01/11/2021
'শুনলাম মঙ্গল গ্রহে নাকি হিজাব পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জানো কিছু?'
ইউরেনাস গ্রহের এক কোনের এই সস্তা চায়ের দোকানটিতে সবাই নড়েচড়ে বসলো। এ দোকানে প্রতি সন্ধ্যায় আড্ডা বসে। ইউরেনাসের নামকরা লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, কলামিস্ট, বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে অনলাইন সেলিব্রৃটি পর্যন্ত ভিড় করে। জমিয়ে আড্ডা দেয়। তুমুল তর্ক হয়। রাত বাড়লে সবাই যার যার গন্তব্যে চলে যায়।
আজ কে যেন মঙ্গল গ্রহের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে কথা তোলায় আড্ডাটা জমে উঠল। বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী মিস্টার এসকে বলল: এগুলো ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি। কেউ যদি নিজে থেকে হিজাব পড়তে না চায়, কেন তাকে বাধ্য করা হবে? এই অধিকার কে দিয়েছে?
পাশ থেকে কবি তনা চিৎকার করে বলে উঠল: চৈত্রের দাবদাহে একটা মেয়ে কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে প্রচণ্ড গরমে হাসফাঁস করবে, এটা শুনেই তো আমার গা ঘিনঘিন করছে! এটা মধ্যযুগীয় বর্বরতা, নারীত্বের চূড়ান্ত অপমান।
গোঁফে তা দিতে দিতে বিজ্ঞানী মি. জাই বলল: এটা শুনে আমি ভীষন কষ্ট পেয়েছি। আমার ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে গেছে। যে মেয়েটা খোলা চুলে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে ফুটপাতে হেঁটে যাওয়ার কথা, সে কিনা একটা কাপড়ের পোঁটলার মত জবুথবু হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে!
বিশিষ্ট সম্পাদক নাইখা সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল: সংখ্যালঘুদেরও বাধ্য করা হবে? কেন? তাদের ধর্মে তো হিজাবের কথা বলা নেই। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কেন পড়বে?
মানবাধিকার কর্মী সুকা আপাও সায় দিয়ে মাথা নাড়তে নাড়তে বলল: হুম, এটা উচিৎ নয়। ধর্ষন কি শুধু পোষাকের জন্য হয়? হিজাব পড়া মেয়েরা কি ধর্ষিতা হচ্ছে না? এটা আসলে নারীকে দাসত্বের নিগড়ে বন্দি করার একটা সূক্ষ্ম কৌশল।
নব্য সেলিব্রৃটি সাবির মাথায় হাত দিয়ে ব্যথাতুর কন্ঠে বলল: ভয় হয়। খুব ভয় হয়।
এতক্ষণ চুপ করে সবার কথা শুনছিলাম। ভাবলাম এবার কিছু বলা দরকার। সবাই যখন কিছুক্ষণের জন্য বিরতি দিল, আমি বলা শুরু করলাম: মাস্ক না পড়ায় আজকে নাকি চারজনকে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমান আদালত। অদ্ভুত না!
সবাই আমার দিকে ঘুরে তাকাল। সুকা আপা বলল: কেন? তাতে সমস্যা কী?
আমি বললাম: যারা মাস্ক পড়তে চায় না, তাদেরকে কেন জোর করে পড়াবে? এটা কি ঠিক হচ্ছে?
মিস্টার এসকে বলল: সকল নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মাস্ক না পড়লে স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘিত হয়। তাই বৃহত্তর স্বার্থে সরকারকে কঠোর হতে হচ্ছে। আমরা সবাই রাষ্ট্রের আইন মানতে বাধ্য।
এবার আমি সুযোগ পেয়ে বললাম: ঠিক একইভাবে মঙ্গল গ্রহের বাসিন্দারাও তাদের রাষ্ট্রের আইন মানতে বাধ্য। তাদের সরকার মেয়েদের ইজ্জতের নিরাপত্তার স্বার্থে কঠোর হয়েছে। হিজাব না পড়লে পর্দা লঙ্ঘিত হয়।
সুকা আপা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল: কিন্তু..
তাকে থামায়ে দিয়ে বললাম: মাস্ক পড়লেই কি করোনা থেকে মুক্তি নিশ্চিত? এমন কেউ কি নেই, যে মাস্ক পড়েও করোনা আক্রান্ত হয়েছে?
সুকা আপা আমতা আমতা করে বলল: তা হয়েছে। মাস্ক পড়লে রিস্ক অনেকটা কমে যায়। তবে অন্য কারণে সে আক্রান্ত হতেই পারে। তারপরও মাস্ক দরকার। এতে কিছু রিস্ক তো কমছে।
বললাম: হিজাব পড়লেও নিগৃহীতা হওয়ার রিস্ক কমে যায়, তবে অন্য কারণে সে ধর্ষিতা হতেই পারে। তারপরও হিজাব জরুরী। কারণ এটা ধর্ষনের হার কিছুটা তো কমাচ্ছে।
তারপর তনা'র দিকে ফিরে বললাম: মাস্ক যখন গরমে ঘেমে মুখের সাথে লেপ্টে থাকে, তখন তোমার ঘেন্না লাগে না? শুধু হিজাব নিকাবে এত বিবমিষা কেন?
সে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তাকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে মি. জাই বলল: যা-ই বলো। যে মেয়েটা নিজে হিজাব পছন্দ করে না, যে মুক্ত বাতাসে খোলা চুল উড়িয়ে ছুটে যেতে চায়, এক খন্ড কাপড় দিয়ে তার সুন্দর মুখ খানা বেঁধে ফেলাটা সত্যি নির্মম, নিষ্ঠুর।
আমি এবার কাঁচা-পাকা চুলের এই আধ-বুড়ো কথিত বিজ্ঞানীটার দিকে ফিরে তাকালাম। বললাম: নির্মম, নিষ্ঠুর? আসলে কি তাই? তাহলে যে মানুষটা মাস্ক পড়তে চায় না, মুক্ত বাতাসে প্রান ভরে শ্বাস নিতে চায়, মাস্কের নামে এক খণ্ড কাপড় দিয়ে জোর করে তার মুখ-নাক বেঁধে রাখাটাও কি নির্মম নয়?
মি. জাই বলল: সে তো চাইলেই ছাদে গিয়ে বুক ভরা শ্বাস নিতে পারে, কেউ তাকে সেখানে বাঁধা দিবে না।
আমি সায় দিয়ে বললাম: একদম ঠিক। সে চাইলেই ছাদে গিয়ে মুক্ত বাতাসে খোলা চুল উড়িয়ে ছোটাছুটিও করতে পারে, কেউ তাকে বাঁধা দিতে যাবে না।
নাইখা সাহেব দাঁত কিড়মিড় করে বলল: সব মানলাম। কিন্তু অন্য ধর্মের মানুষকে কেন হিজাব পড়তে বাধ্য করা হবে? এটা কি তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা ক্ষুন্ন করছে না? ইসলাম কি এটা সাপোর্ট করে? এটার কী ব্যাখ্যা দিবে?
আমি দাঁড়িয়ে গেলাম। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কারো কারো চোখে ক্রুর হাসি ঝিলিক দিচ্ছে, যেন মনে মনে বলছে- এইবার আটকে গেলা বাছাধন।
আমি ব্যাগটা কাঁধে গোটাতে গোটাতে বললাম: সুস্থ মানুষকে কেন মাস্ক পড়তে বাধ্য করা হয়- এটা আমারে বোঝাও। শুধু অসুস্থ মানুষ পড়লেই তো হত।
আমার প্রশ্নে নাইখা সাহেব যেন বেশ মজা পেল, হা হা করে হেসে উঠল। বলল: এ কি বোকার মত কথা! ব্যস্ত রাস্তায় সুস্থ অসুস্থ আইডেন্টিফাই করা কি সম্ভব? তাছাড়া সুরক্ষার জন্য মাস্ক তো সবারই পরিধান করা জরুরি। এটাও জানো না?
আমি বললাম: হ্যাঁ জানি। ব্যস্ত রাস্তায় ধর্ম আইডেন্টিফাই করাও কঠিন। আর দৃষ্টির সুরক্ষার জন্য হিজাবও সকলের পরিধান করা জরুরি, হোক সে মুসলিম কি অমুসলিম। আর ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলছ! কোন ধর্মে হিজাব না পড়তে বলা আছে- পারলে দেখাইও সম্পাদক সাহেব।
এই বলে আমি ইউরেনাসের ছোট্ট চায়ের দোকানটা থেকে বের হয়ে এলাম। সবাই চুপ। কারো মুখে টু শব্দটি নেই।
চলে যাওয়ার আগ মুহূর্তে দরজায় উঁকি দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে সাবিরের উদ্দেশ্যে বললাম: আইনের কথা শুনলে তো চোর ডাকাতেরা ভয় পাবে বাছা। তোমার এত ভয় কীসের?
তারপর তার উত্তরের অপেক্ষা না করে হনহন করে বেরিয়ে আসলাম। রাত বেড়েছে। বাড়ি ফিরতে হবে। সবাই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে আমার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
#ইউরেনাসের_আড্ডা
পর্ব-০১: শর'ঈ আইন
লেখকঃ আল সাকিফ🌿