21/09/2025
এক যুগেরও বেশি সময়ের আগের কথা। তখন দাদাজান বেঁচে ছিলেন। দাদাজানের নিজের নৌকা ছিল। বর্ষাকালে নদীর পানি যখন বাড়ির কাছাকাছি চলে আসতো নৌকাগুলো তখন বাড়ির ঘাটে বাঁধা থাকতো। গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হলেই কাজিনদের সাথে মিলে পরিকল্পনা করতাম নৌকা করে বিলে নিয়ে যাওয়ার জন্য দাদাজানের কাছে বায়না করবো। দাদাজান নিয়েও যেতেন। পেতে রাখা মাছের জাল উঠিয়ে মাছ ধরতেন। বিলের শাপলা তুলে দিতেন। ঢাকায় আসার আগে বেশকিছু বছর দাদা-দাদির সাথেই ছিলাম। ছোটো থেকেই দেখেছি দাদাজান রাত করে মাছ নিয়ে আসতেন আর দাদিজান রাতেই কাটতে বসতেন। তাজা মাছ ভেজে দিতেন। দাদা-দাদি দু'জনই পান পছন্দ করতেন। ছোটোবেলায় আমরা চারবোন তাদের জন্য পান বানানোর প্রতিযোগিতা করতাম। রাত হলে কে দাদির সাথে শুবে এই নিয়ে মহা কান্ড ঘটে যেতো। আমি সবসময়ই দাদিজানের সাথে শোয়ার সুযোগ পেয়ে যেতাম। ছোটোবেলা থেকেই দাদির সাথে আমার বেশি জমতো। আজ ভাবছিলাম দাদিজানকে কল করে সেই গল্পগুলো আবার তাজা করে নিব কিন্তু ব্যস্ততার কারণে আর দেওয়া হয়নি।
গতকাল ‘জোড়াতালির সংসার’ বইটা শুরু করেছি। পড়তে পড়তে গ্রামের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। গল্পটা গ্রামের নিম্নমধ্যবিত্ত একটি পরিবারের। সংসারে তাদের অভাব থাকলেও আছে মজবুত পারিবারিক বন্ধন। মা-বাবা, দাদি, শিশির এবং তার ছোট দুই ভাই-বোন মিলে তাদের জোড়াতালির সংসার। গল্পের প্রতিটি চরিত্র যেনো সংসারের একেকটি পিলার। উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে সংসারের বড় ছেলে শিশির। সংসারের বড় ছেলেরা যেমন সংসারের জন্য হাসে, সংসারের জন্য বাঁচে এবং সংসারের সবার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে নিজের জীবনের ক্যানভাসে আঁকা রঙিন স্বপ্নগুলো সাদা রঙে মাখা তুলির আঁচড়ে মুছে ফেলে; শিশির তাদেরই প্রতিচ্ছবি।
৮৫ পৃষ্ঠার মতো পড়েছি আজ। পড়তে পড়তে বুঝলাম এই গল্পে নেই আধুনিক জীবনের চাকচিক্য, নেই রোমাঞ্চকর প্রেমের কাহিনী আর নেই রূপকথার মতো অবাস্তব প্লট; আছে সাধারণ নিম্নবিত্ত জীবনের বর্ণনা। অতীতের স্মৃতি, প্রিয়জন এবং তাদের সাথে পেছনে ফেলে আসা সরল এবং আনন্দদায়ক অনূভুতি, আছে ভাইবোনের খুনসুটি এবং দাদিজানের সাথে বসে করা হরেক রকমের গল্পের আসর। মমতাময়ী মায়ের ভালোবাসা আর কঠোর অথচ আদর্শ বাবার ছায়া। সবমিলিয়ে একটা অসাধারণ গল্প।
জোড়াতালির এই গল্প পড়তে পড়তে জীবনের অনেক সুখস্মৃতি মনে করছি। সাথে আবার গ্রামীণ পরিবেশ; হাটবাজার, বিলের পানি, মেলা, গ্রামের স্কুলের বর্ণনা মনকে পুলকিত করছে। লেখক