06/04/2026
ইরানের নির্জন পর্বতমালায় আজ এক ইতিহাসের পুনরুত্থান ঘটল—যেখানে যন্ত্রের চেয়ে মানুষের প্রাণের মূল্যই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হলো।
বিধ্বস্ত F-15E Strike Eagle-এর ধ্বংসাবশেষ থেকে একজন সাধারণ Weapon Systems Officer-কে উদ্ধারে মার্কিন বাহিনীর এই রুদ্ধশ্বাস অভিযান কেবল একটি সামরিক কৌশলের সফল বাস্তবায়ন নয়; বরং এটি একটি জাতির এমন এক আত্মপরিচয় ও মর্যাদাবোধের নগ্ন আস্ফালন, যা আজকের এই রূঢ় পৃথিবীতে আমাদের সেই হারানো সোনালি ইতিহাসের স্মারককেই বড্ড নিষ্ঠুরভাবে মনে করিয়ে দিল।
গতরাতের সেই অভিযানটি ছিল সিনেমার গল্পের চেয়েও রোমাঞ্চকর। পাহাড়ি শৈলশিরা থেকে ইমার্জেন্সি বিকন সঙ্কেত পাওয়ার পর United States Special Forces যখন সেখানে পৌঁছায়, তখন ইরানি বাহিনীর সাথে তাদের প্রচণ্ড সম্মুখযুদ্ধ শুরু হয়। এমনকি উদ্ধারকারী দলকে সাপোর্ট দিতে ইরানের অভ্যন্তরে একটি Forward Arming and Refueling Point (FARP) তৈরি করা হয়। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক ছিল যে, দুটি C-130 কার্গো বিমান সেখানে আটকে পড়লে Delta Force-এর একটি টিম এসে বিমান দুটিকে বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে যায়—যাতে প্রযুক্তি শত্রুর হাতে না পড়ে।
কিন্তু এই সামরিক খবরের আড়ালে যে সত্যটি লুকিয়ে আছে, তা প্রতিটি মুসলিমের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটানোর মতো।
আজ আমেরিকা তার একজন সাধারণ সৈন্যের জন্য কোটি কোটি ডলারের সম্পদ ধ্বংস করছে, পুরো বিশেষ বাহিনীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই 'একজনের জন্য সবার লড়াই' করার যে সংস্কৃতি, তা আজ আমেরিকাকে গত ১০০ বছর ধরে বিশ্বমঞ্চে অজেয় করে রেখেছে। অথচ এই আদর্শটি ছিল আমাদের।
ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে তাকালে দেখা যায় সেই জাজ্বল্যমান অধ্যায়, যেখানে একজন মুমিনের জান ও মালের হেফাজত ছিল রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম এবং প্রধান ইবাদত। আজ যখন আমেরিকা তার একজন সৈন্যের জন্য পর্বতসম বাধা ডিঙিয়ে যায়, তখন আমাদের স্মৃতির আয়নায় ভেসে ওঠে সেই অমর কীর্তিগুলো।
আনাতোলিয়ার এক বন্দিশালায় এক রোমান সৈন্য যখন এক মুসলিম নারীর অমর্যাদা করেছিল, তখন সেই নারী আর্তনাদ করে উঠেছিলেন—"ওয়া মুতাসিমাহ!" (হে মুতাসিম, তুমি কোথায়?)।
সেই সংবাদ যখন বাগদাদে খলীফার কানে পৌঁছাল, তিনি পানপাত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই পানি পান করার আগেই তিনি ঘোড়ায় জিন চড়ালেন এবং তলোয়ার উন্মোচিত করে গর্জে উঠলেন। তিনি এমন এক বিশাল বাহিনী নিয়ে আমুনিয়া জয় করেছিলেন, যার অগ্রভাগ ছিল শত্রুর সীমানায় আর পশ্চাদভাগ ছিল খলীফার প্রাসাদে। কেবল এক বোনের ইজ্জত রক্ষায় তিনি একটি সাম্রাজ্যকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিলেন।
উমর ইবনুল খাত্তাব রা.শাসনকালে এক রোমান ব্যক্তি জনৈক মুসলিমকে লাঞ্ছিত করে একটি চপেটাঘাত (থাপ্পড়) করেছিল। খবরটি যখন আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর (রা.)-এর কানে পৌঁছালো, তিনি তা সাধারণ কোনো ঘটনা হিসেবে দেখেননি। তিনি এটিকে পুরো উম্মাহর অপমানের সমান জ্ঞান করেছিলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ কড়া নির্দেশ পাঠালেন সেই অপরাধীকে খুঁজে বের করে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে। তাঁর সেই অটল অবস্থান রোমান সাম্রাজ্যকে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে—একজন মুমিনের গালে পড়া একটি চপেটাঘাতের দাম দিতে হতে পারে পুরো শহর রক্তে রঞ্জিত করে।
রাজা দাহিরের জলদস্যুরা যখন মুসলিম নারীদের লুণ্ঠন করে বন্দি করল, তখন এক কিশোরী চিৎকার করে বলেছিল—"হে হাজ্জাজ, আমাকে বাঁচাও!" সেই এক কিশোরীর আর্তনাদ সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে থাকা ১৭ বছরের যুবক সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমকে স্থির থাকতে দেয়নি। সেই এক বোনের ইজ্জতের বদলা নিতেই এই উপমহাদেশে ইসলামের ঝাণ্ডা উড্ডীন হয়েছিল।
ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মুমিনের রক্ত ও জানের মর্যাদা পবিত্র কাবার চাইতেও বেশি—এই অমোঘ সত্যটি আজ কিতাবের পাতায় বন্দি। আজ শত্রু সেই সুন্নাহর ছায়া অনুসরণ করে অজেয় হয়ে উঠছে, আর আমরা আমাদের মূল পরিচয় হারিয়ে পৃথিবীর আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছি।
হায় আফসোস! আজ ঘোড়া আছে কিন্তু সওয়ার নেই, তলোয়ার আছে কিন্তু সেই হাত নেই যারা এক বোনের আর্তনাদে বিশ্ব কাঁপিয়ে দেবে।
আমেরিকা আজ বিশ্বকে শাসন করছে কারণ তারা তাদের বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে এই নিশ্চয়তা দেয় যে—"আমরা তোমাকে মরতে দেব না, আর মরলেও তোমার দেহ শত্রুর হাতে ছাড়ব না।" যুদ্ধ একটি জাতিকে সম্মানিত করে, তাকে বীরের আসনে বসায়। আজ মুসলিম শাসকরা সেই সম্মান আর আত্মপরিচয় ভুলে গিয়ে আমেরিকার 'প্রজা' হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তারা ভুলে গেছে যে, সম্মান কেবল আল্লাহর পথে সংগ্রামের মাধ্যমেই অর্জিত হয়।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো আমাদের অভ্যন্তরীণ ক্ষত। আজ তথাকথিত অনেক দ্বাঈ ও উলামা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর 'গুড বুক'-এ নাম তোলার জন্য নিজের ভাইকেই শত্রুর হাতে তুলে দিচ্ছে। ক্ষমতার মোহ আর অর্থের লোভে আজ মুসলিম শাসকরা তাদেরই ভাইদের ওপর জুলুম করছে, যারা শুধুমাত্র একনিষ্ঠভাবে ইসলাম মানতে চায়। যে আদর্শ আমেরিকা আজ ধারণ করে বিশ্ব জয় করছে, সেই আদর্শ আমরা বিসর্জন দিয়ে আজ দাসে পরিণত হয়েছি।
মিশর, জর্ডান বা সৌদি আরব—আজ তারা একেকজন 'বর্ডার গার্ড'-এর ভূমিকা পালন করছে। তারা নিজেদের ইতিহাস ভুলে গেছে, ভুলে গেছে খালিদ বিন ওয়ালিদ বা সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর বীরত্বগাথা। তারা আজ নিজেদের ভাইদের আর্তনাদ শুনেও বধির হয়ে থাকে, অথচ আমেরিকা তার একজন পাইলটের জন্য বিশ্বকে কাঁপিয়ে দেয়।
ইরানের সেই পাহাড়ি অঞ্চলে Delta Force-এর বিমানে আগুন দেওয়া আর সেই বৈমানিককে নিয়ে ডানা মেলা প্রমাণ করে যে—জাতি হিসেবে তারা তাদের 'সদস্য'কে সম্মান করতে জানে। আর আমরা জাতি হিসেবে আমাদের 'ভাই'কে বিক্রি করতে জানি।
হে উম্মাহ! যতক্ষণ না আমরা আমাদের সোনালি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেব এবং নিজেদের জান-মালের মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হবো, ততক্ষণ লাঞ্ছনা আমাদের ছায়ার মতোই অনুসরণ করবে।
Copied from Kaiser Ahmed