04/09/2026
মেয়েটার বয়স হয়তো বড়জোর ছয় বছর হবে। কিন্তু হঠাৎ করেই তার চালচলন কেমন যেন বদলে গিয়েছিল। কিছুদিন আগেও সে এমন থমথমে শান্ত ছিল না। এই বয়সে যেকোনো বাচ্চার যে অবাধ্য চঞ্চলতা থাকবে, সেটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক এক বিষয়। কিছুদিন ধরে বাবা অফিস থেকে বাসায় ফিরে মেয়ের পাশে গিয়ে বসলেই মেয়েটা উল্টো লজ্জা পাচ্ছিল, কিংবা অস্বাভাবিক নীরব একটা স্বভাব প্রকাশ করছে।
ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয় প্রায় দুই মাস পর। দুপুর দেড়টার দিকে সাইবুর সাহেব আচমকা একটা কল পান তাঁর মেজো খালাতো ভাইয়ের কাছ থেকে। দিনের এই অসময়ে তাঁর কাছ থেকে এমন কল পাওয়া মোটেও সহজে হজম করার মতো ছিল না। কার কি হয়ে গেল প্রথমে এটাই মাথায় এসেছিল। কিন্তু এটা যে তাকে নতুন একটা সময়ে প্রবেশ করিয়ে দিবে, এটা সে ভাবতে পারেনি।
—
কলটা ধরতেই তিনি জানতে পারেন,”তাঁর মেয়ের একটি আপত্তিকর ভিডিও ইন্টারনেটের এক গোপন প্ল্যাটফর্মে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।”
মাথায় মারাত্মক কাজের চাপ, তার ওপর এমন একটা খবর শুনলে পৃথিবীর কোনো বাবার পক্ষে নিজেকে স্বাভাবিক রাখা সম্ভব নয়। তিনি নিজেকে কোনোমতে সামলে বাইক চালিয়ে কল্যাণপুরে খালাতো ভাইয়ের বাসার দিকে ছোটেন। বাসার ভেতরে তিনি আর ঢোকেননি। খালার মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছে নেই এখন। নিচে দাঁড়িয়ে থেকেই খালাতো ভাইয়ের সাথে অল্প সময়ের মধ্যে কথা সারেন তিনি।
—
ভিডিওর যে দৃশ্য আর জায়গা তিনি দেখেছিলেন, তা দেখার পর তাঁর একবার মনে হয়েছিল বাইকের গতি সর্বোচ্চ বাড়িয়ে দিয়ে নিজেকে শেষ করে দিতে এই মুহূর্তে। পৃথিবীর কোনো বাবার পক্ষেই এমন নরক যন্ত্রণা সহ্য করা সম্ভব না।
বিদায় নেওয়ার সময় তিনি তাঁর খালাতো ভাইকে শুধু একটা প্রশ্নই করেছিলেন, "বাচ্চাদের এই ভিডিও তোর কাছে কীভাবে এলো ?"
ছেলেটা কোনো জবাব দিতে পারেনি। যদিও সে মাত্র কলেজ শেষ করেছে, কিন্তু তার কাছেও এই অন্ধকার জগতের অ্যাক্সেস ছিল। খুব সহজেই সে পেয়ে গেছে এটা। এটা বর্তমান জামানার যুবকদের সবচেয়ে অন্ধকার একটি জগৎ। আমরা এটি নিয়ে মোটেও তেমন আলোচনা করি না।
—
সাইবুর সাহেব বর্তমানে এই কেসটির আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বেশ গোপনেই। তিনি চাইছেন না কোন ভাবে এটা তার মেয়ের উপরে আচর পড়ুক। যদিও তিনি খুব একটা আশাবাদী না বাংলাদেশের আইনের প্রতি। কোনো ভাবে শুধু ভিডিওটা সরাতে পেরেছেন। কিন্তু আর বাকি বাচ্চা গুলো? আইনের বাস্তবতা তিনি বিপদে পড়ার পরেই দেখতে পেয়েছেন। ভিকটিম তিনি, তবুও কেন যেন তার পক্ষে কিছুই নেই। অন্য দিকে ভয়ংকর এই ঘটনাটি এখনো কেবল তিনি সহ তাঁর স্ত্রী আর তাঁর সেই খালাতো ভাই ছাড়া কেউ জানে না পরিবারের ভেতরে। এসব নিয়ে নিজের স্ত্রীর সাথেও সম্পর্কের এক কঠিন তিক্ত পর্যায়ে তিনি এসে পৌঁছেছেন। সাইবুর সাহেবের প্রবল সন্দেহ ছিল যে, ঘটনাটি ঘটেছে মেয়েটার নানাবাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পরেই। বেশ দৌড়ঝাঁপের পর স্থানীয় এক অপরাধীকে পুলিশ আটকও করে, তবে এই চক্রের মূল হোতা বর্তমানে ভারতে পলাতক।
—
এটা কোনো বানানো গল্প বা কল্পকাহিনী নয়। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া হাজার হাজার বিভৎস বাস্তবতার মধ্যে এটি একটি। আমরা সমাজের অনেক কিছু নিয়েই ভাবতে থাকি। কিন্তু আমাদের শিশুদের নিরাপদ ও নিরাপত্তা নিয়ে আমরা তেমন কিছুই ভাবি না।
চাইলে এই অপরাধের বিষদ বিবরণ দেওয়া যেত। কিন্তু সেই বীভৎস দৃশ্যগুলো আপনার চোখের সামনে ভেসে উঠুক, এমন বিবরণ দেওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই।
তবে কেন আজ এই কথাগুলো বলা? কারণ ঘটনাটা অত্যন্ত সাম্প্রতিক এবং আমাদের চোখের সামনেই ঘটেছে। আমাদের নিজেদের নিষ্পাপ শিশুদের টার্গেট করে এক কুরুচিপূর্ণ ও নিকৃষ্ট শ্রেণী এসব ভিডিও বানিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করছে। আর অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে, এগুলো কিনছেও সমাজে লুকিয়ে থাকা একদল পশুর চেয়েও অধম মানুষ। অনেক সময় এমন কিছু মানুষের মুখ থেকেই শোনা যায় যে, আমাদের সমাজে ভালো কোন মেয়ে নেই। অথচ ভালো মেয়েগুলো কাদের থেকে নিরাপদ না সেটা নিয়ে আমরা তেমন আলোচনা করি না। সে ছোট মেয়েটা যে বড় হয়ে কি পরিমাণ ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাবে সেটা নিয়েও আমরা আলোচনা করি না। এক্ষেত্রে যে শুধু একটা মেয়েই আছে ব্যাপারটা তাও না, বাচ্চা ছেলের ক্ষেত্রেও ঘটনা ঘটছে।
—
একটা ছয় বছরের বাচ্চার এই নিপীড়ন বা অপরাধ বোঝার মতো বয়স বা ক্ষমতা কোনোভাবেই থাকে না। কিন্তু ট্রমাটা ঠিকই থেকে যায়। অপ'কর্মটি ঘটে যাওয়ার পর কোনো এক অদৃশ্য ভয় বা অন্ধকার অনুভূতি তাদের ভেতর চেপে বসে। অবচেতনভাবেই বাচ্চাটি বুঝতে পারে যে তার সাথে কোনো এক গভীর অন্যায় হয়েছে। আর এই অবরুদ্ধ আতঙ্কই বড় হওয়ার পর তাকে শান্তিতে ঘুমোতে দেয় না। শৈশবের সেই বিধ্বংসী স্মৃতি প্রতিনিয়ত তাকে ভেতর থেকে শেষ করে ফেলে। এক চরম মানসিক যন্ত্রণায় সে বারবার নিজেকে প্রশ্ন করে, "সেদিন আসলে আমার সাথে কী ঘটেছিল?"
আপনি যদি সন্তানধারী বাবা-মা হয়ে থাকেন, তবে এই অন্ধ সমাজ আর অন্ধ আত্মায় ভরা দুনিয়াকে ঢালাওভাবে বিশ্বাস করা বন্ধ করুন। বিশেষ করে কন্যাসন্তানের বাবা-মা হলে সচেতনতা আর সতর্কতার মাত্রা দ্বিগুণ করা উচিত। শেষ সময়টা এখন এমনই এক কালো অধ্যায়ে এসে ঠেকেছে যে, যেখানে চোখের আড়ালে যেকোনো মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে আপনার সারাজীবনের দীর্ঘশ্বাস।
Written by- Ibn Imtiaj