03/10/2026
স্টেম সেল (Stem Cell) নিয়ে আমরা প্রায়ই শুনি। কেউ বলেন এটি ভবিষ্যতের চিকিৎসা-বিজ্ঞানের বড় সম্ভাবনা, আবার কোথাও এর নামে নানা ধরনের চিকিৎসার প্রচারও দেখা যায়।
কিন্তু আসলে স্টেম সেল কি? কোথা হতে আসে? কীভাবে কাজ করে? কোন রোগে এর ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত? আর কোথায় এখনো গবেষণা চলছে?
চলুন সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক। 👇
স্টেম সেল (Stem Cell) বা কোষের কাঁচামাল হলো মানবদেহের এমন কিছু অনন্য এবং বিশেষ কোষ, যা থেকে শরীরের অন্যান্য সমস্ত নির্দিষ্ট কার্যকারী কোষ তৈরি হয়।
সহজ কথায়, আমাদের শরীরের চামড়া, রক্ত, হাড় বা ব্রেইনের কোষগুলো নির্দিষ্ট কাজ করতে পারলেও নতুন কোনো কোষ তৈরি করতে পারে না। কিন্তু স্টেম সেল হলো এক ধরনের "মাস্টার সেল" বা আদি কোষ। এর প্রধান দুটি বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে:
১. স্ব-নবায়ন (Self-renewal): বিভাজনের মাধ্যমে নিজের অবিকল প্রতিলিপি বা নতুন স্টেম সেল তৈরি করা।
২. রূপান্তর ক্ষমতা (Differentiation): শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তকণিকা, পেশিকোষ, হৃদকোষ কিংবা মস্তিষ্কের কোষে রূপান্তরিত হওয়া।
স্টেম সেলের প্রকারভেদ,
উৎস এবং কার্যক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে স্টেম সেলকে প্রধানত চার ভাগে ভাগ করা হয়:
ক।
ভ্রূণীয় স্টেম সেল (Embryonic Stem Cells):
৩ থেকে ৫ দিনের ভ্রূণ (Blastocyst) থেকে এই কোষ সংগ্রহ করা হয়। এই কোষগুলোর শরীরে যেকোনো ধরণের কোষে রূপান্তরিত হওয়ার এক অসাধারণ ক্ষমতা থাকে।
খ।
প্রাপ্তবয়স্ক বা অ্যাডাল্ট স্টেম সেল (Adult Stem Cells):
এগুলো পূর্ণাঙ্গ মানুষের বিভিন্ন টিস্যুতে (যেমন: অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারো এবং চর্বি) খুব অল্প পরিমাণে থাকে। এরা সাধারণত যে টিস্যুতে থাকে, কেবল সেই টিস্যুর কোষই তৈরি করতে পারে। যেমন: বোন ম্যারোর স্টেম সেল থেকে রক্তকণিকা তৈরি হয়।
গ।
আইপিএস সেল (Induced Pluripotent Stem Cells - iPSCs):
বিজ্ঞানী ও গবেষকরা ল্যাবরেটরিতে সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক কোষকে (যেমন ত্বকের কোষ) জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে ভ্রূণীয় স্টেম সেলের মতো শক্তিশালী কোষে রূপান্তর করেন।
ঘ।
পেরিনেটাল স্টেম সেল (Perinatal Stem Cells):
সন্তান জন্মের সময় গর্ভফুল (Placenta) এবং নাড়ির রক্ত (Umbilical Cord Blood) থেকে এই কোষ সংগ্রহ করা হয়। এই কোষগুলোও বিভিন্ন ধরণের কোষে রূপান্তর হতে পারে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্টেম সেলের ব্যবহার ও গুরুত্বঃ
স্টেম সেল নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বর্তমানে ব্যাপক গবেষণা চলছে, যাকে বলা হয় রিসেন্ট থেরাপি বা রিজেনারেটিভ মেডিসিন (Regenerative Medicine)। এর মূল ব্যবহারগুলো নিচে দেওয়া হলো:
অঙ্গ ও টিস্যু পুনর্গঠনঃ
আগুনে পুড়ে যাওয়া রোগীর ত্বক নতুন করে তৈরি করতে বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষতিগ্রস্ত হার্টের পেশি পুনর্গঠনে স্টেম সেল ব্যবহার করা হচ্ছে।
গুরুতর রোগের চিকিৎসাঃ
লিউকেমিয়া (রক্তের ক্যান্সার), থ্যালাসেমিয়া এবং লিম্ফোমার মতো রোগে আক্রান্ত রোগীদের বোন ম্যারো বা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের (Bone Marrow Transplant) মাধ্যমে সুস্থ করে তুলতে স্টেম সেল সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনাঃ
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে স্টেম সেলের মাধ্যমে টাইপ-১ ডায়াবেটিস, পার্কিনসন্স, অ্যালঝাইমার্স, এবং মেরুদণ্ডের আঘাতজনিত (Spinal Cord Injury) প্যারালাইসিসের মতো জটিল রোগ পুরোপুরি নিরাময় করা সম্ভব হবে।
বিতর্ক ও নৈতিকতাঃ
ভ্রূণীয় স্টেম সেল (Embryonic Stem Cells) গবেষণার জন্য গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে নিষিক্ত ভ্রূণ ধ্বংস করতে হয়। এ কারণে এটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র নৈতিক ও ধর্মীয় বিতর্ক রয়েছে। তবে বর্তমানে ল্যাবরেটরিতে তৈরি আইপিএস সেল (iPSCs) এবং নাড়ির রক্ত থেকে নেওয়া স্টেম সেলের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে এই বিতর্ক অনেকটাই কমে আসছে।