17/06/2025
#আমি_সেই_কাল্পনিক_মেয়ে
্ব
সে এসেছিল নিঃশব্দে।
যেন বাতাসের মতো—নেই, অথচ ছুঁয়ে যায়।
পাড়ার লোকেরা কেউ জানত না তার আগমনের কথা, কেউ তার অপেক্ষায় ছিল না, আবার কেউ অবাক হয়নি তাকে দেখে। তবে আমি বুঝেছিলাম—এই মেয়েটি একদিন হয়তো পুরো পাড়ার নিস্তরঙ্গ জীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে।
এই দোতলা পুরোনো বাড়িটির বয়স প্রায় নব্বই। চারদিক থেকে শেওলা ধরেছে, কাঠের সিঁড়ি চেপে হাঁটলে কাঁপন ধরে দেয়ালে, অথচ ভিতরে একটি চাবির আওয়াজ এখনো বেঁচে থাকে। সেই আওয়াজটাই প্রথম শুনেছিলাম রাতে—যখন বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল, জানালার কাঁচে কুয়াশা ঘনীভূত হচ্ছিল, আর চিলেকোঠায় বাতাসের সুর ছিল অস্বাভাবিক চঞ্চল।
আমরা যাদের ‘ভাড়াটে’ বলি, তারা মানুষ না, বাড়ির ছায়া হয়ে বেঁচে থাকে। কিন্তু মেয়েটি—শিউলি—সে যেন সেই ছায়াকেও ছায়া বানিয়ে রাখে। কারোর সঙ্গে মিশে না, কারোর দিকে তাকায় না, আর জিজ্ঞেস করলে বলে—"আমি এখানে একটু থাকবো, বেশি না।"
প্রথম দিকে মনে হয়েছিল, মেয়েটির হয়তো কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। চোখে কনকনে নির্লিপ্তি, কিন্তু মুখের ভঙ্গিমায় একটা নিখুঁত প্রশান্তি—যেন সে জীবনে বহুবার মরেছে, আবার বারবার ফিরে এসেছে।
সে কখনো বাজারে যায় না, কারো দরজায় নক করে না, অথচ সন্ধ্যার পর প্রায়শ দেখা যায়, সে উঠোনে বসে থাকে। হাতে একটা পুরনো ডায়েরি, আর পাশে রাখে একটি কাঠের বাক্স। আমি বহুবার দেখেছি—সে সেই বাক্সটা খুলে দেখে, আবার বন্ধ করে। যেন ভিতরে তার অতীতটা বন্দী আছে।
একদিন হঠাৎ করে একটি ঘটনা ঘটল।
রাতে সাড়ে বারোটার দিকে পাশের ঘর থেকে কেউ দৌড়ে বের হয়ে আসে। আমি জানালা দিয়ে দেখেছিলাম—একজন মধ্যবয়সী লোক, তার মুখ থমথমে, কাঁধে শাল, আর হাতে একটা চিঠি। লোকটা এসে শিউলির দরজায় দাঁড়াল। শব্দ করলো না, ডাকলো না, শুধু দরজার নিচ দিয়ে কাগজটা ঢুকিয়ে চলে গেল।
পরদিন সকালে মেয়েটিকে দেখা গেল উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে, কাগজটা হাতে। কিন্তু চোখে কোনো বিস্ময় নেই, যেন সে আগেই জানতো কাগজটি আসবে। তার পরপরই সে বাইরে চলে গেল। সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ তাকে দেখেনি। ফেরার সময় তার চোখ ছিল লালচে, কপালে ঘাম, আর ঠোঁট ফাঁটা। মনে হচ্ছিল সে যুদ্ধ করে এসেছে।
কিছুদিনের মধ্যে পাড়ার ভেতরে কানাঘুষা শুরু হয়। কেউ বলে—"মেয়েটা আসলে উকিলের মেয়ে", কেউ বলে—"সে স্বামীকে খুন করে পালিয়েছে", আবার কেউ বললো—"ওর বাপ চাবির দোকান চালাতো, তাই চাবি হাতে হাতে ঘোরে।"
কিন্তু আমি জানতাম—শিউলি কারো পরিচয়ে বাঁধা পড়ার মতো নয়।