29/09/2022
part [২]
#জয়ন্ত_কুমার_জয়
নিচে দেখলো অনুভবের সারা শরীর মানুষের মতো,কিন্তু মাথার যায়গায় একটা হিংস্র পশুর মাথা।পশুরা যেমন দারিয়ে থাকে ঠিক তেমনি ভাবে হাত,পা মাটিতে স্পর্শ করে দারিয়ে আছে অনুভব।হাতের নখ গুলি চকচক করছে।
এই দৃশ্য দেখে অহনা নিজেকে সামলাতে পারলো না।প্রকট একটা চিৎকার করে ওখানেই জ্ঞান হারিয়ে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ে।এরপর আর কিছু মনে নেই।
জানালা অতিক্রম করে সূর্যের আলো অহনার ঘুমন্ত মুখের ওপর পড়ছে।অনুভব বিছানায় উবু হয়ে বসে অহনার পানে একপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। অহনা টিপটিপ করে চোখ মেলতেই দেখলো অনুভব উবু হয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।অহনা কিছুটা ভয় পেয়ে গেলো।হঠাৎ মনে পড়লো কাল রাতের সেই ভয়ংকর দৃশ্যটার কথা।
আঁতকে উঠে বিছানা থেকে উঠে বসলো।কাঁপা কাঁপা স্বরে বললো
" আ..আ..আপনি মানুষ না, আপনি মানুষ না "
" কিসব বলছো তুমি অহনা? মানুষ না মানে? "
" হ্যা,আপনি মানুষ না,আমি নিজ চোক্ষে দেখেছি আপনি একটা পশুতে পরিণত হচ্ছিলেন"
বলেই বিছানা থেকে নেমে দেয়ালের কোনে চলে গেলো অহনা।ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বললো
" আমার কাছে আসবেন না,আমি বাড়িতে যাবো।কাছে আসবেন না আমার "
" অহনা শান্ত হও,তুমি ভুল দেখেছো, কোথাও ভুল হচ্ছে, আমার কথাটা শুনো? "বলতে বলতে অহনার কাছে এগুতেই অহনা আশেপাশে থাকাতে লাগলো,পাশের টেবিলেই ফল রাখার একটা ছুড়ি নজরে পড়লে।ছুড়িটা হাতে নিয়ে নিজের গলায় স্পর্শ করে বললো
" আমার কাছে আসবেন না,আসলে কিন্তু আমি নিজেকে শেষ করে দিবো,একদম কাছে আসবেন না "
" অহনা কি করছো তুমি? পাগল হয়ে গেছো নাকি? ছুড়িটা রাখো,গলায় লেগে যাবে "
হঠাৎ অহনা লক্ষ্য করলো সে হাত নড়াতে পারছে না।এতো চেষ্টা করেও শুধু হাত নয়!সারা শরীর ও এখন নড়াতে পারছে না।যেনো পাথরের মূর্তিতে রুপান্তর হয়ে গেছে।
অহনা দেখলো অনুভব একদম ওর কাছে এসেছে। অহনা ভয়ে ঠোক গিলছে।অনুভব অহনার একদম কাছে এসে শান্ত স্বরে বললো
" অহনা, আমার চোখের দিকে তাকাও "
অহনা দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে রইলো।অনুভব গম্ভীর স্বরে কিছুটা ধমক দিয়ে বললো, " অহনা আমার চোখের দিকে তাকাও, চোখ খোলো অহনা "। এরুপ গম্ভীর ভয়ংকর স্বর অহনা এর আগে কখনো শোনেনি।বুকটা কেমন যেন ছ্যাত করে উঠলো।পিটপিট করে অহনা চোখ মেললো।
চোখ মেলতেই অনুভবের গাঢ হলুদ বর্ণের রেটিনায় চোখ পড়লো অহনার।অহনা চোখ ফেরাতে পারছে না।অনুভবের চোখের গাঢ় হলুদ রং যেনো পাল্টে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর অনুভব অহনার কপালে একটা চুমু একেঁ দিয়ে বিছানায় এসে বসলো।অহনা নিজের হাতে ছুড়িটা দেখে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো
" আমার হাতে ছুড়ি কেন? "
" আমি ফল খেতে চেয়েছিলাম, সেটাই কাটার জন্য ছুড়ি হাতে নিয়েছো " অনুভব নিজের হাত চেপে ধরে বললো।
আসলে অনুভব অহনার এতোটাই কাছে গিয়েছিলো যে অহনার হাতে থাকা ছুড়িতে ওর হাত কেটে যাচ্ছে সেদিকে অনুভবের কোনো খেয়ালই ছিলো না।
" আপনার হাতে কি হয়েছে? দেখি? " বলে ছুড়িটা টেবিলেই রেখে অনুভবের কাছে এসে বসলো অহনা।
অনুভবের হাতটা সরাতেই দেখলো অনেকটা যায়গা কেটে গেছে।অহনা ব্যাস্ত হয়ে সেখানে ব্যান্ডেস করে দিলো।কাল রাতের অনুভবের সেই ভয়ংকর রুপের কথা অহনার আর কিচ্ছু মনে নেই।অনুভবের সেই দৃষ্টিতে অহনার কিছু অতীত মুছে ফেলা হয়েছে।অনুভব মৃদু হেসে মনে মনে বললো
" তুমি আমায় মায়ায় আটকে গেছো অহনা,তোমায় পেতে যা যা করতে হয় আমি করবো"।
অহনা লক্ষ্য করলো এ বাড়িতে আসার পর থেকেই তার খিদে ভাবটা একদম যেন উবে গেছে।মনে হয় পৃথিবীতে খিদে বলতে আদৌও কিছু ছিলো না।এমনটা কেনো হচ্ছে অহনা বুঝতে পারলো না।
মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে দারালো।আসার পর থেকে এই জানালা খোলা হয়নি।অহনা একটা বিষয় লক্ষ্য করলো।ঘরে ৩টা বড় বড় জানালা,কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো কোনো জানালাই খোলা নেই,কিন্তু ঘরে আলো ঘলমল করছে।কিভাবে সম্ভব এটা?এই আলো তো কৃত্রিম আলো না? তাহলে জানালা বন্ধ অবস্থায় এতো আলো ঘরে প্রবেশ করছে কিভাবে?।
এসব ভাবতে ভাবতে অহনার চোখ পড়লো জানালার পাশেই নিচের ফ্লোরে পড়ে থাকা নীল বর্ণের তরলের ওপর।কৌতুহল বশবর্তী হয়ে কাছে যেতেই দেখলো ফ্লোরে ফোঁটায় ফোঁটায় জমে আছে।দেখতে রক্তের মতোই লাগছে।কিন্তু রক্তের বর্ণ তো লাল।ফ্লোর থেকে উঠে টেবিলে রাখা ফল কাটার ছুড়িটায় তাকাতেই অহনা একটু ভয় পেয়ে গেলো।ছুড়িটা হাতে নিয়ে দেখলো ছুড়ির শেষ প্রান্তেও নীল বর্ণের সেই তরলগুলি ভরে আছে।কি এগুলা? এভাবে ছুড়িতে আবার মেঝেতেও পড়ে আছে?।নিজেকেই প্রশ্ন করলো অহনা।
পেছন থেকে অনুভবের ডাকে ফ্লোর থেকে উঠে পেছন ফিরলো অহনা।
" ফ্লোরে বসে বসে কি দেখছো হুম ?
" তেমন কিছু না,এই দেখুন এই ছুড়িটায় নীল নীল কি যেন ভরে আছে,আর ফ্লোরেও ছিটেফোঁটা লেগে আছে " অনুভবের দিকে ছুড়িটা এগিয়ে দিয়ে অহনা বললো।অনুভব মৃদু হেসে বললো
" ছুড়িতে তো কিছুই নেই?"
"আরে দেখতে পাচ্ছেন না, এই তো এখানেই " ছুড়িটার শেষ প্রান্তে হাতের ইঙ্গিতে দেখিয়ে দিতেই অহনা লক্ষ্য করলো সত্যি সত্যিই কিচ্ছু নেই।তৎক্ষনাৎ ফ্লোরে তাকাতেই দেখলো সেখানেও সেই নীল বর্ণের ছিটেফোঁটাগুলি হাওয়া হয়ে গেছে।অহনা হতভম্ব হয়ে বললো
" বিশ্বাস করুন,একটু আগেই ছিলো,আমি নিজ চোখে দেখেছি।রক্তের মতো নীল বর্ণের তরল এই ছুড়িটায় লেগে ছিলো।আর ফ্লোরেও পড়ে ছিলো।এখন দেখতে পাচ্ছি না কেন? এখনি তো দেখলাম "
" তোমার মনের ভুল হচ্ছে অহনা, "
" এতোবড় ভুল কিভাবে আমার হতে পারে? কিছুতো একটা সমস্যা আছেই "
" হাহাহা,,কোনে সমস্যা নেই অহনা,তুমি নেহাতই ভুল দেখেছো।এখানে নীল তরল পদার্থ আসবে কিভাবে? আর আসলে তো সেটা অদৃশ্য হয়ে যাবে না তাই না?
" হু।কিন্তু.."
" আর কোনো কিন্তু নয়।ঘুরতে যাবে? " অহনার কথা থামিয়ে দিয়ে অনুভব বললো।
" কোথায়? " উৎসুক কন্ঠে বললো অহনা।
" কাল আসার পর থেকে তো বাইরেই যাওয়া হয় নি।তাই ভাবলাম তোমায় নিয়ে একটু ঘুরতে যাবো,তেমন কোথাও না,পাশেই একটা সমুদ্র আছে।সেখানে প্রবাহমান ঝরনাও বইছে। "
" হু যাবো।আপনি শুধু দুই মিনিট সময় দিন আমি এক্ষুনি চেঞ্জ করে আসছি।"
আনন্দিত হয়ে অহনা একটা আকাশে রঙ্গের শাড়ি বেড় করলো আলমারি থেকে।কি আশ্চর্য, আলমারিতে শাড়িটা সাধারণ মনে হলেও বেড় করতেই অহনার চোখ চকচক করে উঠলো।শাড়িটা অনেক সুন্দর। একই ঘটনা কাল রাতেও ঘটেছে।অহনার মনে রহস্যর বেড়াজাল যেনো বেঁধেই যাচ্ছে। এখন ওসব বাদ দিয়ে অহনা শাড়িটা পড়ে আয়নায় নিজেকে সুন্দর করে সাজালো।
অনুভব বিছানায় বসে বসে অহনার সাজ দেখছে।অহনা সাজছে,খোলা চুলগুলি বেশির ভাগ ঘাড়ের দিকে সরে গিয়ে অহনার সাদা ধবধবে পিঠ অনুভবের নজরে এলো।অনুভব উঠে গিয়ে অহনাকে পেছন থেকে জরিয় ধরে ঘাড়ে নাক ডুবালো।অহনার সিল্কি চুলের ঘ্রাণ মাতাল করে তুলছে অনুভবকে।
অহনা চমকে উঠলো। মনে হলো বরফে ঢাকা কেউ একজন তাকে স্পর্শ করছে।আয়নার সামন থেকে সরে দারালো।পেছন ঘুরতেই দেখলো অনুভব।সাথে সাথেই অনুভবকে স্পর্শ করে কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লো অহনা।অনুভবের শরীর তো স্বাভাবিক ই আছে।তাহলে প্রথমে এতো ঠান্ডা অনুভব হলো কেন?।
অনুভব জিগ্যেস করলো " কি হলো অহনা? "
অহনা মুচকি হেসে বললো " না কিছু না।চলুন আমি রেডি "৷ কিন্তু মনে মনে অহনার অজানা আতঙ্ক ঠিকই বাড়তে লাগলো।
বাড়ি থেকে বেড় হতেই অহনার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো।এ আমি কি দেখছি? কিভাবে সম্ভব এটা? এটাতো পৃথিবী নয়, অনুভবের দিকে তাকাতেই সারা শরীর শিউরে উঠলো।
চলবে?