27/05/2026
৯ই জিলহজ অর্থাৎ আরাফার দিন ইসলামে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বরকতময় দিনগুলোর একটি। এই দিনের বিশেষ আমলগুলো পবিত্র কুরআন ও বিশুদ্ধ হাদিসের (দলিলসহ) আলোকে নিচে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরা হলো:
১. আরাফার দিনের প্রধান আমল: রোজা রাখা (হাজি ছাড়া অন্যদের জন্য)
যারা হজে যাননি, তাদের জন্য এই দিনের সবচেয়ে বড় আমল হলো রোজা রাখা। এটি বিগত এবং আগামী বছরের গুনাহের কাফফারা হিসেবে গণ্য হয়।
দলিল: রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-কে আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:
"আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, এটি তার পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবে।"
— সহীহ মুসলিম: ১১৬২; সুনানে আবু দাউদ: ২৪২৫
বিশেষ দ্রষ্টব্য: যারা আরাফার ময়দানে হজে অবস্থান করছেন, তাদের জন্য এই দিনে রোজা না রাখা সুন্নাত, যাতে তারা দোয়ায় পূর্ণ শক্তি পান। (সহীহ বুখারী: ১৯৮৮)
২. তাকবীরে তাশরীক আদায় করা
৯ই জিলহজ ফজর নামাজ থেকে শুরু করে ১৩ই জিলহজ আসর নামাজ পর্যন্ত (মোট ২৩ ওয়াক্ত) প্রত্যেক ফরয নামাজের পর পুরুষদের জন্য উচ্চস্বরে এবং নারীদের জন্য নিচু স্বরে একবার এই তাকবীর বলা ওয়াজিব:
"আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।"
দলিল: আলী (রাঃ) এবং ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তাঁরা ৯ই জিলহজ ফজর থেকে শুরু করে ১৩ই জিলহজ আসর পর্যন্ত তাকবীর বলতেন।
— ইবনু আবী শায়বাহ: ২/১৬৫; বায়হাকী: ৩/৩১৪ (ইমাম নববী ও ইবনে হাজার একে সহীহ বলেছেন)
৩. বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করা
আরাফার দিন দোয়া কবুলের সর্বশ্রেষ্ঠ সময়। এই দিনে আল্লাহর কাছে নিজের জীবনের সমস্ত গুনাহের জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং কল্যাণ কামনা করা উচিত।
দলিল: রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফা দিবসের দোয়া।"
— সুনানে তিরমিজি: ৩৫৮৫ (হাদিসটি হাসান)
৪. বিশেষ জিকির ও তাওহীদের ঘোষণা
আরাফার দিনে নবী করিম (সাঃ) নিজে এবং পূর্ববর্তী নবীগণ একটি বিশেষ জিকির বেশি বেশি পাঠ করতেন।
জিকির:
"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।"
(অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব একমাত্র তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসাও তাঁরই। তিনি সব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।)
দলিল: রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন:
"সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফা দিবসের দোয়া। আর আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণ যা বলেছি তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো: [উপরোক্ত জিকিরটি]।"
— সুনানে তিরমিজি: ৩৫৮৫; মুসনাদে আহমাদ: ৬৯৬১
৫. জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার আমল
এই দিন আল্লাহ তাআলা অসংখ্য বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। তাই সারাদিন, বিশেষ করে জোহর থেকে মাগরিব পর্যন্ত ইবাদতে মগ্ন থাকা উচিত।
দলিল: উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী (সাঃ) বলেছেন:
"আরাফার দিনের চেয়ে অন্য কোনো দিন আল্লাহ তাআলা এত বেশিসংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন না। তিনি (বান্দাদের) নিকটবর্তী হন এবং ফেরেশতাদের সামনে তাদের নিয়ে গর্ব করে বলেন— এরা কী চায়?"
— সহীহ মুসলিম: ১৩৪৮
৬. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও নফসের হেফাজত করা
এই পবিত্র দিনে যেকোনো ধরনের গুনাহ (যেমন: গীবত, মিথ্যা, পরনিন্দা, বা হারাম কিছু দেখা/শোনা) থেকে চোখ, কান ও জিহ্বাকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
দলিল: রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আরাফার দিনে বলেছিলেন:
"হে আমার ভাতিজা! এটি এমন একটি দিন, যে ব্যক্তি এই দিনে নিজের কান, চোখ এবং জিহ্বাকে (গুনাহ থেকে) নিয়ন্ত্রণ করবে, তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে।"
— মুসনাদে আহমাদ: ১/৩২৯; শুআবুল ঈমান: ৩৭৪৪
সংক্ষেপে আপনার করণীয় সূচি:
১. সেহরি খাওয়া: ৮ই জিলহজ দিবাগত রাতে সেহরি খেয়ে ৯ই জিলহজের রোজার নিয়ত করা।
২. ফরজ নামাজ ও তাকবীর: প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর 'তাকবীরে তাশরীক' ভুল না করা।
৩. আসরের পর বিশেষ সময়: আসর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়টুকু ইবাদতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় দুনিয়াবি ব্যস্ততা কমিয়ে জায়নামাজে বসে তওবা, ইস্তিগফার, দুরুদ শরীফ এবং তাওহীদের জিকিরে মশগুল থাকা উত্তম।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আরাফার দিনের এই মহান আমলগুলো সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমীন।