22/04/2026
*"গণপ্রজাতন্ত্রী"* টাইটেলধারী দেশগুলোতে একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরাচারী চলে কেন? গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ (১৬ বছর একনায়কতন্ত্র) গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া ওরফে উত্তর কোরিয়া বংশানুক্রমিক স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্র, গণপ্রজাতন্ত্রী চীন ১৯৪৭ সাল থেকে কমিউনিস্ট শাসন?
আসলে "গণপ্রজাতন্ত্রী" শব্দটার ভেতর যে বিশাল একটা আদর্শিক জায়গা আছে, বাস্তবে অনেক সময় তার উল্টোটাই ঘটে। এই বৈপরীত্যটা বোঝার জন্য আমাদের একটু গভীরে যেতে হবে। আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন, পৃথিবীর অনেক দেশই তাদের নামের আগে "People’s Republic" বা "গণপ্রজাতন্ত্রী" যোগ করে মূলত নিজেদের জনগণের বন্ধু হিসেবে জাহির করতে চায়। কিন্তু তাত্ত্বিক সংজ্ঞা আর ক্ষমতার বাস্তব লড়াইয়ের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য, সেটাই বারবার স্বৈরাচারী ব্যবস্থার জন্ম দেয়।
অনেক সময় এই নামকরণটা হয় স্রেফ একটা প্রলেপ হিসেবে। যখন কোনো শাসক বা দল বুঝতে পারে যে তাদের ক্ষমতার সরাসরি কোনো বৈধতা নেই, তখন তারা "জনগণ" শব্দটাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। তারা মুখে বলে যে তারা জনগণের জন্যই শাসন করছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে রাষ্ট্রযন্ত্রকে এমনভাবে সাজানো হয় যেখানে সাধারণ মানুষের কথা বলার বা শাসক পরিবর্তনের কোনো পথ খোলা থাকে না। এটা অনেকটা এক ধরনের রাজনৈতিক মার্কেটিংয়ের মতো—পণ্য যাই হোক, মোড়কটা যেন আকর্ষণীয় হয়।
সমাজতান্ত্রিক বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে এই ধারার একটা আলাদা ইতিহাস আছে। চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো মনে করে, পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র আসলে ধনীদের শাসন। তাই তারা "জনগণের একনায়কত্ব" কায়েম করতে চায়। কিন্তু সমস্যা হলো, এই 'জনগণ' বলতে শেষ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা একটি পরিবারকে বোঝানো শুরু হয়। তখন দলের প্রধানই হয়ে ওঠেন রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা। ক্ষমতার ওপর যখন কোনো নজরদারি থাকে না, তখন সেই ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বংশানুক্রমিক বা দীর্ঘমেয়াদী স্বৈরাচারে রূপ নেয়।
বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর প্রেক্ষাপট আবার একটু ভিন্ন। এখানে সমস্যাটা নামের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতায় বেশি। যখন একটি দল দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকে এবং রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ—যেমন বিচার বিভাগ, পুলিশ বা নির্বাচন কমিশনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়, তখন গণতান্ত্রিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও দেশ একনায়কতন্ত্রের দিকে ধাবিত হয়। আপনি যেটা বললেন, বিগত ১৬ বছরের শাসন ব্যবস্থায় আমরা দেখেছি কীভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হলে "গণপ্রজাতন্ত্রী" তকমাটি কেবল কাগুজে দলিলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
আরেকটা বড় কারণ হলো ভয় আর আনুগত্যের রাজনীতি। একনায়কতান্ত্রিক সরকারগুলো প্রায়ই একটা 'কাল্পনিক শত্রু' তৈরি করে। কখনো সেটা বাইরের দেশ, কখনো সেটা দেশের ভেতরের বিরোধী শক্তি। তারা জনগণকে বোঝাতে চায় যে, এই কঠিন সময়ে একজন শক্তিশালী নেতার কোনো বিকল্প নেই। এই ডমিন্যান্স বা আধিপত্য কায়েম করার জন্য তারা মিডিয়া এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে ব্যবহার করে যেন মানুষ বিকল্প কোনো ব্যবস্থার কথা চিন্তাই করতে না পারে।
শেষ পর্যন্ত শাসন ব্যবস্থা কেমন হবে তা নামের ওপর নয়, বরং ক্ষমতার বণ্টনের ওপর নির্ভর করে। কোনো দেশ যদি নামের আগে 'গণপ্রজাতন্ত্রী' লিখেও ক্ষমতার পূর্ণ বিকেন্দ্রীকরণ না করে, তবে সেখানে স্বৈরাচার আসাটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। গণতন্ত্র তখনই বাঁচে যখন শাসকরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে বাধ্য হয় এবং নিয়মিত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতার বদল ঘটার সুযোগ থাকে। অন্যথায়, বড় বড় আদর্শিক নামগুলো কেবল একনায়কতন্ত্রকে আড়াল করার হাতিয়ার হিসেবেই থেকে যায়।