29/07/2026
*জীবনে যে পরিস্থিতিই আসুক, মেঘের ভেলার মতো ভেসে বেড়াতে শিখুন।*
কখনো গভীর রাতে, জ্যোৎস্নায় ভেজা আকাশের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকেছেন?
নিস্তব্ধ আকাশের বুকে এক টুকরো মেঘ কতটা শান্ত, কতটা নির্ভার, কতটা নিশ্চিন্ত হয়ে ভেসে বেড়ায়! তার নেই কোনো অস্থিরতা, নেই কোনো অভিযোগ, নেই আগামীকাল নিয়ে কোনো উৎকণ্ঠা। সে নিজের পথ নিজে নির্ধারণ করে না; সে শুধু ভেসে চলে, একমাত্র মহান রবের নির্ধারিত নিয়মে।
হয়তো আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলোর একটি লুকিয়ে আছে এই ছোট্ট দৃশ্যটির মাঝেই।
আমরা কত সহজেই ভেঙে পড়ি! একটি ব্যর্থতা, একটি অপূর্ণতা, একটি প্রত্যাখ্যান, একটি অনিশ্চয়তা, আর মনে হয় যেন জীবন সেখানেই শেষ। অথচ কতবার ভেবে দেখেছি, যে মহান রব কোটি কোটি নক্ষত্রকে তাদের কক্ষপথে পরিচালনা করেন, যিনি প্রতিদিন সূর্যকে উদিত করেন, যিনি মেঘকে ভাসিয়ে নিয়ে যান, যিনি প্রতিটি পাখির রিজিকের দায়িত্ব নিয়েছেন, তিনি কি আমার জীবনটাকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে পারেন না? অবশ্যই পারেন।
হয়তো আজ যে দরজাটি বন্ধ হয়ে গেছে, তার ওপাশে ছিল অকল্যাণ। হয়তো যে স্বপ্নটি পূরণ হলো না, তার বদলে আল্লাহ এমন কিছু লিখে রেখেছেন, যা আজ আমার সীমিত দৃষ্টিতে দেখা সম্ভব নয়। হয়তো আজকের অপেক্ষা, আজকের কান্না, আজকের নীরবতা, সবকিছুই আমাকে আরও পরিণত, আরও বিনয়ী, আরও রবমুখী করে তোলার জন্যই।
আমরা খুব দ্রুত ফলাফল চাই। কিন্তু আমাদের রব আমাদের জন্য ফলাফল নয়, কল্যাণ নির্ধারণ করেন। আর কল্যাণ সব সময় আমাদের ইচ্ছার মতো হয় না; হয় তাঁর অসীম হিকমাহ অনুযায়ী।
তাই জীবনের প্রতিটি অবস্থায় নিজেকে একটি কথাই মনে করিয়ে দিন, "আমার জন্য আমার মহান রবই যথেষ্ট"।
জ্যোৎস্নার আলোও আমাকে একটি বিষয় শেখায়।
চাঁদ নিজের আলো সৃষ্টি করে না; সে শুধু আলো ধারণ করে পৃথিবীকে আলোকিত করে। একজন মুমিনের জীবনও ঠিক তেমনই। সে নিজের অহংকারের আলোয় নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া নূর, ইলম, উত্তম চরিত্র, দয়া, ভালোবাসা ও উপকারী কাজের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে আলো ছড়িয়ে দেয়।
এই পৃথিবী আজ আলোর অভাবে নয়, আলোকিত মানুষের অভাবে অন্ধকার।
আসুন, আমরা এমন মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি, যার উপস্থিতিতে মানুষ স্বস্তি খুঁজে পায়, যার কথায় মানুষ আশার আলো দেখে, যার আচরণ আমাদের আল্লাহ রব্বুল আলামিনের অপার অনুগ্রহকেই আরও বেশি স্মরণ করিয়ে দেয়। কারণ পৃথিবীতে থেকে যাওয়ার সবচেয়ে সুন্দর উত্তরাধিকার সম্পদ নয়; বরং এমন কিছু ভালো কাজ, যা মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে এবং যার সওয়াব মৃত্যুর পরও আমাদের আমলনামায় প্রবাহিত হতে থাকে।
মনে রাখবেন, রিজিক চাকরি দেয় না, ব্যবসা দেয় না, মানুষও দেয় না। এগুলো কেবল মাধ্যম। রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। সম্মান তাঁর হাতে, প্রশান্তি তাঁর হাতে, সফলতাও একমাত্র তাঁরই হাতে। আমাদের হাতে আছে শুধু ইখলাসের সঙ্গে চেষ্টা করা, হালাল পথে অটল থাকা, ধৈর্য ধারণ করা এবং প্রতিটি ফলাফল হাসিমুখে মহান রবের ফয়সালা হিসেবে গ্রহণ করা।
যেদিন আমরা সত্যিকার অর্থে তাওয়াক্কুল শিখে যাব, সেদিন দেখব, বাইরে ঝড় থামেনি, কিন্তু ভেতরের ঝড় থেমে গেছে। পরিস্থিতি বদলায়নি, কিন্তু হৃদয় বদলে গেছে। আর হৃদয় বদলে গেলে পুরো পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিটাই বদলে যায়।
তাই, জীবনে যে পরিস্থিতিই আসুক, মেঘের ভেলার মতো ভেসে বেড়ান। জ্যোৎস্নার মতো আলো ছড়ান। ফুলের মতো নীরবে সৌন্দর্য বিলিয়ে দিন। নদীর মতো চলতে থাকুন। আর প্রতিটি প্রশ্বাসে শুধু একটি বিশ্বাস বাঁচিয়ে রাখুন: আমার রব আছেন। তিনি আমাকে দেখছেন। তিনি আমাকে ভুলে যাননি। তিনি আমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, সেটিই আমার জন্য সর্বোত্তম।
এই একটি বিশ্বাস যদি হৃদয়ের গভীরে জীবন্ত হয়ে যায়, তাহলে জীবনের সবচেয়ে কঠিন পথও সহজ হয়ে যায়, সবচেয়ে অন্ধকার রাতও প্রশান্ত হয়ে যায়, আর সবচেয়ে ভারী পরীক্ষাও রবের সান্নিধ্য লাভের এক অপূর্ব উপহার হয়ে ওঠে।
"হে আল্লাহ! আমাদেরকে আপনার ওপর প্রকৃত অর্থে তাওয়াক্কুলকারী বানিয়ে দিন। আমাদের জীবনকে মানুষের জন্য কল্যাণ, উপকারী জ্ঞান ও আলোর উৎস বানিয়ে দিন। আমাদের প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ ও প্রতিটি পদক্ষেপ যেন একমাত্র আপনার সন্তুষ্টির জন্য হয়। আমাদের এমনভাবে কবুল করুন, যেন আমাদের ক্ষুদ্র জীবনটুকু আপনার দীনের, উম্মাহর এবং মানবতার জন্য উপকারী হয়ে থাকে। আমীন।
© আমাদের একজন প্রিয় ভাইয়ের লেখা। অসাধারণ উপলব্ধি। জীবনে যেই ঘটনাই ঘটুক না কেন, আল্লাহ পাকের উপর পূর্ণ তওয়াক্কুল করুন।