সামুদ্রিক মাছের রাজ্য

সামুদ্রিক মাছের রাজ্য Contact information, map and directions, contact form, opening hours, services, ratings, photos, videos and announcements from সামুদ্রিক মাছের রাজ্য, Health Food Shop, Madrasa Road, Bus stand, Chandpur.

"সামুদ্রিক মাছ খান,
যদি বহুদিন বাঁচতে চান"।

আমাদের কাছে সমুদ্রের মাছ পাবেন," কোরাল মাছ, রুপচাদা মাছ, লাল চিংড়ি, কাইক্কা মাছ, টোনা ফিস, সুরমা মাছ, ইত্যাদি আরো অনেক ধরনের মাছ।

আমার মা আমার স্ত্রীর গালে সবার সামনে চড় মেরেছিল। তখনও সে সদ্য সন্তান জন্ম দিয়েছে।কারণ? এক বাটি গরুর পায়ার ঝোল।আমি ভেব...
29/07/2026

আমার মা আমার স্ত্রীর গালে সবার সামনে চড় মেরেছিল। তখনও সে সদ্য সন্তান জন্ম দিয়েছে।

কারণ? এক বাটি গরুর পায়ার ঝোল।

আমি ভেবেছিলাম, আমার স্ত্রী হয়তো রাগ করবে, দু-একদিন কথা বলবে না, তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সেদিন সে যা করেছিল, তা শুধু আমাকে নয়, আমার মাকেও স্তব্ধ করে দিয়েছিল। আর আমাকে এমন এক অনুতাপের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল, যেটা হয়তো মৃত্যুর আগ পর্যন্তও ভুলতে পারব না।

আমি রাশেদ। ঢাকার একটি বড় গাড়ির শোরুমে সেলস ম্যানেজার হিসেবে কাজ করি।

আমার স্ত্রী মেহরিন। ঢাকার একটি বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা করত। খুব বেশি বেতন না, তবে নিজের সম্মান আর ভালোবাসা দিয়ে সংসারটাকে আগলে রাখত।

আমার মা রহিমা বেগম। সারা জীবন মানুষের বাসায় কাজ করেছেন, সেলাই করেছেন, কষ্ট করে আমাকে মানুষ করেছেন। বাবা মারা গিয়েছিলেন আমি খুব ছোট থাকতেই। সেই থেকে মা-ই আমার বাবা, মা, সবকিছু।

তাই মায়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর ঋণের শেষ ছিল না। জীবনে কখনো তাঁর কথার অবাধ্য হইনি। তিনি যা বলতেন, সেটাকেই ঠিক মনে করতাম।

মেহরিন যখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখনই মা গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় চলে এলেন।

এসেই বললেন,

— "ছেলের বউয়ের এই সময়ে আমি না থাকলে কে থাকবে? নিজের মেয়ের মতোই দেখাশোনা করব।"

মেহরিনের মুখটা সেদিন কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল। বুঝেছিলাম, ও চাইছিল সন্তান জন্মের পর কয়েকদিন নিজের মায়ের কাছে থাকতে। কিন্তু আমি তখন ভেবেছিলাম, নিজের মা আর শাশুড়ির মধ্যে পার্থক্য কী? মা তো অভিজ্ঞ মানুষ। কত কিছু জানেন।

আজ বুঝি, জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল সেটাই।
..

আল্লাহর রহমতে আমাদের কন্যাসন্তান জন্ম নিল।

বাড়িতে যেন নতুন আলো নেমে এলো।

মা খুব খুশি হয়ে পরদিন সকালেই বাজারে গেলেন। ফিরে এলেন গরুর পায়া, বিভিন্ন মসলা আর অনেক কিছু নিয়ে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে রান্না করলেন।

বারবার বলতে লাগলেন,

— "এই ঝোল খেলে শরীরে শক্তি আসবে। দুধও ভালো হবে।"

এদিকে মেহরিন তখনও খুব দুর্বল। সন্তান জন্মের কষ্টে মুখ শুকিয়ে গেছে। ঠিকমতো বসতেও কষ্ট হচ্ছিল।

মা এক বাটি ধোঁয়া ওঠা ঝোল এনে বিছানার পাশে রেখে বললেন,

— "নাও, গরম গরম খেয়ে ফেলো। শেষ হলে আবার দেব।"

মেহরিন ধীরে বাটিটার দিকে তাকাল।

উপরে মোটা তেলের স্তর ভাসছে।

ও আস্তে বলল,

— "মা... ডাক্তার বলেছেন প্রথম কয়েকদিন ভারী, তেল-চর্বিযুক্ত খাবার না খেতে।"

মুহূর্তেই মায়ের মুখের রং বদলে গেল।

— "ডাক্তার! ডাক্তার কী জানে? আমি যখন তোর স্বামীকে জন্ম দিয়েছিলাম, তখন তিনবেলা এসব খেয়েছি। কিছু হয়েছে?"

মেহরিন খুব শান্ত গলায় বলল,

— "সময় তো বদলেছে মা। এখন ডাক্তাররা—"

মা আর শুনলেন না।

কঠিন গলায় বললেন,

— "আমি যা বলছি, সেটাই করো।"

মেহরিন একটু থেমে নিচু স্বরে বলল,

— "ক্ষমা করবেন মা... আমি সত্যিই পারব না। ছোটবেলা থেকেই গরুর পায়া খেতে পারি না। গন্ধেই—"

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই...

ঠাস!

একটা জোরে চড় এসে পড়ল ওর গালে।

ঘরের ভেতর মুহূর্তেই নেমে এল মৃত্যুর মতো নীরবতা।

মেহরিন নিজের গালে হাত দিয়ে স্থির হয়ে বসে রইল।

চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেছে।

মনে হচ্ছিল, ও নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না, ঠিক কী ঘটল।

আমি ছুটে এলাম বারান্দা থেকে।

— "মা! আপনি এটা কী করলেন?"

মা তখনও রাগে কাঁপছেন।

বললেন,

— "আমি এতক্ষণ দাঁড়িয়ে রান্না করলাম, আর সে বলে গন্ধ লাগে? মানে আমার রান্না নাকি নোংরা? এত অহংকার কিসের?"

আমি দেখলাম...

মেহরিনের গালটা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল হয়ে গেছে।

কিন্তু ও কাঁদল না।

চিৎকারও করল না।

শুধু নিঃশব্দে চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল।

সেই পানি গিয়ে পড়ছিল আমাদের ছোট্ট মেয়ের গায়ে, যাকে সে বুকের কাছে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল।

আমি মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম।

একদিকে আমার মা...

অন্যদিকে আমার স্ত্রী...

দুজনই আমার সবচেয়ে আপন মানুষ।

কী বলব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

অনেক কথা মাথায় এল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি এমন একটা কথা বললাম, যেটার জন্য আজও নিজের মুখের দিকে আয়নায় তাকাতে লজ্জা লাগে।

আমি বললাম,

— "মেহরিন... মা তো বড় মানুষ। উনি রাগের মাথায় করেছেন। তুমি প্লিজ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে এটা খেয়ে ফেলো। আজকের মতো বিষয়টা শেষ করে দাও।"

মেহরিন ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকাল।

সেই দৃষ্টিটা...

আজও আমাকে ঘুমাতে দেয় না।

সেখানে কোনো অভিযোগ ছিল না।

কোনো চিৎকার ছিল না।

কোনো অভিমানও ছিল না।

ছিল শুধু...

সম্পূর্ণ নিঃশব্দে ভেঙে যাওয়া একটা মানুষের শীতল দৃষ্টি।

মনে হচ্ছিল, ওর ভেতরে আমার জন্য যে শেষ ভালোবাসাটুকু ছিল, সেটাও সেই মুহূর্তে নিভে গেল।

ও আর একটা কথাও বলল না।

নিঃশব্দে বাটিটা হাতে তুলে নিল।

তারপর এক চুমুক...

আরেক চুমুক...

গলা দিয়ে নামাতে কষ্ট হচ্ছিল।

তবু জোর করে খেয়ে যাচ্ছিল।

আর চোখের পানি থামছিল না।

আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখছিলাম।

সেদিন নিজের কাছেই নিজেকে সবচেয়ে ছোট মানুষ মনে হচ্ছিল।

মা তখন সন্তুষ্ট হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

বাইরে পাশের বাসার এক খালার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বললেন,

— "এখনকার মেয়েদের একটু শক্ত হাতে না ধরলে সংসার করতে শেখে না।"

মেহরিন কিছুই শুনল না।

অথবা শুনেও শুনল না।

খালি বাটিটা নামিয়ে রেখে মেয়েকে বুকে নিয়ে আস্তে আস্তে ঘুম পাড়ানোর গান গাইতে লাগল।

কিন্তু সেই গলায় কোনো সুর ছিল না।

ছিল শুধু জমে থাকা কষ্ট।

আমি অনেকবার ভেবেছিলাম ওর কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইব।

বলব, আমি ভুল করেছি।

কিন্তু কোনো শব্দ মুখ দিয়ে বের হলো না।
..

সেই রাতেই মেহরিনের প্রচণ্ড জ্বর এল।

বুক ফুলে শক্ত হয়ে গেল।

ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল।

তবু মুখ চেপে সব সহ্য করছিল।

মা শুধু একবার তাকিয়ে বললেন,

— "এসব স্বাভাবিক। একটু কষ্ট তো হবেই।"

তারপর থেকে মেহরিন যেন বদলে গেল।

আগের সেই হাসিখুশি মেয়েটা কোথায় হারিয়ে গেল, জানি না।

ও শুধু তিনটা কাজ করত।

মেয়েকে দুধ খাওয়াত।

ডায়াপার বদলাত।

ঘুম পাড়িয়ে দিত।

এর বাইরে যেন ওর নিজের কোনো অস্তিত্বই ছিল না।

মা যা বলতেন, ও চুপচাপ করত।

কোনো তর্ক না।

কোনো প্রতিবাদ না।

কোনো অভিযোগও না।

মা ভেবেছিলেন, বউমা বুঝি অবশেষে তাঁর কথা মানতে শিখেছে।

কিন্তু আমি বুঝতেই পারিনি...

ওর নীরবতা আসলে ঝড়ের আগের ভয়ঙ্কর নীরবতা।

দিন কেটে গেল।

মেয়ের আকিকার আগের দিন মেহরিনের মা আমাদের বাসায় এলেন।

ঘরে ঢুকেই তাঁর মুখটা কেমন কঠিন হয়ে গেল।

তিনি শান্ত গলায় বললেন,

— "আমি মেহরিনকে কয়েকদিনের জন্য নিয়ে যাব।"

আমি বিন্দুমাত্র আপত্তি করিনি।

হেসেই বললাম,

— "ঠিক আছে খালা। ওরও একটু পরিবর্তন হবে।"

মা তখন পাশে দাঁড়িয়ে বললেন,

— "দুই-একদিন থাকুক। তারপর পাঠিয়ে দিয়েন।"

মেহরিন একবারও পেছনে তাকাল না।

মেয়েকে কোলে নিয়ে ধীরে ধীরে দরজার বাইরে চলে গেল।

গাড়িতে ওঠার আগে একবার শুধু আমার দিকে তাকিয়েছিল।

সেই দৃষ্টির অর্থ আমি সেদিন বুঝিনি।

আজ বুঝি।

সেটা ছিল...

একজন মানুষের শেষবারের মতো বিশ্বাস হারানোর দৃষ্টি।

গাড়িটা ধীরে ধীরে রাস্তার মোড় পেরিয়ে চোখের আড়াল হয়ে গেল।

মা তখনও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন,

— "চিন্তা করিস না। দুদিন পর ঠিকই ফিরে আসবে। বাচ্চা নিয়ে মেয়েরা আর কতদিন বাবার বাড়িতে থাকে?"

আমিও তখন সেই কথাই বিশ্বাস করেছিলাম।

দিন গেল।

এক সপ্তাহ।

তারপর আরেক সপ্তাহ।

মেহরিন আমার কোনো ফোন ধরল না।

একটা মেসেজেরও উত্তর দিল না।

শেষ পর্যন্ত একদিন মাকে নিয়ে নিজেই শ্বশুরবাড়িতে গেলাম।

ভাবলাম, গিয়ে দুটো ভালো কথা বলব।

সব ভুল বোঝাবুঝি মিটে যাবে।

দরজায় নক করতেই মেহরিনের মা দরজা খুললেন।

আমাদের দেখে তাঁর মুখ শক্ত হয়ে গেল।

তিনি শুধু বললেন,

— "কী দরকার?"

আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম...

ঠিক তখনই তাঁর পেছনে এমন একটা দৃশ্য চোখে পড়ল...
যেটা দেখে মনে হলো, আমার পায়ের নিচ থেকে পুরো পৃথিবীটাই সরে গেল।

চলবে
অন্তর_অভিমান

পর্ব:১
(copied)

'মা ম*রলে বাপ তালোই হয়ে যায়' কথাটার প্রমাণ নাহিদ পেল মায়ের মৃত্যুর পর বাবা যখন নতুন বউ ঘরে তুলল। চাচা-ফুপুরা বলতেন ছোটো ...
18/07/2026

'মা ম*রলে বাপ তালোই হয়ে যায়' কথাটার প্রমাণ নাহিদ পেল মায়ের মৃত্যুর পর বাবা যখন নতুন বউ ঘরে তুলল। চাচা-ফুপুরা বলতেন ছোটো দুটো ছেলেমেয়েকে দেখাশোনা করার জন্য হলেও বাবার খুব শীঘ্রই বিয়ে করা দরকার। তাই তাদের কথা রাখতেই যেন এক মাসের মাথায় নাহিদ নতুন মা পেল। অবশ্য নতুন মা আসার আগের এক মাস যে বাবা তাদের আদর যত্ন করেছে তেমনটা নয়, এ কয়দিন দশ বছর বয়সী নাহিদ ও তার সাড়ে চার বছর বয়সী ছোটো বোন নাদিয়া পালাক্রমে চাচা-ফুপুদের বাড়িতেই ছিল। তখনই নাহিদ খেয়াল করল মায়ের হাত ধরে এলে যারা ওদের বুকে টেনে নিতেন, পছন্দের খাবার রেধে খাওয়াতেন, তারাই কেমন চোখ টাটিয়ে কথা বলেন। সামান্য ভুলেই ধমক দেন। নাহিদ অস্থির হয়ে গেছিল কবে তারা আবার নিজের বাড়িতে গিয়ে স্বাধীনভাবে থাকতে পারবে।

কিন্তু নিজের বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর দেখল, মায়ের সংসারটা এখন আরেকজনের হয়ে গেছে। বাবা শিখিয়ে দিলেন তাকে ছোটো মা ডাকতে হবে। নাহিদ মায়ের জায়গায় অন্য কাউকে বসাতে পারে না। তাই সে মুখে কিছুই ডাকে না। কিন্তু নাদিয়া অবুঝ শিশু। সে অল্প কিছুদিনের মাঝেই মায়ের স্মৃতি ভুলতে শুরু করে নতুন মাকে আপন করে নিল।

নাহিদ দেখল সংসারে অনেক কিছুই বদলে গেছে। আগে যখন নাহিদের মা কোমর ব্যথায় বিছানায় পড়ে কাঁদতেন, বাবা পাড়ার মোড়ের দোকানে বসে ক্যারাম খেলতেন। বাড়ি ফিরতেন রাত দশটায়। সেই বাবা এখন অফিস থেকে এসে যে বাড়িতে ঢোকেন, আর বেরই হন না। নতুন মায়ের হাতে হাতে কাজ করে দেন। ছুটির দিনে নাহিদের কাছে নাদিয়াকে রেখে তারা একসাথে ঘুরতে বের হয়। নাদিয়া সঙ্গে যেতে বায়না ধরলে বলে "তোমাকে পরে নিয়ে যাব।"
সেই পরে আর ওদের জীবনে আসে না।

নাহিদের মা ছিলেন কিডনির পেশেন্ট। তার চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল ছিল। বাবা এসব নিয়ে মাকে উঠতে বসতে খোঁটা দিতেন। মা সেসব খোঁটা থেকে বাঁচতে একে একে নিজের সব গয়না বিক্রি করে দিয়েছিল। যখন মায়ের স্ত্রীধন শেষ হলো তখন যেন তার চিকিৎসার গতিও কমে গেল। এক পর্যায়ে ঘরের ভেতর গুমরাতে গুমরাতে মা নাহিদের হাতের ওপরই মরে গেল। মা মরেছিল সন্ধ্যায়, নাহিদ মায়ের মৃতদেহ আগলে ধরে বসে ছিল রাত দশটা অবধি। দশটা না বাজলে তো বাবা ঘরে ফেরেন না।

মায়ের প্রতি বাবার রুক্ষ এক অবতার দেখে বড়ো হওয়া নাহিদ নতুন মায়ের প্রতি বাবার এই কোমল রূপ মানতে পারে না। নতুন মাকে তার হিংসে হয়। সেই হিংসে আরো বেড়ে যায় যখন নতুন মায়ের গর্ভে সন্তান আসে। অসুস্থতার বাহানায় নতুন মা তখন নাহিদকে দিয়ে কাপড় ধোয়াতেন, বাসন মাজাতেন। একদিন বাসন মাজতে গিয়ে হাত থেকে কাচের গ্লাসটা পড়ে যাওয়ায় সজোরে থাপ্পড় মারলেন। কারণ গ্লাসটা নাকি নতুন মায়ের বাপের বাড়ির দেওয়া ছিল। অতি আবেগের বিষয়। তাছাড়া গর্ভাবস্থায় মেয়েরা নাকি একটু খিটখিটে হয়ে যায়। তাই বাবাও এখানে মায়ের কোনো ভুল দেখলেন না। ভুল নাহিদের ছিল। সে নাকি নতুন মাকে সহ্য করতে না পেরে তার জিনিসপত্র নষ্ট করে।

বোনের কাজ সব নাহিদ একা হাতেই করত।একদিন নাহিদ স্কুল থেকে এসে ছোটো বোনকে গোসল করিয়ে দিতে গেল। হঠাৎ খেয়াল করল বোনের পিঠে লম্বা আচড়ের দাগ। নাহিদ জিজ্ঞেস করল, "কে মেরেছে তোমায়?"

নাদিয়া ভয়ে ভয়ে উত্তর দেয়, "ছোটো মা মেরেছে। তুমি কাউকে বোলো না৷ তাহলে তোমাকেও মারবে।"

নাহিদ সেদিন বুঝতে পারল তার আড়ালে ছোটো বোনটাকে কীভাবে আদর করা হয়।বাবা অফিস থেকে ফিরলে নাহিদ সরাসরি বাবার কাছে সব খুলে বলল। বোনের পিঠ দেখিয়ে প্রমাণও দিল। সেদিন বাবার সঙ্গে বেশ একটা ঝগড়া হয়ে গেল নতুন মায়ের। পরদিন সকালেই তিনি কাপড় গুছিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেলেন। বাবা অফিস থেকে ফিরে তাকে আনতে গেলে বললেন, এমন বদমায়েশ বাচ্চাদের সঙ্গে থাকতে তিনি ভয় পাচ্ছেন। তারা যদি হিংসায় পেটের বাচ্চার ক্ষতি করে?

অতঃপর বেশ কয়েকটা সালিশ-বৈঠক করে সিদ্ধান্ত এলো নাহিদ ও নাদিয়া চলে যাবে নানাবাড়ি। সেখানেই তাদের খরচা পাঠিয়ে দায়িত্ব পালন করবেন বাবা। মামা এসে ওদের নিয়ে চলে গেল। নাদিয়া খুব কান্নাকাটি করেছিল বাবার কাছে থাকতে। বাবা একটাবার ওকে কোলে নিলেন না। মাথায় হাত বুলিয়ে আদরও করলেন না। নাহিদকে শুধু বললেন, "বোনকে দেখে রাখিস।"
এরপর চলে গেলেন নতুন মাকে একটা নির্ঝঞ্ঝাট সংসারে ফিরিয়ে আনতে।

নাহিদ সেদিনই টের পেল, ওরা শুধু মাকে হারায়নি, এবার বাবাকেও হারিয়েছে। কিন্তু নাদিয়া যে বোঝে না। তার এক ঘর ভরতি খেলনা তাকে বারবার ঘরের কথা মনে করায়। মামা তাকে বুঝ দিতে বলেন, "আমরা বেড়াতে যাচ্ছি। বাবা পরে এসে আবার নিয়ে যাবে।"

নাহিদের নানাবাড়ি গ্রামে। এক উঠোনকে কেন্দ্র করে তিন মামার ঘর। মাটির ঘরটা নানির। নাহিদ ও নাদিয়া সেখানেই থাকে। মামা নাহিদকে স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন, নাদিয়াকে স্কুলে দেওয়া হবে সামনের বছর। ঘুম থেকে উঠে ও ঘুমাতে যাওয়ার আগে নাদিয়া রোজ একটাই প্রশ্ন করে, "বাবা কবে নিতে আসবে? আর কতদিন বেড়াব?"

সারাদিন অবশ্য টইটই করে ঘুরে বেড়িয়ে প্রশ্নটা ভুলে থাকে। ইটের দালানে মায়ের সযত্নে বেড়ে ওঠা নাদিয়াকে আগে দেখলে সবাই বলত জ্যন্ত পুতুল৷ সেই পুতুল এখন রোদে পুড়ে, গায়ে ধুলো লাগিয়ে গ্রামের মেঠো প্রান্তরে খেলে বেড়ায়। ঘেসো মাঠে প্রজাপতির পেছনে ছুটতে গিয়ে আছার খায়, ফড়িং ধরে বোতলে ভরে পোষ মানাতে চায়। নাহিদ খেয়াল করেছে নাদিয়া গালি দেওয়া শুরু করেছে। খেলতে গিয়ে মামাতো বোনের সাথে ঝগড়া বেধে বলেছে, "তুই মা'গি, তুই ছি'নাল।"

নাহিদ বোনের কান ধরে টেনে এনে জিজ্ঞেস করল, "এসব কথা কোথায় শিখেছো?"
নাদিয়া সরল সুরে বলল, "সবাই বলে।"
"কিন্তু তুমি বলবে না।"
"কেন?"
"তাহলে মা কষ্ট পাবে।"
"মা কষ্ট পেলে আমাদের নিতে আসে না কেন? আমার এখানে ভালো লাগে না।"
নাদিয়ার চোখ ছলছল করে। নাহিদ জিজ্ঞেস করে, "মাকে তোমার মনে আছে?"

নাদিয়া মনে করার চেষ্টা করে। মায়ের মুখটা তার কাছে ঝাপসা হয়ে গেছে। ও বাড়িতে মায়ের একটা বড়ো ছবি টানানো ছিল দেয়ালে। রোজ রাতে সেই ছবি দেখিয়ে মায়ের গল্প করত নাহিদ। আসার সময় ছবিটা আনতে পারেনি ও। নাদিয়া মাকে ভুলে যাচ্ছে দেখে খুব কষ্ট হয় তার। নানির কাছে মায়ের একটা ছোটোবেলার ছবি আছে। মা তখন ফ্রক পরে স্কুলে যায়। সেই ছবি দেখালে নাদিয়া হেসে বলে, "মা এত ছোটো হয় নাকি?"

কিন্তু বাবার কথা নাদিয়ার ভালো করে মনে আছে। শুরুতে বাবা রোজ একবার করে মামার ফোনে কল দিত। নাদিয়া বাবাকে শোনাত গ্রামে তার নতুন নতুন অভিজ্ঞতার কথা। এরপর একদিন খবর এলো নাদিয়ার ছোটো মায়ের একটা মেয়ে হয়েছে। বাবাও সেদিনের পর থেকে ফোন করা কমিয়ে দিলেন। খরচা আসাও কমে গেল। এক মাসে এলে আরেক মাসে আসে না। তখন মামারাও বিরক্তি প্রকাশ করতে শুরু করে।

নাদিয়া বাবাকে শোনাতে চায় জোছনা রাতের ভূতের ভয়ে কুকড়ে যাওয়ার কথা, শোনাতে চায় বোতলের গায়ে গরম পেরেক দিয়ে ফুটো করে রঙ বেরঙের ফড়িং বন্দি করে পোশ মানানোর কথা। কিন্তু ফড়িংগুলো পোষ মানে না। বরং ওড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে মরে যায়। নাদিয়া বাবাকে জিজ্ঞেস করবে কী করলে ফড়িংগুলো না মরে বেঁচে থাকবে। কিন্তু এখন আর বাবার গল্প করার সময়ই হয় না।

নাহিদ বোনকে বকে বলেছিল, "তুমি বোতলে ফড়িং বন্দি করবে না। এটা অনুচিত।"

নাদিয়া বলল, "তাহলে আমি গল্প করব কার সাথে? কে আমার বন্ধু হবে?"

নাহিদ সেদিন টের পেল নাদিয়া এই বয়সেই একাকিত্বে ভুগে সঙ্গী বানিয়েছে ফড়িং ও প্রজাপতিদের। বোনের থেকে নাহিদও অনেকটা দূরে সরে গেছে। মাকে হারানোর পর থেকে ছেলেটা অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে গেছে। মামিদের খোঁচা শোনার ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে বেড়ায়৷ মাঠে-ঘাটে ক্রিকেট-ফুটবল খেলে বেড়ায়। রাতে চোখ-কান বুজে দুমুঠো ভাত খেয়ে ঘুম দেয়। এ ছাড়া তার টিকে থাকার উপায় নেই।

অতিরিক্ত গরম পড়লে পাড়ার ছোটো ছেলে-মেয়েদের ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। নাদিয়ার লম্বা সুন্দর চুলগুলো অযত্নে জট পাকিয়ে থাকে, গরমে মেয়েটার কষ্ট হয়, ঘাড়ে ঘামাচিতে ভরে গেছে বিধায় বড়ো মামা বললেন নাদিয়াকে ন্যাড়া করানো হবে। নাদিয়া সে কথা শুনে কান্নাকাটি জুড়ে দিল। নাহিদ মায়া করে বলল, "ন্যাড়া করতে হবে না। আমি বোনের চুল আচড়ে বেধে দেব প্রতিদিন।"

কে জানত সেই লম্বা চুল দেখেই একদিন নাদিয়াকে খুঁজে পাওয়া হবে পানাপুকুরে!

নাহিদ দুপুরে খেয়ে-দেয়ে বোনকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে চলে গেছিল স্কুলের মাঠে ক্রিকেট খেলতে। নাদিয়া ইদানীং খুব ভালো ঘুমের ভান করতে পারে৷ ভাইয়া চলে গেলেই সে বিছানা ছেড়ে চলে যায় ক্ষেতের দিকে। ক্ষেতের আইলে অনেক ছোটো ছোটো ফুল ফোটে, ফসলের ওপর প্রজাপতি আর ফড়িং ওড়ে। ওদিকটায় নদী থেকে ভালো বাতাস আসে৷ দুই হাত দুদিকে প্রসারিত করে আইল ধরে দৌড়ালে যখন বাতাসের সঙ্গে চুলগুলো ওড়ে, নাদিয়ার নিজেকেও ফড়িং মনে হয়।

একটা লাল রঙের ফড়িংয়ের পেছনে ছুটতে গিয়ে নাদিয়া ইউক্যালিপটাস গাছের শেকরে হোচট খেয়ে পার্শ্ববর্তী পুকুরে পড়ে গেল। সবুজ পানাপুকুরটা একটা শিশুর ছটফটানিতে উত্তাল হয়ে নীরবেই শান্ত হয়ে গেল। শুধু নদীর পাড় থেকে উড়ে আসা বাতাস সাক্ষী হয়ে রইল।

সন্ধ্যাবেলা নাদিয়াকে পুকুর থেকে তোলা হলো। পানি খেয়ে তার পেট ফুলে গেছে। গায়ের রঙ অস্বাভাবিক সাদা। গ্রামে এসে ময়লা হয়ে যাওয়া নাদিয়াকে আজ আবারও সেই ফুটফুটে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী পুতুল মনে হচ্ছে। বছরখানিক আগে ঠিক যেভাবে দুই হাতের ওপর মায়ের নিথর মাথাটা আকড়ে ধরেছিল নাহিদ, সেভাবেই পুতুল বোনকেও ধরতে হলো তাকে।

জীবন্ত নাদিয়াকে দেখার সময় না হলেও মৃত মেয়েটিকে দাফন করার ফুরসত হয়েছিল বাবার। যাওয়ার সময় নাহিদকে তিনি সঙ্গে নিতে চেয়েছিলেন। বোর্ডিংয়ে দিয়ে দেবেন বলে। নাহিদ যায়নি। বরং একসময় সে নিজ ইচ্ছায় পড়াশোনা ছেড়ে দিল।

*****

তিতলি দাদাবাড়ি বেড়াতে এসেছে। দাদু-দাদি তাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে পুকুরপাড়ে যেন না যায়। কথিত আছে এই পুকুরটি নাকি ভূতুড়ে। ফলে সকলেই এড়িয়ে চলে। কিন্তু পুকুরের দিকেই তিতলির ভীষণ ঝোঁক। সেখানে প্রায়ই একটা ছেলেকে বসে থাকতে দেখা যায়। আচ্ছা, ছেলেটার কি ভয় করে না? আট বছরের তিতলি সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে যায় পুকুরের কাছে। পেছন থেকে পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে ছেলেটিকে ভয় দেখাতে চেষ্টা করল সে। কিন্তু ছেলেটি একটুপ চমকাল না। তিতলি মনঃক্ষুণ্ন হয়ে বলল, "এই তুমি কি ভয় পাও না?"

নাহিদ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। বলল, "তোমাকে আমি আগেই দেখে ফেলেছি। তাই ভয় পাইনি।"

"তুমি জানো এই পুকুরে ভূত থাকে।"

"কে বলেছে তোমাকে?"

"আমার দাদু বলেছে। একটা মেয়ে এখানে পড়ে গিয়ে ভূত হয়ে গেছে।"

নাহিদ বলল, "উঁহু, ভূত হয়নি। সে একটা ফড়িং হয়ে গেছে।"

"তুমি কীভাবে জানলে?"

"আমি তো ফড়িংটাকে দেখি। ওর সঙ্গে এখানে বসে সময় কাটাই।"

"সত্যিই!" তিতলি ভীষণ কৌতুহলী হলো। আবার বলল, "তোমার হাতে সবসময় ওই ফুটো করা বোতল থাকে কেন?"

নাহিদ হাতের বোতলটার দিকে চেয়ে বলল, "এটায় আমি ফড়িং ভরে আনি। এনে এখানে ছেড়ে দেই। আমার বোন ফড়িং খুব পছন্দ করে।"

"তোমার বোন কোথায়?"

"সে এই পুকুরে পড়ে গিয়েছিল। এখানে ওর চুলগুলো ভাসছিল। সবাই ওকে ভুলে গেছে। কিন্তু আমি ওকে প্রতিদিন মনে করি।"

(সমাপ্ত)

ছোটোগল্প: #বোতল_বন্দি_ফড়িং

Address

Madrasa Road, Bus Stand
Chandpur
3600

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when সামুদ্রিক মাছের রাজ্য posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share