি কি আবেগ দিয়ে তার বাপের বাড়ির সেই বটগাছের কাহিনী বলতেন! যখন একটু একটু করে বড় হচ্ছিলাম, তখন থেকে বুঝতাম আমার দিদি বটগাছকে সাক্ষী রেখে তাঁর বাবা মা, ভাই বোনের বা তাঁর বাড়ির স্মৃতি আকড়ে ছিলেন। বাল্য বিবাহ হয়ে যাওয়া এক বাচ্চা মেয়ের ১০ বছর বয়েসে বাড়ি ছাড়ার পরে বটগাছ ছাড়া আর কি ই বা সাক্ষ্য হয়ে থাকবে? বছরে ছয় মাসে এক বার বাপের বাড়ি গিয়েছে ঠিকই, আদৌ কি নিজের বাড়ি ছিলো? আমি কল্পনায় দেখি, আমার দিদি হয়তো বটগাছের কাছে তাঁর দুঃখ জমা রেখে আসতো। নয়তো একটা বটগাছের গল্প কেউ এতো আবেগ দিয়ে করে? এই মধ্য তিরিশে এসে আমিও দিদির মতোন একটা বটগাছ খুঁজি, যে গাছের গল্পের আড়ালে থাকে আমার শৈশব, আমার কৈশোর, আমার ফেলে আসা দিন, আমার দাদু দিদি, আম্মা আব্বা, আমার ভাই বোন কিংবা উঠানে লাগানো রংবেরং এর ফুলের গাছ। আমার আর ঘরে ফেরা হয়না। আমার বাড়ি থেকে কখন কবে বাপের বাড়ি হয়ে গেলো! আমার দিদি, আমার আম্মা, আমি, আমরা কি সেই বটগাছের মতোন? আমাদের ঘিরে থাকে সংসার, আমরা হয়ে থাকি একা দাঁড়িয়ে থাকা বটগাছ!