16/06/2026
চাইনিজ বন্ধু চেনের ইসলাম গ্রহণের গল্প❤️
হোস্টেলে আমার প্রথম দিন। ওয়াশরুমে মুখ ধুচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখি হাতে স্পিকার নিয়ে একজন চাইনিজ ছেলে ঢুকলো। নীল চুল, পুরো শরীরে ট্যাটু, মুখে হাসি। এসেই বলল,
“What’s up man! What’s your name?”
সেখান থেকেই শুরু আমাদের পরিচয়। ওর নাম ছিল চেন। মজার একটা মানুষ, খুবই মিশুক, আরেকটু পাগলাটেও বলা যায়। সবসময় রাত ৩টায় গোসল করত আর স্পিকারে গান বাজাতো। ওর গানের শব্দে ঘুমাতেই পারতাম না। তবে বুঝতে পেরেছিলাম, ওর ভিতরে একটা গভীরতা আছে। প্রচুর বই পড়তো, দুনিয়ার নানা বিষয় নিয়ে জানার আগ্রহ ছিল। ধীরে ধীরে ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো।
চেনের সঙ্গে যত মিশলাম, বুঝলাম ও অনেক একাকিত্বে ভুগে।সঙ্গ দোষে কিছু বাজে অভ্যাসও ঢুকেছিল জীবনে।
একদিন আমি যোহরের নামাজে যাচ্ছিলাম। আমাদের পাকিস্তানি ভাই উমাইর সবসময় হোস্টেলের পেছন দিয়ে আমাদের মসজিদে নিয়ে যেত। সেদিন দেখি চেন দাঁড়িয়ে, আমি বললাম, “চলো চেন, আমাদের সঙ্গে মসজিদে চলো, দেখে যাও আমরা কী করি।” চেন আগ্রহ দেখালো।
মসজিদে ঢোকার পর আমি খেয়াল করলাম, চেন একদম শান্ত হয়ে গেছে। যেন ওর ভিতর কিছু নরম কিছু জেগে উঠেছে। ও কখনো এভাবে মসজিদে আসেনি আগে। আমি ওকে বুঝিয়ে বললাম মসজিদ কী, আমরা কীভাবে নামাজ পড়ি, কী করি। চেন বলল, “আমি তোমাদের সঙ্গে নামায পড়তে চাই।”
আমরা বললাম, “চাও তো পড়তে পারো।”
সেদিন চেন আমাদের সঙ্গে যোহরের নামায পড়লো। নামায পড়ার পর তার ভিতরে নাকি এক অন্যরকম প্রশান্তি অনুভব করলো৷ এরকম শান্তি এর আগে ও কখনো পায়নি। কারণ আমরা রবকে না চিনলেও আমাদের আত্মা তো রবকে ঠিকই চিনে। সেজদা দেয়ার পর চেন এর আত্মা তাকে ইশারা দিয়েছে এটা তোমার রব।
চেন তখনই ইসলাম গ্রহণ করতে চাইল। কিন্তু আমরা বললাম, “না চেন, এখনই না। আগে ইসলামকে জানো, আমাদের সঙ্গে থেকো, সময় নাও। সিদ্ধান্তটা যেন জ্ঞান ও উপলব্ধি থেকে আসে।”
ও রাজি হলো। আমরা ওকে কোরআনের ইংরেজি অনুবাদসহ কিছু ইসলামিক বই দিলাম। অবাক হয়ে দেখলাম, মাত্র ৩ দিনেই চেন সূরা বাকারার অনুবাদ শেষ করে ফেলেছে। প্রতিদিন নতুন প্রশ্ন নিয়ে আমাদের কাছে আসে, আমরা উত্তর দিই। ওর সংশয়গুলো আস্তে আস্তে দূর হতে থাকে। ওর প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার সময় এক অন্যরকম শক্তি অনুভব করতাম যা কখনো পাইনি, বুঝতে পারতাম যে আল্লাহ নিজে সাহায্য করছেন আমাকে, ওর সামনে সবকিছু ক্লিয়ার ভাবে উপস্থাপন করতে পারতাম, তাও আবার ইংলিশে। এরকম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আমি এর আগে কারো উত্তর দিতে পারিনি, যেভাবে ইসলামের ব্যাপারে ওকে বুঝাতাম। নিশ্চয়ই এটা আল্লাহর সাহায্য ছিলো।
চেন এখন নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাযে আমাদের সঙ্গে আসে। সারাদিন ওকে সঙ্গে রাখি, যেন ওর একাকিত্ব দূর হয়। ও আমাদের সাথে খুব আনন্দে থাকে।
এরপর আমরা চেনকে এপ্রিল মাসে তাবলিগ জামাতের সাথে কানসাস সিটিতে নিয়ে যাই। যাওয়ার আগে বলেছিলাম, “তুমি বড় বড় প্রশ্নের একটা লিস্ট বানাও, স্কলারদের জিজ্ঞেস করো।” সেখানে বড় বড় আলেমদের সঙ্গে ওর দেখা হয়, সব প্রশ্নের উত্তর পায়। তিন দিন মিলে দারুণ সময় কাটলো।
ফেরার সময় চেন বলল, “এতো ভদ্র, জ্ঞানী, বিনয়ী মানুষ আমি জীবনে দেখিনি। তোমরা এত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, বারবার অযু করো, একসাথে নামায পড়ো, মিলেমিশে থাকো। পশ্চিমা মিডিয়ায় ইসলামকে যেভাবে দেখায়, বাস্তবটা তার একেবারেই উল্টো। আমি সত্যিই মুগ্ধ।”
সেই অনুভূতি থেকেই চেন ১৩ মে ইসলাম গ্রহণ করে। আলহামদুলিল্লাহ।
"আপনি (হে মুহাম্মদ ﷺ) যাকে পছন্দ করেন তাকে হেদায়েত দিতে পারেন না, বরং আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দেন।"
--------- সুরা আল কাসাস:৫৬
হেদায়েত একমাত্র আল্লাহর হাতে। আমরা শুধু চেষ্টা করেছি। সবাই ওর জন্য দোয়া করবেন। আমার আরো অনেক বন্ধু অনেক জানতে চায় ইসলাম নিয়ে, আল্লাহর দেয়া অল্প জ্ঞান নিয়ে ওদের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেষ্টা করি, তারাও সংশয় দূর করে। দোয়া করবেন আল্লাহ যেন জ্ঞান ইলম বাড়িয়ে দেন এবং চেন এর জন্যও সকলে দোয়া করবেন।💙
(গত বছরের পোস্ট)
Copy