18/06/2026
একজন গরিবের ছেলের আলেম হওয়ার হৃদয়স্পর্শী কাহিনি
গল্প: “মায়ের চোখের পানি আর বাবার শেষ স্বপ্ন”
গ্রামের এক কোণে ছিল ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর। সেই ঘরে থাকতেন রিকশাচালক আবদুল করিম ও তার স্ত্রী আমেনা বেগম। সংসারে অভাব ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। কখনো চুলায় আগুন জ্বলত, কখনো জ্বলত না। কিন্তু তাদের হৃদয়ে ছিল একটি বড় স্বপ্ন—তাদের একমাত্র ছেলে রায়হান একদিন আলেম হবে, মানুষের পথ দেখাবে।
রায়হানের বয়স যখন মাত্র সাত বছর, তখন থেকেই সে কুরআন পড়ার প্রতি আগ্রহী ছিল। একদিন সে বাবাকে বলল,
— “আব্বা, আমি মাদরাসায় পড়তে চাই। আমি আলেম হতে চাই।”
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার চোখের কোণে পানি জমে গেল। কারণ তিনি জানতেন, ছেলেকে মাদরাসায় পড়ানোর সামর্থ্য তার নেই।
বাবা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
— “বাবা, আমার ঘরে টাকা নেই, কিন্তু তোমার জন্য আমার দোয়া আছে। তুমি যদি দ্বীনের মানুষ হতে পারো, তাহলে এটাই হবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা।”
কিন্তু বাস্তবতা ছিল কঠিন। সংসারে খাবার নেই, পরনের কাপড় নেই। গ্রামের মানুষ বলত,
— “করিম, তোমার ছেলে তো বড় হয়েছে। তাকে মাদরাসায় দিয়ে কী হবে? কাজে লাগাও, কিছু টাকা আয় করবে।”
কঠিন সময় এসে বাবার হৃদয়ও কাঁপিয়ে দিল। একদিন ক্ষুধার জ্বালায় রায়হানকে বললেন,
— “বাবা, কিছুদিন কাজ করো। তোমার ছোট হাতের উপার্জনে হয়তো সংসারে একটু খাবার আসবে।”
রায়হানের চোখে পানি এসে গেল। সে বলল,
— “আব্বা, আমি কাজ করব, কিন্তু আমার কুরআনের পড়া কি বন্ধ হয়ে যাবে?”
বাবা মুখ ফিরিয়ে চোখের পানি লুকালেন।
বাবার ত্যাগ
পরদিন ভোরে রায়হানকে কাজে পাঠানো হলো। সারাদিন ইট বহন করত, দোকানে কাজ করত, আবার রাতে ক্লান্ত শরীর নিয়ে মাদরাসার পড়া চালিয়ে যেত।
মা রাতে ছেলের পা টিপে দিতেন আর কাঁদতেন।
— “হে আল্লাহ! আমার সন্তানের কষ্ট তুমি বৃথা করো না। তাকে দ্বীনের খাদেম বানিয়ে দাও।”
একদিন বাবা সারাদিন কাজ করেও কোনো টাকা পেলেন না। ঘরে খাবার নেই। মা নিজের ক্ষুধা লুকিয়ে ছেলের সামনে খাবার তুলে দিলেন।
রায়হান বলল,
— “আম্মা, তুমি খাবে না?”
মা হাসার চেষ্টা করে বললেন,
— “আমি খেয়েছি বাবা।”
কিন্তু সেই রাতে রায়হান দেখল—তার মা পানি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন।
বাবার শেষ রাত
দিন যেতে লাগল। অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে করতে বাবার শরীর ভেঙে পড়ল। একদিন প্রচণ্ড ক্ষুধা ও অসুস্থতায় তিনি বিছানায় পড়ে গেলেন।
রায়হান বলল,
— “আব্বা, আমি কাজ করব। আপনি আর কষ্ট করবেন না।”
বাবা দুর্বল কণ্ঠে বললেন,
— “না বাবা… তুমি পড়াশোনা ছেড়ো না। আমার জীবন চলে গেলেও তোমার ইলমের পথ যেন বন্ধ না হয়।”
সেই রাতেই বাবা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে শেষ কথা বললেন—
“বাবা, মানুষ তোমাকে গরিবের ছেলে বলবে, কিন্তু তুমি এমন আলেম হও যেন মানুষ তোমাকে দ্বীনের সন্তান বলে সম্মান করে।”
কথা শেষ করে বাবার চোখ বন্ধ হয়ে গেল।
রায়হানের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠল।
মায়ের সংগ্রাম
বাবা চলে যাওয়ার পর মা একা হয়ে গেলেন। তিনি মানুষের বাড়িতে কাজ করতেন। নিজের হাতে ফোসকা পড়ত, তবুও ছেলের মাদরাসার খরচ পাঠাতেন।
একদিন রায়হান মাকে বলল,
— “আম্মা, এত কষ্ট করবেন না। আমি পড়া ছেড়ে কাজ করব।”
মা চোখ মুছে বললেন,
— “না বাবা, তোমার আব্বা ক্ষুধার কষ্ট সহ্য করে তোমার জন্য স্বপ্ন রেখে গেছে। তুমি সেই স্বপ্ন ভেঙো না।”
স্বপ্নের পূরণ
বছরের পর বছর কষ্ট, কান্না আর পরিশ্রমের পর রায়হান একজন বড় আলেম হয়ে গেল।
যেদিন তার প্রথম ওয়াজের মঞ্চে হাজার মানুষ বসেছিল, সেদিন সে মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলল—
“আজ আমি যা হয়েছি, তা আমার মেধার কারণে নয়। এটা আমার বাবার ক্ষুধার রাতগুলোর ফল, আমার মায়ের চোখের পানির ফল।”
তারপর সে মঞ্চ থেকে নেমে মায়ের পায়ের কাছে বসে কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“আম্মা, আজ আপনার কষ্টের দাম আল্লাহ দুনিয়াতেই দেখিয়ে দিয়েছেন।”
মা আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন—
“আলহামদুলিল্লাহ! আমার সন্তানের মাধ্যমে আল্লাহ দ্বীনের খেদমত নিয়েছেন।”
শিক্ষা
যে বাবা-মা সন্তানের দ্বীন ও শিক্ষার জন্য নিজের সুখ বিসর্জন দেন, আল্লাহ তাদের ত্যাগ কখনো বৃথা করেন না।
অনেক বড় আলেমের পেছনে থাকে কোনো এক মায়ের রাতজাগা কান্না আর কোনো এক বাবার নীরব আত্মত্যাগ।