14/03/2026
"চাচি,ফ্রিজ থেকে আমগো তেলাপিয়া মাছের পোটলাটা একটু দিন তো। দাদি আসছে গ্রাম থেকে।সেহরিতে আজ উনি মাছ ভাজা খেতে চেয়েছে।"
"তোমাদের যা-যা লাগে একসাথ নিতে পারো না? বারবার ফ্রিজ খুললে ফ্রিজে সমস্যা হয়,বিল বেশি হয়। তাছাড়া, আমিতো আর সারাক্ষণ ফ্রিজের কাছে বসে থাকি না। রোজার দিন। বিকেল বেলা কত কাজ থাকে হাতে!"
প্রতীবেশী আন্টির শক্ত কথায় চোখ টলমল করে উঠলো, ষোড়শী রুপার। মা তাকে শেষ বিকেলে এই বাসার ফ্রিজ থেকে মাছ নিতে পাঠিয়েছে। তাদের ঘরে ফ্রিজ নেই। টুকটাক জিনিস গুলো এখানেই রাখে ওরা। একটু আগেও টুকটাক জিনিস নিয়েছে, রুপা। প্রতিবারই এই আন্টি আড় চোখে তাকায়। কিছু নিতে এলে বা রাখতে এলে ব্যস্ততা দেখিয়ে কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখে।
উনি হয়তো চক্ষু লজ্জায় মুখে কিছু বলতে পারছে, কিন্তু আন্টির এ আচরণ বুঝিয়ে দিচ্ছে তাদের ফ্রিজে জিনিসপত্র রাখা আন্টির পছন্দ নয়। তবুও মা তাকে এটা সেটা রাখতে পাঠায়।
রুপার মন খারাপ করে আন্টির দরজায় দাঁড়িয়ে রইলো, মিনিট দশেক। তবেই আন্টি মুখ কুঁচকে মাছের পোটলাটা দিলো।
বারান্দায় চেয়ারে বসে কোরআন তিলাওয়াত করছিলো, মোরশেদ। মেয়েকে মুখ গোমড়া করে বাসায় ঢুকতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
"কি-রে মা, কি হয়েছে তোর? মুখটা ওমন কালো করে রাখছিস কেন?"
"বাবা আমাদের বাসায় একটা ফ্রিজ দরকার। তুমি তাড়াতাড়ি একটা ফ্রিজের ব্যবস্হা করো।"
"হ্যাঁ মা, ঠিক বলছিস তুই। আমাদের একটা ফ্রিজ খুব দরকার। আগামী মাসের বেতনটা পেলেই একটা ফ্রিজ আমরাও কিনবো।"
বাবা'র কথা শুনে মুখ বিকৃত করলো, রুপা। এ নিয়ে বাবা হাজারবার বলেছে," আগামী মাসের বেতনটা পেলেই ফ্রিজ কিনবো।" বাবা বেতন পায় ঠিকই, কিন্তু ফ্রিজ আর কেনা হয় না। ততক্ষণাৎ রুপা মন খারাপ করে জবাব দিলো ,
"তোমার কবে যে আগামী মাস পূর্ণ হবে, বাবা!"
মেয়ের কথায় মোরশেদ গোপনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোক, মোরশেদ। একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কেরানি পদে চাকরি করছে, লোকটা। মাস শেষে, আঠারো হাজার টাকা বেতন পায়। স্ত্রী- তিন সন্তানের লেখাপড়া থাকা খাওয়া সব এরমধ্যে। টানাটানির সংসার। তাছাড়া, আজকাল নিত্যপণ্যের যে দাম! রাতারাতি পণ্যের দাম বাড়ে হুড়মুড়িয়ে, কিন্তু বেতন আর বাড়ে না।
মধ্যবিত্তদের থাকা-খাওয়াই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে দিনদিন। সেখানে ঘর সাজানো , বিলাসবহুল জীবন চালানো তো বিলাসিতা মাত্র। মোরশেদও ইচ্ছে হয় একটা ফ্রিজ কিনতে, কিন্তু বেতন যা পায় মাস শেষে চলতেই কষ্ট হয়।
এরিমধ্যে মোরশেদের স্ত্রী এসে বললো,
"হ্যাঁ গো। ঘরের বাজার-সদাই সব শেষ হয়ে গেছে। তুমি যদি আজ একটু বাজারে যেতে। আম্মা আসছে কতদিন পর, একটু ভালোমন্দ পারলে আনো।"
"জরুরী কি কি সদাই লাগবে সেগুলো বলো? পকেটের অবস্থা খুব একটা ভালো না, নাজমা।"
স্ত্রী প্রয়োজনী জিনিস গুলোর একে-একে লিস্ট দিলো। তাতেও লম্বা লিস্ট। মোরশেদ পকেটে হাত রাখলো,একটা চকচকে হাজার টাকার নোটই রয়েছে। সেটা নিয়েই বাজারে গেলো। দুই লিটার সয়াবিন তেল, পিঁয়াজ-রসুন টুকটাক কিছু সদাই কিনতেই লেগেছে সাড়ে সাতশো টাকা। অবশিষ্ট রইলো, আড়াইশো টাকা। আম্মা আসছে একটু মাছ-মাংস কেনা দরকার। মোরশেদ মাছের বাজারে গেলো। পাশ থেকে পরিচিত এক জেলে ডাক দিয়ে বললো,
"মোরশেদ ভাই! নদীর তাজা ইলিশ আনছি। লইয়া যান একটা, খুব কম দাম। একদাম, বারশো কেজি।"
মোরশেদ ইলিশ মাছের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো। তার খুব পছন্দের মাছ। আগে বছরে সুযোগ মতো পেলে, দুই-একবার কিনতো।
এখন ইলিশে এতো দাম, বছরেও একবার খাওয়া হয় না। পকেটে পয়সা নেই। মোরশেদ মিথ্যা করে বললো,
"বাচ্চাদের এলার্জির সমস্যা আছে! ইলিশ আর বাসায় কিনি না ভাই। তুমি অন্য কাস্টমার দেখাও।"
বলেই দ্রুত ওখান থেকে বেরিয়ে পড়লো লোকটা। বেছে বেছে সচতার কয়েকটা দোকানে মাছের দরদাম করলো। দুইশো টাকার মধ্যে নেই কোনো মাছ। আশাহত মনটা নিয়ে বেড়িয়ে উনি মুরগির দোকানে গেলো। আম্মা মুরগীর মাংস পছন্দ করে। একটা পোলট্রি মুরগী নেওয়া যাক। দোকানদার কে জিজ্ঞেস করলো,
"মুরগীর কেজি কতো করে ভাই?"
"একদাম,২৩০।"
"কি বলেন, এতো দাম? গতকালই তো কেজি ছিলো ২০০।"
"দামতো প্রতিদিনই বাড়ে। গতকাল ছিলো ২০০, আজ ২৩০। আপনার বিশ্বাস না হইলে অন্য সব দোকানে গিয়া দেখেন। একদাম।"
"আচ্ছা ঠিক আছে, এক কেজির একটা মুরগী দেন আমাকে।"
"এক কেজির কোনো মুরগী নাই। সব দেড় কেজির উপরে।"
"ভাই,একটু দেখেন এক কেজি পাওয়া যায় কি-না।"
দোকানদার বাধ্য হয়ে কয়েকটা মুরগী মেপে জানালো, "এক কেজি ৪০০ গ্রাম আছে।"
মোরশেদ মনেমনে হিসাব করলো, পকেটে মাত্র আড়াইশ টাকা। মুরগী দাম দেওয়ার মতো বাড়তি টাকা নেই। বাধ্য হয়ে বললো,
"তাহলে থাক, ভাই। রেখে দিন।"
দোকানদার তখন বিকৃত মুখে বললো, "একটা মুরগী কেনার মুরদ নেই, আবার শার্ট-প্যান্ট পড়ে ভাব দেখাইতে আইছে। রোজা-রমজানের দিন শুধু শুধু সময় নষ্ট। যত্তসব!"
মোরশেদ সেসব শুনেও শুনলো না যেন। ততক্ষণাৎ আশেপাশে তাকালো একবার। কেউ শুনলো না তো? বড় মেয়েটার বিয়ে কিছুদিন পর, এসব লোক জানাজানি হলে ইজ্জত যাবে। নাহ কেউ শুনেনি। অস্বস্তির মাঝেও স্বস্তি পেলো এক মধ্যবিত্ত বাবা। চাপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে, শূন্য বাজারে থলে নিয়ে দ্রুত ওখান থেকে সরে গেলো মোরশেদ। বাজারে নিত্যপণ্যের দামে নাভিশ্বাসারের সঙ্গে মধ্যবিত্তদের কপালে জুটছে এমনই অপমান- কটূকথা। এই মানুষগুলোর কেবল চুপচাপ হজম করে যায়, লোক-লজ্জার ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারে না।
আধহাত খালি বাজার ব্যাগ হাতে নিয়ে বাজার থেকে বেরিয়ে পড়লো, মোরশেদ। সঙ্গে রয়েছে, হাট থেকে কুড়িয়ে আনা চাপা কষ্ট। সেই কষ্ট সঙ্গে নিয়ে আনমনে হাঁটছে মোরশেদ।
এরিমধ্যে পরিচিত এক বড়ভাইয়ের সাথে দেখা। ভাই অতি আন্তরিকতার সঙ্গে বললো,
"আরে মোরশেদ! কি খবর ভালো? কেমন আছো, ভাই?"
মোরশেদ সকল ব্যথা চেপে গিয়ে মুচকি হেসে বললো, "এই তো ভালো আছি ভাই।"
আসলেই কি ভালো আছে, মোরশেদ? নেই ভালো নেই, মধ্যবিত্ত হাজারো মোরশেদ ভালো নেই। তবুও তারা লোকলজ্জা কিংবা আত্মসম্মানের জন্য প্রকাশ করতে পারে না, আমরা ভালো নেই। বরং শত ব্যথা লুকিয়ে এই লোকগুলো মুচকি হেসে বলে যায়, আমি/আমরা ভালো আছি। তাদের এই ভালো আছির ভিতরে লুকিয়ে থাকে, চাপা কষ্ট আর ভারী কিছু দীর্ঘশ্বাস!
(সমাপ্ত)
#মধ্যবিত্তের_নিত্যদিন
[ঘটনাটির আংশিক প্রকাশিত এক নিউজ থেকে অনুপ্রেরিত ।]
(রি-পোস্ট)
Ritu Aktar Fariya Aktar