22/05/2026
#ঘুমপাড়ানি_মা
পর্ব ০৭
The Story Haven
হাসপাতালের সেই করিডোরে সাদা কাপড়ে ঢাকা মরিয়ম বিবির নিথর দেহটা পড়ে রইলো। আরিশ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখের জল শুকিয়ে গেছে, সেখানে এখন এক অদ্ভুত ধীরতা। তার হাতে সেই মলিন বার্থ সার্টিফিকেট।
নীলা আরিশকে জড়িয়ে ধরতে গেল, কিন্তু আরিশ আলতো করে নিজেকে সরিয়ে নিল। এই প্রথম নীলার স্পর্শে আরিশের শরীরে কোনো সাড়া নেই। নীলা আর্তনাদ করে উঠলো, “আরিশ, আমি তোর মা! ওই পাগ*লিটা তোকে চু*রি করে পালতে চেয়েছিল।, আমি তোকে আমি আমার জীবনের থেকেও ভালোবাসি বাবা। আমি এগুলো সহ্য করতে পারতেছি না বাবা।
আরিশ শান্ত গলায় বললো, মা বাবা ওনাকে ক*বর দেওয়ার ব্যবস্থা করো। আমাদের আজকেই যেতে হবে ওই ঠিকানায়।
আমি আর না বলতে পারলাম না। মৃ*ত মরিয়ম বিবি কে সমাজকর্মীদের সাথে নিয়ে মাটি দিয়ে আসলাম। তারপার আমরা সেই গভীর রাতেই রওনা হলাম কাগজের নিচে লেখা ঠিকানায়। ঠিকানাটা ঢাকার অদূরে সাভারের এক অজপাড়াগাঁয়ের।
গাড়িতে কেউ কোনো কথা বলছে না। নীলা জানালার বাইরে তাকিয়ে নীরবে কাঁদছে। সে হয়তো বুঝতে পারছে, আরিশের ওপর তার একচ্ছত্র অধিকারটা আজ রাতের অন্ধকারের মতোই হারিয়ে যাচ্ছে।
ভোর হওয়ার ঠিক আগে আমরা সেই গ্রামে পৌঁছালাম। আঁকাবাঁকা মাটির পথ পেরিয়ে আমরা একটা ছোট জরাজীর্ণ টিনের ঘরের সামনে দাঁড়ালাম। ঘরটা তালাবদ্ধ, উঠোনে ঘাস জমেছে। দেখে মনে হচ্ছে এখানে অনেক বছর কেউ থাকে না।
আশেপাশের প্রতিবেশীরা আমাদের দেখে বেরিয়ে এলো। একজন বয়স্ক লোক এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “কাদের খুঁজছেন আপনারা?”
আমি আরিশের হাতের সেই কাগজটা দেখালাম। লোকটা কাগজটা দেখেই চমকে উঠলেন। তার চোখ ভিজে এলো। তিনি বললেন, “ওরে বাবা! এটা তো মরিয়ম আর তার ছোট ছেলের কাগজ। আপনারা কোত্থেকে আসলেন?”
আমি নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “আমরা শহর থেকে আসছি। মরিয়ম বিবি মা**রা গেছেন।”
পুরো উঠোনে এক নিস্তব্ধতা নেমে এলো। বৃদ্ধ লোকটা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বেচারি! প্রায় ১৫ বছর আগে তার সাজানো সংসারটা এক রাতে শেষ হয়ে গিয়েছিল। এই গ্রামে জমি নিয়ে মা*রামা*রি হয়েছিল। মরিয়মের স্বামীকে গ্রামের মাতব্বররা কু*পিয়ে মে**রে ফেলেছিল। মরিয়ম তার তিন মাসের দুধের শিশুকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল শহরে। আমরা ভেবেছিলাম সেও ম*রে গেছে।”
আমার আর নীলার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল। তার মানে মরিয়ম কোনো জন্মগত পাগলি ছিল না! সে তার স্বামীর সোকে পাগ*ল হয়ে গেছিলো। সে ছিল এক নিগৃহীত মা, যে তার স্বামীর খু**নিদের হাত থেকে সন্তানকে বাঁচাতে শহরে পালিয়ে গিয়েছিল। আর আমরা সেই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তার কোল খালি করেছিলাম।
বৃদ্ধ লোকটা আবার বললেন, “মরিয়ম কিন্তু পাগ*ল ছিল না সাহেব। সে ছিল গ্রামের স্কুলের শিক্ষিকা। স্বামী হারানোর শোক আর মাথার আ*ঘাত তাকে ওরকম করে দিয়েছিল। তবে যাওয়ার আগে সে একটা কথা সবাইকে বলে গিয়েছিল— 'আমার বাজানরে কেউ না কেউ ঠিকই পালবে, আমি তারে একদিন খুঁইজা পামুই'।”
আরিশ ধীর পায়ে সেই বন্ধ ঘরের দরজার সামনে গিয়ে বসলো। সে মাটির দিকে তাকিয়ে হাসলো—একটা বুক ফাটা হাসা। সে বললো, “শুনেছো মা? সে চো*র ছিল না। সে আমাকে বাঁচাতে পালিয়েছিল। আর তার পর আমি তোমাদের কাছে ছিলাম।
নীলা চিৎকার করে উঠলো, “আমরা তোমাকে ভালো রেখেছি আরিশ! আমরা তোমাকে শিক্ষা দিয়েছি, বড় করেছি তুমি আমার সন্তান। আমি তোমাকে আমার জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসি। তোমার জন্য আমি জীবন দিতেও দ্বিতীয় বার দ্বিধা বোধ করবো না আরিশ!”
নীলা বুক ফাটা কান্না করতে করতে বললো।
আরিশ মাথা তুলে নীলার দিকে তাকালো। তার চোখে এখন আর ক্রোধ নেই, আছে শুধু এক বিশাল শূন্যতা। সে বললো, “ভালো রেখেছো মা, কিন্তু মিথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে। আজ থেকে আমি আর আরিশ নই। এই কাগজে আমার নাম লেখা আছে— 'আকাশ'।”
ঠিক তখনই ঘরের এক কোণ থেকে এক বৃদ্ধা মহিলা লাঠি ভর দিয়ে বেরিয়ে আসলেন। তিনি মরিয়মের বড় বোন। তিনি আরিশের মুখের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলেন। তারপর ফিসফিস করে বললেন, “ঠিক যেন তার বাবার মতো দেখতে হয়েছে ছেলেটা!”
তিনি ঘরের চাবিটা এগিয়ে দিলেন আরিশের দিকে। বললেন, “তোর মা বলছিল তুই একদিন ফিরবি। ঘরের ভেতরে তোর জন্য একটা জিনিস রাখা আছে।”
আরিশ কাঁপা হাতে তালাটা খুললো। ঘরের ভেতরে ভ্যাপসা গন্ধ। এক কোণায় একটা পুরনো কাঠের সিন্দুক। আরিশ সিন্দুকটা খুলতেই আমরা যা দেখলাম, তাতে আমাদের সবার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো।
চলবে...
সংগ্রহীত
খুব শীঘ্রই ৮ম পর্ব পোস্ট করা হবে সবাই পেজটি ফলো করে ছোট একটা কমেন্ট করবেন তাহলে ৮ম পর্ব পোস্ট করার সাথে সাথে নোটিফিকেশন পেয়ে যাবেন।