01/12/2024
ভাবী আমাদের বাড়িতে বিয়ে হয়ে আসার তিন মাসের মাথায় মা মারা যান।
তখন আমার বয়স আট কী নয়।
ক্লাস থ্রিতে পড়ি আমি।ঘরে বোন নাই।বাবা তো সেই কবে থেকেই সহ্যাশায়ী রোগী।সংসারটা কেমন যেন এলোমেলো হয়ে উঠতে চাইলো হঠাৎ।সবাই বললো, এবার ওদের সংসার ভাঙবেই ভাঙবে।সবাই যখন আমাদের সংসার ভাঙার লীলা দেখার প্রস্তুতি নিলো তখন ভাবী দেখিয়ে দিলেন উল্টো লীলা।মার মৃত্যুর পর যেন নতুন মা হয়ে ফিরে এলেন তিনি। গায়ের সাজসজ্জা,বাহারি নেলপলিশ,চুড়ি,টিপ সবকিছু ছুঁড়ে ফেলে নিজের হাতে তুলে নিলেন তিনি আলমাড়ির চাবির গোছা, রান্না ঘরের হাড়ি পাতিল, আব্বার সেবা যত্ন,অষুধ খাওয়ানো, আমার পড়া তৈরি করে দেয়া, গোসল করানো,খাইয়ে দেয়া,ঘুম পাড়ানো,সব, সবকিছু।মার শোক কী জিনিস তা আমি আদৌ বুঝতে পারলাম না। অবশ্য প্রথম প্রথম একটু খারাপ লাগতো।মার গায়ের গন্ধ নিয়ে যে পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কেউ আসতে পারে না তাই! কিন্তু ভালোবাসা নিয়ে অনেকেই আসতে পারে।আমরা বলি না যে ইনি আমায় ঠিক ছেলের মতোই দেখেন!
ভাবী ছিলেন এরও বেশি। কতদিন আমি দুষ্টুমি করে ঘরের এটা ওটা ভেঙে দিয়েছি।এর জন্য ভাইয়া রাগ করলেও ভাবী কিন্তু মোটেও রাগ করতেন না। ভাইয়াকে বরং বুঝিয়ে বলতেন, 'ছোট সময় এমন কত কীই তো তুমি আমি করে এসেছি।নয়নও তো তেমনই। ছোট মানুষ। ওর কী এখনও বোঝ এসেছে বলো?
ভাইয়া বলতেন,'লায় দিয়ে দিয়ে তো মাথায় তুলছো বাদরটাকে।'
ভাবী হাসতেন।বলতেন,'দেখো,বাদরটা একদিন অনেক বড় হবে।'
বাবা একটু পর পর ভাবীকে ডাকতেন। একবার অষুধের জন্য, একবার মাথা গরম হয়ে গেছে বলে একটু জল ঢেলে দিতে,একটু শরবতের জন্য আরো কত কী!ভাবী হাসিমুখে সব করে দিতেন। কোনদিন তাকে আমি বিরক্ত হতে দেখিনি। কিন্তু ভাবীর মনে একটা দুঃখ ছিল। অবশ্য এই দুঃখ তিনি কখনো প্রকাশ করতেন না। মানুষ বলতো,'খেয়া, তোমার যে সন্তান সন্ততি নাই তোমার মন খারাপ হয় না এতে?'
ভাবী অবাক হয়ে বলতেন,'কে বলেছে আমার সন্তান নাই?নয়ন কী আমার সন্তান না?'
প্রতিবেশীরা বলতো,'এইসব শুধু মুখের কথাই হয় বাস্তবে হয় না।পরের সন্তান কী আর নিজের সন্তান হয় কোনদিন?'
ভাবী তখন চুপ হয়ে যেতেন। তারপর ঘরে এসে সেদিন আমায় পড়াতে বসে মাথায় বিলি কাটতে কাটতে বলতেন,'নয়ন, তুই আমার কী হস বলতো?'
আমি অনেক্ষণ ভেবে বলতাম,'ভাই।'
ভাবী তখন মুখটা কালো করে ফেলতেন। বলতেন,'আর কখনো ভাই বলবি না।বলবি সন্তান। তুই আমার সন্তান।'
আমি ডান দিকে মাথা নুইয়ে হ্যা