Md jakir mazhi

Md jakir mazhi Alhamdulillah

20/05/2026

নিষিদ্ধ অনুভূতি
পর্ব-২০
শামীমা মিশু

রিভা ধীরে ধীরে বাসার ভেতরে ঢুকতেই বুকটা ধক করে উঠল।
পুরো বাড়িটা অস্বাভাবিক চুপচাপ।

ড্রয়িংরুমে শুধু রাহেলা বেগম বসে আছেন। মুখভর্তি রাগ।

আকলিমা বেগম আনোয়ার সাহেবকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেছেন। সাথে ফাইয়াজও গেছে।

রিজবি আর মারিয়া এখনও ভার্সিটিতে।

রিভা ভয়ে ভয়ে মাথা নিচু করে ভেতরে যেতে নিল।

ঠিক তখনই রাহেলা বেগম গর্জে উঠলেন—

—“এই মেয়ে! এদিকে আয়!”

রিভা কেঁপে উঠল।

ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াতেই রাহেলা বেগম ঝড়ের বেগে উঠে দাঁড়ালেন।

—“কোন নাগরের ফোন নিয়ে আমার ছেলেকে ফোন দিয়েছিস তুই?!”

রিভা হতভম্ব হয়ে তাকাল।

—“মামি… আমি ফোন দিইনি…”

ঠাসস!

একটা ভয়ংকর চড় পড়ে তার গালে।

রিভা ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল।

তার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল।

কিন্তু রাহেলা বেগম থামলেন না।

তিনি চুলের মুঠি ধরে রিভাকে টেনে তুললেন।

—“আমার ছেলে বিদেশে বসে আজ আমাকে জিজ্ঞেস করে—‘রিভার হাত কীভাবে পুড়ল?’”

তার চোখেমুখ বিকৃত হয়ে গেছে রাগে।

—“তুই ভাবছিস আমি বুঝি না কিছু?!”

রিভা কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—“বিশ্বাস করেন মামি… আমি কিছু বলিনি…”

—“চুপ কর!”

এই বলে পাশে থাকা ঝাড়ুর লাঠিটা হাতে তুলে নিলেন রাহেলা বেগম।

রিভা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যেতে নিল।

কিন্তু পরের মুহূর্তেই—

লাঠির আঘাত সোজা তার পিঠে পড়ল।

রিভা চিৎকার করে উঠল।

—“আহহহ মামি!”

আরেকটা আঘাত।

আরেকটা।

একটার পর একটা মারতে মারতে রাহেলা বেগম চিৎকার করে বলছেন—

—“তোর জন্যই আমার ছেলে বদলে যাচ্ছে!”

—“তুই একটা অপয়া!”

—“তোর জন্যই সংসারে অশান্তি!”

রিভা মেঝেতে পড়ে হাত জোড় করে কাঁদছে।

তার পোড়া হাতটাতেও আঘাত লেগেছে।

ব্যথায় পুরো শরীর কাঁপছে তার।

সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল—

—“মামি প্লিজ… আর মারবেন না…”

কিন্তু রাহেলা বেগমের রাগ যেন আরও বেড়ে গেল।

তিনি আবার লাঠি তুলতেই রিভা কান্নাভেজা গলায় বলে উঠল—

—“মামি… এভাবে প্রতিদিন আমাকে না মেরে একেবারেই মেরে ফেলুন না…”

রাহেলা বেগম থমকে গেলেন।

রিভার চোখ দিয়ে অনবরত পানি ঝরছে।

সে কাঁপা গলায় বলল,

—“আমার আর এভাবে বাঁচতে ইচ্ছে করে না…”

কথাগুলো শুনে মুহূর্তের জন্য পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

কিছুক্ষিন আগে তাহসিন কল দেই রিভার ফোনে। রিভার ফোন রাহেলা বেগমের কাছে।

রাহেলা বেগম বিরক্ত মুখে ফোনটা রিসিভ করলেন।

ওপাশ থেকে তাহসিনের গম্ভীর গলা ভেসে এলো—

—“আম্মু… রিভার হাত কীভাবে পুড়েছে?”আমি আজকেই দেশে ব্যাক করছি। এ কথা বলেই ফোন কেটে দেই।

ভার্সিটির ক্যান্টিন থেকে বের হওয়ার পরও মারিয়ার অস্বস্তিটা পুরোপুরি কাটেনি।

আরিফের সামনে পড়ে যাওয়ার ঘটনাটা মনে পড়তেই বারবার লজ্জায় গাল লাল হয়ে উঠছে তার।

রিজবি সেটা বুঝতে পেরে পাশে হাঁটতে হাঁটতে মুচকি হেসে বলল,

—“এই মারিয়া… এত লজ্জা পাচ্ছিস কেন?”

মারিয়া বিরক্ত মুখে তাকাল।

—“চুপ কর তো! এত মানুষের সামনে পড়ে গেছি… কী যে লজ্জা লাগছে!”

রিজবি এবার হেসে ফেলল।

—“আরে ধুর! এটা নিয়ে কেউ এত ভাবেও নাকি?”

মারিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

—“তুই বুঝবি না। আমি তো এমন না…”

তার কথার ভঙ্গিটা এত কিউট লাগল যে রিজবি আবারও হেসে উঠল।

দুজন ধীরে ধীরে ভার্সিটির ভেতরের রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগল।

চারপাশে অনেক স্টুডেন্ট।

কেউ বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে, কেউ ক্লাসে যাচ্ছে, কেউ আবার মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে।

মারিয়া চারপাশটা মুগ্ধ হয়ে দেখছিল।

সে নরম গলায় বলল,

—“তোদের ভার্সিটির পরিবেশটা সত্যি অনেক সুন্দর রে…”

রিজবি ব্যাগটা ঠিক করতে করতে বলল,

—“হুম। আমারও অনেক ভালো লাগে এখানে।”

মারিয়া একটু চুপ থেকে বলল,

—“তোর অনেক ফ্রেন্ড?”

—“মোটামুটি।”

—“সবাই কি এমন ফাজিল? ওই আরিফ ভাইয়ার মতো?”

রিজবি এবার হো হো করে হেসে উঠল।

—“উনি তো ছোটবেলা থেকেই এমন। তবে খারাপ না।”

মারিয়া আস্তে বলল,

—“আমার তো উনাকে দেখে ভয়ই লাগছিল।”

—“ভয়?”

—“হ্যাঁ! কেমন করে তাকাচ্ছিল দেখিসনি?”

রিজবি ভ্রু তুলে তাকাল।

তারপর দুষ্টু হেসে বলল,

—“ওমা! আরিফ ভাইয়া তোকে পছন্দ করে ফেলেনি তো?”

মুহূর্তেই মারিয়ার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

—“কি?! আজাইরা কথা বলবি না!”

রিজবি হাসতে হাসতেই বলল,

—“আচ্ছা আচ্ছা বললাম না।”

মারিয়া বিরক্ত হয়ে সামনে হাঁটতে লাগল।

হালকা বাতাসে তার চুলগুলো উড়ছে।

রিজবি কিছুক্ষণ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ মেয়েটাকে আজ অন্যরকম সুন্দর লাগছে।

একদম শান্ত… কোমল…

ঠিক তখনই পাশ দিয়ে কয়েকজন ছেলে হেঁটে যেতে যেতে মারিয়ার দিকে তাকাল।

একজন ফিসফিস করে বলল,

—“নতুন নাকি?”

আরেকজন মুচকি হেসে তাকাল।

রিজবির কপাল সঙ্গে সঙ্গে কুঁচকে গেল।

সে বিরক্ত চোখে ছেলেগুলোর দিকে তাকাতেই তারা দ্রুত সরে গেল।

মারিয়া কিছু বুঝতে না পেরে বলল,

—“কি হয়েছে?”

—“কিছু না।”

—“মুখ এমন করলি কেন?”

রিজবি একটু থেমে বলল,

—“তুই আমার পাশেই থাকবি। একা কোথাও যাস না।”

মারিয়া অবাক হয়ে তাকাল।

—“কেন?”

—“এমনি বললাম।”

মারিয়া ঠোঁট চেপে হাসল।

—“তুই তো দেখি পুরো বডিগার্ড হয়ে গেছিস।”

রিজবি গম্ভীর মুখে বলল,

—“হ্যাঁ। সমস্যা?”

মারিয়া এবার খিলখিল করে হেসে উঠল।

তার হাসিটা এত সুন্দর ছিল যে আশেপাশের কয়েকজন পর্যন্ত তাকিয়ে রইল।

রিজবি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থেকে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।

তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে।

কেন লাগছে সেটা সে নিজেও বুঝতে পারছে না।

হাঁটতে হাঁটতে তারা ভার্সিটির লেকের পাশটায় চলে এলো।

জায়গাটা অনেক শান্ত।

পানির ওপর রোদের আলো পড়ে চিকচিক করছে।

মারিয়া মুগ্ধ হয়ে বলল,

—“ওয়াও… জায়গাটা অনেক সুন্দর!”

সে দৌড়ে একটু সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

তার খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে।

রিজবি পিছন থেকে তাকিয়ে রইল।

মেয়েটাকে এই মুহূর্তে অসম্ভব মায়াবী লাগছে।

হঠাৎ মারিয়া পিছনে ফিরে বলল,

—“এই রিজবি!”

—“হুম?”

—“একটা ছবি তুলে দিবি?”

রিজবি ফোন বের করতে করতে বলল,

—“আজব! তুইও ছবি তুলিস নাকি?”

—“কেন? আমি কি মানুষ না?”

—“না। তুই এলিয়েন।”

—“চুপ!”

মারিয়া মুখ ফুলিয়ে দাঁড়াতেই রিজবি হেসে ছবি তুলতে লাগল।

কয়েকটা ছবি তোলার পর মারিয়া দৌড়ে এসে ফোনটা দেখতে লাগল।

তারপর মুখ কুঁচকে বলল,

—“ইশ! আমাকে এত মোটা লাগছে কেন?”

রিজবি ভ্রু তুলে বলল,

—“কারণ তুই মোটা।”

—“রিজবি!”

মারিয়া রাগ দেখিয়ে তার হাতে ছোট্ট একটা ঘুষি মারল।

রিজবি হেসে উঠল।

অনেকদিন পর এত হালকা লাগছে তার মনটা।

বিকেলের রোদ তখন ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে।

রাস্তার পাশ দিয়ে গাড়িটা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

আকলিমা বেগম আর আনোয়ার সাহেবকে ডাক্তারের কাছে নামিয়ে দিয়েই ফাইয়াজের বুকের ভেতরটা অদ্ভুত অস্থির হয়ে উঠেছিল।

কেন জানি বারবার রিভার কান্নাভেজা মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

সকালের ঘটনাটার পর থেকেই মনটা খারাপ হয়ে আছে তার।

শেষমেশ আর থাকতে না পেরে সে বলেছিল,

—“আম্মু, তোমরা চেকআপ শেষ করে ড্রাইভার নিয়ে চলে আসো। আমি একটু বাসায় যাচ্ছি।”

আকলিমা বেগম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন,

—“হঠাৎ?”

ফাইয়াজ শুধু বলেছিল,

—“কাজ আছে একটু।”

কিন্তু আসল কারণটা সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারেনি।

গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত বাসার ভেতরে ঢুকতেই হঠাৎ ওপরতলা থেকে চিৎকারের শব্দ ভেসে এলো।

—“আহহ মামি… প্লিজ আর মারবেন না…”

ফাইয়াজের বুক ধক করে উঠল।

সে এক সেকেন্ডও দেরি না করে দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠল।

আর রুমের সামনে পৌঁছাতেই তার চোখ বিস্ফোরিত হয়ে গেল।

রাহেলা বেগম হাতে ঝাড়ুর লাঠি নিয়ে রিভাকে মারছেন।

মেয়েটা মেঝেতে পড়ে কাঁদছে।

পোড়া হাতটা বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়েও বারবার আঘাত খাচ্ছে।

চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গেছে।

ঠোঁটের কোণ ফেটে সামান্য রক্ত বের হয়েছে।

ফাইয়াজের মাথার ভেতর যেন মুহূর্তেই আগুন জ্বলে উঠল।

সে দৌড়ে গিয়ে রাহেলা বেগমের হাত চেপে ধরল।

—“বড় আম্মু! কী করছেন আপনি?!”

রাহেলা বেগম রাগে হাঁপাচ্ছিলেন।

—“হাত ছাড় ফাইয়াজ!”

—“না ছাড়ব না!”

ফাইয়াজ এবার প্রায় চিৎকার করে উঠল।

তার চোখেমুখে স্পষ্ট রাগ।

—“মেয়েটা মরে যাবে!”

রাহেলা বেগম ঝাঁঝালো গলায় বললেন,

—“মরলে মরুক! এই মেয়ের জন্যই—”

—“Enough!”

ফাইয়াজের গর্জনে পুরো ঘর কেঁপে উঠল।

রাহেলা বেগম পর্যন্ত থমকে গেলেন।

ফাইয়াজ দ্রুত নিচু হয়ে রিভাকে উঠাতে গেল।

কিন্তু রিভা ব্যথায় কেঁপে উঠল।

তার পুরো শরীর কাঁপছে।

ফাইয়াজের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

সে হতভম্ব চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল।

এতটা খারাপ অবস্থা!

তার গলা ভারী হয়ে গেল।

—“ইয়া আল্লাহ…”

রিভা ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

চোখদুটো ফুলে গেছে।

সে কাঁপা গলায় বলল,

—“আমি কিছু করিনি…”

ফাইয়াজের ভেতরটা হঠাৎ অদ্ভুত রকম রাগে ভরে গেল।

সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে রাহেলা বেগমের দিকে তাকাল।

তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

—“আপনি মানুষ নাকি?”

রাহেলা বেগম অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন।

—“কি বললি তুই?”

ফাইয়াজ এবার আর নিজেকে আটকাতে পারল না।

—“তুমি তো ভয়ংকর একটা মানুষ বড় আম্মু!”

কথাটা শুনে রাহেলা বেগম যেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

ফাইয়াজের চোখ লাল হয়ে উঠেছে।

—“এভাবে কেউ একটা মানুষকে মারে?!”

—“ওর হাত আগেই পুড়ে গেছে! শরীর খারাপ! তারপরও আপনি মারছেন?”

রাহেলা বেগম রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,

—“তুই আমার সাথে এভাবে কথা বলছিস একটা কাজের মেয়ের জন্য?!”

ফাইয়াজ তীব্র গলায় বলল,

—“ও কাজের মেয়ে না!”

তার গলার রাগে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

রিভা অবাক হয়ে তাকাল তার দিকে।

ফাইয়াজ রাগে হাঁপাচ্ছে।

—“ও মানুষ! একটা অসহায় মেয়ে!”

—“আর আপনি দিনের পর দিন ওর উপর অত্যাচার করছেন!”

রাহেলা বেগম চিৎকার করে উঠলেন,

—“ফাইয়াজ!”

কিন্তু সে থামল না।

—“আজ যদি তাহসিন ভাইয়া এগুলো দেখত—”

কথাটা শেষ করেই থেমে গেল ফাইয়াজ।

কারণ সে জানে—

তাহসিন জানলে সত্যিই ভয়ংকর কিছু হয়ে যাবে।

রিভা তখনও কাঁদছে।

ফাইয়াজ ধীরে ধীরে তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল।

নরম গলায় বলল,

—“উঠো… ভয় পেও না…”

রিভা কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসতেই ব্যথায় মুখ কুঁচকে গেল।

ফাইয়াজ খুব সাবধানে তার পোড়া হাতটার দিকে তাকাল।

দাগগুলো আরও লাল হয়ে গেছে।

মনে হচ্ছে আবার আঘাত লেগেছে।

ফাইয়াজের চোখেমুখ শক্ত হয়ে গেল।

সে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,

—“আজ থেকে রিভার গায়ে আর কেউ হাত তুলবে না।”

রাহেলা বেগম তাচ্ছিল্য করে হাসলেন।

—“তুই আমাকে থামাবি?”

ফাইয়াজ এবার সরাসরি তার চোখের দিকে তাকাল।

—“হ্যাঁ। দরকার হলে থামাব।”

রাহেলা বেগম হতভম্ব হয়ে গেলেন।

চলবে

11/05/2026

#পাপড়ির_সীতাহার
#পর্ব - ১৪
#মারিয়া_আক্তার_সাদিয়া

অন্ধকার ঘরে বসে শুধু পাপড়ির মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল সে। মেয়েটা ঘুমের মধ্যেও কেঁপে কেঁপে উঠছে। মাঝে মাঝে ভ্রু কুঁচকে যাচ্ছে, ঠোঁট কাঁপছে। মনে হচ্ছে ঘুমের ভেতরেও সে ভয় পাচ্ছে।
আরিফ ধীরে ওর কপালে হাত রাখল। গরম নেই, তবুও বুকের ভেতর অজানা আতঙ্ক জমে আছে।
তার মাথার ভেতর শুধু একটা কথাই ঘুরছে আমার বাচ্চা,
চোখ বন্ধ করতেই সে যেন আবার শুনতে পাচ্ছে মায়ের গলা, গয়নাগুলো পেলে,,

আর হাফসার কণ্ঠ, সীতাহারটা আমি পরতাম,

আরিফ দুহাতে মুখ ঢেকে বসে রইল। বুকের ভেতরটা জ্বলছে। রাগ, অপমান, কষ্ট সব মিলিয়ে সে যেন দম নিতে পারছে না।

হঠাৎ পাপড়ি ঘুমের মধ্যেই বিড়বিড় করে উঠল, আমার বাচ্চাটাকে বাঁচাও,

আরিফ চমকে উঠে দ্রুত ওকে বুকে টেনে নিল। কিছু হয়নি, আমি আছি আমি আছি,

পাপড়ি আধোঘুমে ওর শার্ট খামচে ধরল। তারপর ধীরে ধীরে আবার শান্ত হয়ে গেল।

কিন্তু আরিফ শান্ত হতে পারল না।

আরিফ কিছুক্ষণ থম দিয়ে বসে ছিল। এরপর নিঃশব্দে নিজের ছোট্ট টর্চ লাইট টা নিয়ে সদর দরজা খুলে বেরিয়ে গেলো বাইরে। নিজের বারান্দার সামনে মাটির অংশে তল্লাশি চলালো। খুবই অল্প সময়ের মধ্যে তার নজরে এলো আলগা করা মাটি। যা হঠাৎ করে কেউ বুঝতেই পারবে না যে কিছুক্ষণ আগে এখানে খোঁড়া হয়েছে। খুব সুন্দরভাবে মাটিগুলো ঠিক করে রাখা হয়েছে।

আরিফ আর দেরি করলো না। মাটি খুঁড়ে তার নিচে পেল কাঙ্খিত জিনিসটি। অদ্ভুত দেখতে একটা পুতুলের মত আর তার গায়ে কতগুলো আলাদা আলাদা গিট্টুর মত। পুনরায় মাটিগুলো আবার যেমন ছিল তেমন করার চেষ্টা করল আরিফ এবং তাতে সফলও হলো।
বস্তুটি হাতে নিয়ে ওর ভীষণ রকম অস্বস্তি হতে লাগলো। তবুও ওটাকে সুরক্ষিত একটা স্থানে রেখে অতিথিদের জন্য বরাদ্দ করা রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লো, পাপড়ির কাছে এগোলো না। পাছে না আবার কোন ভুল করে বসে।

বাকি রাতটুকু এক ফোঁটা ঘুমও ধরা দিল না আরিফের চোখে। কি করবে ভেবে অস্থির হয়ে গেল। সে ছাড়া মায়ের আর কে আছে? কিভাবে সেই মাকে দূরে সরিয়ে দিবে। আর কিভাবেই বা তার সন্তানের খুনিদের ক্ষমা করবে। আরিফের বুকের ভেতরটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।

ফজরের আযান পড়তেই আরিফ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। সে বস্তুটা নিয়ে চলে গেল ভালো একজন হুজুরের উদ্দেশ্যে। আরিফ এখনো আশা রাখছে তার কানে শোনা যেন ভুল হয়। আর এই সমস্যার সমাধান কিভাবে হবে তাও জানা দরকার।

অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে এলাকার সবচেয়ে বড় যে মসজিদটা সেখানে গেল আরিফ। ওখানকার হুজুরের সঙ্গে কথা বলবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। নামাজ আদায় করে মোনাজাতে অনেক কাঁদলো। আরিফ মোনাজাতে এতটাই মগ্ন ছিল যে আশপাশের সকলেই চলে গিয়েছে তাও সে খেয়াল করেনি। তার চোখ জোড়া ভেজা। ভোরের আলো ততক্ষণে ফুটতে শুরু করেছে।

নামাজ শেষে ইমাম সাহেব নিজেও দোয়া দরুদ পড়ে খানিক কোরআন তেলাওয়াত করলেন। আরিফকে তিনি খেয়াল করেছেন অনেকক্ষণ থেকে। সবাই গেলেও এই লোকটা যাচ্ছে না। আরিফকে ইমাম সাহেব চেনেন, মাঝেমধ্যেই এখানে নামাজ পড়তে দেখা যায় তাকে। আরিফের চোখ মুখের অবস্থা দেখে তিনি বুঝতে পারলেন কিছুতো একটা হয়েছে। চোখ জোড়াও ভেজা, রবের দরবারে হাত পেতে বসে রয়েছে।
ইমাম সাহেব অপেক্ষা করলেন আরিফের মুনাজাত ভাঙ্গার।

অবশেষে আরিফ নিজের মোনাজাত শেষ করে আমীন বলে খানিক শব্দ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল।

ইমাম সাহেব এবার আর বসে থাকতে পারলেন না। কুরআনটা যথাস্থানে গুছিয়ে রেখে আরিফের দিকে এগিয়ে গেলেন। আরিফের পাশে বসে মাথায় হাত বুলালেন।
বয়স্ক একজন লোক তিনি, একেবারে নুয়ে পড়ার মতো বয়সও নয় আবার মাঝ বয়সীও নয়।
অত্যন্ত কোমল গলায় বললেন,
কি হয়েছে বাবা? আপনাকে ভীষণ বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। রবের নিকট নিশ্চয়ই মন খুলে চেয়েছেন, তিনি অবশ্যই সমাধান দিবেন। আপনি আমাকে খুলে বলুন, সেই সমাধানের মাধ্যম যদি আমি হতে পারি।

গতকালকের একটার পর একটা ধাক্কা থেকে প্রায় পাথর হয়ে গিয়েছিল আরিফ। আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারল না। সবকিছু আল্লাহর দরবারে খুলে বললো। কান্নাও আর তার বাধ মানলো না।

বহু কষ্টে নিজেকে সামলালো আরিফ। ইমাম সাহেবের হাত দুটো ধরে বলল, আমাকে একটা সমাধান খুঁজে দিন।
সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তুটি বের করে ইমাম সাহেবের হাতে দিল।

চমকে উঠলেন ইমাম সাহেব। ভয়ার্থ কণ্ঠে বললেন,
একি! এটা আপনি কি নিয়েছেন। এগুলো তো আল্লাহর তরফ থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হারাম কুফরি।

হুজুর এটা আপনি দয়া করে দেখুন। আমার বারান্দার সামনের মাটির নিচে এটা পেয়েছি।
গত কয়েক মাস ধরে আমার স্ত্রীর সঙ্গে আমার মনোমালিন্যতা লেগেই রয়েছে। কোন ঝগড়া হচ্ছে না কিন্তু সে মাঝেমধ্যে আমাকে ভীষণ বিরক্ত অনুভব করে। আমিও তার কাছাকাছি যাওয়ার ফুসরত পাইনা, অথচ আমার কাছে তাকে দেওয়ার মত অফুরন্ত সময় রয়েছে। গতকাল আমার প্রথম সন্তানটা রক্তপিণ্ড থেকেই দুনিয়া ছেড়েছে। এরপর আরিফ আস্তে আস্তে সব কিছু খুলে বলল। খুলে বলল মা বোনের থেকে শোনা রাতের সেই সব কথা।

মনোযোগ দিয়ে আরিফের সমস্ত কথা শুনলেন ইমাম সাহেব। তিনি ভীষণ হতভম্ব হলেন এবং দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ভাবলেন এই অন্ধকার সমাজের কিছু মায়েদের জন্য মা নামটা ভীষণ কলঙ্কিত হচ্ছে। শাশুড়ি শব্দটায় ভীষণ আতঙ্ক।
ইমাম সাহেব সূরা ফালাক নাস পড়তে পড়তে পুতুলের গায়ের সমস্ত গিট্টুগুলো খুললেন।

পাপড়ি তখনো ঘুমন্ত ছিল। আচমকা ওর সমস্ত শরীরে ঘাম ছেড়ে দিয়ে বমি করে দিল। অসুস্থ শরীরে কোন একটা ধাক্কা সে সামলাতে পারেনি। বমি করে ক্লান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে সেভাবেই পড়ে রইল।

চিন্তায় চিন্তায় হাফসা আর রাহেলাও ঘুমাতে পারেনি। নামাজ পড়ে তারাও এখনো সজাগ রয়েছে। পাপড়ির শরীর আর মনের অবস্থা তারা জানে। তাই রাহেলার অপেক্ষা না করে নাস্তা বানানোর জন্য প্রস্তুতি নিবে। ছেলের ঘর থেকে এমন আওয়াজ আশায় মেয়েকে পাঠালো। হাফসা উঁকি দিয়ে পাপড়িকে বমি করতে দেখে নাক ছিটকে সেখান থেকে সরে গেল।

রাহেলা জানতে চাইলো,
কিরে কি হয়েছে মেয়েটার।

বিছানায় শুয়ে শুয়ে বমি করছে, কেন একটু উঠে বাথরুমে যেতে পারল না?

কাছে গিয়ে একটু ধরতি, নইলে তোর ভাই এসে তো আবার আমাদেরকেই দোষারোপ করবে, যে বউ পাগল হয়েছে।

উহ মা করুকতো দোষারোপ, ও এমনিতেও করবে ওমনিতেও করবে এর চেয়ে বরং যেমন আছে তেমন থাক আর ও এসে দোষারোপ করুক।

ইমাম সাহেব সমস্ত গিট্টু খুলে ভেতরের সব কিছু দেখলেন। তার ভেতর থেকে ভারী দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসছে। কেন এই মানুষগুলো এত অবুঝ। কি প্রয়োজন এই কুফুরি কাজ করার।

আরিফের লক্ষ্য সেদিকে স্থির, ও খেয়াল করে দেখতে পেল সেখানে পাপড়ির শাড়ি আর জামার টুকরো রয়েছে। ওর নিজেরও একটা শার্টের টুকরো রয়েছে। এই শার্টটা খুজেছিল কিন্তু পায়নি।

আরিফ অস্থির হয়ে জানতে চাইলো,
হুজুর আপনি কি বুঝলেন?

মা জননী সবসময় নামাজ-কালাম করেন?

আরিফ শুরু তে কথাটার অর্থ ধরতে পারল না, পরক্ষণেই বুঝতে পারলো যে পাপড়ির কথা জানতে চাইছে।
হ্যাঁ, একদম সময় মত। কোরআন তেলাওয়াত করে নিয়ম মত।

তাইতো আল্লাহর রহমত আছে তার উপরে। আপনাদের ভিতরে বড় কোন ঝামেলা ঘটেনি। তবুও শয়তানের কিছুটা প্রভাব পড়েছে।

হুজুর আমার সন্তানটা কি এ কারণেই, আর কিছু উচ্চারণ করতে পারল না আরিফ, থেমে গেল মাঝ পথে।

হুজুর আরিফের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
হতে পারে। যারা আল্লাহর রহমত থেকে দূরে শয়তান তাদের আরো কঠিন ভাবে ঝেঁকে ধরে এবং এতে মানুষের প্রাণ সংশয় পর্যন্ত হতে পারে।

ইমাম সাহেবের কথা শুনে চোখ জোড়া বন্ধ হয়ে এলো আরিফের।
এখন আমি কি করবো বলুন তো? মা তো আমার। আমাকে জন্ম দিয়েছেন তিনি। এই পৃথিবীতে মায়ের মত কে হয় বলুন তো,

কুফুরি যেই করুক সেই কাফের হয়ে যায়। সে মা হোক বা সবচেয়ে কাছের কেউ হোক । যে এই কাজ করে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আদেশ রয়েছে হাদিসে।

আরিফের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

হুজুর তাকে কিছু সমাধান দিল। রুকাইয়ার নিয়ম কানুন সবকিছু ঠিকঠাক করে আরিফকে বিদায় দিল।

,
,

রান্নাঘর থেকে টুংটাং আওয়াজ আসছে। আরিফ আজান শুনেই যেভাবে বেরিয়ে গিয়েছিল দরজারটা সেভাবেই রয়েছে। কেউ ভেতর থেকে বন্ধ করেনি। খানিক শব্দ করেই ফের দরজাটা আটকালো আরিফ। রাহেলা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বলল,

কিরে বাবা কোথায় গিয়েছিলি বলতো? কতটা বেলা হয়ে গেল, বৌমাও এখনো ওঠেনি ঘুম থেকে। ডাক্তার নিশ্চয়ই ওষুধ দিয়েছে, কিছু খেয়ে ওষুধ খাওয়াতে হবে তো নাকি!

মা!

হ্যাঁ

আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মা, আমার বাচ্চাটা,

শান্ত হও, হয়তো আল্লাহর কোন পরীক্ষা। আল্লাহর জিনিস আল্লাহ নিয়ে গেছে আবার দিতে কতক্ষণ।

আরিফ কিছুক্ষন ওর মায়ের মুখটা দেখল, ভাঙ্গা গলায় বলল,
আমার কি দোষ ছিল মা? আমি কি তোমায় কোন কষ্ট দিয়েছি?

এটা কি বলছিস? তোর মত ছেলে ক জনের হয় বলতো?

তোমাদের সবাইকে নিয়ে সুখে থাকার স্বপ্ন যে আমার দুচোখে।

এমন কথা বলছিস কেন বাবা?

আরিফ ছোট্ট একটা ব্যাগ থেকে সেই তাবিজ কালো সুতা কাটা কাপড় গুলো বের করল। মায়ের সামনে ধরে বলল এগুলো কি মা?

চলবে,

এটা একটা গল্প বাস্তব নয়। বাস্তবতা এর চেয়েও ভয়ঙ্কর। বাস্তবে আরিফেরা থাকে মায়ের ছেলে।

09/05/2026

#ডেসটেনি [ ২৪ ]
#সুহাসিনি_মিমি

“কিহহহ!? ওই হ্যান্ডসাম লোকটা তোর ভাইয়ের ফ্রেন্ড!?”

মেয়েটার আকস্মিক চিৎকারে কানের পর্দা ফেটে পড়ার জোগাড় প্রিয়ন্তীর। বিরক্ত হয়ে ফোনটা কানের কাছ থেকে একটু সরিয়ে নিয়ে ধমকে উঠল তখন,

“শ্রেয়ার বাচ্চা! আমি তোকে কী বলছি আর তুই কী রিয়্যাক্ট করছিস! একটু তো সিরিয়াস হ ভাই!”

“আরে বেডি চুপ থাক! আগে আমাকে একটা জিনিস বুঝা, এই আজব জিনিসগুলো ঘুরে ফিরে তোর দিকেই কেন টার্নিং পয়েন্ট হয়? আমাকে কি কেউ দেখে না নাকি? মানে বাংলাদেশের সব হ্যান্ডসাম ছেলে গুলা কেন ঘুরে ফিরে তোর আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই পড়ে?”

“এ্যা?”

“হ্যা! তুই একটু ভেবে দেখ,প্রথমে এই ব্যাটা নিরামিষ কমান্ডা...

প্রিয়ন্তী চোখ কুঁচকে মাঝপথেই থামালো বান্ধবীকে,

“শ্রেয়ার বাচ্চা! এখানে আবার ওনাকে টানছিস কেন?”

“আরেহ আগে পয়েন্টে তো আসতে দে মেরি বেহেন!
প্রথমে ওই ব্যাটা কমান্ডার, তারপর আবার এই গ্রীন চোখ ওয়ালা! কেন ভাই? আমাকে কি কেউ চোখে দেখে না?”

প্রিয়ন্তী এবার বিরক্ত হয়েই বলল,

“আমার জায়গায় থাকলে বুঝতি! আমার কি অবস্থাটাই না হয়েছিল! হার্টবিট থেমে গিয়েছিলো ভয়েতে! ভাগ্যিস ব্যাটা আমায় চিনেনি। চিনলে এতক্ষনে ভাইয়ার কাছ থেকে জুতো পিটা খেতাম হান্ড্রেড পার্সেন্ট সিউর!”

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল শ্রেয়া। তারপর হঠাৎ করেই ফুস করে শব্দ তুলে গাঁ হেলিয়ে হেসে উঠল,

“আমি সিরিয়াসলি বলতেছি, তোর এই আজব গুজব মিস্টেক সিস্টেক লাইফ নিয়ে সুন্দর করে একটা উপন্যাসের বই ছাপা যাবে!”

প্রিয়ন্তী চোখ উল্টে ফোঁসফোঁস করে বলল,

“তুই হাসছিস? আমার হার্ট অ্যাটাক হওয়ার জোগাড় আর তুই মজা পাচ্ছিস?”

“আরে মজা পাবো না? তুই ভাব, এত মানুষ থাকতে ওই অলিভ গ্রিন চোখ ওয়ালা হ্যান্ডসাম বান্দাকেই কেন তোর ভাইয়ের ক্লোজ ফ্রেন্ড হতে হবে! মানে ইউনিভার্স লিটারেললি তোকে ঘিরেই ঘুরতেছে!”

“শ্রেয়া, প্লিজ!এইটা কোনো ফানি ব্যাপার না। আমি এখনো শিওর না,লোকটা আমাকে চিনছে কিনা।যদি ব্যাটা সত্যিই আমায় চিনে ফেলে তো?"

“ওকে,ওকে, ফাইন। একটা কথা বল উনি তোর দিকে স্বাভাবিক ভাবেই চেয়ে ছিল, নাকি খানিকটা অন্যভাবে?”

প্রিয়ন্তী একটু থামল। সময় নিয়ে সুধালো,

“অদ্ভুতভাবে। মানে নরমাল না। মনে হচ্ছিল আমায় খুব আগে থেকেই চিনে হয়তো।আর জানিস উনি আমায় এমন একটা নামে সম্মোধন করেছেন,আমার কেন জানি ডাউট হচ্ছে!"

“ব্যাস!এইটাই তো সন্দেহজনক!"

“মানে তুই কি বলতে চাস,সে হয়তো চিনে ফেলছে?”

“আমি বলতেছি না নিশ্চিত! কিন্তু পসিবিলিটি আছে।”

প্রিয়ন্তী ঠোঁট কামড়ে চুপ করে গেল। গলা শুকিয়ে আসছে।শ্রেয়া আবার বলল,

“একটা কাজ কর, লোকটার সাথে আরেকটু কথা বলিস। ক্যাজুয়াললি। দেখ, কোনো হিন্ট দেয় কিনা।”

“পাগল নাকি?আমি নিজে গিয়ে আগ বাড়িয়ে কথা বলবো? যাতে সে আরো সন্দেহ করে?”

"এই প্রিয়, আচ্ছা যদি বাই এনি চান্স তোকে প্রতিদিন রাতে মেসেজ করা সে ব্যক্তিটি'ই তোর ভাইয়ের সেই ফ্রেন্ড বের হয় তখন?"

তড়িৎ বেগে ছুড়ে দেয়া শ্রেয়ার এহেন অদ্ভুত প্রশ্নে আরও বেশি তেতে গিয়ে উত্তর করে প্রিয়ন্তী,

"বেঙের মাথা! তুই চিনিস ওনাকে? উনি কতটা ব্যস্ত মানুষ আইডিয়া আছে? সে কিনা আসবে এরকম লেইম মার্কা কাজ করতে? তাও আবার আমায়?"

“এমনি বললাম। বাদ দে। কোথায় তুই এখন?"

“একপাশে এসে দাঁড়িয়েছি। ভিতরে মানুষের সরগম অনেক। হলুদের প্রোগ্রাম না!"

“আর তোর ওই নিরামিষ কমান্ডার কই?”

প্রিয়ন্তী বিরক্ত হয়ে বলল,

“এখানেই আছে কোথাও!ভাইয়া বলল আর উনি নাচতে নাচতে চলেও আসলো। এতটা আত্মসম্মানহীন মানুষ্ হয় কখনো উনাকে না দেখলে বুঝতাম না!"

“ওমা! ব্যাটা নিশ্চই তোর পিছনে লাইন মারতে আসছে!"

"লাইন না ছাই। আর এই প্রিয়ন্তী বারবার একই ভুল করেনা বুঝেছিস। উনার আত্মসম্মানবোধ না থাকতে পারে, আমার আছে। ব্যাটা ভেবেছে কি নিজেকে? আমায় রিজেক্ট করা? দিয়েছি মেসেন্জার থেকে ব্লক!"

“তো আমাকে ব্লক করার রিজনটা কি জানতে পারি, মিস প্রিয়ন্তী?”

আচানক ভারি পুরুষালি স্বরে আতঙ্কিত চোখে উল্টো ঘুরে তাকালো প্রিয়ন্তী। চোখে পড়ল সাদা রঙের প্যান্ট এর পকেটে দু হাত গুঁজে নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে থাকা মানবেতে। চোখদুটো স্থির। ওর দিকেই নিবদ্ধ। ওপাশে শ্রেয়া তখনও বলেই যাচ্ছে,

“হ্যালো? প্রিয়? কে রে ওটা? ওই মাইয়া?"

প্রিয়ন্তীর গলা শুকিয়ে কাঠ। বহু কষ্টে ঠোঁট নেড়ে জানাল,

“আ আমি… পরে কথা বলছি তোর সঙ্গে!”

বলেই তড়িঘড়ি করে কল কাটল।ফোনটা নামিয়ে আনতেই বুঝল,তাজধীর তখনো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। মাটির দিকে চোখ নামিয়ে ফেলল প্রিয়ন্তী। বুকের ভেতর ধুপধুপ শব্দটা বাইরে থেকেও শোনা যাচ্ছে কি? শক্ত হ প্রিয়ন্তী,শক্ত হ। প্রিয়ন্তী ঢোক গিলল। মাথা কাজ করছে না একদমই। উপরে যতই শক্ত কথা বলুক না কেন। এই লোকটার সামনে এলেই কেন জড়তা কাজ করে ওর বুঝে পায়না।তাজধীর এগিয়ে এলো কয়েক পা।

“আই রিপিট,হোয়াট ইজ দ্যা এক্সাক্ট রিজন,মিস প্রিয়ন্তী?”

"আগে আমায় বলুন আপনার আসলে সমস্যাটা কি?যখন তখন, যেখানে সেখানে এসে হুটহাট এমন ভুতের মত হাজির হয়ে যান কেন? ওয়েট আপনি আবার আমায় স্টক করছেন নাতো?"

চড়াও গলায় একনিঃশাসে হড়বড়িয়ে কথাগুলো বলে থামে মেয়েটা। তাজধীর কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রয় শুধু। চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত।আচমকাই লোকটা শব্দ করে বাঁকা হেসে উঠে। ডান ভ্রু কুঞ্চিত করে জানায়,

“স্টক? আর আপনায়?তা ঠিক কোন দুঃখে আমার আপনাকে স্টক করতে হবে শুনি? "

"সেটা তো আপনি'ই ভালো জানেন। যেখানে সেখানে এসে হুটহাট হাজির হয়ে যাচ্ছেন সামনে। বলি কি, এসব ফাজলামো ছেড়েছুড়ে ভালো হয়ে যান। ভালো হতে পয়সা লাগেনা। যেই কাজে আসছেন সেটায় মন দিন!"

রাগে গজগজ করতে করতেই কথাটা ছুড়ে দিল প্রিয়ন্তী। তাজধীর অবশ্য বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না এতে। বরং প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজেই দাঁড়িয়ে রইল আগের মতো। ঠোঁটের কোণে অস্পষ্ট একটুকরো হাসি ফুটিয়ে অতঃপর স্থির, মোহনীয় দৃষ্টিতে প্রিয়ন্তীর চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলল,

“সেটাই তো করছি।”

প্রিয়ন্তী ভ্রু কুঁচকাল,

“মানে?”

এবার ধীর পায়ে আরও খানিকটা এগিয়ে এলো লোকটা। এতটাই কাছে যে লোকটার পারফিউমের গাঢ় সুবাস এসে লাগল প্রিয়ন্তীর নাকে। বুকের ভেতরটা কেমন অকারণেই শিহরিত হলো। কিন্তু মুখে সেটা প্রকাশ হতে দিল না একটুও।

“প্রথমে বউ সেজে মেসেজ। তারপর মাছ চুরি। এরপরে আবার ব্লক। আর এখন তো সোজা আমাকে স্টকার বানিয়ে দিলেন।আপনার ক্রাইম লিস্ট কিন্তু দিনবেদিন লম্বা হচ্ছে, ম্যাডাম।”

প্রিয়ন্তী কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। লোকটার গলার স্বরটা কেমন যেন বদলে গেছে আচমকা।
ও দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল।

“আপনার সাথে কথা বলাই ভুল!"

“তাহলে ক্লিয়ার করুন? "

"কিহ?"

"ব্লক করেছেন কেন?"

"এভাবে বলছেন যেন আপনার সঙ্গে আমার জন্ম জমান্তরের সংসার চলছিল সেখানে?যে হুট্ করে ব্লক করায় তার কৈফিয়তও দিতে হবে?"

"না করলে সংসার টা শুরু হবে কিভাবে মিস?"

"মানে?"

"মানে খুব সিম্পল! আনব্লক করুন।ব্লক করে রেখে আবার রাগ দেখানোটা কেমন বাচ্চামি দেখায় না?তাই বলছি আনব্লক করুন, এরপর নাহয় ধীরে সুস্থে আবার জগড়াটা কন্টিনিউ করা যাবে।"

প্রিয়ন্তী হতভম্ব হয়ে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইলো। কি শেয়ানা লোক! জোড় করে আনব্লক করাবে কিনা শেষমেশ জগড়া কন্টিনিউ করার জন্য?

“ঝগড়া কন্টিনিউ করার জন্য আপনায় আমি আনব্লক করবো?"

"সেটা তো আপনার ইচ্ছা এন্ড মুডের উপর ডিপেন্ড করছে। আপনি চাইলে অন্য কিছুও কন্টিনিউ করা যাবে!"

"আপনি সত্যি সত্যিই অদ্ভুত মানুষ একটা!"

“এই কথাটা আপনি আগেও বলেছেন।”

“আরও হাজারবার বলবো!কোনো সমস্যা?"

"বাই দ্যা ওয়ে আপনি আমার কাছ থেকে এভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে বেড়াচ্ছেন কেন আজকাল?"

“আমি? আপনার থেকে পালাবো? প্লিজ! নিজেকে এতটাও ইম্পরট্যান্ট ভাবার কিছু নেই মিস্টার কমান্ডার।”

“ওহ? তাহলে ব্লক করলেন কেন?”

এক সেকেন্ড থেমে গেল প্রিয়ন্তী। পরক্ষণেই ঠোঁট শক্ত করে বলল,

“আমার ইচ্ছা হয়েছে তাই করেছি। সো?”

তাজধীর মাথা নেড়ে ধীরস্বরে বলল,

“মজার ব্যাপার কি জানেন? মানুষ সাধারণত তাকেই এভয়েড করতে চায়, যে মানুষটা তার মাথার ভেতর একটু বেশিই জায়গা করে নেয়।উম!দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা ঘুরঘুর করে! ইউ নো না হোয়াট আই মিন?"

“আপনি নিজেকে নিয়ে একটু বেশিই ভাবেন না?”

“হয়তো। তবে আমার ধারণা সাধারণত ভুল হয় না।”

“তাহলে এবার ভুল হয়েছে।”

প্রিয়ন্তী আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না সেখানে। বিরক্তিতে ফুঁসতে ফুঁসতে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে পেছন থেকে আবার ভেসে এলো তাজধীরের ভারী কণ্ঠ,

“আর হ্যা মিস প্রিয়ন্তী।”

পা থামিয়ে বিরক্ত চোখে ঘাড় ঘুরালো ও।তাজধীর তখনো একইভাবে তাকিয়ে আছে। তারপর একদম নির্লিপ্ত স্বরে বলে উঠল লোকটা,

“আপনি রাগলে আপনার নাকটা একদম লজ্জা রাঙা বধূর মতো টুকটুকে লাল হয়ে যায়।উম,ততটাও খারাপ কিন্ত লাগেনা দেখতে!"

****

রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সেখান থেকে বেরিয়ে এলো প্রিয়ন্তী। লোকটার প্রতিটা কথা কেন যেন মাথার ভেতর হাতুড়ির মতো বাজছে বারবার। বিরক্তিতে দাঁত চেপে হাঁটতে হাঁটতেই আচমকা টের পেল শাড়িটার আঁচল কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। সম্ভবত তাড়াহুড়োয় কোথাও পিন ছুটে গেছে।

“উফফ!”

বিরক্তিতে কপালে হাত ঠেকালো ও। চারপাশে এত মানুষের ভিড় যে ঠিকঠাক করাও মুশকিল। নিচতলা আর দোতলা পুরো মানুষে গমগম করছে। একবার দোতলার ওয়াশরুমে গিয়ে উঁকি দিয়েই হাঁ হয়ে গেল প্রিয়ন্তী। মেয়েদের লম্বা লাইন!এই লাইনে দাঁড়ালে আজ আর বাড়ি যাওয়া লাগবেনা। নিজের মনেই বিড়বিড় করে তিনতলার দিকে উঠে গেল ও।
আশ্চর্যজনকভাবে থার্ড ফ্লোর পুরোটাই প্রায় ফাঁকা। লম্বা লম্বা পা ফেলে ওয়াশরুমের সামনে পৌঁছাতেই দেখল একটা মেয়ে মাত্র বের হচ্ছে ভিতর থেকে। মেয়েটা চলে যেতেই দ্রুত ভিতরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে নিল। বড় আয়নার সামনে এসে দাঁড়াতেই নিজের এলোমেলো অবস্থা দেখে ঠোঁট কুঁচকালো। শাড়ির আঁচলটা ঠিক করল প্রথমে। খুলে যাওয়া পিন আবার লাগালো। খোঁপা থেকে বেরিয়ে আসা চুলগুলোও আঙুল দিয়ে গুছিয়ে নিল খানিকটা। এরপর চোখ গেল সামনের বড় কাঁচের দেয়ালটার দিকে। পার্স থেকে ফোনটা বের করল কয়েকটা মিরোর সেলফি নেয়ার জন্য।

ফোন বের করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দু-তিনটা মিরর সেলফি তুলে ফেলল প্রিয়ন্তী।তারপর মিনিট পাঁচেক আরও সময় লাগিয়ে বের হয়ে এলো বাইরে। পার্সে ফোন রাখতে রাখতে আচমকাই অসাবধানতায় কারো পায়ের উপর নিজের ৪ ইঞ্চির হাই হিল বসিয়ে দিতেই সঙ্গে সঙ্গেই কারো ভারী গলা থেকে চাপা একটা শব্দ বের হলো,

“উহ্!"

প্রিয়ন্তী আঁতকে উঠে তড়িঘড়ি পা সরালো। অসাবধানতায় সোজা কারো জুতোর ওপর পা দিয়ে ফেলেছে ও!

“স-সরি! আমি আসলে দেখিনি!"

কথাটা বলতে বলতেই মাথা তুলে তাকালো সামনে।
আর পরক্ষণেই ওর চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল ওর। গাঢ় রঙের কাবলি সেট পরে দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। একহাতে ফোন, অন্যহাত পকেটে। অলিভ গ্রিন চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে প্রিয়ন্তীর মুখে। চোখেমুখে বিরক্তির লেশমাত্র নেই। বরং কেমন যেন শান্ত, অদ্ভুত একটা দৃষ্টি। প্রিয়ন্তীর গলা শুকিয়ে কাঠ।

“আ-আপনি?”

ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে হাঁসফাঁস করল মেয়েটা। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে। এই লোকটার সঙ্গে কেন বারবার এমন অদ্ভুত অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় ওর, সেটাই বুঝে উঠতে পারে না।তড়িঘড়ি করে পা সরিয়ে নিয়ে জড়ানো গলায় বলে উঠল,

“স-সরি! আমি আসলে খেয়াল করিনি। আমার দেখে চলার উচিত ছিল, আমি সত্যিই সরি ভাইয়া!"

কথাগুলো বলতে বলতেই প্রায় গুলিয়ে ফেলল ও। অভিরাজ অবশ্য একদম শান্ত। যেন ব্যাপারটা তেমন কিছুই না। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে ধীর স্বরে বলল উল্টো,

“ইটসস ওকে। ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আম আলরাইট!"

লোকটার স্বাভাবিক গলায় বলা কথাতেও প্রিয়ন্তীর অস্বস্তি কমল না খুব একটা। বরং চোখ এড়িয়ে যেতে নিয়েও হঠাৎ থেমে গেল ওর দৃষ্টি। অভিরাজের কাবলি সেটের একপাশে খানিকটা ভেজা দাগ পড়েছে।কাপড়টা চিপচিপেও লাগছে কিছুটা। প্রিয়ন্তী অবচেতনভাবেই বলে ফেলল,

“এখানে কী হয়েছে?”

অভিরাজ নিজের পোশাকের দিকে তাকিয়ে বিরক্তির হাসি দিল।বলল,

“নিচে এক ওয়েটার জুস উল্টে ফেলেছে। এত গেদারিংয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকাও মুশকিল। তাই একটু উপরে চলে এলাম।”

“ওহ!"

অভিরাজ মাথা নেড়ে বুঝালো। তারপর আরও কিছু বলতে নিল হয়তো। কিন্তু প্রিয়ন্তীর ভেতরে ভেতরে অস্বস্তিটা আবার বাড়তে শুরু করেছে। লোকটার চোখদুটো খুব অদ্ভুত। মনে হয় যেন সব বুঝে ফেলছে।
তাই আর দাঁড়ালো না ও। ছোট্ট করে মাথা নেড়ে পাশ কাটিয়ে বের হয়ে যেতে নিল।ঠিক তখনই পেছন থেকে অভিরাজের ভারী গলা ভেসে এলো,

“ম্যাম, আপনার কাছে টিস্যু হবে?”

প্রিয়ন্তী থেমে গেল। পরক্ষণেই ব্যাগ খুলে তাড়াতাড়ি একটা টিস্যু বের করল। তারপর এগিয়ে দিয়ে ভদ্রতাসূচক ছোট্ট একটা হাসি ফুটিয়ে বলল,

“জি। নিন।”

"ধন্যবাদ!"

বলেই টিস্যুটা নিল। আঙুল ছুঁয়ে যাওয়ার আগেই হাত সরিয়ে নিল প্রিয়ন্তী। তারপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না সেখানে। দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে নেমে গেল।অভিরাজ দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল আগের মতোই। অলিভ গ্রিন চোখ দুটো স্থির হয়ে থাকল প্রিয়ন্তীর চলে যাওয়ার দিকে। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল অস্পষ্ট এক মুচকি হাসি।তারপর হাতে ধরা টিস্যুটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সেটাকে খুব যত্ন করে ভাঁজ করল। অতঃপর নিঃশব্দে নিজের পকেটে ঢুকিয়ে রাখল সে।
:
:
:
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে রাত বেশ গড়িয়ে গেছে। চারপাশের কোলাহল পুরোপুরি না থামলেও ইতিমধ্যে দূর দূরান্তের আত্মীয়স্বজনরা দুয়েকজন বেরিয়ে গেছে বাড়ির উদ্দেশ্যয়। এত রাত হওয়ায় পাভেলও ঠিক করল আর দেরি না করে বাসায় ফিরে যাবে সবাইকে নিয়ে।

তাজধীর আগেই গাড়ি পার্কিং থেকে বের করে এনে কমিউনিটি সেন্টারের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। নিজে বসে আছে ড্রাইভিং সিটে। গাড়ির কাঁচের ভেতর থেকে নির্লিপ্ত চোখে বাইরে তাকিয়ে আছে লোকটা।
কিছুক্ষণ পর মিতালী আর প্রিয়ন্তী বের হয়ে এলো ভিতর থেকে। শাড়ি সামলাতে সামলাতে হাঁটছে দুজন। ওদের পেছনেই আসছিল পাভেল, কিন্তু মাঝপথে এক পরিচিত মানুষের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতেই দাঁড়িয়ে গেল কথায়।

“আরে ভাই! আপনি এখানে?”

ব্যস, তারপর আর তাকে সরানো দায়।মিতালী একবার পিছনে তাকিয়ে হেসে মাথা নাড়ল। তারপর প্রিয়ন্তীকে নিয়ে গাড়ির কাছে এসে দরজা খুলে বলল,

“তুমি বসো, আমি তোমার ভাইয়াকে ডেকে আনছি।”

প্রিয়ন্তী কিছু বলার আগেই মিতালী মুচকি হেসে আবার ভেতরের দিকে চলে গেল। পিছনের সিটে বসে অস্বস্তিতে গুটিয়ে রইল প্রিয়ন্তী। সামনে তাজধীর স্টিয়ারিংয়ে একহাত রেখে বসে আছে। কিন্তু রিয়ার ভিউ মিররের ভেতর দিয়ে লোকটার দৃষ্টি বারবার এসে আটকে যাচ্ছে ওর মুখে। তখনের পর থেকে আর সামনাসামনি হয়নি দুজন। পাভেল নিজের বন্ধুবান্ধব সবার সঙ্গে গর্ব নিয়ে তাজধীরকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে একে একে। তাজধীর ও সৌজন্যেতায় সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলেছে। তবে প্রিয়ন্তী ঠিকই লক্ষ্য করেছে, প্রোগ্রামে থাকা সমস্ত মেয়েগুলো চোখ দিয়ে গিলে খেয়েছে নিরামিষটাকে। মেয়েগুলো তো আর জানেনা যাকে এতটা প্রয়োরিটি দিচ্ছে তার যে মেয়ে মানুষেই ইন্টারেস্ট নেই। ভাবতেই আফসোস লাগে প্রিয়ন্তীর মেয়েগুলোর জন্য।

“আমার মাছটা কবে দিচ্ছেন?”

একবারে আচানক, অপ্রত্যাশিত ভাবেই মুখের উপর ধুম করে ভারী গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল তাজধীর। প্রিয়ন্তী তাকিয়ে ছিল বাইরে। অমনি কপাল কুঁচকে তাকাল সামনে,

“কি?”

তাজধীর এবার ঘাড় ঘুরিয়ে সরাসরি তাকালো ওর দিকে। গলায় সেই চিরচেনা রুক্ষ ভাবটা স্পষ্টতই বজায় রেখে শুধাল,

“আমার ব্লু হাফমুনটার কথা বলছি। কবে ব্যাক দিচ্ছেন?”

প্রিয়ন্তী বিরক্তিতে চোখ বড় বড় করে বলল,

“এইখানে কি আপনার মাছ সঙ্গে করে আমি নিয়ে এসেছি নাকি?এইযে দেখুন নেই আমার ব্যাগে!"

রাগে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে সত্যি সত্যিই ব্যাগটা খুলে দেখাল প্রিয়ন্তী। তাজধীর সেদিকে চেয়ে গমগমে সরে জানাল,

“সেটা তো জানি না। আপনি যেভাবে জিনিস গায়েব করেন, ট্রাস্ট করা মুশকিল।”

“আর দিব না বলেছি না?”

“দেবেন না বললেই হলো?”

“হ্যা, হলো। একবার যেটা আমার কাছে এসেছে, সেটা ফেরত যাওয়ার চান্স নাই।”

“চুরি করে আবার এত কনফিডেন্স?চোরের মায়ের বড় গলা! তবে আপনি কেন আমার সবকিছু চুরি করতে হাত ধুয়ে লেগেছেন বলুন তোহ? "

"আজব! আবার কি চুরি করেছি আমি?"

"এইযে প্রথমে মাছ, এরপর আমার শান্তি!"

শেষের কথাটা বিড়বিড় করে বলে ঘাড় উল্টে ফোকাস করল সামনের রাস্তায়। প্রিয়ন্তী তখনো সেই কথার পিঠে একের পর এক ঝাঁঝালো বাক্য বলেই যাচ্ছে।তবে তাজধীরের সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই আপাতত। রিয়ার ভিউ মিররে তাকানো চোখ দুটো মুহূর্তেই সরে গিয়ে আটকালো সামনের মেইন রাস্তায়। কপাল কুঁচকে গেল ওর। কয়েক সেকেন্ড একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাইরে। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে। বয়স খুব বেশি না। কানে ফোন চেপে কী যেন বলছে আর হাসছে। এতটাই ফোনে ডুবে আছে যে আশপাশের দিকে কোনো খেয়ালই নেই মেয়েটার। পোশাক দেখে বুঝতে বাকি রইল না— এই প্রোগ্রামেরই কোনো গেস্ট হবে হয়তো।

চারপাশ অস্বাভাবিক রকম ফাঁকা। রাত অনেক হওয়ায় রস্তায় কোনো গাড়িঘোড়াও নেই বললেই চলে। এমনিতেই কমিউনিটি সেন্টারটা একটু ভিতরের দিকে। ঠিক তখনই একটা বাইক খুব দ্রুতগতিতে মেয়েটাকে ক্রস করে চলে গেল সামনের দিকে।
তাজধীরের চোখ সরু হয়ে এলো আরও।বাইকে বসা দুজন ছেলে। সামনের জনের মাথায় হেলমেট থাকলেও পিছনের জনের মুখে কালো মাস্ক।বাইকটা কয়েক সেকেন্ড সামনে গিয়ে আচমকাই ইউ-টার্ন নিল।
তাজধীরের মুখের রঙ বদলে নিমিষেই।যা বুঝার তার বিচক্ষণ মস্তিস্ক বুঝে নিলো মুহূর্তেই।

“ওহ শিট!”

চোখদুটো হঠাৎ ভয়ানক তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে।পরিস্তিতির আগামবার্তা বুঝতে পেরেই খানিকটা চিন্তিত হয়ে উঠল মুখভঙ্গি। হর্ন দিলেও লাভ হবে না, এটাও বুঝল সঙ্গে সঙ্গে। মেয়েটা সম্পূর্ণ ফোনে মগ্ন।আমলে নিবেনা কিছুই।

এক মুহূর্ত দেরি করল না তাজধীর আর। ধড়াম করে গাড়ির দরজা খুলে প্রায় লাফিয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে। তারপর ঝড়ের বেগে দৌড় দিল রাস্তার দিকে।ওদিকে
প্রিয়ন্তী পুরোপুরি হতভম্ব।খানিকটা ঝুকে জানালার কাছে মুখে নিয়ে বিড়বিড় করল,

“এই ব্যাটার আবার কি হলো?"

বাক্য শেষ করার আগেই একটা বাইক এদিক দিয়ে তেড়ে আসতে দেখল ও।তাজধীর দূর থেকেই গর্জে উঠল,

“হেই! সরে যান! সরে যান ওখান থেকে!”

মেয়েটা শুনলই না। এখনো ফোন কানে চেপে দাঁড়িয়ে আছে। পরের মুহূর্তেই বাইকের পিছনে বসা ছেলেটা হাতে ধরা সাদা রঙের একটা বোতল উঁচু করল। ভেতরে স্বচ্ছ তরল জাতীয় কিছু। সবকিছু খুব দ্রুতই ঘটল। পুরো চোখের পলকে।ছেলেটা বোতলের মুখ খুলে মেয়েটার দিকে ছুঁড়ে মারতে নিলে তাজধীর দৌড়ে গিয়ে প্রায় ছিনিয়ে আনার মতো করে মেয়েটাকে জোরে টেনে নিজের দিকে সরিয়ে নিল।ব্যাস!তরলটা গিয়ে পড়ল রাস্তার একপাশে।সঙ্গে সঙ্গে সেখান থেকে ধোঁয়ার মতো কুয়াশা উঠতে লাগল।

প্রিয়ন্তীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল ভয়ানকভাবে।
এ সিড! আর এক সেকেন্ড দেরি হলেই মেয়েটার পুরো মুখটাই ঝলসে যেত।তাজধীরের ঝটকা টানে মেয়েটা সোজা গিয়ে ধাক্কা খেল ওর বুকের সঙ্গে। ভারসাম্য হারিয়ে হাত থেকে ফোনটাও ছিটকে পড়ল রাস্তায়।
এর মাঝেই বাইকটা পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে নিলে
কমিউনিটি সেন্টারের গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কেয়ারটেকারের হাত থেকে ঝটকা মেরে লাঠিটা টেনে নিয়ে সোজা ছুড়ে মারল বাইকের দিকে। লাঠিটা গিয়ে সজোরে আঘাত করল পিছনে বসা ছেলেটার পিঠে।

“আআহ!”

ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠে ভারসাম্য রাখতে না পেরে বাইক থেকে গড়িয়ে পড়ল ছেলেটা। উঁবু হয়ে পড়ল সোজা রাস্তায়। তবে সামনের জন আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। বাইকটা নিয়েই তীব্র গতিতে ছুটে পালাল সামনে। চারপাশে তখন চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেছে। কমিউনিটি সেন্টারের ভেতর থেকে একে একে সবাই দৌড়ে বেরিয়ে আসছে বাইরে। তাজধীর ইতিমধ্যে দৌড়ে গিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা ছেলেটার কলার চেপে ধরেছে একহাতে। ছেলেটা রাগে ছটফট করতে লাগল নিজেকে ছাড়ানোর জন্য।

“ছাড়! ছাড় বলছি!”

পালিয়ে যাওয়া বাইকের নাম্বারপ্লেটের দিকে একবার তাকিয়েই পুরো নাম্বারটা মুখস্থ করে ফেলেছে তাজধীর।একহাতে ছেলেটাকে চেপে ধরে রেখেই অন্য হাতে ফোন বের করল দ্রুত। কল লাগতেই ঠান্ডা গলায় বলে উঠল,

“একটা ব্ল্যাক R15এইমাত্র বের হয়েছে। নাম্বার— ঢাকা মেট্রো....!ইমিডিয়েটলি ব্লক দ্য রুট। আমি লোকেশন পাঠাচ্ছি। ছেলেটা এ সিড কেসের সঙ্গে ইনভলভড।”

ওপাশে কী বলা হলো শোনা গেল না। তাজধীর শুধু সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,

“নাও।”

কল কেটে আবার পুরো মনোযোগ দিল ছেলেটার দিকে। ওদিকে ছেলেটা বুঝে গেছে এবার বাঁচা কঠিন। মরিয়া হয়ে পকেট থেকে আচমকা ছোট একটা ধারালো ব্লে ড জাতীয় অস্ত্র বের করে সোজা তাজধীরের হাতের দিকে চালিয়ে দিতে যেতেই পিছন থেকে আতঙ্কিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল প্রিয়ন্তী,

“সাবধান!”

কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নেভি অফিসারের রিফ্লেক্স এত সহজে হারাতে পারবে?একহাতে ছেলেটার কবজি চেপে ধরল সে মোচড়িয়ে।সঙ্গে সঙ্গে ব্যথায় ককিয়ে উঠল ছেলেটি। হাতে থাকা ধারালো জিনিসটা ছিটকে পড়ে গেল দূরে।এরপর কোনো রকম সুযোগ না দিয়েই তাজধীর ছেলেটাকে মাটিতে চেপে ধরল শক্তভাবে।ওদিকে মেয়েটা তখনো আতঙ্কে কাঁপছে। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে পুরো। ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করছে।প্রিয়ন্তী দৌড়ে গিয়ে মেয়েটাকে ধরল।কাঁপতে থাকা মেয়েটাকে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল ও। এর মধ্যেই মেয়েটার মা-বাবাও দৌড়ে এসে পৌঁছাল। মেয়ের অবস্থা দেখে মহিলা প্রায় ভেঙে পড়লেন কান্নায়। চারপাশে তখন একটাই আলোচনা,আর একটু হলেই আজ ভয়ংকর একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেত।

ছেলেটাকে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে তাজধীর। চারপাশে তখন মানুষজনের ভিড় জমে গেছে।
কিন্তু ধরা পড়েও ছেলেটার মুখের দাপট কমল না একটুও।উল্টো ছটফট করতে করতেই দাঁত কিঁচিয়ে বলে উঠল,

“ছাড় শালা! তুই জানস আমি কে? হাত ছাড় বলতেছি!"

তাজধীরের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল আচানক।
ছেলেটা থামল না। নিজেকে ছাড়াতে মরিয়া হয়ে বলে গেল,

“বেশি হিরোগিরি দেখাস না! তোরে আমি.. ”

"ঠাস!

আচমকা এমন জোরে একটা চড় বসল ছেলেটার গালে যে চারপাশের কয়েকজন পর্যন্ত কেঁপে উঠল।
ছেলেটার মাথা ঝাঁকুনি খেয়ে একপাশে কাত হয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখেমুখ ঝাপসা হয়ে এলো বেচারার। যেন ডানপাশের পৃথিবীটা হঠাৎ বামপাশে চলে গেছে। বাম পাশটা শুন্য, ফাঁকা। তাজধীর ক্ষান্ত হলো না তাতেও। পরপর বাম পাশে আবারও আগের ন্যায় শক্ত পোক্ত দাবাং হাতের চড় পরায় এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে সক্ষম হলোনা। পুরো ভারসাম্য হারিয়ে সোজা ধপ করে পড়ে গেল ধুলোমাখা রাস্তায়। হাঁপাতে হাঁপাতে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল। পরক্ষণেই কাশতে কাশতে সামনে থুথু ফেলতেই জমে গেল ওর দৃষ্টি।র ক্ত।টকটকে লাল রক্তের সঙ্গে ছোট্ট সাদা কিছু একটা গড়িয়ে পড়েছে মাটিতে।সর্বনাশ! দাঁত,দাঁত পড়ে গেছে দ্বিতীয় থাপ্পরে?

বেচারা ব্যথার চাইতে বেশি আশ্চর্যে হতোবিহুল। চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। কাঁপা হাতে নিজের মুখে হাত দিল সে। সত্যিই,দাঁত পড়ে গেছে। তাজধীর ধীর পায়ে এগিয়ে এলো ওর সামনে। কালো জুতোর নিচে রাস্তায় পড়ে থাকা লাঠিটা চাপা পড়ে কট করে শব্দ করল কেমন। তারপর নিচু হয়ে ছেলেটার কলার আবার চেপে ধরে ভয়ংকর ঠান্ডা গলায় বলল,

“এ সিড নিয়ে মেয়েদের মুখ ঝলসানোর আগে একবারও হাত কাঁপেনি, না?মনতো চাচ্ছে ওগুলো দিয়ে তোমার নিজের চেহারার নকশা'ই বদলে দেই!"

রাস্তাজুড়ে তখন বিশৃঙ্খল এক পরিস্থিতি। চারপাশে মানুষজনের জটলা বেঁধেছে বেশ। কেউ আতঙ্কিত, কেউ উত্তেজিত গলায় পুরো ঘটনা আলোচনা করছে। মাঝখানে মাটিতে আধশোয়া হয়ে পড়ে আছে ছেলেটা। মুখের কোণে রক্ত, চোখেমুখে স্পষ্ট ভয়।
আর ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাজধীর।
পাঞ্জাবির হাতার কাছটা সামান্য কুঁচকে গেছে ধস্তাধস্তিতে। হাতের শিরাগুলোও ফুলে উঠেছে রাগে। কিন্তু এতকিছুর পরও লোকটার মুখে ভয়ংকর রকমের নিয়ন্ত্রিত একটা স্থিরতা বিদ্যমান। দূর থেকেই পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ ভেসে এলো কিছুক্ষণ পর। প্রিয়ন্তী নিজেকে সামলে দাঁড়িয়ে থাকতেই পাভেল, মিতালী আর শিহাবও দৌড়ে চলে এলো সেখানে। মেয়েটা শিহাবের'ই কাজিন।

ওদিকে পুলিশের গাড়ি এসে থামল সামনে।দুজন কনস্টেবল আর একজন অফিসার দ্রুত নেমে এলো গাড়ি থেকে। পরিস্থিতি দেখে প্রথমে তারা ছেলেটার দিকে এগোতেই আশপাশের কয়েকজন একসঙ্গে বলে উঠল,

“এই স্যার! এই ছেলেটাই এ সিড মারতে আসছিল!”

পুলিশ অফিসারের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।তখনই তাজধীর সামনে এগিয়ে এলো। ঠান্ডা গলায় বলল,

“ওর পার্টনার ব্ল্যাক R15 ফাইভ নিয়ে পালিয়েছে। নাম্বারটা আমি ট্রেসে পাঠিয়ে দিয়েছি।”

অফিসারটা প্রথমে স্বাভাবিকভাবেই নিলেও পরক্ষণেই ভালো করে তাজধীরের দিকে তাকাতেই মুখের ভাব বদলে গেল খানিকটা। তৎক্ষণাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সম্মানসূচক ভঙ্গিতে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল,

“জ্বি স্যার।”

বাংলাদেশে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মান প্রদর্শনের একটা প্রটোকল থাকেই, বিশেষ করে উচ্চপদস্থ অফিসারদের ক্ষেত্রে। তাই অফিসারের আচরণেও সেই সম্মানটাই স্পষ্ট ফুটে উঠল। তাজধীর শান্ত, দৃঢ় গলায় বলল,

“ছেলেটার বিরুদ্ধে অ্যাটেম্পটেড অ্যাসিড অ্যাটাক, ক্রিমিনাল অ্যাসল্ট— সবকিছুর চার্জ যাবে। আর একটা কথা…”

একটু থেমে ছেলেটার দিকে তাকাল সে।চোখদুটো মুহূর্তেই বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে উঠল।

“এত সহজে যেন ছাড়া না পায়।”

পুলিশ অফিসার দৃঢ় গলায় বলল,

“ডোন্ট ওরি স্যার। আমরা বিষয়টা সিরিয়াসলি হ্যান্ডেল করব।”

ওদিকে শিহাবের বাবা এগিয়ে এসে তাজধীরের হাত দুটো চেপে ধরলেন আবেগ নিয়ে।

“বাবা, আপনি না থাকলে আজকে আমার মেয়েটার কি হইতো আমি কল্পনাও করতে পারতেছি না।আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুক বাবা।"

তাজধীর অস্বস্তিতে মাথা নেড়ে বলল,

“ইটস ওকে, আঙ্কেল। আমি শুধু মানুষ হিসেবে আমার দায়িত্বটুকু পালন করেছি।"

:
:

রাত অনেকটাই গড়িয়ে গেছে তখন। চারপাশের রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। তাজধীর যথারীতি স্থির হাতে গাড়ি চালিয়ে এনে থামালো সিদ্দিক কুঞ্জের সামনে। গাড়ির হেডলাইটের আলো সামনের গেট ছুঁয়ে নিভে যেতেই একে একে দরজা খুলে নামল সবাই।
প্রথমে মিতালী নামল। তারপর পাভেল। দুজনেই নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে বাড়ির ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল। পিছনের সিটে বসে থাকা প্রিয়ন্তীও ধীরে ধীরে দরজা খুলে নামলো। স্বাভাবিকভাবে নেমেই দু কদম হাটতে গিয়ে বাঁধলো বিপত্তি। শাড়ির আঁচলে টান লাগায় ঝটকায় পেছনে তাকায় ও। দেখতে পায় সেদিনের মতো আজও একই ভাবে শাড়ির আঁচল আটকেছে গাড়ির দরজায়।

“উফফ!”

কপাল কুঁচকে নিচে তাকাতেই বুঝল, শাড়ির আঁচলটা গাড়ির দরজার ভেতরে আটকে গেছে। কিছুটা অংশ এখনো ভিতরে রয়ে গেছে। বিরক্ত হয়ে একহাতে শাড়ি সামলে অন্যহাতে আঁচলটা ধরে টান দিতে লাগল প্রিয়ন্তী।ঠিক তখনই ড্রাইভিং সিট থেকে নেমে আসা তাজধীর দৃশ্যটা দেখে প্রায় আহাজারির সুরেই বলে উঠল,

“আরে আরে! কী করছেন? নষ্ট হয়ে যাবে তো!”

প্রিয়ন্তী এমনিতেই বিরক্ত ছিল। তার উপর এই লোকের কথা শুনে আরও খেপে গেল। আঁচলটা টানতে টানতেই রাগী গলায় বলে উঠল,

“আমার শাড়ি নষ্ট হলে হবে আপনার কী?”

তাজধীর একহাতে গাড়ির চাবিটা ঘুরাতে ঘুরাতে নির্লিপ্ত মুখে উত্তর দিল,

“ম্যাডাম, আমি আপনার শাড়ির কথা বলিনি। আমি আমার গাড়ির কথা বলেছি। যেইভাবে টানাটানি করছেন, কোনোদিন দেখি আমার গাড়ির আত্মার মাগফিরাত কামনা করতে হয়।অনেক কষ্টের টাকায় কেনা গাড়ি এটা আমার।”

প্রিয়ন্তী চোখ কুঁচকে তাকাল লোকটার দিকে। এই লোকটা এমন অদ্ভুত কেন? কিছুক্ষন আগেও তো কতটা সিরিয়াস ছিল। পুরো রাস্তায়ও কেমন গম্ভীর মুখ করে এসেছে। টু শব্দটি অব্দিও করেনি। অথচ ওর সঙ্গেই কেন সবসময় এমন ঠেস মেরে কথা বলে? কোন জন্মের শুত্রুতা ওর সঙ্গে?বিরক্তিতে ঠোঁট বাঁকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,

“রাস্তায় বসে প্লেট নিয়ে দিনরাত ভিক্ষা করে কিনেছিলেন বুঝি?”

"টাকার মূল্য আপনি কি করে বুঝবেন?খান তো ভাইয়ের পয়সায়। এটা লাগলে ভাইয়া, ওটা লাগলে ভাইয়া, তাই বুঝবেন কি করে টাকা কামাতে যে কতটা ইফোর্ট দিতে হয়!"

বলেই এগিয়ে এলো। প্রিয়ন্তী কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাজধীর নিচু হয়ে খুব সাবধানে দরজার ফাঁকে আটকে থাকা শাড়ির আঁচলটা আলগা করে বের করে আনল।আঁচলটা বের করে সোজা হয়ে দাঁড়াল তাজধীর। তারপর খানিকটা ঝুঁকে প্রিয়ন্তীর কানের কাছাকাছি এসে নিচু ভারী গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল,

“আচ্ছা আপনি এসব ইচ্ছা করে করেন না তো?বাচ্চার বাবাকে দিয়ে শুধু শুধু কাজ করানোর ধান্দা,তাই না?ভারি দুষ্ট তো আপনি ম্যাডাম!"

বেচারির মুখটা মুখটা হাঁ হয়ে গেল। কান পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল লজ্জা আর রাগে। কিন্তু ততক্ষণে তাজধীর দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে বড় বড় পা ফেলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। যেতে যেতে আবারও গলায় হাঁক ছেড়ে মেয়েটার মেয়েটার উদ্দেশ্য বলে গেল,

"টাকাপয়সা এখন থেকে একটু হিসেব করে ভাঙবেন মিস প্রিয়ন্তী, আপনার হাসব্যান্ডের কিন্ত ওতো বেশি টাকা নেই। শেষে দেখা গেল বাচ্চার মা'কে নিয়েই না আবার রাস্তায় বসতে হয়!"

চলবে....

জানিনা কি লিখেছি। রিচেকও দেয়নি। পরবর্তী পর্ব কবে আসে জানিনা। কেউ অপেক্ষা করবেন না।

আজ রাত ১২ টা অব্দি আমার সকল ইবুকে ১৫% ডিসকাউন্ট পেয়ে যাচ্ছেন। সময় আর মাত্র কিছু ঘন্টা। এরপর থেকে এই অফার আর পাবেন না।

Address

Rajshahi
Rajshahi

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Md jakir mazhi posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share

Category