19/08/2026
গল্প
শ্রাবণ এলেই তুমি
—শুভ বড়ুয়া
অভ্র, রেডি হয় তারতারি। স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যাবে । যাও, সময় থাকতে ছাতা নিয়ে যাস। যে কোনো সময় বৃষ্টি আসতেছ পারে আর বিছানার তলা থেকে ৫ টাকা নিস। এর থেকে বেশি নিস না। আমি গোয়ালঘরে যাচ্ছি।
— আচ্ছা, মা।
বলে অভ্র রেডি হয়ে স্কুলে যেতে বের হলো। সময় তখন সকাল ৮টা বেজে ৪৬ মিনিট। অভ্র আজ একটু তাড়াতাড়ি যাচ্ছে, কারণ আজ বৃষ্টি বেশি হচ্ছে। বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব হাতের নাগালে নয়, তবুও মাত্র ২ কিলোমিটার। পুরো পথই হেঁটে যেতে হয়।
শ্রাবণ মাসে বৃষ্টি একটু বেশি হয়, তাই অভ্রর কাছে সব সময় একটা ছাতা থাকে। কিন্তু ছাতাটা নামে ছাতা হলেও, বৃষ্টি বেশি হলে সব কাপড় ভিজে যায়।
অভ্র ২০১৭ সালে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। তখন স্কুল থেকে উপবৃত্ত টাকা পেয়ে এই ছাতা টা কিনে।
পড়াশোনায় সে তেমন ভালোও না, আবার খারাপও না। বলতে গেলে মোটামুটি। পড়াশোনা নিয়ে তার ভালো চিন্তা আছে, কিন্তু দুষ্টুমির জন্য পড়ায় মন বসে না।
অভ্র স্কুলে এসে সামনে ও বসে না , আবার একেবারে পেছনে বসে তাও না । সে মাঝখানে, জানালার পাশে একটি সিটে বসে,
জানালা পাশে বড় একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ আছে। যেটা ৪ তলা ভবনে মানি অভ্র ক্লাসে এসে ডালপালা গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে । জানালা দিয়ে হাত বের করলে পাতা গুলো ধরা যায়।
তাই অভ্র জানলা পাশে বসে।
যাতে জানালা দিয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছ থেকে পড়া বৃষ্টির পানি হাত দিয়ে ধরতে পারে।
একদিন ক্লাস চলছিল। বাইরে ভারি বৃষ্টি হচ্ছিল। অভ্র জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখছিল। সে এতটাই বৃষ্টিতে মগ্ন হয়ে গিয়েছিল যে খেয়ালই করেনি, স্যার ক্লাস নিচ্ছেন।
স্যার এসে কোনো কথা না বলে ঠাস করে গালে একটা থাপ্পড় দিলেন। অভ্র ভয়ে "বাবা গো!" বলে দাঁড়িয়ে গেল।
স্যার জিজ্ঞেস করলেন,
— তুই পড়ায় মন না দিয়ে জানালার দিকে কী তাকিয়ে দেখছিস?
অভ্র চুপ করে রইল।
স্যার বললেন,
— কান ধরে দাঁড়িয়ে থাক।
ক্লাসরুমে যদি স্যার আমাকে মারতেন, তবুও আমার তেমন লজ্জা লাগত না। কিন্তু কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা—এর চেয়ে অপমান হয়তো আর কিছু হতে পারে না। তার চেয়ে যেন আমাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতেন। সবচেয়ে লজ্জার বিষয় ছিল, মালতী এটা দেখে হাসছিল।
মালতী ছিল আমার সহপাঠী। ক্লাসে মনে হয় ওকেই আমার সবচেয়ে ভালো লাগত। শুধু আমার নয়, প্রায় সব ছেলেরই ভালো লাগত। তখন তো ভালো লাগা আর ভালোবাসার পার্থক্য বুঝতাম না।
আমাদের সব সহপাঠীর মধ্যে মালতী একটু বেশি সুন্দর ছিল। তাই হয়তো সবাই তাকে পছন্দ করত। সবাই কোনো না কোনোভাবে মালতীকে খুশি করার চেষ্টা করত। আর সেটা দেখে আমার খুব হিংসা হতো।
আমার মতো আরও কয়েকজন মালতীকে পছন্দ করত। সেটা মালতীও জানত। কিন্তু আমি যে মালতী কে পছন্দ করি এটা সে জানে না।
তাদের মধ্যে একজন ছিল নীল, আরেকজন ছিল আয়ান।
নীল সব সময় মালতীকে খুশি করার জন্য কিছু না কিছু করত। একদিন সে মালতীর পিছু পিছু গেল। উদ্দেশ্য একটাই—আজ সে মনের সব কথা বলে ফেলবে। সে যেন সবকিছু প্রস্তুত করে ফেলেছিল। আজ যদি বিশ্বযুদ্ধও শুরু হয়, কিংবা এই শ্রাবণ মাসে নতুন কোনো ভয়ংকর ঝড় আসে, তবুও সে থামবে না।
নীল মালতীকে ডেকে একটা চিঠি দিল। চিঠিতে লেখা ছিল—
"ওগো মালতী, তুমি আমার শেষ গোলাপের স্মৃতি। তোমার কাছে করি মিনতি, হয়ে যাও আমার জীবনের প্রথম এবং শেষ স্মৃতি।"
নীলের এমন কাণ্ড দেখে মালতী তখন কিছুই বলল না। কিন্তু পরের দিন চিঠিটা হেডস্যারের হাতে তুলে দিল। হেডস্যার এমন বেতের বাড়ি দিলেন যে, মনে হলো নীলের পিঠের ওপর দিয়ে যেন বন্যার ঢল বয়ে গেল। সেদিন থেকে নীল আর মালতীকে দুই চোখে সহ্য করতে পারত না।
এদিকে আমি মহাখুশি। কারণ ভাবলাম, আমার আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। কিন্তু আয়ানও যে মালতীকে পছন্দ করত, সেটা আমি জানতাম না। সে আমার মতোই নিজের অনুভূতি গোপন করে রেখেছিল।
ক্লাসে আমার সবচেয়ে প্রিয় বিষয় ছিল ধর্ম ক্লাস । কারণ এই বিষয়টায় বেশি পড়তে হতো না। ম্যাম পড়া নিয়ে চলে যেতেন, আর তখন আমি ধর্ম ক্লাসের লিডার ছিলাম।
একদিন ম্যাম পড়া জিজ্ঞেস করছিলেন। অনেক ছেলে পড়া দিতে পারেনি, তাদের মধ্যে আমিও ছিলাম। ম্যাম মালতীকে হুকুম দিলেন, সবাইকে গালে থাপ্পড় দিতে।
তখন মনে হলো, আমার মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে। যেন হঠাৎ কালো মেঘ এসে আমার মুখটা অন্ধকার করে দিয়েছে।
মালতী একে একে সবাইকে থাপ্পড় দিয়ে এলো। এবার আমার পালা। প্রথমে আমার মুখে দিকে তাকিয়ে একটু হাসে। তারপর চোখ দিয়ে যেন কিছু একটা বলতে চেয়েছিল।হয়তো এটা বলতে চেয়েছে পড়া শিখি নাই কেন। তারপর ঠাস করে গালে থাপ্পড় বসা দে।
আমার মনে হলো, আমাকে সে একটু জোরেই থাপ্পড় মারল। আমি লজ্জায় কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
তখন থেকে আর সাহস নিয়ে মালতীর চোখের সামনে দাঁড়াতে পারি না। কেমন জানি লজ্জা লাগে। মালতীদের বাড়ি ছিল স্কুলের পশ্চিম পাশে, আর আমার বাড়ি ছিল স্কুলের দক্ষিণ পাশে। আমি সব সময় যে জানালার পাশে বসতাম, সেই জানালা দিয়ে মালতীদের গ্রাম দেখা যেত।
আমি আর জয় ছিলাম ভালো বন্ধু। জয়ের বাড়ি ছিল মালতীদের গ্রামে। মাঝে মাঝে আমি জয়ের বাড়িতে যেতাম, আবার জয়ও আমাদের বাড়িতে আসত। ঠিক একবার আমি জয়ের বাড়িতে যাই। দুজনে দুপুরে খাবার খেয়ে জয়ের বাড়ি থেকে স্কুলে চলে আসছি। তখন দেখি, মালতী পেছন থেকে ডাক দেয়। প্রথমে জয়কে ডাক দেয়, তারপর আমাকে ডাক দেয়।
এদিকে মেঘ ঘনিয়ে বৃষ্টি আসছে। আমি আর জয় তাড়াতাড়ি হাঁটতে থাকি। মালতীর ডাক শুনে দুজনে দাঁড়াই। তখন আমার হৃদয় এমন শব্দ করছিল, যেন সেটা বজ্রপাতের শব্দের চেয়েও বেশি। মালতীকে দেখলে একটা আলাদা ভয় কাজ করত। কেন এমন হতো, সেটা আমি বুঝতে পারতাম না।
মালতী বলল, “অভ্র, তুমি কোথায় গিয়েছিলে?”
আমি ভয়ে কিছু বলতে পারছিলাম না। তখন জয় উত্তর দিয়ে বলল, “এই, আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল।”
মালতী হেসে বলল, “তাই তো! অভ্র বেড়াতে এসে বৃষ্টি নিয়ে আসছে আমাদের গ্রামে।”
আমি তো এদিকে ভয়ে শেষ। তবে একটু হেসে মালতীর কথার জবাব দিচ্ছিলাম।
কথা বলতে বলতে তিন জনে হাটতে থাকি।
তখন দেখি এক ঝালমুড়ি বিক্রি করে বুড়ি। তিনি আমাদের স্কুলে প্রতিদিন ঝাল মুড়ি বিক্রি করে তার বয়স হয়তো ৬৩ বা তার বেশি হবে। আজ পযন্ত তার নাম কি এটা কোনো দিন জানা হলো না। কিন্তু আমরা সবাই নানী বলে ডাকি। নানী সাথে আমার অনেক ভাব। হয়তো আমি ১ম ক্লাসে ভর্তি হওয়ার সময় আমার অভিভাবক হিসাবে আমার ঠাকুমা গিয়েছিল। সেটা ছিল আমার প্রথম স্কুলে ভর্ত্তি হওয়া। স্যার বই দিতে দিতে দেরি করতেছিল। তখন বেলা পার হয়ে ৩ টা বেজে গেছে। নানী কয়টা বক্স নিয়ে ঝালমুড়ি বিক্রি করতেছিল। আমি নানী কাণ্ড দেখতেছি। তখন ঠাকুমা তার কাপের গোপন ঝুড়ি থেকে একটা দুই টাকা নোট দিয়ে ঝালমুড়ি খেতে বলে। ঠাকুমার সে গোপন ঝুড়ি টা কতটা গোপন তা এখনো জানতে পারি নাই। দুইটাকা নোট এটা নিয়ে আমি ঝালমুড়ি কিনতে যায় তখন থেকে আমার সাথে নানী একটা বড় ভাব বেড়ে যায়। যাক এই কথা গুলো না বলি।
নানী আমাদরে দেখে বলতেছে ভাঙা গলা নিয়ে
তোরা এখানে কি করিস তোদের ক্লাস তো শুরু হয়ে গেছে।
আমি বলি নানী দুপুরে খেতে আসছি তাই দেরি হয়ে গেছে।
নানীকে দেখে আজকে বেশি অসুস্থ লাগতেছে। কিন্তু আমাদের এটা খেয়াল করা সময় নাই তারাতাড়ি স্কুলে যেতে হচ্ছে।
স্কুলে হেঁটে যেতে আরও ১০ মিনিট সময় লাগবে। ততক্ষণে বৃষ্টি বলতে বলতে মাথার ওপর চলে এসেছে। মালতীর কাছে ছাতা ছিল, কিন্তু আমার আর জয়ের ছাতা ছিল না। আমি আর জয় কাছের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। দেখি, মালতীও আমাদের সঙ্গে সেই বাড়িতে এসে দাঁড়াল।
এদিকে টিফিনের সময় শেষ, আর বৃষ্টিও অনেক বেশি হচ্ছে। তখন মালতী বলল, “একেবারে সবার শেষ ক্লাসটা করব।”
আমি আর জয় এমনিতেই পড়ালেখায় একটু ফাঁকিবাজ। তার মধ্যে মালতী যখন এই কথাটা বলল, আমি একটু খুশি হলাম।
বৃষ্টি থামার নামই নিচ্ছে না। তাই মালতী বলল, “চলো, তিনজনে এই একটা ছাতা নিয়েই চলে যাই।”
আমি বললাম, “একটা ছাতা নিয়ে কীভাবে যাব?”
আমার তখন কী রকম সংকোচ লাগছিল। জয় বলল, “হ্যাঁ, ছাতাটা নিয়ে যাই। বেশি দেরি করে ফেলেছি। এখন তো অর্ধেক ক্লাস শুরু হয়ে যাবে।”
ওদের দুজনের জোর করার কারণে আমি মালতীর ছাতার তলায় আশ্রয় নিলাম। তখন যেন মালতীর হাতে হাত রেখে, একসঙ্গে একটি ছাতার নিচে বৃষ্টির মধ্যে হাঁটা—কী যে মধুর অনুভূতি, সেটা বলে বোঝাতে পারব না। তার ভিজে হাতের সেই স্নিগ্ধ স্পর্শ, মনে হয় এখনও আমার হাতে লেগে আছে। যে স্পর্শ আমি এত দিন খুঁজে বেড়িয়েছি, সেটা যেন সেদিন আমাকে ধরা দিয়েছিল।
তখন ভাবছিলাম, জয় যদি এখানে না থাকত, তাহলে আমি আর মালতী... শুধু কত কী যে ভাবছিলাম, তার কোনো হিসাব নেই।
তারপর তিনজনে মোটামুটি ভিজেই স্কুলে এসে পৌঁছালাম। ক্লাসে গিয়ে দেখি, ম্যাম আগেই হাজির। তারপর ম্যাম জিজ্ঞেস করলেন, “ক্লাস না করে কোথায় গিয়েছিলে?”
আমরা সব খুলে বললাম। তাই ম্যাম আর কিছু বললেন না। কারণ, আমাকে তিনি একটু বেশি আদর করতেন।
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও বড় হলাম। একসময় ক্লাস টেনের পরীক্ষা শেষ করলাম। মালতীকে সবাই নিজের মনের কথা বলে ফেলেছিল, কিন্তু আমি কখনোই তাকে আমার মনের কথা বলতে পারিনি। কখন যে সেই ভালো লাগা ভালোবাসায় পরিণত হয়ে গেছে, আমি নিজেও বুঝতে পারিনি।
কোনো এক শ্রাবণ মাসে তুমি আমার মনে জায়গা করে নিয়েছিলে। আজও তুমি অনাবৃষ্টির মতো আমার মনের গোপন কোণে রয়ে গেছ। তোমাকে "ভালোবাসি"—এই কথাটা কি কোনো দিন বলা হবে? নাকি চিরকাল শ্রাবণ মাস এলেই তোমার স্মৃতি মনে পড়বে?
নীল বা আয়ানের মতো যদি আমিও আমার মনের কথাটা তোমাকে বলতে পারতাম, তাহলে হয়তো এত কষ্ট থাকত না। হ্যাঁ, আমি জানি, তুমিও হয়তো আমাকে তাদের মতোই প্রত্যাখ্যান করতে। তবুও অন্তত নিজের মনকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম।
গোপনে যে ব্যথা বুকে রয়ে গেল, সে ব্যথা শ্রাবণ এলেই, মালতী, আরও ঝাঁকুনি দিয়ে বেড়ে যায়। তখন আকাশের বৃষ্টির চেয়েও বেশি, আমার না-বলা সেই গোপন প্রেম তোমাকে খুঁজে বেড়ায়।
বর্ষার সময় কেন কদম ফুল ফোটে জানো? হয়তো জানো না। শুধু বৃষ্টির একটু স্পর্শ পাওয়ার জন্য। বৃষ্টি কিন্তু তার নিজের মতো করে ঝরে পড়ে। নীল দিগন্তে হারিয়ে যায়। এদিকে কদম ফুল তার আসার কথা ভেবে সারা বছর তার জন্য অপেক্ষা করে।
ঠিক আষাঢ় এলে আমার মনে তোমার পুরোনো স্পর্শের কথা মনে পড়ে, মালতী।
শেষে একটা কথা বলি, মালতী—মেঘে ঢাকা আকাশ যেমন শ্রাবণের বৃষ্টিতে প্রিয় মানুষের খোঁজে থাকে, তেমনি ১লা আষাঢ়ে বর্ষার মৌসুমে তোমার সঙ্গে ভিজতে চাই। নতুন আষাঢ়ের শুভেচ্ছা জানাই, ওগো, আমার গোপন প্রিয়তমা, তোমাকে।