20/08/2026
#আশবিন_সাপোর্ট_ইউনিট
#কাব্যবিলাস
#অনুগল্প
#গল্পের_নাম_সমাজ_ও_তার_কথার_প্রভাব
#জনরা_সামাজিক
#লেখকের_নাম_kohinur_Islam_Tuli
আসামির কাঠগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে রায়হান। আর তার সামনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে তারি বাদী পক্ষের ছেলে, অর্থাৎ খুন হওয়া ফয়সাল মিয়ার বড়ো ছেলে। আর যথারীতি উকিল, জজ আরো যা মানুষ আছেন সবাই বসে আছে যার যার নিজের জায়গায়। জজ সাহেব ঘোষণা দিলেন, এভরিওয়ান কোড কার্যক্রম শুরু করুন। এ কথা বলার সাথে সাথে সবাই যার যার জায়গায় নড়েচড়ে বসে থাকলো আর বাদী পক্ষের উকিল রায়হান কে জিজ্ঞাসা করলেন, তো মিস্টার রায়হান বলুন -
কেন আপনি আমার ক্লাইন্ট ফিরুজ ভূঁইয়ার বাবাকে খুন করেছেন? আর হ্যা এখানে কিন্তু কেনো এমন প্রমান নেই যে, আপনি অস্বীকার করবেন যে আপনি খুন করেনি বা আপনাকে ফাঁসানো হয়েছে। আপনার বিরুদ্ধে না কেনো আইনজীবী আছেন আর আপনি কিন্তু নিজেই ব
লেছেন কোটে সব কিছু নিজে থেকেই বলবেন তো এখন বলুন।
রায়হান এবার কোটের সাধারণ সারিতে বসে মায়ের দিকে তাকিয়ে তারপর বলতে শুরু করলো। হ্যা, আমিই খুন করেছি ফয়সাল ভূঁইয়াকে। আর খুনটাও করেছি তারি বাড়িতে তার বড় ছেলের সামনে আর আমার খুন করার কারণটা জানলে হয়তো আপনার সবাই আরো অবাক হবেন যে, এত ছোট কারণে কেও কাওকে খুন করতে পারে? হ্যা আমি করেছি!
বাদী পক্ষের উকিল এবার প্রশ্ন করলেন, সেই কারণটা কি বলুন?
রায়হান বলতে শুরু করলেন, আমার বাবা য্খন বেঁচে ছিলেন তখন একবার আমাদের গ্রামের একজনের সাথে আমাদের বিষণ ঝগড়া হয়। সেই ঝগড়া এক সময় মারামারিতে রূপ নেয়। তখন আমার বাবা নিজেকে বাঁচাতে তার হাতে দা ছিল তা দিয়ে একজনকে কপ মেরেছিলেন। তার ছিলেন খুবই ক্ষমতা বান পরিবার তারা আমার বাবাকে হুমকি দিয়েছিলেন যে আমার বাবাকে ছাড়বে না। হ্যা সত্যি আমার বাবার লাশ পাওয়া গেছিলো আমাদের ক্ষেতের কাছে আর খুবই নৃশংস ভাবে মারা হয়েছিল। আর সবচেয়ে বেশি কপানো হয়েছিল আমার বাবার ডান হাত টা পুরো টুকরো টুকরো অবস্থায়। পড়বর্তীতে আমরা সেই ক্ষমতাবান পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বরাবরের মতোই সমাজ সেই ক্ষমতাবান্দের টাকা ও ক্ষমতার কাছে বিক্রি ও চুপ হয়ে গিয়েছিলো। আমরাও আল্লাহর কাছে বিচার চেয়ে সব বাদ দিয়েছিলাম কিন্তু এখানেই শেষ নেই তারপর থেকে শুরু হয় আমাদের ওপর আরো মিথ্যে দোষারোপ।
আমাকে ডাকা শুরু করেন খুনির ছেলে, আমার ছোট বোনকে শুনতে হতো খুনির মেয়ের আর আমার মাকে বলা হতো খুনির বউ। অথচ চিত্র টা কিন্তু ছিল উল্টো, আর এই কথা গুলো ছড়িয়েছে ফয়সাল ভূঁইয়া। তিনি আমাকে আমি য্খন বাজারে কাজ করতাম তিনি আমাকে দেখলেই বলতেন ঐযে খুনির ছেলের আর সবার সাথে এগুলো নিয়ে হাসি তামসা করতেন।
আমি বলেছিলাম, চাচা আপনি যা বলছেন তা ঠিক না।সবাই জানে আমাদের সাথে কি হইছে, তাও আপনি এগুলো কথা ছড়াচ্ছেন। আর আপনার কথা মানুষ বিশ্বাস করছে, আপনি তাঁদের সাথে উঠবস করেন বলে।
তিনি, আমাকে আরো বিদ্রুপ করে আরো ভরা বাজারে বললেন খুনির ছেলেকে খুনি বলবো না তো কিছু বলবো।
আদালতের কয়েকজনের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল।
রায়হান বলল,
আমি সেদিন অপমানিত হয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। কিন্তু সেখানেই শেষ হয়নি।পরের দিন থেকে গ্রামের মানুষ আমাকে সহ আমার মা বোনকে খুনির ছেলে বলে ডাকতে শুরু করল।
আমার বোন স্কুলে গেলে তার সহপাঠীরা বলত, তোর বাপ তো খুনি ছিল।
আমার মা বাজারে গেলে মানুষ ফিসফিস করত।
আমি চুপ করে ছিলাম।
একদিন বোনটা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে বলল ভাইয়া, আমি আর স্কুলে যাব না।আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন?
সে বলেছিল, সবাই বলে আমরা খুনি পরিবার।সেদিন আমার ভেতরে কিছু একটা ভেঙে গিয়েছিল।রায়হানের কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো।আমি ফয়সাল ভূঁইয়ার কাছে গিয়েছিলাম। তাকে অনুরোধ করেছিলাম, তিনি যেন গ্রামের মানুষকে এসব বলা বন্ধ করেন।কিন্তু তিনি হেসে বলেছিলেন.....মানুষ তো সত্য কথাই বলবে।
আমি বলেছিলাম, আমার বাবা যা করেছিল তা তো নিজেকে বাঁচানোর জন্য করেছিলেন। কিন্তু তারাই তো আমার বাবাকে মারলো খুন করলো তারপর ও কেনো আমাদের খুনি বলছেন।তিনি বলেছিলেন.......
"তোর বাপের মতো তুইও একদিন খুনি হবি।"
সেদিন আমি চলে এসেছিলাম।
কিন্তু সমাজ থামেনি।প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে তাদের কথাগুলো আমাকে মনে করিয়ে দিত—আমি নাকি খুনির ছেলে।একসময় কাজের জায়গাতেও কেউ এসব কথা পৌঁছে দেয়। মালিক আমাকে কাজ থেকে বের করে দেয় আর আমাকে কেও কাজ ও দিতো না।আমি বেকার হালাম।সংসার ভেঙে পড়ল।মা অসুস্থ হয়ে গেলেন।বোন পড়াশোনা ছেড়ে দিল।
রায়হান এবার কিছুক্ষণ চুপ রইল।তারপর ধীরে ধীরে বলল......
"মাননীয় আদালত, মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করে.....আমি কেন খুন করেছি?"
কিন্তু কেউ আমাকে কখনো জিজ্ঞেস করেনি, আমি কতবার মরেছি।
প্রতিদিন একটু একটু করে।
মানুষের কথায়।
অপমানে।
সমাজের চোখে।
বাদী পক্ষের উকিল বললেন,
তবুও হত্যা কোনো সমাধান নয়, মিস্টার রায়হান।
রায়হান মাথা নিচু করল।
আমি জানি।
আমি কোনোদিন বলিনি যে আমি ঠিক করেছি।
আমি অপরাধ করেছি।
ফয়সাল ভূঁইয়াকে হত্যা করে আমি শুধু একজন মানুষকে মারিনি, নিজের জীবনটাও শেষ করে দিয়েছি।
কিন্তু আমি চাই, আমার শাস্তি যেন শুধু আমার শাস্তি না হয়।
যারা কথা দিয়ে মানুষকে প্রতিদিন মেরে ফেলে, তারাও যেন একবার ভাবে।
তারপর রায়হান কাঠগড়ার বাইরে বসে থাকা নিজের মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল—
মা আমাকে ছোটবেলায় শিখিয়েছিল, ছুরি দিয়ে কাটলে ক্ষত হয়। কিন্তু মা কখনো বলেনি, মানুষের কথাতেও ক্ষত হয়।
আর সেই ক্ষত কখনো কখনো এত গভীর হয় যে, মানুষ বেঁচে থেকেও আর স্বাভাবিক থাকতে পারে না।
আদালত কক্ষ আবার নীরব হয়ে গেল।
জজ সাহেব কিছুক্ষণ নথির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন—
আদালত মানুষের কষ্ট বুঝতে পারে, অপমানও বুঝতে পারে। কিন্তু কোনো কষ্ট, কোনো অপমান কাউকে অন্যের জীবন নেওয়ার অধিকার দেয় না।
রায়হান শান্ত গলায় বলল,
আমি আমার শাস্তি মাথা পেতে নেব, মাননীয় আদালত। কারণ আমি জানি আমি অপরাধী।
কিন্তু সমাজের কাছে আমার একটা প্রশ্ন থাকবে.....
আপনারা যখন কাউকে প্রতিদিন অপমান করেন, তার চরিত্র নিয়ে কথা বলেন, তার পরিবারকে ছোট করেন—তখন কি একবারও ভাবেন, আপনার একটি কথাই হয়তো কারও পুরো জীবন বদলে দিতে পারে?
কারণ হাতের আঘাতের ক্ষত একদিন শুকিয়ে যায়।
কিন্তু মানুষের কথার আঘাত....
কখনো কখনো মানুষকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসা আর সম্ভব হয় না।
#শিক্ষিনীয়_দিক : আমাদের সমাজে জোর যার মূল্যক তার কথাটি অনেক বেশি প্রচলিত। আসলেই আজকের সমাজে যার টাকা আছে ক্ষমতা আছে তার যেন সব আছে। তারা টাকার জোরে সত্যি কে মিথ্যা ন্যায় কে অন্যায় বানাতে পারে। আমাদের গল্পের রায়হান ও তার পরিবারের সাথে ক্ষমতা ও টাকার জন্য বাবা হত্যার বিচার পেলো না আর যেই অপবাদ সেই পরিবার পেত সেটা সে ও তার পরিবার পেলো। আর কেও যদি কেনো ভুল করেও থাকে তাকে তার করা ভুল নিয়ে আমাদের তাকে বুলিং বা কথা শুনানো উচিত না। বরং তাকে বুজিয়ে তার ভুল মাফ করে সঠিক পথে আসতে সাহায্য করা। তাই আমরা যার যার অবস্থান থেকে মানুষকে ক্ষমা ও বুলিং ও তার করা ভুল নিয়ে হাসি তামসা করা বাদ দেই আজকে থেকেই যেন সমাজে আর কেনো রায়হান তৈরী না হয়।
#বিঃদ্রঃ - আমি জানি না কত টুকু বুজাতে পেরেছি। তবে মানুষ ভুল ত্রুটির উর্ধে নয় ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন সবাই... ❤️🍁
কোনো কিছু কাটি নাই, থাকনা একটুকরো স্মৃতি হয়ে.... ❤️