02/09/2025
খুচরো টাকাগুলো গুনে সামনে তাকিয়ে বলে ‘এখানে তো তিনশো টাকা, এক হাজার টাকা দিতে হবে।’
বাবা মেয়ে দুজনেই মুখের দিকে তাকায় তারপর আবার জাবেদের দিকে তাকায়। জাবেদ বলে, কি হলো আরো সাতশো টাকা দেন।
‘আর নেই স্যার। এই দেখেন দুইশো টাকা আছে। একশো টাকা দিয়ে দুপুরে ভাত খাবো। আর একশো টাকা দিয়ে বাড়িতে যাবো।’
জাবেদ বিরক্ত হয়। লোকটার দিকে তাকিয়ে বলে, টাকা নাই এখানে আসছেন কেনো? সরকারি হাসাপাতালে যাননি কেন?
লোকটা কোনো কথা বলে না, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। মনে হয় তার কোনো কথা নেই।
তখনই বেল বেজে উঠে। দরজা খুলে স্যারের কাছে যায়। ডাক্তার মাসুদ হকের সহকারী হিসেবে জাবেদ আছে। মাসুদ হক বলেন, লোক কি আর নেই? পাঠাচ্ছো না কেন?
জাবেদ বলে, স্যার একটা ঝামেলা হয়েছে। এক লোক এসেছে তার মেয়েকে নিয়ে, টাকা দিয়েছে তিনশো। কি এক অবস্থা বলুন, এরা যে কেন সরকারি হাসাপাতালে যায় না।
মাসুদ হক বলে, কি আর করবা ভিতরে পাঠিয়ে দাও।
জাবেদ এসে বলে, আপনারা ভিতরে যেতে পারেন। ছাতা সামনে রেখে যান।
লোকটা ছাতা সামনে রেখে মেয়েকে নিয়ে দরজা ঠেলে ভিতরে যায়।
পারু বাবার পাশেই একটা চেয়ারে বসে, সামনে বড় ডাক্তার বসে আছে। পারু এমনিতে অনেক দুষ্টু, তবে এখানে চুপচাপ বসে আছে। বাবা একে একে পারুর রোগের কথা ডাক্তারের কাছে বলছে, পারু একবার বাবাকে দেখছে আরেকবার ডাক্তার সাহেবকে দেখছে।
ডাক্তার চেয়ার থেকে উঠে এসে পারুর, জিভ দেখে, জিজ্ঞেস করে কেমন সমস্যা হয়। পারু সেসব বলে।
মাসুদ হক কাগজে লিখে দেয় দুটো টেস্টের কথা। পারুর হাত ধরে বাবা চেয়ার থেকে তুলে।
তখনই পারু হাতে রাখা কেকটা ডাক্তার সাহবের টেবিলের উপর রাখে। পারু বলে, এটা আপনার জন্যে। মাসুদ হক বলে, আমি খাবো না তুমি খাও।
পারু বলে, না আপনার ওই লোক বাবার সাথে টাকার জন্যে রাগ করে কথা বলেছে তাই আমি আমার কেক আপনাকে দিয়ে গেলাম।
মাসুদ হকের টেবিলের উপরেই হাতের কেক রেখে পারু বাবার সাথে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।
মাসুদ হক কেকের দিকে তাকিয়ে আছে, এর ভিতরেই জাবেদ ঘরের ভিতরে আসে।
স্যার একমনে টেবিলের উপর রাখা কেকের দিকে তাকিয়ে আছে। জাবেদ বলে, স্যার পেশেন্ট পাঠাবো?
মাসুদ হক বলে আপাতত কিছুসময় ব্রেক নিবো জাবেদ।
জাবেদ বলে, স্যার আপনার কি শরীর খারাপ? চা কফি দিতে বলবো?
মাসুদ হক কোনো উত্তর দেয় না। জাবেদকে ইশারা দিয়ে বসতে বলে। মিনিট দুই চোখ বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকে। চোখ বন্ধ রেখেই বলে জাবেদ বুঝলা আমরা ছিলাম আট ভাই বোন। বুঝো একটা লোকের আট ছেলেমেয়ে যে কিনা ছিলো সরকারি একটা অফিসের চার হাজার টাকা বেতনের কর্মচারী।
সেই টাকায় বাবা আমাদের সব ভাই বোনকে পড়াশোনা করিয়েছে, আমরা সব ভাই বোনরা শিক্ষিত, সাতজনই সরকারি চাকরি করে আর একজন দেশের বাইরে আছেন। একটা কেক চার ভাই বোন ভাগ করে খেয়েছি এমন দিন গেছে৷
তখন মেডিকেলে পড়ি, থাকতাম এক দুঃসম্পর্কের মামার বাসায় লজিং মাস্টার হিসেবে। তার দুই ছেলেমেয়েকে পড়াতাম, দুই বেলা খাবারের বিনিময়ে। প্রায়দিন দুপুরে ক্লাস থাকতো তাই খাবার খেতে বাসায় যেতে পারতাম না, এদিকে ক্যান্টিনে খাবারের মতো পয়সা আমার ছিলো না। ক্যাম্পাসের সামনের দোকান থেকে একটা পাঁচ টাকার কেক খেয়ে সেইসব দুপুর কাটিয়ে দিয়েছি, ইচ্ছে করতো কেকের সাথে একটা কলা খাই তবে সে টাকাও ছিলো না।
আমাার মেয়ের জন্মদিন গেলো গত সপ্তাহে, ওর মা মেয়ের জন্যে সবচেয়ে দামী কেক কিনলো। মেয়ের বান্ধবীরা আসলো৷ অথচ আমাদের কোনোদিন জন্মদিন কখনো পালনই করা হয়নি।
মাসুদ হকের চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। টেবিলের উপর রাখা কেকটা হাতে নিয়ে দেখে। পারুর বাবা মেয়েকে শখ করে কেক কিনে দিয়েছে, তুমি ওর বাবার সাথে রাগ করে কথা বলেছে তাই দাম চুকিয়ে দিয়ে গেলো সেই কেক দিয়ে। বাবার অসম্মান কেউ সহ্য করতে পারে না বুঝলা।
জাবেদ চুপচাপ নিচু হয়ে তাকিয়ে আছে। স্যারের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে চোখে টলমল করছে পানি। একটা কেক হাতে নিয়ে তাকিয়ে আছে।
মাসুদ হক কেকে কামড় বসায়, চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরে। এমনভাবে কেউ কখনো পাওনা চুকিয়ে দেয়নি।
মাসুদ হক বলে, যাও দেখো ওরা কই আছে। হয়তো আশেপাশে আছে। টেস্ট করানোর মতো টাকাও মনে হয় নেই। তুমি ওদের টেস্ট করানোর ব্যবস্থা করো, বলবে আমার কথা আমি বিল দিবো। আর দুজনকে কোনো একটা ভালো হোটেলে খাবার খাওয়াবে, মেয়েটাকে ভালো দেখে একটা কেক কিনে দিবে। এখনি যাও বসে থাকবে না।
জাবেদ উঠে যায়, মাসুদ হক ডেকে বলে টাকা নিবে কে? টাকা নিয়ে যাও। মাসুদ হক মানিব্যাগ থেকে বের করে জাবেদের হাতে টাকা দেয়।
জাবেদ সামনে অন্য একজনকে বসিয়ে রেখে বাবা মেয়েকে খুঁজতে শুরু করে। সিঁড়ির পাশেই তাদের দেখতে পায়। জাবেদ বলে, দেখি স্যার কি টেস্ট দিছে। কাগজটা হাতে নিয়ে বলে চলুন আমার সাথে।
জাবেদের পিছনে পিছনে বাবা মেয়ে দুজনে আসে। টেস্টের বিল মাসুদ স্যার দিবে কাউন্টারে বলে দেয়।
পারুকে নিয়ে টেস্ট করায়। রিপোর্ট দিবে ঘন্টাখানেক পরে। এর ভিতরে জাবেদ দুজনকে নিয়ে নিচেই একটা ভাতের হোটেলে যায়, সেখানে সবচেয়ে ভালো খাবার দিয়ে ভাত দিতে বলে। পাশের দোকান থেকেই একটা বড় দেখে কেক কিনে পারুর হাতে দেয়।
পারু এবং পারুর বাবা দুজনেই কিছু বুঝে উঠতে পারে না। জাবেদ লোকটার হাত ধরে বলে, ভাই ওইখানে বসে আপনার সাথে এমন খারাপ আচরণ করা ঠিক হয়নি, কিছু মনে নিয়েন না। পারুর মাথায় হাত রেখে বলে, মা রাগ কইরো না, এই যে তোমার জন্যে সবচেয়ে দামী কেক নিয়ে এসেছি অর্ধেকটা এখন খাবে বাকি অর্ধেকটা বাড়িতে যেয়ে ঠিক আছে। এবার হাসো? পারু লোকটার কথায় হাসে।
ঘন্টাখানেক পরেই পারু আর তার বাবা আসে টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে। মাসুদ হক বলে, পারু তোমার কেকটা অনেক মজা ছিলো। ছোটোবেলায় আমার বাবাও কিনে দিতো। আমার কিনে দেওয়া কেক পেয়েছো? পারুর বাবা হেসে বলে, জ্বি স্যার পাইছি। মাসুদ হক বলে, পারু তুমি কি হাসো না? মাসুদ হক তার ড্রয়ার থেকে কলম আর ডাইরি বের করে পারুর হাতে দেয়। পারুকে একটা হাসির গল্প শুনায়। পারু এবার হাসে।
একটা কেক
-মুস্তাকিম বিল্লাহ