Jui Sharmin Jui

Jui Sharmin Jui "আমি সেই নীরব গাছ,
যার শিকড় পাথরের চেয়েও শক্ত।
আমাকে যত খুশি আঘাত করো,
আমার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হবে না।"


~মাহনুর সেন ইয়েশা~
(1)

‎গল্প: #রক্তচন্দনের_মোহর‎লেখিকা: ‎পর্ব:০৩‎‎⭕(এক রহস্যে ঘেরা জমিদার বাড়ি, রহস্যময় / রহস্য, ‎ ক্রাইম ফিকশন, থ্রিলার,অ্যাডভ...
03/05/2026

‎গল্প: #রক্তচন্দনের_মোহর
‎লেখিকা:
‎পর্ব:০৩

‎⭕(এক রহস্যে ঘেরা জমিদার বাড়ি, রহস্যময় / রহস্য,
‎ ক্রাইম ফিকশন, থ্রিলার,অ্যাডভেঞ্চার অতিপ্রাকৃত, সাসপেন্স,ঐতিহাসিক থ্রিলার)

‎ [অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ]

‎অন্ধকার রাত তখনো কাটে নাই, আসমানের কোণায় কেবল ফর্সা ভাব ফুটতে শুরু করছে। এমন সময় গফুরের বাড়ির উঠানে এক বিকট শব্দে জুলেখা বেগমের ঘুম ভাইঙা গেল। হুড়মুড় কইরা দরজা খুইলা বাইরে আসতেই জুলেখার কলিজা যেন শুকায়া পাথর হইয়া গেল। উঠানের মাঝখানে একটা চটের বস্তা পইড়া আছে, আর সেইখান থিকা চুইয়া চুইয়া কাঁচা রক্ত মাটি ভিজায়া ফেলতাছে।

‎কাঁপা কাঁপা হাতে জুলেখা বস্তার মুখ খুলতেই আকাশ-বাতাস কাঁপায়া এক চিৎকার দিয়া মাটিতে পইড়া গেল। ভেতরে গফুরের সেই খণ্ডিত মাথা, চোখ দুইটা যেন এখনো আতঙ্কে বড় বড় হইয়া আছে। শরীরটা আলাদা কইরা পোটলা কইরা পাশে রাখা। জমিদার বাড়ির রক্তচক্ষু যে কত ভয়ংকর হইতে পারে, গফুরের এই ছিন্নভিন্ন লাশই তার প্রমাণ।

‎জুলেখা বেগম বুক থাপ্পায়া বিলাপ শুরু করলেন, "ওগো পরানপাখি, তুমি আমারে কার কাছে রাইখা গেলা গো! কেন ওই রাক্ষসগো বাড়ির ফাদে পা দিতে গেলা? আমি তোমারে কত মানা করলাম, পাপিষ্ঠগো ছায়া মাড়াইও না। এহন আমাদের কী হইবো গো! আমার সোনার সংসারটা শ্মশান কইরা দিলা তুমি!"

‎গ্রামের মানুষজন ততক্ষণে ভিড় জমাইছে। মশাল আর লণ্ঠনের আলোয় গফুরের সেই দশা দেইখা সবার বুক শুকায়া আসছে। কেউ ভয়ে থরথর কইরা কাঁপতাছে, কেউ আবার মুখে কাপড় দিয়া বমি আটকানোর চেষ্টা করতাছে। দশ বছরের হাসান তার বাপের রক্তমাখা মাথার দিকে ফ্যালফ্যাল কইরা তাকায়া আছে। ছোট মানুষ, মরণের মানে ঠিকমতো বোঝে না, কিন্তু এইটুকু বুঝতাছে যে—তার বাপ আর কোনোদিন জঙ্গল থিকা ফিরা আইসা তারে কোলে নিবো না, তার লাইগা মেলা থিকা বাতাসা নিয়া আসবো না। হাসানের চোখের কোণ দিয়া টপটপ কইরা পানি পড়তাছে, কিন্তু তার মুখে কোনো শব্দ নাই।

‎ভিড়ের মধ্য থিকা নূরুল মিয়া আগায়া আইসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফালল। হাসানের মাথায় হাত দিয়া বিড়বিড় কইরা কইল, "আহা রে! অভাগা পোলাডারে এক রাইতেই এতিম কইরা দিলি রে গফুর। তোরে কত বুঝাইলাম যে বেশি লোভ করিস না, মহেরা বাড়ির মানুষগুলা মানুষ না, ওগুলা সব জ্যান্ত শয়তান। জমিদার বাড়ির চন্দন কাঠের তলে যে মানুষের রক্ত মিশানি থাকে, সেই কথা তুই বিশ্বাস করলি না। এহন দেখ, তোর রক্ত দিয়াই সেই মাটির তৃষ্ণা মিটলো।"

‎পাশে দাঁড়ায়া ছিল নূরুল মিয়ার বউ রাফিয়া বেগম। স্বামীর কথা শুইনা রাফিয়া ঝাড়ি দিয়া উঠল, "আহা, এহন আর হিতোপদেশ দিয়া কী হইবো? আপনে চুপ করেন তো! জানের মায়া থাকলে মুখ সামলান। মহেরা বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে কান পাতা আছে। ওই শয়তানগো নামে একটা কথা কইলে আমাগো দশারও ঠিক থাকবো না।"

‎রাফিয়া আগায়া গিয়া জুলেখারে জাপটায়া ধরল, "কান্দিস না বইন, কপালরে তো আর কেউ খণ্ডাইতে পারে না। এই অভিশপ্ত মোহর আর চন্দনের নেশা এই গেরামের কত ঘর যে উজাড় করলো, তার হিশাব নাই।"

‎পুরো গ্রাম এক অজানা আতঙ্কে থমথমে হইয়া রইল। সবার মনে একটাই কথা ঘুরতাছে—জমিদার কায়সান ইবনাত কি তাইলে শুরু কইরা দিল সেই রক্তস্নানের খেলা।

‎বাইরে মানুষের শোরগোল আর জুলেখা বেগমের বুকফাটা কান্দন শুনে ঘরের ভেতরে অরুণিমা অস্থির হয়ে উঠল। তার জানটা যেন ছটফট করতাছে বাইরে কী হইছে দেখার লাইগা। আপার দশা দেখে ছোট বোন আভা ফিসফিস করে বলল, "আপা, তুমি এমন করতাছ ক্যা? আমি গিয়া দেইখা আহি বাইরে কী হইছে।"

‎অরুণিমা ভয় পেয়ে ধমক দিয়ে উঠল, "পাগল হইছিস আভা? বাইরে গিজগিজ করতাছে মানুষ। তুই এই মাইয়া মানুষ একা কেমনে যাবি?"

‎আভা জেদ ধরে বলল, "আমি মাথায় বড় একটা ঘোমটা দিয়া যামু। কেউ আমারে চিনতে পারবো না। তুমি ঘরের দরজাটা ভালো করে খিল দিয়া রাখো।"

‎অরুণিমার নিষেধ না মেনেই আভা পা টিপে টিপে উঠানের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু ভিড়ের একটু কাছে গিয়েই তার নজর পড়ল মাঝখানে রাখা সেই বীভৎস পোটলার দিকে। গফুরের সেই আলাদা হওয়া মাথা আর রক্তমাখা নিথর দেহটা দেখেই আভার কলিজা যেন গলার কাছে চলে আসল। সে নিজেরে সামলাইতে না পেরে সজোরে এক চিৎকার দিয়ে উঠল।

‎মেয়ের গলার আওয়াজ শুনে রাফিয়া বেগম বাজপাখির মতো ছুটে আসলেন। আভার হাত ধরে একটা কষে থাপ্পড় লাগিয়ে দিলেন রাফিয়া। দাঁতে দাঁত চেপে ধমক দিয়ে বললেন, "তোরে না মানা করছি অরুণিমারে ছাড়া ঘরের বাইরে বের হবি না? এই মরার মেলায় তুই কেন আইলি? দেখছিস তো কী অবস্থা? যা! এখনই ঘরে ঢোক!"

‎ভয়ে আভা তড়বড় করে দৌড়ে ঘরে গিয়ে ঢুকল। ভয়ে তার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে, শরীর থরথর করে কাঁপতাছে। অরুণিমা তাকে জড়িয়ে ধরতেই আভা কান্নায় ভেঙে পড়ল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, "আপা গো... চাচারে জমিদার বাড়ির লোকগুলা এক্কেবারে কুপায়া শেষ কইরা দিছে। মাথাটা আলাদা কইরা ফেলছে রে আপা! মানুষ এতো নিষ্ঠুর কেমনে হয়?"

‎শুনে অরুণিমার দুচোখ বেয়ে লোনা পানি গড়িয়ে পড়ল। সে বিড়বিড় করে বলল, "যেই মানুষের রক্তে এতো বিষ, সে তো এতো নিকৃষ্ট হবেই। আল্লায় কি এর বিচার করবে না?" দুই বোন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল।

‎ভোরের আবছা আলো ফুটতেই গ্রামের আকাশ এক ভারি নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেল। রাফিয়া বেগম চোখের পানি মুছে স্বামীর দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বললেন, "ওগো শুনছো, আর কতোক্ষণ এভাবে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবা? বেলা তো বাড়ছে। যাও, গিয়া দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করো। মানুষটারে শেষবারের মতো বিদায় তো দিতে হবে।"

‎নূরুল মিয়া এতক্ষণ একনাগাড়ে ছোট ভাইয়ের ছিন্নভিন্ন লাশের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। রক্তের ভাই বলে কথা, তার বুকের ভেতরটা যেন ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল। গফুর হয়তো ভুল করেছিল, লোভে পড়েছিল, কিন্তু তার এই পরিণতির কথা নূরুল মিয়া স্বপ্নেও ভাবেননি। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁপাকাঁপা হাতে ভাইয়ের লাশের ওপর একটা সাদা চাদর টেনে দিলেন তিনি। মনে মনে বললেন, 'গফুর রে, তুই তো গেলি, কিন্তু এই আগুন এখন কার কার ঘর পোড়ায় কে জানে!'

‎গফুরকে দাফন দিয়ে আসার পর গ্রামের মানুষের মুখে মুখে নানা কথা। কেউ বলছে লোভের সাজা, কেউ আবার ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। কিন্তু সবার চেয়ে করুণ দশা জুলেখা বেগমের। স্বামী হারানোর শোকে মানুষটা কেমন জানি পাথর হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে অদ্ভুত সব অঙ্গভঙ্গি করছে, যা দেখে রাফিয়া বেগমের বুক কেঁপে উঠছে। জুলেখা বিড়বিড় করছে, আবার হঠাৎ করে বিকট হাসিতে ফেটে পড়ছে।

‎রাফিয়া বেগম তাকে সামলানোর চেষ্টা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। "বইন, শান্ত হ। আল্লাহর কাছে বিচার দে," বলতেই জুলেখা হঠাৎ বাঘিনীর মতো গর্জে উঠল। চোখের পলকে হেঁসেল ঘর থেকে একটা ধারালো দা হাতে নিয়ে সে পাগলের মতো বাড়ির বাইরে দৌড় দিল। রাফিয়া চিৎকার করে ডাকতে থাকলেন, "ও জুলেখা, যাস না! মরতে যাস না!" কিন্তু কে শোনে কার কথা? উন্মাদিনী জুলেখা তখন মহেরা জমিদার বাড়ির দিকে ছুটছে।

‎জমিদার বাড়ির সিংহদুয়ারের সামনে গিয়ে জুলেখা দা দিয়ে কপাটে আঘাত করতে লাগল আর চিৎকার করে বলতে থাকল, "ওরে পিশাচের দল, তোরা আমার সোনার সংসার ছারখার করলি! তোদের ধ্বংস হবেই! আমার স্বামীর রক্ত তোদের গায়ে লেগে আছে, আল্লাহ সইবে না রে জানোয়াররা! বের হয়ে আয়, তোদের আমি আজ এক কোপে শেষ করব!"

‎ভেতর থেকে ছোট জমিদার খালিদ ইবনাত বেরিয়ে আসলেন। জুলেখাকে দেখে ঘৃণাভরে মুখ কুঁচকে বললেন, "এই বেশ্যা এখানে কী রে? মরণ কামড় দিতে আইছস?"

‎জুলেখা তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সে দাউ দাউ করে জ্বলছে। দা উঁচিয়ে খালিদ ইবনাতকে আঘাত করতে যেতেই পাশ থেকে আইশান ইবনাত তার তলোয়ার দিয়ে জুলেখার পিঠে এক সজোরে কোপ বসিয়ে দিল। একটা আর্তনাদ করারও সুযোগ পেল না জুলেখা, মুহূর্তের মধ্যে মাটির ওপর লুটিয়ে পড়ল সে। রক্তের লাল স্রোতে ভিজে গেল জমিদার বাড়ির সদর দরজার মাটি।

‎আইশান তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে দেওয়ানকে ডাকল, "যাও দেওয়ান, এই মাগিরে টেনে নিয়ে ওর বাড়ির সামনে ফেলে দিয়ে আস। আসছে জমিদার বাড়ির লোকের সাথে লড়াই করতে! শখ কত!"

‎দেওয়ান যখন জুলেখার নিথর দেহটা টেনে নিয়ে গ্রামের রাস্তার ওপর ছুড়ে মারল, তখন পুরো গ্রামের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। রাফিয়া বেগম পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন, তার চোখের পানিও যেন শুকিয়ে গেছে। আভা কান্নায় ভেঙে পড়ল, আর দশ বছরের হাসান "মা গো... আই মা..." বলে চিৎকার দিয়ে মায়ের লাশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এক রাতের ব্যবধানে একটা আস্ত ঘর ধ্বংস হয়ে গেল।

‎ঘরের কোণায় দাঁড়িয়ে অরুণিমা সব দেখছিল। তার মনের ভেতরে ঘৃণা আগুনের মতো দাউ দাউ করে জ্বলছে। জমিদার বাড়ির লোকেদের প্রতি তার এতোটাই বিতৃষ্ণা হলো যে, তার মনে হলো যদি তার হাতে ক্ষমতা থাকতো, তবে সে নিজ হাতে এই ইবনাত বংশের নাম নিশান মুছে ফেলত। এতোটা নিকৃষ্ট মানুষ কীভাবে হতে পারে?

‎বিকেলের পড়ন্ত রোদে গফুরের কবরের পাশেই জুলেখার দাফন সম্পন্ন হলো। গ্রামের মানুষের মনে এখন শুধু শোক নয়, এক গভীর আতঙ্ক জেঁকে বসেছে। কেউ আর টু শব্দ করার সাহস পাচ্ছে না। অরুণিমা ঘরে বসে ছোট হাসানকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে রাখল। হাসানের অঝোর কান্নার মাঝে অরুণিমা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল, কিন্তু তার নিজের চোখের দৃষ্টি তখন অনেক দূরে—যেখানে মহেরা বাড়ির আভিজাত্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক একটা রক্তখেকো দানব।

‎সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এই অন্যায়ের বদলা কোনো না কোনোভাবে নেওয়া হবেই।

‎মহেরা জমিদার বাড়ির বিশাল সেগুন কাঠের ডাইনিং টেবিল। রূপার থালা-বাসনে সাজানো হরেক রকমের খাবার—পোলাও, কোপ্তা, হরিণের মাংস আর ঘিয়ে ভাজা নানা পদের এলাহি কাণ্ড। রান্নাঘরে হাহাকার থাকলেও খাবার টেবিলে রাজকীয় জাঁকজমকের কোনো কমতি নেই। বড় গিন্নি আলিহা খাতুন সারা সকাল হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে এখন খাবার সাজাতে ব্যস্ত। পাশে সালেহা খাতুন তার হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে দিচ্ছে, কারো মুখে কোনো কথা নেই—বাড়ির পুরুষদের মেজাজ কখন কোন দিকে যায়, কেউ জানে না।

‎কায়সান ইবনাতকে ডাইনিং হলের দিকে আসতে দেখে আলিহা খাতুন এগিয়ে গেলেন। মায়াবী সুরে ডাক দিলেন, "আব্বা..."
‎কায়সান মায়ের দিকে তাকিয়ে ধীরস্বরে বলল, "বলুন আম্মা।"

‎আলিহা খাতুন ছেলের রক্তমাখা অতীতের কথা ভেবে আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কায়সানের মাথায় হাত বুলিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, "আব্বা, আর কত? কেন এমন খুন-খারাবি করো? এসব মোটেও ভালো না রে বাপ, এসব ছেড়ে দে।" কায়সান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল, কোনো উত্তর দিল না। আলিহা খাতুন ডুকরে কেঁদে উঠে বললেন, "আব্বা, এগুলো পাপ... এই রক্তের অভিশাপ আমাদের শান্তিতে থাকতে দেবে না।"

‎"পাপ!"—পিছন থেকে এক হুঙ্কার ভেসে এল। সাজিদ ইবনাত খাবার ঘরে ঢুকতেই আলিহা খাতুনের চুলের মুঠি ধরে এক ঝটকায় টেনে ধরলেন। রাগে গরগর করতে করতে বললেন, "কী রে মাগি! কাকে কী বুঝাস? কিসের পাপ? আমার পোলার কান ভারী করছিস তুই? আমার বিরুদ্ধেই উসকানি দিচ্ছিস?"

‎আলিহা খাতুন ব্যথায় কুঁকড়ে গেলেন, তার চোখ দিয়ে দরদর করে পানি ঝরছে। মায়ের এই অপমান দেখে কায়সানের চোখ দুটো হঠাৎ আগুনের গোলার মতো জ্বলে উঠল। সে এক পা এগিয়ে এসে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "খবরদার আব্বা! একদম হাত দেবেন না ওনার গায়ে। নয়তো যে হাত দিয়ে ওকে ধরেছেন, সেই হাত আমি শরীর থেকে আলাদা করে দেব।"

‎কায়সানের গলার সেই শীতল কিন্তু ভয়ংকর স্বরে সাজিদ ইবনাতের পিঠ দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। তিনি তড়িঘড়ি করে আলিহা খাতুনের চুল ছেড়ে দিলেন। তিনি খুব ভালো করেই জানেন, তার ছেলে কায়সান যা বলে, তা করতে সে এক সেকেন্ডও সময় নেয় না। সাজিদ ইবনাত কিছুটা ভড়কে গিয়ে সরে দাঁড়ালেন। আলিহা খাতুন কাঁদতে কাঁদতে আবার রান্নাঘরের দিকে ছুটলেন—দেরি হলে আবার কী বিপদ হয় কে জানে!

‎কায়সান তার বাবার দিকে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে থেকে বলল, "ছাড় দিছি বলে বেশি মাথায় উঠবেন না আব্বা। নয়তো এই মাথাটাই যে ধড় থেকে আলাদা হয়ে যাবে, বুঝতেই পারবেন না।"

‎ঠিক সেই সময় খালিদ ইবনাত ঘরে ঢুকে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলেন। তিনি আলতো হেসে বললেন, "আহা কায়সান, রাগে কী বলো এসব! বাড়ির বউদের একটু দাসীর মতো না রাখলে ওরা মাথায় উঠে যায়। এটা তো আমাদের বংশের নিয়ম।"

‎কায়সান কোনো কথা না বলে নিজের আসনে গিয়ে বসল। এর কিছুক্ষণ পর আইশান এসে কায়সানের পাশের চেয়ারে বসলো। খাওয়ার মাঝেই আইশান মোহরের গোপন কুঠুরি আর তা নিয়ে শত্রুদের চক্রান্ত নিয়ে অনেক কথা পাড়ল। আইশানের চোখে এক অদ্ভুত লালসা, কিন্তু কায়সানের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে নিস্পৃহভাবে খেয়ে যাচ্ছে, যেন বাইরের জগৎ বা ঘরের ভেতরে জমা হতে থাকা এই বারুদ তাকে ছুঁতেও পারছে না।

‎কিন্তু আইশান মনে মনে তখন হিসাব কষছে—কায়সানের এই জেদ আর অহংকারই হবে ইবনাত বংশের পতনের মূল কারণ। আর সেই পতনের ওপরই গড়ে উঠবে আইশানের নতুন সাম্রাজ্য।

‎[ আশা করি লাইক কমেন্ট শেয়ার করবেন ]

01/05/2026

‎আশিস ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে তার বুকের দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করল— “বেশ বড় হয়েছে তো! তাহলে কি আমার হাতের শক্তির ছোঁয়াতেই এমন উন্নত হয়েছে?”
‎লজ্জায় ইয়েশার কান-মুখ লাল হয়ে গেল। সে আশিসের বুকে মুখ লুকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল— “ছিঃ! আপনি এত অসভ্য!”
‎আশিস তাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। তার চোখে তখন আদিম নেশা। সে বলল— “অসভ্য যখন বলেছিই, তাহলে কাজটাও অসভ্যের মতোই করি।”
‎বলেই সে ইয়েশার শরীরের ভাঁজে হারিয়ে গেল। রুমের এসিটা সচল থাকলেও তাদের শরীরের উত্তাপে চারপাশ যেন তপ্ত হয়ে উঠল।

গল্প : #দুই_মেরুর_বন্ধন
লেখিকা:
#স্পয়লার

#গল্প
#উপন্যাসগল্প
#উপন্যাসপ্রেমী
#গল্পফ্যাক্ট
#উপন্যাসগল্প
#উপন্যাস
#দুই_মেরুর_বন্ধন

‎ ‎লেখিকা :  ‎পর্ব:০২‎‎🚫 (সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, ডার্ক রোমান্স, অবসেসিভ রোমান্টিক, সাসপেন্স থ্রিলার উইথ গ্যাংস্টার আন্ডা...
01/05/2026


‎লেখিকা :
‎পর্ব:০২

‎🚫 (সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, ডার্ক রোমান্স, অবসেসিভ রোমান্টিক, সাসপেন্স থ্রিলার উইথ গ্যাংস্টার আন্ডারটোন)

‎ [অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ]



‎"হেই বেবি চাঁদ! ওপেন ইয়োর আইস। প্লিজ... বেবি চাঁদ, চোখ খোল!"

‎জাইয়ানের কণ্ঠে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। যে নূরাইশাকে একটু আগেই সে রুম থেকে বের করে দিতে চেয়েছিল, তাকে নিথর হয়ে পড়ে থাকতে দেখে জাইয়ানের ভেতরে যেন প্রলয় ঘটে গেল। নূরের আর্তচিৎকার শুনে হন্তদন্ত হয়ে রুমে ছুটে এলেন রাবেয়া আর জুবায়ের চৌধুরী।

‎মেয়ের এই অবস্থা দেখে রাবেয়া আছড়ে পড়লেন ফ্লোরে। তিনি হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে নূরকে ডাকতে লাগলেন। জুবায়েরের চোখ তখন জাইয়ানের দিকে। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠলেন, "কী করেছিস তুই নূরাইশার সাথে? জবাব দে জাইয়ান!"

‎জাইয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে নূরাইশার বিবর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। রাবেয়া কোনোমতে নিজেকে সামলে বললেন, "পরে এসব হবে, আগে ডাক্তার ডাকুন! আমার মেয়েটা কেন চোখ খুলছে না?"

‎জুবায়ের দ্রুত তাদের পারিবারিক চিকিৎসক সাজিদ সাহেবকে ডেকে পাঠালেন। ডাক্তার আসার অপেক্ষা করতে করতে তিনি জাইয়ানকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "লজ্জা করল না তোর? একটা ছোট্ট বাচ্চাকে এভাবে ভয় দেখাতে?"

‎ঠিক সেই সময় দরজার পাশে উদয় হলেন সালমা আর জুলেখা চৌধুরী। তারা এমন ভাব করলেন যেন কিছুই হয়নি। মুখ বাঁকিয়ে বিড়বিড় করতে করতে সেখান থেকে চলে গেলেন তারা। কিন্তু সায়েরা দাঁড়িয়ে রইল। সে বেশ গুছিয়ে মিথ্যা বলতে শুরু করল, "বড় আব্বু, জাইয়ান ভাইয়ার কোনো দোষ নেই। এই মেয়েটাই সব নষ্টের গোড়া। ও এসে জাইয়ান ভাইয়াকে বিরক্ত করছিল, তারপর হঠাৎ কী হলো কে জানে, ও অজ্ঞান হয়ে গেল! আমি তো জাইয়ান ভাইয়ার ক্ষততে ওষুধ লাগাতে আসছিলাম।"

‎কিছুক্ষণ পরেই ডাক্তার এলেন। জুবায়ের পরম মমতায় নূরকে কোলে তুলে নিয়ে নিজের রুমে শুইয়ে দিলেন। ডাক্তার পরীক্ষা করে গম্ভীর মুখে বললেন, "ভয়ংকর কিছু দেখে হয়তো ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। একে প্যানিক অ্যাটাক বলে। ওকে শান্তিতে ঘুমাতে দিন।"

‎রাবেয়া লক্ষ্য করেছিলেন জাইয়ানের হাতে তখনো তাজা রক্ত। তিনি বুঝতে পারলেন, ছোট নূরাইশা হয়তো এই রক্ত দেখেই সহ্য করতে পারেনি। রাবেয়া জুবায়েরের দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বললেন, "জাইয়ানের হাতটা অনেকখানি কেটে গেছে। ডাক্তার সাহেবকে দিয়ে ওর ব্যান্ডেজটা করিয়ে দিন।"

‎জুবায়ের ছেলের রুমে গিয়ে দেখলেন, জাইয়ান আগের মতোই বসে আছে। আপনমনে কী যেন বিড়বিড় করছে সে। জুবায়ের যখন জাইয়ানের হাতটা নিজের হাতে নিলেন, দেখলেন ক্ষতটা কতটা গভীর। মুহূর্তেই বাবার মনটা হাহাকার করে উঠল। বুকটা চিনচিন করে ব্যথায় ফেটে যাচ্ছিল তার। অজান্তেই দু-ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ছেলের হাতের ওপর।

‎ডাক্তার ক্ষত পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে ওষুধ দিয়ে চলে গেলেন। জুবায়ের ছেলের দিকে তাকিয়ে অপরাধী কণ্ঠে বললেন, "আমি জানি জাইয়ান, নিজের কষ্টগুলো আড়াল করতে আমি কাজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রেখেছি। আমি তোকে সময় দিতে পারিনি, আমাদের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। আমি ইচ্ছে করে রাবেয়াকে বিয়ে করিনি। আমার কারণে একটা নিরীহ লোক মারা গিয়েছে, এই নিষ্পাপ শিশুটা এতিম হয়ে গিয়েছিল। তাদের সাহায্য করতে গিয়ে সমাজের কিছু নিকৃষ্ট মানুষের কটু কথার মুখে পড়েছিলাম। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল বলেই বাধ্য হয়ে আজ তাকে এই বাড়ির বউ করে আনতে হয়েছে।"

‎জুবায়ের অনেক কথা বললেন, কিন্তু জাইয়ানের কোনো ভাবান্তর হলো না। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।

‎রুমে এখন একা জাইয়ান। তার চোখ দুটো যেন জ্বলছে। সে হাতের ব্যান্ডেজের দিকে না তাকিয়ে এখনো ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করছে— "বেবি চাঁদ, ওপেন ইয়োর আইস! ওপেন ইয়োর আইস... নয়তো তোকে আমি শাস্তি দেব।"

‎কথাটা শেষ করেই জাইয়ান এক রহস্যময়, ভয়ংকর হাসি হাসল। সেই হাসিতে কোনো মমতা ছিল না, ছিল এক আদিম অধিকারবোধ আর অন্ধ উন্মাদনা। কেউ যদি এই মুহূর্তে তাকে দেখত, তবে নিশ্চিত ভয়ে তার ত্রিসীমানায় আসত না।

‎রাবেয়া রান্নাঘরে ব্যস্ত, আগুনের তাপে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। পাঁচ বছরের ছোট্ট নূরাইশা তার মায়ের আঁচল টেনে ধরে বায়না ধরল, "আম্মু চলো না বাইরে যাই! আইসক্রিম খাবো!"

‎রাবেয়া কিছুটা বিরক্ত হয়েই বললেন, "রান্না করছি তো নূর, এখন আইসক্রিম খেলে আবার ঠান্ডা লাগবে। একদম জেদ করবে না!"

‎ঠিক তখনই রুম থেকে বের হতে হতে কামরুল আহমেদ হেসে উঠলেন। তিনি আদুরে স্বরে বললেন, "আহা রাবেয়া, আমার রাজকন্যাকে বকছো কেন? ও তো আইসক্রিমই চেয়েছে!" রাবেয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "আজ তুমি অফিসে যাবে না?"

‎কামরুল তৃপ্তির হাসি দিয়ে বললেন, "না, আজ বস ছুটি দিয়েছেন। আজ সারাটা দিন শুধু আমার মেয়ের জন্য।"

‎কামরুল আর রাবেয়ার ছোট সংসার। এক তলা ছাদওয়ালা চার রুমের এই বাড়িটি কামরুলের বাবা অনেক শখ করে বানিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। কামরুল আহমেদ মা বা মারা যাওয়ার পরই তাদের একলা জীবন চলছে।বিয়ে অনেক বছর পার হয়ে যায় কিন্তু তাদের কোন সন্তান হয় নি।অবশেষে
‎ সাত বছর পর অনেক ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়ে যখন নূরাইশা এল, তখন তাদের পৃথিবীটা খুশিতে ভরে গিয়েছিল। তবে নূরাইশার রূপ দেখে তারা যতটা খুশি ছিলেন, তার চেয়ে বেশি ভয় পেতেন। এত ফর্সা আর কোমল শিশু যে হালকা করে ধরলে চামড়ায় লালচে ছাপ পড়ে যেত। তাই মেয়েকে সবসময় আড়ালে আড়ালে রাখতেন তারা।

‎"নূরাইশা চন্দ্রা নূর, আম্মু এদিকে এসো!"—বাবার ডাক শুনেই নূর দৌড়ে গিয়ে কামরুলের বুকে আছড়ে পড়ল। ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, "বাবাই, মা বকা দিয়েছে। চলো আমরা বাইরে যাব!"

‎রাবেয়া মনমরা হয়ে বললেন, "আজ বাইরে না গেলে হয় না? আমার মনটা কেন জানি কু গাইছে, খুব অশান্তি লাগছে। কাল যেও বরং।"

‎কামরুল হেসে উড়িয়ে দিলেন, "তুমি একজন শিক্ষিত মেয়ে হয়েও এসব কুসংস্কার বিশ্বাস করো? কিছু হবে না, আমরা একটু ঘুরে আসছি।" রাবেয়া আর না করলেন না, শুধু একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে রান্নায় মন দিলেন।

‎বাইরে বেরিয়ে গেলেন ঢাকা শহরের যানজট কোলাহলে নূরাইশা বেশ বিরক্ত। তারপর
‎কামরুল মেয়েকে নিয়ে বড় একটা দোকানে গেলেন,নূরাইশা কে কোল থেকে নামিয়ে চকলেট আর আইসক্রিম কিনে দিলেন। নূর তার ছোট্ট হাতে আইসক্রিম নিয়ে খুব খুশি।

‎একই সময়ে, অফিসের জরুরি মিটিংয়ে যাওয়ার পথে জুবায়ের চৌধুরীর দামি গাড়িটা মাঝরাস্তায় নষ্ট হয়ে গেল। বিরক্ত জুবায়ের গাড়ি থেকে নেমে ড্রাইভারকে বকাবকি করছিলেন। ফোনে তার অ্যাসিস্ট্যান্টকে বলছিলেন মিটিংটা সামলে নিতে।

‎হঠাৎ করেই দুরন্ত গতিতে একটা কালো রঙের মাইক্রোবাস জুবায়েরের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। জুবায়ের ফোনে এতটাই মগ্ন ছিলেন যে কিছুই লক্ষ্য করেননি। কামরুল দূর থেকে চিৎকার করে ডাকলেন, কিন্তু জুবায়ের শুনলেন না। জুবায়েরকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে কামরুল নিজের জীবন বাজি রেখে দৌড়ে গেলেন।
‎ছোট নূরাইশা বাবাই বলে তার পিছন দৌড়ে গেলেন।
‎"সাবধান!"—বলেই জুবায়েরকে জোরে এক ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন কামরুল। জুবায়ের ছিটকে পড়ে ব্যথা পেলেন, কিন্তু তার চোখের সামনেই সেই ঘাতক গাড়িটা কামরুলকে পিষে দিয়ে চলে গেল।

‎ছোট্ট নূরাইশা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে দেখল তার বাবাই রক্তে ভেসে যাচ্ছে। "বাবাই! রক্ত! রক্ত!"—নূরের ছোট্ট মস্তিষ্ক এই বীভৎস দৃশ্য সহ্য করতে পারল না। তার শ্বাস আটকে এল, চোখের সামনে অন্ধকার নেমে এল। হাতে ধরা সেই সাধের আইসক্রিম আর চকলেট নিয়ে সে রাস্তার ওপর ঢলে পড়ল।

‎জুবারেয়র নিজে শরীরে ব্যাথা ভুলে গিয়ে দৌড়ে রক্তাক্ত কামরুলের মাথাটা কোলে তুলে নিলেন। আর্তনাদ করে বললেন, "আপনার কিছুই হবে না! প্লিজ চোখ খুলুন!"

‎কামরুল নিস্তেজ হয়ে আসছিলেন। তিনি জুবায়েরের হাতটা শক্ত করে ধরলেন। ভাঙা গলায় বললেন, "আমার সময় শেষ... আপনার কাছে একটা অনুরোধ, আমার মেয়েটাকে দেখে রাখবেন। আমার স্ত্রী বড্ড সরল... তাদের আগলে রাখাবেন ওয়াদা দিন।"

‎জুবায়েরের চোখে জল। তিনি বললেন, "কেন আমাকে বাঁচাতে গেলেন আপনি? আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, আমৃত্যু আমি আপনার স্ত্রী আর সন্তানকে আগলে রাখব। আমি ওয়াদা দিলাম।"

‎কামরুলের শেষ নিশ্বাস বেরিয়ে গেল জুবায়েরের কোলেই। চারদিকে অনেক লোক জমে গেল। জুবায়েরের বুকটা ধক করে উঠল যখন তিনি একটু দূরে পড়ে থাকা সেই নিথর মেয়েটির দিকে তাকালেন। কী জবাব দেবেন তিনি এই নিষ্পাপ ফুলটাকে?

‎তিনি কামরুলের ভাঙ্গা ফোন হাতে নিয়ে দেখল কল লিস্টে রাবেয়ার নাম , তারপর তিনি কল দিলেন। ওপাশ থেকে রাবেয়ার কণ্ঠ শোনা যেতেই জুবায়েরের গলা বুজে এল। তিনি কোনোমতে হাসপাতালের নাম বলে দিলেন। স্বামীর অ্যাক্সিডেন্টের খবর শুনে রাবেয়া পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে হাসপাতালের দিকে ছুটলেন। তার সাজানো পৃথিবীটা এক মুহূর্তের ঝড়ে তছনছ হয়ে গেল।

‎হঠাৎ চিৎকারে নিস্তব্ধ চিরে গেল। নূরাইশা বিছানায় ধড়ফড় করে উঠে বসল। তার ছোট্ট কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে, চোখ দুটো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেছে। সে চিৎকার করে বলে উঠল, "বাবাই! রক্ত! অনেক রক্ত!"

‎জুবায়ের পাশেই ছিলেন, নূরের আওয়াজ শুনে দ্রুত তার কাছে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। বুকটা তার অপরাধবোধে ফেটে যাচ্ছে। তিনি পরম মমতায় নূরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, "এই তো মা, বাবাই এখানে। ভয় নেই, আমি আছি তো!"

‎নূর জুবায়েরকে শক্ত করে জাপটে ধরল। তার ছোট্ট শরীরটা তখনো কাঁপছে। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল, "নতুন বাবাই... ওই যে বাবাইয়ের রক্ত! অনেক রক্ত! আমার বাবাই কোথায়? কেন আসছে না?"

‎নূরের এই কথা শুনে জুবায়েরের মনে হলো কেউ যেন তার কলিজায় ছুরি চালিয়ে দিয়েছে। তিনি কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না। পাশ থেকে রাবেয়া ছলছল চোখে এগিয়ে এলেন। তিনি মেয়ের হাত ধরে শান্ত স্বরে বললেন, "নূর, বাবাই তো আকাশে তারা হয়ে গেছে। তোমাকে কতবার বলেছি সোনা, বাবাই ওখান থেকেই তোমাকে দেখছে।"

‎জুবায়ের রাবেয়ার দিকে তাকিয়ে নিজের আবেগ সামলানোর চেষ্টা করলেন। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আমি কাজের লোককে বলে দিয়েছি, খাবার নিয়ে আসছে। তুমি ওকে একটু খাইয়ে দাও, তারপর ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। ওর বিশ্রাম খুব দরকার।"

‎কিছুক্ষণ পর খাবার নিয়ে আসা হলো। নূরের একদমই খাওয়ার রুচি ছিল না, বারবার সে তার বাবাকে খুঁজছিল। রাবেয়া অনেক কষ্টে তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে কয়েক লোকমা খাইয়ে দিলেন এবং ডাক্তারের দেওয়া ঘুমের ওষুধটা খাইয়ে দিলেন। ধীরে ধীরে ওষুধের প্রভাবে নূর আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।

‎রাবেয়া মেয়ের নিষ্পাপ মুখটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নূরের কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে মনে মনে বললেন, "কামরুল চলে যাওয়ার পর থেকে এই একটা স্বপ্ন মেয়েটার পিছু ছাড়ল না। কবে ও এই ভয় থেকে মুক্তি পাবে?"

‎রুমে এক কোণে দাঁড়িয়ে জুবায়ের সবটা দেখছিলেন। তার মনে পড়ল কামরুলের সেই শেষ অনুরোধ—'আমার মেয়েটাকে দেখে রাখবেন'। জুবায়ের মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলেন, যেভাবেই হোক তিনি নূরের জীবন থেকে এই অন্ধকার দূর করবেন।

‎ আর্ট রুমের সেই গা ছমছমে অন্ধকার। জাইয়ানের চোখের মণি দুটো যেন শিকারি বিড়ালের মতো জ্বলছে। সে আপনমনে বিড়বিড় করছে, "রক্ত... লাল রক্ত... উফ্!"

‎একটি ধবধবে সাদা বড় আর্ট পেপার বোর্ডের ওপর শক্ত করে আটকালো সে। জাইয়ানের দৃষ্টি সেই শুভ্রতার দিকে স্থির, যেন এক আদিম তৃষ্ণা তাকে গ্রাস করছে। হঠাৎ সে তার হাতের সাদা ব্যান্ডেজটা দাঁত দিয়ে টেনে খুলে ফেলল। মুহূর্তেই সেলাই না করা গভীর ক্ষতটা হা করে খুলে গেল, আর সেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে তাজা লাল রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করল।

‎জাইয়ানের ঠোঁটে তখন সেই পৈশাচিক হাসির রেখা। ব্যথা তো নেই-ই, বরং এক অদ্ভুত আনন্দ খেলা করছে তার চোখেমুখে। সে তার রং-তুলিটা হাতে তুলে নিল। এরপর তুলির ডগাটি নিজের ক্ষতবিক্ষত হাতের রক্তের ওপর ডুবিয়ে দিল।

‎ধবধবে সাদা কাগজে রক্তের তুলি দিয়ে সে দ্রুত কিছু আঁকতে শুরু করল। আঁকছে আর ফিসফিসিয়ে বলছে, "বেবি চাঁদ! এই যে দেখো রক্ত... হুমম রক্ত! এত কিসের রক্তের ভয় তোর? কিসের আতঙ্ক?"

‎রক্তের লাল রঙে সাদা পৃষ্ঠাটা ধীরে ধীরে বীভৎস হয়ে উঠছে। জাইয়ানের গলার স্বর এবার পাল্টে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর গলায় শাসন করার ভঙ্গিতে বলল, "এ বেবি চাঁদ! ওপেন ইয়োর আইস! চোখ খোল বলছি... নয়তো এমন মারব আমি তোকে! আমার অবাধ্য হবি না একদম!"

‎ক্যানভাসের ওপর সেই রক্তের দাগগুলো যখন শুকিয়ে গাঢ় খয়েরি হচ্ছে, জাইয়ান তখন নিজের রক্তাক্ত হাতটার দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার কাছে এই রক্ত ভয়ের নয়, বরং এক অদ্ভুত বন্ধনের প্রতীক। তাজা রক্ত দিয়ে কি চমৎকার ছোট শিশু একটা ছবি এঁকেছে।

‎কলেজ থেকে ফিরেছে জায়েদ আর আরাভ, সাথে স্কুল ফেরত পিউলি। বাড়ির থমথমে পরিবেশের তোয়াক্কা না করেই জায়েদ আর পিউলি দৌড়ে সালমা চৌধুরীর কাছে গেল। জায়েদ বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল, "আম্মু, জানো আজ জাইয়ান ভাইয়ার রেজাল্ট দিয়েছে! সে পুরো কলেজের মধ্যে সবচেয়ে ভালো রেজাল্ট করেছে।"

‎পিউলি চারদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "আম্মু, জাইয়ান ভাইয়া কোথায়? ওকে উইশ করব।"

‎সালমা চৌধুরী মুহূর্তেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, "চুপ থাক তোরা! আমার পেটের সন্তান হয়ে তোরা সারাক্ষণ ওই জাইয়ানের জন্য পাগল কেন? জাইয়ান আর জাইয়ান!"

‎মায়ের এমন কর্কশ কথায় জায়েদ আর পিউলির হাসিমাখা মুখ দুটো মুহূর্তেই কালো হয়ে গেল। তারা জানে, মা জাইয়ান ভাইয়াকে সহ্য করতে পারে না, কিন্তু তাদের কাছে জাইয়ান ভাইয়া সবসময়ই অন্যরকম।

‎এদিকে জুলেখা চৌধুরী আরাভকে দেখে তার স্বভাবসুলভ ন্যাকা কান্না শুরু করলেন। "জানিস আরাভ, আজ তোর বড় মামা সায়েরাকে কত বকাবকি করেছে!" আরাভ তার মায়ের স্বভাব ভালো করেই জানে, তাই বিরক্ত হয়ে বলল, "মা চুপ করো তো! ফালতু কথা কম বলো।"

‎সায়েরা পাশ থেকে ফোড়ন কেটে বলল, "মামা কিন্তু নতুন বিয়ে করে বউ নিয়ে এসেছে বাড়িতে।"

‎কথাটা শুনে জায়েদ, আরাভ আর পিউলি একসাথে অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, "কীহ!"

‎সালমা আর জুলেখা এবার বিষ উগরে দিতে শুরু করলেন, "হ্যাঁ, শুধু বিয়ে নয়, সাথে পাঁচ বছরের এক আপদকেও নিয়ে এসেছে। কার না কার সন্তান এ বাড়িতে রাজত্ব করবে, আর দুদিন পর আমাদের ভাগের সম্পদে ভাগ বসাবে!"

‎তারা তিন ভাই-বোন বড়দের এই নিচু মানসিকতায় প্রচণ্ড বিরক্ত হলো। আরাভ স্পষ্ট গলায় বলল, "তোমরা চুপ করবে? আমরা জাইয়ান ভাইয়ার কাছে যাচ্ছি।"

‎তারা তিনজনেই উপরে জাইয়ানের রুমের দিকে পা বাড়াল। জাইয়ান তখন জানালার পাশে নিশ্চুপ বসে ছিল। জায়েদ আর আরাভ রুমে ঢুকে ডাক দিল, "ভাইয়া!" জাইয়ান একবার তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। আরাভ পকেট থেকে একটা ফুল বের করে জাইয়ানের হাতে দিয়ে বলল, "অভিনন্দন ভাইয়া! তোমার রেজাল্টের কথা শুনলাম।"

‎ছোট পিউলি একটা চকলেট জাইয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "এটা তোমার জন্য এনেছি ভাইয়া।"

‎ভাই-বোনদের এই অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখে জাইয়ানের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। পিউলি অজান্তেই বলে ফেলল, "জানো ভাইয়া, আমাদের নাকি একটা নতুন বোন এসেছে!"

‎মুহূর্তের মধ্যে জাইয়ানের মুখটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। তার চোখের মণি দুটো আবার সেই ভয়ংকর লালচে রঙ ধারণ করল। সে দাঁতে দাঁত চেপে শান্ত কিন্তু শীতল গলায় বলল, "আমাকে এখন একা থাকতে দে। বেরিয়ে যা এখান থেকে!"

‎জায়েদ আর আরাভ বুঝতে পারল জাইয়ানের মনের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তারা আর কথা না বাড়িয়ে পিউলিকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। রুমের দরজা বন্ধ হতেই জাইয়ান জানালার কাঁচটা সজোরে আঁকড়ে ধরল। তার মাথায় শুধু একটা শব্দই ঘুরপাক খাচ্ছে—'বোন'

‎তার কান ঝাঝাঁ করছে ‘বোন’ শব্দটা শুনে। জানালার কাঁচের ওপারে আকাশের দিকে তাকিয়ে সে এক পৈশাচিক হাসিতে ফেটে পড়ল।

‎দাঁতে দাঁত চেপে সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, "আই হেইট ফাকিং সিস্টার! সিস্টার... হাহ্!"

‎সে হাসছে, কিন্তু সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই; আছে তীব্র ঘৃণা আর প্রতিহিংসা। হাসতে হাসতেই সে তার রক্তাক্ত হাতে আঁকা সেই ক্যানভাসটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। লাল রক্তের প্রলেপগুলো এখন কালচে হয়ে জমাট বেঁধেছে। সে ক্যানভাসে হাত বুলিয়ে বলতে লাগল, "তোর রক্তই তোকে আমার কাছে টেনে এনেছে বেবি চাঁদ। বোন? না... তুই শুধু আমার শিকার।"

‎জাইয়ানের এই বিকৃত হাসি রুমের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি হতে লাগল।


চলবেই.....!

[ গল্প টা কেমন লাগল কমেন্ট করুন, ভুল হলে কমেন্ট করুন, আশা করি লাইক কমেন্ট শেয়ার করবেন। ]

 #রক্তচন্দনের_মোহর সকল পর্ব এক সাথে যুক্ত করা হলো।গল্প: #রক্তচন্দনের_মোহরলেখিকা:  #ক্যাটাগরি : এক রহস্যে ঘেরা জমিদার বাড়...
30/04/2026

#রক্তচন্দনের_মোহর সকল পর্ব এক সাথে যুক্ত করা হলো।

গল্প: #রক্তচন্দনের_মোহর
লেখিকা:

#ক্যাটাগরি : এক রহস্যে ঘেরা জমিদার বাড়ি, রহস্যময় / রহস্য, ক্রাইম ফিকশন, থ্রিলার,অ্যাডভেঞ্চার অতিপ্রাকৃত, সাসপেন্স,ঐতিহাসিক থ্রিলার।

( এই উপন্যাসের কোন অংশ কপি করা নিষিদ্ধ)

১.
[ #স্পয়লার] https://www.facebook.com/share/r/1af1GXXzrL/

[ #স্পয়লার]
৩.
[ #স্পয়লার]

★★★প্রিয় পাঠক-পাঠিকা, আপনাদের জন্য আমার বিশেষ অনুরোধ

যদি এই উপন্যাসটি আপনাদের ভালো লাগে, তবে দয়া করে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার করে আমাকে উৎসাহিত করবেন। আপনাদের ভালোবাসা এবং আগ্রহই আমার লেখার একমাত্র প্রেরণা।

এই গল্পে আপনারা খুঁজে পাবেন:

১.রহস্য আছে, ভয় আছে, লুকোনো অতীত আছে, এবং তার মাঝেই ধুকধুক করা, উষ্ণ, জীবন্ত একটি প্রেম আছে।
২.এক রহস্য, এক উত্তরাধিকার, এক লাল জ্যোতি
৩.রহস্য, অন্ধকার… আর দু’টি হৃদয়ের অজানা টান


#মূল_আলোচনা: #রক্তচন্দের_মোহর" এমন এক গল্প, যাকে শুধু পড়া যায় না—অনুভব করতে হয়। উপন্যাসটি হাতের মুঠোয় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হয় যেন সময়ের পর্দা ধীরে ধীরে সরতে শুরু করেছে, আর পাঠক প্রবেশ করছে এক প্রাচীন রহস্যের দরজায়।

১. #পটভূমি ও কাহিনি
উপন্যাসটির পটভূমি সাধারণত অতীতের কোনো এক জমিদারী আমল বা ঔপনিবেশিক যুগকে ঘিরে তৈরি হয়েছে।
উপন্যাসের শুরুতেই এক অদ্ভুত অশরীরি আবেশ। পুরোনো কিছু দলিল, ইতিহাসের চাপা অধ্যায়, আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই কিংবদন্তির মোহর—রক্তচন্দের মোহর। এমনভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে মনে হয় দৃশ্যগুলো কুয়াশার ভেতর থেকে ফুটে উঠছে। প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে আছে রহস্যের গন্ধ।

#কাহিনী: এই লালচন্দের মোহর যেন গল্পের হৃদস্পন্দন। এর সাথে জড়িয়ে আছে অতীতের রক্তাক্ত ইতিহাস, পরিবারের অদ্ভুত গোপন সত্য, আর এমন এক উত্তরাধিকার যা গ্রহণও কঠিন, ত্যাগও অসম্ভব। লেখিকা মোহরটিকে শুধু রহস্যের চাবিকাঠি হিসেবে নয়—এক প্রতীক হিসেবেও ব্যবহার করেছেন। শক্তি, অভিশাপ, দায়িত্ব—সবই মিশে আছে এর ভেতরে।

#ইতিহাসের_স্পর্শ: লেখিকা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সেই সময়ের সমাজ, রীতিনীতি এবং জীবনযাত্রার একটি বিশ্বাসযোগ্য চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন।

২. #চরিত্রায়ন
এই উপন্যাসের চরিত্রগুলি সাধারণত জীবন্ত ও বহুমাত্রিক।

#নায়ক/নায়িকা: অনুসন্ধানী প্রধান চরিত্রটি যেমন বুদ্ধিদীপ্ত এবং আবেগপ্রবণ, তেমনি অতীতের চরিত্রগুলি, বিশেষত লালচন্দ এবং তার পরিজন, তাদের লোভ, প্রেম, এবং বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে কাহিনিতে গভীরতা যোগ করেছে।

#পার্শ্বচরিত্র: পার্শ্বচরিত্রগুলিও গল্পের মূল স্রোতে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা গল্পের গতিশীলতা বজায় রাখে।

৩. #ভাষা: লেখিকার ভাষা সাধারণত মার্জিত এবং সুষম, যা সেই ঐতিহাসিক সময়ের আবহ তৈরি করতে সাহায্য করে। কথোপকথনে ব্যবহৃত শব্দচয়ন গল্পের সঙ্গে মানানসই।
শৈলী: রহস্য উপন্যাসের উপযোগী সাসপেন্স বা উত্তেজনা সৃষ্টিতে লেখক সফল। ফ্ল্যাশব্যাক এবং বর্তমানের দৃশ্যাবলির মধ্যে সংযোগ স্থাপনের কৌশলটি খুবই মসৃণ।

★★★কেন গল্পটি পড়বেন?
যদি আপনি ইতিহাস এবং রহস্যের মিশ্রণ পছন্দ করেন।
যদি আপনি পরিবারের গভীর সম্পর্ক এবং মানুষের স্বভাবের জটিলতা নিয়ে লেখা কাহিনি ভালোবাসেন।
লেখকের আকর্ষণীয় বর্ণনাভঙ্গি আপনাকে গল্পের গভীরে প্রবেশ করতে সাহায্য করবে।

#পরিশেষে: #লালচন্দের_মোহর" একটি অত্যন্ত সুপাঠ্য উপন্যাস যা পাঠককে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত আটকে রাখতে সক্ষম। এটি কেবল একটি মোহর উদ্ধারের গল্প নয়, বরং সময়ের সাথে হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ, লোভ এবং ভালোবাসার এক অবিস্মরণীয় আখ্যান। এটি নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের রহস্য-উপন্যাসপ্রেমীদের জন্য একটি মূল্যবান

" রহস্যময়" #রক্তচন্দনের_মোহর উপন্যাস।

পর্ব:১ https://www.facebook.com/share/p/1BvXynh9bB/

পর্ব:২ https://www.facebook.com/share/p/1ALRvp4CPE/

পর্ব:৩ https://www.facebook.com/share/p/17g31uoDeW/

পর্ব:৪

পর্ব:৫

পর্ব:৬

পর্ব:৭

পর্ব:৮

পর্ব:৯

পর্ব:১০

পর্ব:১১

পর্ব:১২

‎গল্প:  #তীব্র_নেশায়_তুমি‎লেখিকা: ‎পর্ব :১৩ ‎‎                  [অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ]‎‎‎লবনী আর মিহিকা যখন আবা...
30/04/2026

‎গল্প: #তীব্র_নেশায়_তুমি
‎লেখিকা:
‎পর্ব :১৩

‎ [অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষিদ্ধ]


‎লবনী আর মিহিকা যখন আবার ডাইরিটা পড়তে শুরু করে।
‎অতীত....,

‎সারারাত যন্ত্রণায় ছটফট করার পর রোশার শরীরটা আজ পাথর হয়ে আছে। কিন্তু জোহরা বেগমের হুকুম পাল্টায়নি। ভোর থেকে উঠান ঝাড়ু দেওয়া, হাঁস-মুরগি সামলানো আর কলতলা থেকে পানি টানতে টানতে রোশার দম ফেটে যাচ্ছিল। মামী বার বার এসে দেখে যাচ্ছিলেন রোশা ঠিকমতো কাজ করছে কি না। সব কাজ শেষ করে যখন সে স্কুলের ইউনিফর্মটা পরল, তখন তার পোড়া হাতে কাপড়ের ঘষায় বুক চিরে কান্না এল।

‎স্কুলের পথে কিছুটা এগোতেই দেখল রানা আর ময়না দাঁড়িয়ে আছে। দুজনকে দেখেই রোশার দুচোখ ছাপিয়ে পানি এল।

‎"কিরে রোশা? তোর এই দশা কেন? মুখটা এমন ফ্যাকাশে কেন?" রানা উৎকণ্ঠা নিয়ে এগিয়ে এল। ময়নাও অবাক হয়ে লক্ষ্য করল রোশার কপালে আর হাতে অদ্ভুত কিছু দাগ।

‎রোশা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। মেঠো পথের সেই বীভৎস রক্তারক্তি কাণ্ড, তাহসিনের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শিস দেওয়া, সেই রক্তাক্ত ব্যাগ এবং সবশেষে মামীর হাতের জ্বলন্ত খুন্তির ছ্যাঁকা—সবকিছু এক নিঃশ্বাসে বলে দিল সে।

‎সব শুনে রানার হাত মুঠো হয়ে এল, রাগে ওর রগ ফুলে উঠল। "ওই তাহসিন তো একটা কসাই! ওর এত বড় সাহস যে তোকে এভাবে ভয় দেখায়? আর তোর মামী... ও কি রক্ত-মাংসের মানুষ? চল, আজই এর একটা হিল্লে করতে হবে। আমি গ্রামের মাতব্বরকে বলব!"

‎ময়না রানার হাত চেপে ধরল। তার চোখে আতঙ্ক। সে ফিসফিস করে বলল, "মাথা গরম করিস না রানা। তাহসিন শুধু বড়লোকের ছেলে না, ও একজন খুনি। ও যদি রোশার চোখের সামনে ওভাবে কলিজা বের করতে পারে, তবে তুই বিচার চাইতে গেলে ও তোকেও বাঁচিয়ে রাখবে না। আর মামীর কথা তো জানিসই, উনি উল্টো রোশাকেই ঘর থেকে বের করে দেবেন।"

‎রানা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "তাহলে কি আমরা এভাবে ওকে মরতে দেখব?"

‎ময়না রোশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, "এখন আমাদের সাবধানে থাকতে হবে। রোশা, তুই আজ অন্তত আমাদের সাথে আছিস। স্কুলের ভেতরে ওই জানোয়ারটা অন্তত কিছু করতে পারবে না।"

‎তিনজন যখন স্কুলের ভেতরে ঢুকছে, তখন রোশা টের পেল হাজারো ছাত্রছাত্রীর মাঝেও সে আসলে কতটুকু একা। কিন্তু সে জানত না, স্কুলের সীমানার ওপার থেকেই জোড়া জোড়া চোখ তাদের দিকে নজর রাখছে।

‎তন্ময় ফোনের ওপাশ থেকে আইশানকে সব জানাচ্ছিল। আইশান যখন শুনল রোশার হাতে মামীর দেওয়া পোড়া ক্ষত আছে, তখন তার ফোনের ওপাশে একটানা ভাঙচুর করার শব্দ পাওয়া গেল।

‎"তন্ময়! ওই মহিলার হাত যেন আর আস্ত না থাকে।" আইশানের গলায় তখন শয়তানের রাজত্ব। "আর ওই রানা ছেলেটা... ওকে নজরদারিতে রাখ। রোশার খুব কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করলে ওর পা দুটো যেন আর চলার যোগ্য না থাকে।"

‎রোশা ক্লাসের বেঞ্চে গিয়ে বসল ঠিকই, কিন্তু বারবার তার মনে হচ্ছিল—ক্লাসের এই দেয়ালগুলোও যেন তাকে বিদ্রূপ করছে। সে জানে, স্কুল ছুটির পর আবার সেই নির্জন মেঠো পথ তাকে ডাকছে, যেখানে ওত পেতে আছে তাহসিনের মতো দানব আর বাড়িতে অপেক্ষা করছে মামীর মতো নরক।

‎ক্লাসে তখন পিনপতন নীরবতা। রতন স্যার ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে লিখছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মন পড়ে আছে রোশার দিকে। আড়চোখে কয়েকবার রোশার ফ্যাকাশে মুখটার দিকে তাকালেন তিনি। রোশার হাতের সেই পোড়া ক্ষত আর চোখের কোণে জমে থাকা শুকিয়ে যাওয়া পানি দেখে স্যারের বুকটা চিনচিন করে উঠল। কিছু একটা বলতে চাইলেন তিনি, কিন্তু অস্হির আর মায়ায় তাঁর গলাটা যেন বুজে এল।

‎ঠিক তখনই কোনো সংকেত ছাড়াই ক্লাসের দরজা ধাক্কা মেরে খুলে ভেতরে ঢুকল তাহসিন। ওর চেহারায় তখন পৈশাচিক আভা। রতন স্যার কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাহসিন তাঁর কলার চেপে ধরে সজোরে কয়েকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল। ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা ভয়ে বেঞ্চের নিচে কুঁকড়ে গেল।

‎তাহসিন দাঁতে দাঁত চেপে গরজে উঠল, "এই মাস্টার! পড়াতে এসেছিস পড়া। চোখ যদি আর একবার রোশার দিকে যায়, তবে ওই চোখ দুটো আমি উপড়ে ফেলব। নিজের সীমানায় থাকিস!"

‎বেচারি রতন স্যার অপমানে আর ভয়ে থরথর করে কাঁপছেন। ক্লাসে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। তাহসিন সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সরাসরি রোশার দিকে এগিয়ে গেল। রোশা পালানোর চেষ্টা করার আগেই সে তার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিল।

‎"চলো আমার সাথে!" তাহসিনের কণ্ঠস্বরে কোনো আবেদন নেই, আছে শুধু হুকুম।

‎টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় রোশার পিঠের সেই কালশিটে আর মামীর দেওয়া গরম খুন্তির ক্ষতগুলোতে চাপ লাগতেই সে ব্যথায় আর্তচিৎকার করে উঠল। ওর দুচোখ বেয়ে লোনা পানি গড়িয়ে পড়ল। তাহসিন এক মুহূর্ত থামল না, রোশাকে একপ্রকার জোর করে পাঁজাকোলা করে গাড়িতে নিয়ে তুলল। রানা আর ময়না কিছু বলতে চেয়েও তাহসিনের কোমরে গোঁজা পিস্তলের বাঁট দেখে হিম হয়ে গেল। তারা ছুটে গিয়ে স্যারকে মাটি থেকে তুলে পানি খাওয়ালো।

‎গাড়ি ছুটছে গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে। রোশা গাড়ির এক কোণে লেপ্টে বসে কাঁপছে। তাহসিন ড্রাইভ করতে করতে আড়চোখে ওর ক্ষতগুলো দেখছিল। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে। গাড়ি থামল এক পরিচিত ডাক্তারের চেম্বারের সামনে।

‎ভেতরে নিয়ে গিয়ে ডাক্তার যখন রোশার ক্ষতগুলোতে ঔষধ লাগাচ্ছিল, রোশা যন্ত্রণায় ফুঁফিয়ে উঠছিল। তাহসিন পাশে দাঁড়িয়ে শান্ত কিন্তু শীতল গলায় বলল, "বড্ড বেশি বাড় বেড়েছে তোমার মামীর। মনে হচ্ছে এবার কিছু একটা করতে হবে। আমার জিনিসে দাগ ফেলার সাহস সে পায় কোত্থেকে?"

‎রোশার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না, শুধু আতঙ্কে ওর শরীরটা রি-রি করছে। তাহসিন নিচু হয়ে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, "এত ভয় পাওয়ার কিছুই নেই রোশা। আমি থাকতে তোমাকে মারার অধিকার আর কারোর নেই—এমনকি তোমার নিজেরও নেই।"

‎ডাক্তার কাঁপাকাঁপা হাতে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। ঔষধ নিয়ে তাহসিন আবার রোশাকে নিয়ে গাড়িতে উঠল। গন্তব্য—রোশার সেই নরকসম বাড়ি।

‎এদিকে ঝোপের আড়াল থেকে তন্ময় পুরো ঘটনার ভিডিও আইশানকে পাঠিয়েছে। ফোনের ওপাশে আইশানের রক্ত তখন টগবগ করে ফুটছে। রাগে তার শরীর কাঁপছে, হাতের গ্লাসটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে।

‎আইশান বিড়বিড় করে বলল, "তাহসিন... তুই সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিস। রোশার গায়ে হাত দেওয়ার সাহস তুই যেমন দেখাচ্ছিস, তেমনি ওর ক্ষত মোছার নাটকও করছিস? পাখিকে কীভাবে খাঁচায় বন্দি করতে হয় তা আইশান খুব ভালো করেই জানে। সময় আসুক, তোর ওই হাত দুটো আমি কেটে ফেলব যা দিয়ে তুই ওকে ছুঁয়েছিস।"

‎আইশানের চোখে তখন খুনের নেশা আর রোশাকে সম্পূর্ণ নিজের করে পাওয়ার এক অবসেসিভ উন্মাদনা। সে শুধু সঠিক সুযোগের অপেক্ষায় আছে।

‎গ্রামের নিস্তব্ধ দুপুর চিরে যখন তাহসিনের কালো গাড়িটা রোশার বাড়ির সামনে এসে থামল, তখন আশেপাশের বাড়ির মানুষ জানালা দিয়ে উঁকি দিতেও ভয় পাচ্ছিল। সবার মনে এক জ্যান্ত আতঙ্ক—তাহসিন আসা মানেই কোনো অঘটন।

‎মামী জোহরা বেগম এতক্ষণ সাহসী ছিলেন, কিন্তু গাড়ির হর্ন শুনে তার কলিজা শুকিয়ে গেল। তাহসিন গাড়ি থেকে নেমে রোশাকে একপ্রকার টেনে হিঁচড়ে বের করে আনল। রোশার চোখ-মুখ কান্নায় ফুলে আছে।

‎জোহরা বেগম কিছু বলার আগেই তাহসিন বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল। সজোরে কয়েকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল জোহরার গালে। তারপর চুলে মুঠো করে ধরে মুখটা কাছে টেনে এনে হিসহিসিয়ে বলল, "আমার জিনিসে আঘাত করার সাহস পেলি কোত্থেকে? তোকে আজই এখানে জ্যান্ত পুঁতে ফেলতাম, কিন্তু সামনে নির্বাচন তাই তোকে ছেড়ে দিলাম। খবরদার! এরপর যদি ওর গায়ে একটা আঁচড়ও দেখি, তবে তোর শরীরের মাংস একটাও আস্ত থাকবে না। কুত্তা দিয়ে খাওয়াব তোকে!"

‎জোহরা বেগম ভয়ে তখন থরথর করে কাঁপছেন, প্রস্রাব করে দেওয়ার মতো অবস্থা। ঠিক তখনই তাহসিন পকেট থেকে তিনটে টাকার বান্ডিল বের করে জোহরার মুখের ওপর ছুড়ে মারল। "এখানে তিন লাখ আছে। রাখ এটা। আর আজ থেকে ওর ঠিকঠাক যত্ন নিবি। এক চুল এদিক-ওদিক হলে নিজের মরণ নিজে দেখবি।"

‎টাকার বান্ডিল মাটিতে পড়তেই জোহরার চোখের পলক বদলে গেল। ভয় ছাপিয়ে এক পৈশাচিক লোভ তার চোখে চকচক করে উঠল। মুহূর্তেই ভোল পাল্টে সে রোশাকে জাপটে ধরল।

‎"ওরে আমার কলিজার টুকরা রোশা! ও তো আমার নিজের মেয়ের মতো। আপনি কোনো চিন্তা কইরেন না ছোট সাহেব, ও আমার আঁচলের তলেই থাকবে। যত্ন-আত্তিতে কোনো কমতি হবে না।" বলতে বলতে সে রোশার কপালে একটা মেকি চুমু খেল।

‎তাহসিন রোশার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "ঔষধগুলো ঠিকমতো খেয়ো। আমি আজ যাচ্ছি, কয়েকদিন পর আবার আসব।"

‎গাড়িটা ধুলো উড়িয়ে চলে যেতেই জোহরা বেগমের রূপ মুহূর্তেই বদলে গেল। হাত থেকে রোশাকে ঝটক দিয়ে ফেলে দিয়ে টাকার বান্ডিলগুলো লুফে নিলেন তিনি। তারপর আবার রোশার চুলের মুঠো ধরে চিৎকার করে উঠলেন, "কি রে মাগির ঘরের মাগি! আমি তোরে খাওয়াই-পরাই আর তুই দুই বাচ্চার বাপের লগে নষ্টামি করস? তোর লাইগা ওই লোক আমার গায়ে হাত তুলে গেল? তুই নিশ্চয়ই আমার নামে বিচার দিছিস!"

‎রোশা ব্যথায় কোঁকাতে কোঁকাতে বলল, "আহহ মামী! লাগছে! ছাইড়া দাও। আমি কিছুই বলি নাই, সত্যি মামী!"

‎জোহরা তার কথা কানেই নিলেন না। রাগের মাথায় আরও কয়েকটা ঘা বসিয়ে দিয়ে রোশাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিলেন। "থাক এখানে পইড়া! আমার বাড়িতে থাইকা আমারে অপমান করস!" টাকার নেশায় অন্ধ জোহরা বেগম টাকাগুলো আঁচলে বেঁধে ঘরের ভেতরে চলে গেলেন। জীবনে একসাথে এত টাকা তিনি দেখেননি।

‎রোশা তখন উঠানের ধুলোয় পড়ে ডুকরে কাঁদছে। তার শরীর আর মন—দুটোই আজ ক্ষতবিক্ষত। আকাশের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে সে তার মৃত বাবা-মাকে ডাকতে লাগল।

‎"বাবা, মা... তোমরা কেন আমাকে এই নরকে একা রেখে গেলে? আমি আর পারছি না। এই পৈশাচিক ভালোবাসা আর এই নিষ্ঠুর অত্যাচার থেকে আমাকে নিয়ে যাও!"

‎এদিকে অনেকটা দূরে বসে আইশান ল্যাপটপের স্ক্রিনে তন্ময়ের পাঠানো ভিডিওটা দেখছিল। জোহরা বেগম যখন রোশার চুলে মুঠো দিয়ে ধরল, তখন আইশানের হাতের কলমটা মট করে ভেঙে গেল।

‎"জোহরা... তোর দিন ঘনিয়ে এসেছে।" আইশানের চোখে তখন এক ঠান্ডা খুনের নেশা। "আর তাহসিন, তুই টাকা দিয়ে ওকে কিনতে চেয়েছিস? তুই জানিস না, আইশান যাকে চায় তাকে পৃথিবী উল্টে হলেও ছিনিয়ে আনে। বন্দি পাখি এবার খাঁচা বদলাবে।"

‎তাহসিন যখন বাড়িতে ফিরল, তার চোখেমুখে তখনো উত্তেজনার রেশ। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই তার বাবা কাদের চৌধুরী গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, "তাহসিন, ওই মেয়েটাকে নিয়ে তুমি বেশি বাড়াবাড়ি করছো। অজাত-কুজাত এক ফকিন্নি মেয়ের জন্য নিজের সম্মান ধুলোয় মিশিও না। ও তোমাকে একদিন ধ্বংস করবে।"

‎বাবার কথা শুনে তাহসিন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। হাতের কাছে থাকা দামি ফুলদানিটা আছাড় দিয়ে ভেঙে সে গর্জে উঠল, "রোশাকে আমি চাই মানে চাই! যেকোনো মূল্যে তাকে আমি হাসিল করব। আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলাবেন না।" বলেই সে হনহন করে নিজের ঘরের দিকে রওনা দিল। পেছনে কাদের চৌধুরী বিড়বিড় করে বললেন, "এই মেয়েই তোমার কাল হবে, দেখে নিও।"

‎রুমে ঢুকতেই তাহসিনের ছোট মেয়ে তিথি 'বাবাই বাবাই' বলে দৌড়ে এসে কোলে উঠল। মুহূর্তেই তাহসিনের চেহারার সেই খুনে ভাবটা মিলিয়ে গেল। মেয়েকে আদর করে কোলে তুলে নিয়ে কপালে চুমু খেল সে, পকেট থেকে বের করে দিল কয়েকটা চকলেট।

‎এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিল তার ছেলে রাহাত। তাহসিন তার দিকে তাকিয়ে একটা দামি খেলনা গাড়ি বাড়িয়ে দিয়ে বলল, "এদিকে আসো বাবা, এই নাও তোমার গাড়ি।" কিন্তু রাহাত নড়ল না, কোনো কথাও বলল না। ছোট বয়সেই সে বুঝে গেছে তার বাবা কতটা নিকৃষ্ট আর ভয়ঙ্কর। সে ঘৃণাভরে বাবার দেওয়া উপহারের দিকে তাকিয়ে রইল।

‎তাহসিন তিথিকে নামিয়ে দিয়ে বলল, "আম্মু, রাহাত ভাইকে নিয়ে পাশের রুমে যাও তো।" রাহাত পরিস্থিতি বুঝে ছোট বোনকে নিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সে জানত, এখন আবার তার মায়ের ওপর ঝড় নামবে।

‎সন্তানেরা বেরিয়ে যেতেই তাহসিন তার স্ত্রী লামিয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। চুলে মুঠো করে ধরে চিৎকার করে বলল, "কি কানপড়া দিস আমার ছেলেকে? আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকিস কেন? সারাদিন খাস আর ঘুমাস, বেশি বাড়াবাড়ি করলে গলা কেটে গাঙ্গে ভাসিয়ে দেব!"

‎লামিয়া যন্ত্রণায় কোঁকাতে কোঁকাতে বলল, "আপনি কেন ওই মেয়েটাকে নিয়ে হাসপাতালে গেলেন? গ্রামের মানুষ হাসাহাসি করছে। আপনি কি আমাদের কথা একবারও ভাববেন না?"

‎লামিয়ার মুখে ওই মেয়ের কথা শুনে তাহসিনের রাগ সপ্তমে চড়ল। সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে বলল, "চুপ থাক! আমি কী করব না করব তা তোকে বলতে হবে না।"

‎লামিয়া ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, "আল্লাহর দোহাই লাগে, এই দুটো মাসুম বাচ্চার দিকে তাকিয়ে হলেও আপনি ভালো হয়ে যান। এই পাপ সহ্য হবে না।"

‎তাহসিনের রাগ যেন এবার আগুনের মতো জ্বলে উঠল। সে কোমর থেকে বেল্ট খুলে অমানুষিকভাবে লামিয়াকে পিটাতে শুরু করল। দরজার ওপাশে তাহসিনের মা মাধুরী চৌধুরী দাঁড়িয়ে সব দেখছিলেন, কিন্তু তিনি কোনো বাধা দিলেন না। বরং না দেখার ভান করে সেখান থেকে সরে গেলেন।

‎মায়ের চিৎকার শুনে ছোট রাহাত আর ঘরে থাকতে পারল না। সে দৌড়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। রাহাতকে দেখা মাত্রই তাহসিন বেল্ট মারা থামিয়ে দিল। ঘৃণায় আর আক্রোশে গালি দিতে দিতে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

‎লামিয়া তখন মেঝেতে পড়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। রাহাত তার ছোট্ট হাত দুটো দিয়ে মাকে তুলে ধরল এবং জড়িয়ে ধরে বলল, "সব ঠিক হয়ে যাবে মা। আমি বড় হয়ে সব ঠিক করে দেব।" সে মায়ের শরীরের ক্ষত জায়গায় আলতো করে চুমু খেল।

‎ছেলের এই অবুঝ ভালোবাসা আর সান্ত্বনা দেখে লামিয়া নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। রাহাতকে জড়িয়ে ধরে তিনি হু হু করে কেঁদে উঠলেন। তিনি বুঝতে পারছেন না, এই নরক থেকে তাদের মুক্তি কোথায়।

‎জসিম সাহেব সন্ধ্যাবেলা বাড়িতে পা রাখতেই জোহরা বেগম যেন ফেটে পড়লেন।
‎"হে গো, শুনছো? তোমার ওই গুণবতী ভাগ্নি তো এবার আমাদের জ্যান্ত কবরে পাঠাবে!" জোহরা ফিসফিস করে কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন।

‎জসিম সাহেব কপালে ভাঁজ ফেলে তাকালেন। "আবার কী হলো? ওই মেয়েটা তো সারাদিন কুঁকড়ে এক কোণে পড়ে থাকে।"

‎জোহরা বেগম হাত নেড়ে বলতে লাগলেন, "আরে রাখো তোমার ওই কচি খোকা সাজা! হারামজাদি এখন তাহসিন চৌধুরীকে হাত করেছে। আজ ওই ছোট সাহেব এখানে এসে আমাকে চুলে ধরে মারলো, অপমান করলো—সবই ওই ছুঁড়ির লাইগা। ও এখন তাহসিনের নজরে পড়ছে। শরীর দেখাইয়া তারে পাগল করছে। কতটা নষ্টা মেয়ে ভাবো একবার! তার নাকি যৌবনের জ্বালা সয় না, তাই দু বাচ্চার বাপের সাথে ঢলাঢলি কইরা আসছে। এখন যদি আমরা তাকে শাসন করতে যাই, তাহসিন আমাদের লাশ গুম কইরা রাখবে। আমরা কি এই বয়সে ওই খুনি পোলার হাতে মরবো নাকি?"

‎জসিম সাহেবের চেহারায় এতক্ষণ কোনো বিকার ছিল না, কিন্তু তাহসিনের নাম শুনে তার কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। তাহসিন চৌধুরীর ক্ষমতার কথা গ্রামের সবাই জানে। তবে নিজের স্ত্রী অপমানিত হয়েছে শুনে আর রোশার চরিত্রে জোহরার লাগানো কাল্পনিক অপবাদ শুনে তার ভেতরটাও বিষিয়ে উঠল।

‎জসিম সাহেব দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, "এত বড় সাহস রোশার? যার নুন খাচ্ছে, তার সাথেই বেইমানি! ওর বাবা-মা তো এমন ছিল না, এ কার রক্ত পাইলো শরীরে?"

‎জোহরা বেগম আরও উসকানি দিয়ে বললেন, "রক্তের দোষ গো! ওই রিমাও এখন ওর দিকে টানছে। সময় থাকতে বিহিত না করলে আমাদের মান-সম্মান, জান-মাল কিছুই থাকবে না। আমি তো ভয়ে সারাদিন কাঁপছি।"

‎জসিম সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তামাকের পাইপটা পাশে রাখলেন। তার চোখে এক ঠান্ডা কূটচাল। তিনি ধীর গলায় বললেন, "শোনো জোহরা, এখন কিছু বইলো না। তাহসিন মাথা গরম লোক, এখন ওর সাথে ঝামেলায় যাওয়া ঠিক হবে না। রোশার সামনে তো দু মাস পর ফাইনাল পরীক্ষা। এই কয়দিন অন্তত ওর সাথে একটু ভালো ব্যবহার করার ভান করো। ওরে বুঝতে দিও না যে আমরা ওর ওপর খেপছি।"

‎জোহরা ভ্রু কুঁচকে বললেন, "ভালো ব্যবহার! ওর মরা মরা মুখ দেখলে তো আমার পিত্তি জ্বলে যায়।"

‎জসিম সাহেব একটা পৈশাচিক হাসি দিয়ে বললেন, "আরে পাগল! এটা হলো ফাঁদ। পরীক্ষাটা শেষ হতে দাও। পরীক্ষার শেষ দিন বিকেলেই আমি ওর বিয়ের ব্যবস্থা করে রাখছি। এমন জায়গায় দিব যেখান থেকে কোনো তাহসিন চৌধুরী আর ওরে খুঁজে পাবে না। আর যাওয়ার আগে ওই টাকার ভাগটাও তো আমাদের বুঝে নিতে হবে। এই দুই মাস ওরে চোখে চোখে রাখো। কোনো ছোঁকরার সাথে যেন বের না হইতে পারে।"

‎জোহরা বেগম টাকার কথা শুনে কিছুটা শান্ত হলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন, জসিমের বুদ্ধিতে অন্তত রোশার থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে আর বড় অঙ্কের টাকাও হাতে আসবে।

‎এদিকে নিজের অন্ধকার ঘরে মেঝেতে শুয়ে রোশা দেয়ালের ওপাশে মামী আর মামার এই ফিসফিসানি শুনছিল। যদিও সব কথা স্পষ্ট নয়, কিন্তু সে বুঝতে পারছে তার জীবন নিয়ে বড় কোনো ষড়যন্ত্র চলছে। রোশা ভাবল, পরীক্ষা পর্যন্ত কি সে নিজেকে সামলাতে পারবে? নাকি তার আগেই তাহসিন কোনো এক উন্মত্ততা তাকে শেষ করে দেবে?

‎অন্ধকারে রোশা শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল, যেন এই নরক থেকে অন্তত একটা পথ সে খুঁজে পায়। কিন্তু সে জানত না, আইশানের ড্রোন আর তন্ময়ের ক্যামেরা তখনো তাকে ঘিরে এক নিচ্ছিদ্র জাল বুনে চলেছে।

‎চলবে.........


[ আশা করি লাইক কমেন্ট শেয়ার করবেন

Address

Burichang

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Jui Sharmin Jui posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Share