13/02/2026
নব্য 'মীর জাফর' ও বাংলাদেশের রাজনীতির ক্রান্তিকাল: আলেমদের ভূমিকা ও জাতির বিভীষিকা
ইতিহাসের চাকা অদ্ভুতভাবে ঘোরে। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন কোনো শক্তিশালী বিদেশী শক্তির কাছে হয়নি, বরং হয়েছিল ঘরের শত্রু মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায়। নিজের ক্ষমতার লোভ আর ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য মীর জাফররা ইংরেজদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল। ফলাফল? ২০০ বছরের গোলামি, অবর্ণনীয় নির্যাতন আর লুণ্ঠন। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট দেখে মনে হচ্ছে, আমরা আবার সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করছি। লেবাসধারী একদল আলেম আর স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী নিজেদের তুচ্ছ স্বার্থে যে খেলা খেলছে, তা আমাদের আবার কোনো দীর্ঘমেয়াদী গোলামির দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
১. সফলতার আড়ালে বিভীষিকা: জামায়াতকে ঠেকানোর মিশন
বাংলাদেশের কতিপয় তথাকথিত বড় আলেম—যেমন চরমোনাই পীর, মহিবুল্লাহ বাবুনগরী কিংবা আব্বাসী সাহেবদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পথচলার দিকে তাকালে একটি বিষয় দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়। তাদের প্রধান শত্রু কোনো জালেম বা ইসলামবিদ্বেষী শক্তি ছিল না, বরং তাদের সকল শক্তির কেন্দ্রবিন্দু ছিল জামায়াতে ইসলামীকে ঠেকানো। তারা সফল হয়েছেন। জামায়াতকে ক্ষমতার বাইরে রাখা বা তাদের সাংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করার মিশনে তারা আজ বিজয়ী। কিন্তু এই বিজয় কার জন্য?
পলাশীর যুদ্ধে মীর জাফরও ভেবেছিলেন তিনি সফল, তিনি নবাব হবেন। কিন্তু তিনি হননি, হয়েছিলেন 'ক্লাইভের গাধা'। ঠিক তেমনি, আজ যারা জামায়াতকে ঠেকিয়ে আনন্দিত হচ্ছেন, তারা আসলে কার হাত শক্তিশালী করছেন? তারা কি বুঝতে পারছেন না যে, ইসলামী শক্তিগুলোর এই বিভাজন মূলত সেই শক্তির পথ প্রশস্ত করছে যারা এ দেশ থেকে ইসলামের নাম-নিশানা মুছে দিতে চায়?
২. ফতোয়ার রাজনীতি ও মুনাফেকি
এক সময় এই আলেমরা মঞ্চ কাঁপিয়ে ফতোয়া দিতেন যে, জামায়াত নাকি 'মুনাফেক'। তাদের আকিদা নাকি ভ্রান্ত। কিন্তু আজ জাতির সামনে আয়নার মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে—আসল মুনাফেকি কারা করছে। যারা মুখে ইসলামের কথা বলে কিন্তু কার্যত ইসলামের শত্রু বা স্বৈরাচারী শক্তিকে বৈধতা দেয়, তাদের আমলনামা কী?
মুনাফেকের প্রধান লক্ষণ হলো আমানতের খেয়ানত করা এবং মিথ্যা বলা। এই আলেমরা জাতির আমানত—অর্থাৎ সঠিক নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা—নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন। তারা দ্বীনি ঐক্যের চেয়ে নিজেদের গদি আর প্রভাবকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। যার ফলে সাধারণ মানুষ আজ আলেমদের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে।
৩. গণতন্ত্রের দ্বিমুখী মানদণ্ড
এদের দ্বিমুখী নীতি সবচেয়ে বেশি হাস্যকর হয়ে ওঠে যখন তারা 'গণতন্ত্র' নিয়ে কথা বলেন। ওয়াজ মাহফিলে তারা গণতন্ত্রকে 'হারাম' ও 'কুফরি' বলে ফতোয়া দেন, সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেন। অথচ নির্বাচনের সময় সেই তথাকথিত 'হারাম' গণতন্ত্রের নামেই তারা অন্য দলগুলোকে বৈধতা দেন, সিট ভাগাভাগি করেন এবং আঁতাত করেন।
নিজেদের স্বার্থে যা হালাল, অন্যের বেলায় তা হারাম—এই নীতিই আজ এ দেশের ইসলামী রাজনীতিকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে এসেছে। তারা আসলে চায় না যে বাংলাদেশে কোনো ন্যায়পরায়ণ শাসক আসুক। কারণ একজন প্রকৃত ন্যায়পরায়ণ শাসক আসলে এই লেবাসধারী আলেমদের "ধর্মের ব্যবসা" বন্ধ হয়ে যাবে।
৪. উপমহাদেশের করুণ ইতিহাস: মীর জাফরের প্রেতাত্মা
ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের পতনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোনো বাইরের শক্তি আমাদের হারায়নি। আমরা হেরেছি আমাদেরই ঘরের লোক, আমাদেরই মুসলিম ভাইদের হিংসা, মুনাফেকি আর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে। নিজের ক্ষমতার জন্য, সামান্য পদের লোভে তারা ২০০ বছরের জন্য ইংরেজদের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়েছিল।
সেই ২০০ বছর আমরা ইংরেজদের কাছে গোলামি করেছি। আমাদের রক্ত, ঘাম আর সম্পদ লুটে নিয়েছে বিদেশীরা। সেই একই রক্ত আমাদের শরীরে বইছে বলেই হয়তো আমরা আজও চাবুকের ঘা না খেলে সচেতন হই না। আজকের এই তথাকথিত আলেমরা ঠিক একই কাজ করছেন। তারা জামায়াতের বিরুদ্ধে গিয়ে বা ইসলামী ঐক্যের বিরোধিতা করে কার্যত এ দেশকে আবার কোনো নতুন আধিপত্যবাদী শক্তির হাতে তুলে দেওয়ার পথ পরিষ্কার করছেন।
৫. পরবর্তী প্রজন্মের দায়ভার ও জুলুমের ফিরে আসা
বাংলাদেশে যদি ভবিষ্যতে আবারও কোনো অন্যায়-জুলুম ফিরে আসে, মানুষের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়, কিংবা এ দেশ আবার কোনো গোলামির শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়—তবে তার জন্য সরাসরি দায়ী থাকবেন এই সুযোগসন্ধানী আলেমরা। ইসলামের দোহাই দিয়ে যারা বিভাজন সৃষ্টি করেছেন, যারা জালেমদের পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছেন, তারা ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবেন।
ইতিহাস স্বাক্ষী, যারা ভাইয়ে-ভাইয়ে বিবাদ লাগিয়ে তৃতীয় পক্ষকে সুযোগ করে দেয়, সেই তৃতীয় পক্ষ কাউকেই ছাড় দেয় না। আজ যারা জামায়াতকে দমানোর জন্য কুচক্রী মহলের সাথে হাত মেলাচ্ছেন, কাল সেই একই চক্র তাদেরও পিষে মারবে।
৬. জেগে ওঠার সময় এখনই
আমাদের পূর্বপুরুষরা ২০০ বছর গোলামি করেছিলেন বিশ্বাসঘাতকদের কারণে। আমরা কি আবার সেই একই অন্ধকার যুগে ফিরে যেতে চাই? আলেম সমাজকে বুঝতে হবে, অহংকার আর হিংসা কোনোদিন দ্বীনের বিজয় আনতে পারে না। জামায়াত-বিদ্বেষের যে বিষ তারা ছড়িয়েছেন, তা আজ পুরো জাতিকে নীল করে দিচ্ছে।
যদি বাংলাদেশের মানুষ সত্যিকার অর্থে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার চায়, তবে এই লেবাসধারী চাটুকার আলেমদের বর্জন করতে হবে। মনে রাখবেন, ক্ষমতার মোহে যারা ঘরের লোককে শত্রু বানিয়ে বাইরের লোকের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়, তারা কোনোদিন জাতির কল্যাণ করতে পারে না।