29/11/2024
তুমি সিঙ্গেল প্যারেন্ট?
হ্যাঁ তোমাকে বলছি,তুমি সিঙ্গেল প্যারেন্ট! যখন তুমি সিঙ্গেল প্যারেন্ট, তখন তুমি চিন্তায়-ভাবনায়-গতিতে-স্থিরতায় সবেতেই সিঙ্গেল। এটা মেনে নিয়ে তোমাকে রাস্তা পরিমাপ করতে হবে তোমার সন্তান নিয়ে। আমাদের সমাজে যখন কোনো পুরুষ স্ত্রী-হারা হোন, তখন তার পাশে হাজারটা সাহায্যের হাত জুটে। বাবা,মা,শ্বশুর,শাশুড়ি,ভাই,বোনসহ অনেক অনেক হাত পাশে থাকে সহযোগিতার জন্য,এমনকি পাশের বাসার খালাম্মা, ভাবিরাও ভীষণভাবে সহযোগিতার চেষ্টায় থাকেন।
"ও একা মানুষ,বাচ্চাটা কীভাবে পালবে! চাকরি করবে নাকি বাচ্চার স্কুল সামলাবে!"
" বেচারা নিজে খাবে নাকি বাচ্চাকে খাওয়াবে!!"
" কী যে কষ্ট হচ্ছে ছেলেটার,থাক্ বাচ্চাটাকে আমরাই রাখি।"
"ছেলে মানুষ, এসব কাজ করেছে নাকি কখনো? কেমন করে করবে? ইস্!"
"আহারে! পুরুষ মানুষ, বউ ছাড়া থাকবে কেমনে!"
যেন পুরুষ মানুষরা এতই অ-বলা,নিজের খেয়াল নিজে রাখতেই পারে না। রান্নাবান্নার বিষয়টা যেন ধর্মগ্রন্থে লিখিত যে পুরুষরা করতে পারেই না,এমন একটা বিষয়!
আর এতই অবুঝ তারা, তাদের দেখাশুনা করতেই বউ দরকার। কেবল সংসার সামলানো ছাড়া বাদবাকি সব আবার তাদের কার্যতালিকায় ঠিকঠাক থাকতে পারে। বড়োই অদ্ভুত!
কিন্তু সেই একই পরিস্থিতিতে একজন নারী এসে দাঁড়ালে তার পাশে সাহায্যের হাত থাকে না। তবে যা থাকে ,তা হলো হাজারটা মুখ এবং তার থেকে নিক্ষেপ হওয়া কথার বান।
" মা হইসে,বাচ্চার দিকে খেয়াল নাই। সারাদিন ধেইধেই করে বেড়ায়।"
"টাকা পয়সা কামালেই হবে, বাচ্চার দিকে নজর দিতে হবে না?"
" চাকরি করতে করতে তো বাচ্চার খাওয়া-দাওয়া, যত্নআত্তি সব শেষ। এগুলারে মা বলে!"
" বাচ্চা নাকি এভাবে বড়ো করে! কাজের লোকের হাতে, আরও কত কী দেখতে হবে!"
"একা মহিলা,বাচ্চা আছে,বাচ্চার দিকেই না নজর দিবে!সারাদিন রং-ঢং করে বেড়ায়,চৌদ্দ বেটার সাথে বন্ধুত্ব।হুহ্!"
বিশ্বাস করো, যারা এসব কথা বলে তাদের কেউ তোমার পাশে এসে দাঁড়াবে না তোমার প্রয়োজনে। বাচ্চাকে একবেলা কেউ রাখবে না,বাচ্চা নিয়ে বিপদে পড়লে কেউ সাহায্য করবে না।তবে হ্যাঁ, কথা শোনাবে বটে! তৈরি থাকো, তোমাকে কথা শুনতেই হবে, দোষ করলেও শুনবে,না করলেও শুনবে।
সিঙ্গেল মায়েদের অনেক দোষ, বিচারক হলো জনগণ। এই জনগণ যে এত কথা বলে,তোমার চাকরি নিয়ে খোঁটা দেয় কথায় কথায়, তাদের কেউ তোমার সংসারে তেল-নুন-চালের খবর রাখবে না। তোমার বাচ্চা কী খাচ্ছে তা জানার প্রয়োজনবোধ করবে না। তোমাকে কেন অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয় সেটা একবারও ভেবে দেখবে না।
তারা কালেভাদ্রে তোমার বাচ্চাকে গিফট দেবে,হ্যাঁ দেবে তো! অসহায়ত্বের উপহার --ইদে তোমার বাচ্চাকে কাপড়চোপড় দেবে, জন্মদিনটা মনে থাকলে উপহার পাঠাবে। ব্যস দায়িত্ব শেষ,এর বদলে গুরু দায়িত্ব তারা নিজেরাই নিয়ে নিবে তোমাকে উপদেশ দেওয়ার।
শুনছ মেয়ে? তোমাকে এসবের মাঝেই টিকে থাকতে হবে,তোমার সন্তান জগতের সব আনন্দ পাবে না, এটা মেনে নিয়েই চলতে হবে।
তুমি আজই তোমার গতিপথ মাপো,কতটুকু তুমি একা করতে পারবে,কতটুকু পারবে না তা জেনে নাও। নিজেকে বারবার জিগ্যেস করো।তোমাকে তোমার সময় যোগ্য উত্তর দেবে,সে হিসেবে তুমি তোমার রাস্তা তৈরি করো,আজই।
অন্য কারো উপর ভরসা করবে না,একদম না। ভরসা করলে উপদেশ শুনতে হবে,তোমার সে উপদেশের প্রয়োজন আছে কি না ভেবে দেখো! থাকলে শুনো,না থাকলে নিজের এবং সন্তানের দায়িত্ব নিজে পালন করো।
মনে রেখো,তোমার গায়ে জ্বর থাকুক আর ক্যান্সার, তোমার সন্তানের ব্যাপারে যারা ভীষণ সচেতন তারা এসে বলবে না যে
"তোমার বাচ্চাগুলোকে স্কুল থেকে নিয়ে আসার দায়িত্ব আমার।
আর্ট ক্লাসে না হয় আমিই দিয়ে আসব, আবৃত্তি ক্লাসে আমি নামিয়ে দিয়ে আসব। ক্যারাটে ক্লাসটায় আমি বসব,ভেবো না।
তার স্কুলের বেতনটা ব্যাংকের লাইন ধরে আমি দিয়ে দেবো,তুমি টেনশন নিও না।"
"আজকের দিনটা একটু রেস্ট করো,শরীরটা তো ভালো না। বাচ্চাদের আমি দেখছি। তুমি চোখ বন্ধ করে শোও কিছুক্ষণ।"
--- বলবে না কেউ। গ্যারান্টি!
সিঙ্গেল প্যারেন্টিং সহজ বিষয় না,এরচেয়ে বেশি কঠিন সমাজের ছুঁড়ে দেওয়া এসিডের মতো কথা হজম করা।
কিন্তু মেয়ে তুমি পারবে,কারণ তোমাকে পারতে হয়,তোমাকে পারতে হবে।
★★সন্তানের চোখে তুমি সেরা হও,সমাজের চোখে সাধু হতে গেলে মেরুদন্ড জমা দিয়ে আসতে হবে।
সমুদ্র হও মেয়ে তুমি, হাজারো জোয়ার-ভাটা সয়ে টিকে থাকো।
সূর্য হও নারী তুমি, তোমার আলো এতটাই উজ্জ্বল হোক,চারপাশকে কেবল আলোকিত করে তুলো। কিন্তু তোমার দিকে চোখ তুলে তাকাতে যেন কেউ না পারে!
★★ ছবিতে আমি একটা সমুদ্র দেখি, সূর্য দেখি,আলো ঝলমলে দু'টো নক্ষত্র দেখি,জগত দেখি।।
✍️ সাজিয়া আফরিন