15/01/2026
আবদুস সালাম পিন্টুর মেয়ে Facebook পোষ্ট
একদিন এক বক্তব্যে আমি আমার ছোটবেলার কিছু কথা বলেছিলাম-আমার আব্বুকে ঘিরে।
আমার জন্মের আগের গল্পটা দিয়েই শুরু হয় সেটা ।
আব্বু আম্মুর প্রথম সন্তান মেয়ে-আমার বোন ।
কিন্তু আব্বু যেহেতু রাজনীতির মানুষ, তাই চারপাশের সবারই আশা ছিল- দ্বিতিয় সন্তান একটা ছেলে হবে।
আল্ট্রাসাউন্ডে যখন আম্মু জানলেন, পেটে মেয়ে সন্তান-আম্মু তো এটা শুনে রুম বন্ধ করে সেই কান্না! তখন আব্বু–আম্মু এমপি হোস্টেলে থাকতেন।
আম্মু দরজা খুলছিলেন না।
বাড়ির সবাই ভয়ে অস্থির-কী হয়েছে? বাচ্চার কোনো সমস্যা নাকি?
সব কাজ ফেলে আব্বু দৌড়ে এলেন।
কান্নার কারণ শুনে হো হো করে হেসে উঠলেন তিনি।
বললেন,
“আমার দল ভারী হবে বলে কাঁদছো?”
এই গল্পটা আমি পরে জেনেছি।
কারণ আব্বুকে কাছে পাইনি প্রায় ১৭ বছর।
শৈশবের স্মৃতিগুলো ঝাপসা।
ক্লাস ফোরে পড়তেই আব্বু মন্ত্রী হয়ে গেলেন-আর ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
এর আগে ক্লাস ২ তে পড়তে একদিন আম্মুর বকা খেয়ে আমাকে পড়াতে বসেছিলেন-এইটুকুই স্পষ্ট মনে আছে।
যখন বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই আব্বুকে দেখেছি জেলে।
আমাদের কোনো নিজস্ব বাড়ি ছিল না-আম্মুর সরকারি কোয়ার্টারেই থাকতাম।
আওয়ামী সরকার আম্মুর চাকরি নিয়ে যে কী নির্যাতন করেছে!
খাগড়াছড়ি, ঠাকুরগাঁও , জয়পুরহাট, আবার বাশাইল-
বদলির পর বদলি, মামলার পর মামলা।
তখন আমার আব্বুর প্রতি ভীষণ রাগ হতো।
যারা আমাকে চেনে, তারা জানে-এই রাগের গল্প।
আমি এমনও বলেছি,
“একটা মেয়ের যদি বিয়ে করে এত কষ্ট পেতে হয়, তাহলে বিয়ে না করাই ভালো।”
কারণ আমি আমার মায়ের কষ্ট দেখেছি।
রাতভর পাগলের মতো কান্না।
মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে শুনতাম আম্মু কাঁদছেন।
আমাদের দুই বোনকে AGB কলোনির একটা নিচতলার বাসায় রেখে
আম্মুকে দূরদূরান্তে চাকরি করতে হতো।
বাসাটা ভুতুড়ে ছিল।
কিন্তু উপায় ছিল না।
আমরা থাকতাম—আর দেখাশোনার জন্য থাকতেন মাসুদ আঙ্কেল।
সেই বাসার ভৌতিক গল্প অন্য একদিন বলব।
কিন্তু সবচেয়ে বেশি যেটা ছিল সেটা ছিল মানুষের ভয়।
আর আল্লাহর ওপর অভিমান।
একটা ছোট মন তখন সব দোষ দিত আব্বুকে।
মাঝে মাঝে অভিমান করে বাবাকে বলতাম,
“রাজনীতি করে কী পেলা ? উকালতি করলেই তো পারতে !”
আব্বু কখনো কিছু বলতেন না।
তার কষ্টটা আমি তখন বুঝিনি।
কিন্তু আমার রাগটা ছিল আকাশছোঁয়া।
এসএসসি পরীক্ষার আগে শুনলাম—পুলিশ আসবে, কোয়ার্টার থেকে উচ্ছেদ করবে।
পরীক্ষার খাতায় লিখতে লিখতে চোখ ভিজে যেত।
ভাবতাম—বাসায় গিয়ে কি দেখব!আম্মু রাস্তায় মালপত্র নিয়ে কাঁদছেন।এমন কিছু!
বড় আপুর বিয়ের দিন শুনলাম আব্বু নাকি দুই ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তি পাবেন।
শেষ মুহূর্তে সেটাও হলো না।
সকালে কাবিনের পর আমি খুব কেঁদেছিলাম।
মনে হয়েছিল,আমার বাবার কপালে নিজের মেয়ের বিয়েটাও জুটল না।
নিজের মায়ের জানাজায়ও আব্বু থাকতে পারেননি।
এই কষ্টের ভার কি পৃথিবীর সবকিছু দিয়েও হালকা করা যায়?
আমি জানি না।
আজ আব্বুর সাথে থাকছি ১২ মাস হলো।
এই ১২ মাসেও খুব বেশি সময় একসাথে থাকা হয়নি।
নির্বাচন নিয়ে তিনি ব্যস্ত।
আমি চেয়েছিলাম প্রচারণায় যেতে।
কিন্তু আব্বু তো নিয়ম ভাঙতে পারেন না । তাই বার বার মানা করেন । কিন্তু আমার মন তো চায় আব্বুর আসে পাশেই থাকি । তাই বললাম ভোট চাইব না । তোমাকে দেখব, গ্রামের মানুষজনকে দেখব । এবার যদি একটু নেন আরকি ।
আমি জানি না কোন এমপি প্রার্থী তার স্ত্রী–মেয়েকে মনোনয়ন জমা দিতে পাশে রাখে। তিনি আম্মুকে প্রস্তাবক আর আমাকে সমর্থক বানিয়েছেন ।
আমরা জানি, আব্বু আমাদের স্বর্ণ –দালান কিনে দিতে পারবেন না।
আম্মুও জানেন।
কিন্তু আম্মু যদি হঠাৎ মুড়ির মোআ খেতে চান,
আব্বু গাড়ি থামিয়ে পকেট থেকে ৫০ টাকা বের করে মুড়ির মোআ প্যাকেট কিনে দেন।
আম্মুর একটা খারাপ দিক হল , হুটহাট রাগ করেন । ১৭ বছরের কষ্ট থেকেও এই রাগ কিছুটা এসে যায় ।
কিন্তু আব্বু?
আজও আম্মু রাগলে অন্য রুমে পিছু পিছু গিয়ে হাত ধরে আদর করে নিয়ে আসেন।
খাবার টেবিলে আম্মুর জন্য অপেক্ষা করেন।
বের হওয়ার সময় বলেন,
“যাচ্ছি, বেগম সাহেবা।”
১৭ বছর আগে আমি রাগ করে আম্মুকে বলতাম,
“কেন বিয়ে করতে গেছিলা এমন লোক?”
আজ সেই আমিই বলি,
“তোমার সাত জন্মের কপাল যে আব্বুর মতো মানুষ পেয়েছো।”
অনেক পুরুষ দেখি স্ত্রী–সন্তানকে দমিয়ে রাখে।
অথচ আমার বাবা টাকা-পয়সা না দিতে পারলেও
আমাদের মাথায় তুলে রাখেন।
আলহামদুলিল্লাহ।
আজ বুঝি,
কেন আব্বু বলেন, তার নারী ভোট বেশি।
আজ বুঝি,
কেন তিনি বলেছিলেন,
“আমার দল ভারী হবে বলে কাঁদছো?”
মাশাআল্লাহ।
এমন পুরুষ মানুষ ঘরে ঘরে জন্ম নিক-
যারা নারীদের শাসন করে নয়,
ভালোবাসা দিয়ে নিজের দলে আনতে জানে।