28/10/2023
সজনে পাতার উপকারিতা ও খাওয়ার নিয়ম
পরিণত বয়সী বাংলাদেশিদের মধ্যে সজনের ডাটা বা সজনে শাক খাননি, এমন মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি হবে না। মৌসুমে পাতে নিয়মিতই সজনে রাখেন অনেকে, কিন্তু তাদের সবাই কি জানেন সজনে কতটা উপকারী? কীভাবে খেতে হয় সেটিও হয়তো জানা নেই অনেকের।সজনে পাতা খাওয়ার নানাবিধ উপকারিতা এবং সেটি কীভাবে খেতে হয়, তা জানিয়েছেন কোয়ান্টাম হার্ট ক্লাবের কোঅর্ডিনেটর ডা. মনিরুজ্জামান, যেটি তার ভাষায় পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো।
‘অলৌকিক পাতা’
আজকে আমরা এ সময়ের একটি সুপারফুড নিয়ে আলোচনা করব, যেটি বলা যেতে পারে এ সময়ের আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি গবেষণা। সেটি হচ্ছে সজনে পাতা; সুপারফুড সজনে পাতা।
সজনে পাতার নাম তো আমরা ছোটকাল থেকেই শুনেছি। সজনে খেতে খেতে বড় হয়েছি। সজনে পাতার ভর্তা খেয়েছি, শাক খেয়েছি। এ আবার এমন কিছু কী? এর মধ্যে নতুনত্ব কী আছে, যেটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে?
আসলে সজনে পাতাকে এখন বলা হচ্ছে অলৌকিক পাতা। বিজ্ঞানীরা সজনে পাতাকে বলছেন অলৌকিক পাতা। কেন? এত কিছু থাকতে সজনে পাতাকে অলৌকিক পাতা বলা হচ্ছে কেন? সজনে পাতার যে ফুড ভ্যালু (খাদ্যমান), এর নিউট্রিশন (পুষ্টি), এর কনটেন্ট যেকোনো মানুষকে বিস্মিত করবে। সে কারণেই বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন যে, এ সময়ের একটি অলৌকিক পাতা হচ্ছে সজনে পাতা।
কী আছে সজনে পাতায়
সজনে পাতায় আমিষ আছে ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ এক কেজি সজনে পাতা যদি আপনি খান, তাহলে এর ২৭ শতাংশ, মানে কত? ২৭০ গ্রাম হচ্ছে আমিষ। ৩৮ শতাংশ হচ্ছে শর্করা (কার্বোহাইড্রেট)। ২ শতাংশ হচ্ছে ফ্যাট। ১৯ শতাংশ হচ্ছে ফাইবার বা আঁশ।
আমরা জানি যে, এখন ফাইবার বা আঁশকে খাদ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। আঁশ কোনো ঐচ্ছিক খাবার নয় যে, ইচ্ছা হলে খেলাম; ইচ্ছা না হলে খেলাম না।
ইট ইজ অ্যা ম্যান্ডাটোরি কম্পোনেন্ট (এটা আবশ্যিক উপাদান)। প্রত্যেক দিন আপনার খাদ্যতালিকায় যেন পর্যাপ্ত আঁশ থাকে এবং সেই সজনে পাতায় আঁশ আছে ১৯ শতাংশ।
অ্যামাইনো অ্যাসিডের উৎস
সজনে পাতায় অ্যাসেনশিয়াল অ্যামাইনো অ্যাসিড আছে আটটি। ভিটামিন ‘এ’ এবং ভিটামিন ‘সি’ আছে। রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম। ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, জিংক, আয়রন এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এতগুলো নিউট্রিয়েন্ট থাকার কারণে বিজ্ঞানীরা বলছেন যে, সজনে পাতা একটি অলৌকিক পাতা।
দুধের প্রায় সমান পুষ্টি
এটি (সজনে পাতা) যদি তুলনা করেন কোনো খাবারের সাথে, তাহলে আমরা সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি খাবারের সাথে তুলনা করতে পারি। সেটি হচ্ছে গরুর দুধ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গরুর দুধের পুষ্টি এবং সজনে পাতার পুষ্টি অলমোস্ট কাছাকাছি।
আমরা উপমহাদেশে বা বাংলাদেশে গরুর দুধ কেন খাই, কিসের জন্য খাই? মূলত কী লক্ষ্যে খাই? গরুর দুধ আমরা খাই মূলত ক্যালসিয়ামের জন্য, প্রোটিনের জন্য, আমিষের জন্য। গরুর দুধ খেয়ে আমরা বলি, এটা একটা সুষম খাবার।
গরুর দুধ এবং সজনে পাতার মধ্যে পুষ্টিগত কোনো পার্থক্য নাই। গরুর দুধে যা আছে, সজনে পাতাতেও তা আছে। যে লক্ষ্যে আমরা মূলত গরুর দুধ খাই, সে পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম আছে সজনে পাতায়। পর্যাপ্ত আমিষও আছে।
ঔষধি গুণ
সজনে পাতার কিছু ঔষধি গুণ আছে এবং ঔষধি গুণের কারণে আর্থ্রাইটিস নিরাময়ে এটি দারুণ কার্যকর। ইতোমধ্যেই আমরা এক্সপেরিমেন্ট করেছি। যাদের হাঁটু ব্যথা আছে, সজনে পাতার জুস খান। সজনে পাতার ভর্তা খান অথবা গুঁড়া খান। ছয় মাস খান। দেখেন আপনার আর্থ্রাইটিসের কী অবস্থা হয়।
শরীরকে ডিটক্সিফাই করতে সাহায্য করে সজনে পাতা। আমরা জানি যে, আমাদের শরীরে ৭০ থেকে ১০০ ট্রিলিয়ন সেল বা কোষ আছে। প্রত্যেকটা কোষের ভেতরে লক্ষাধিক রিঅ্যাকশন হয় প্রত্যেক দিন; প্রতি মুহূর্তে এবং এই লক্ষাধিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, বিক্রিয়া হতে গিয়ে ভয়াবহ কিছু টক্সিন, কিছু বিষাণু, কিছু ক্ষতিকর পদার্থ সেলের ভেতরে তৈরি হয়। এগুলোকে আমরা বলি বর্জ্য পদার্থ, টক্সিন, ফ্রি রেডিক্যাল। এগুলো যদি সেলের ভেতরে থেকে যায়, আপনি কোনো দিন সুস্থ থাকতে পারবেন না। কেউ আপনাকে সুস্থ করতে পারবেন না।
এই বর্জ্য পদার্থকে বের করার জন্য আপনি সজনে পাতা খেতে পারেন। এটা দারুণ একটা ডিটক্স হিসেবে কাজ করতে পারে। আপনার শরীরকে ডিটক্সিফাই করবে এবং আপনারা এখন জানেন, আমরা সবাই জানি, বিশ্বব্যাপী এই ডিটক্স প্রোগ্রামগুলো দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
সাত দিন, ১৫ দিন আপনি একটা বিশেষ প্রোগ্রাম ফলো করবেন, বিশেষ খাবার খাবেন, আপনার শরীরে জমানো বর্জ্য পদার্থগুলো বেরিয়ে যাবে। তো সজনে পাতা সেই কাজটা করতে আপনাকে সাহায্য করবে। আপনার ভেতরের বর্জ্য পদার্থগুলো বের করে দেবে।
সজনে পাতা কীভাবে খাবেন
আমরা মনে করি যে, ফুল সিজনে সবচেয়ে উত্তম উপায় হচ্ছে এটিকে আপনি জুস করে খাবেন। কিছু সজনে পাতা নিন। ভালো করে পরিষ্কার করে নিয়ে এটাকে ব্লেন্ডারে নিন। কিছু পানি যোগ করে টেস্টের জন্য কিছু আদা, কিছু জিরা, একটু বিট লবণ দিতে পারেন। ভালো করে ব্লেন্ড করেন। এরপর ছেঁকে নিন। ছেঁকে নিয়ে খাওয়ার সময় একটু মধু দিয়ে খেয়ে নিন। পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জুসটি আপনার খাওয়া হয়ে গেল।
যদি আপনার জুস বানাতে ঝামেলা হয় অথবা সব দিন যদি জুস খেতে না পারেন, ভর্তা খান, তবে এটা কাঁচা হলে বেস্ট। যখন আপনি সিদ্ধ করলেন, এই যে নানাবিধ যে উপাদানগুলো আছে, এটি নষ্ট হয়ে যেতে থাকবে। সে জন্য কাঁচা পাতা ভালো করে বেটে নিয়ে এটাকে টেস্টি করার জন্য যা যা লাগে…সেখানে আপনি রসুন দেন, আদা দেন, মরিচ দেন, পেঁয়াজ দেন, যা যা দিলে টেস্টি হয়, দেন। তারপর আপনি খান। সিজনে।
অফ সিজনে গুঁড়া। সজনে পাতাকে আপনি সিজনে ভালো করে রোদে শুকান। শুকানোর পর এটাকে ক্রাশ করে ফেলেন। ছয় মাস এটা চমৎকার থাকবে এবং এক থেকে দুই চা চামচ সজনে পাতা যথেষ্ট আপনার পুষ্টির জন্য। তাই আমরা বলব যে, নিজের দেশের এই অ্যাভেইলেবল এই পাতাটিকে অবহেলা করবেন না।
আজ না হলে কাল থেকে শুরু করুন। অফ সিজনে আপনি গুঁড়ো সংগ্রহ করুন। প্রতিদিন এক চামচ সকালে, এক চামচ রাত্রে। ছয় মাস পর আপনি আপনার স্ট্রেংথ, আপনার কর্মক্ষমতা দেখে নিজেই বিস্মিত হবেন।
মরিঙ্গা অথবা সহজন যার বৈজ্ঞানিক নাম হল মরিঙ্গা অলিফেরা। এটি খুব সম্ভব যে আপনিও তার সবজি খেয়েছেন। যেমন এটা খেতে সুস্বাদু তেমনি এতে পুষ্টির ভালো পরিমাণও রয়েছে। সহজনেবিটা ক্যারোটিন, অ্যামিনো অ্যাসিড এবং আরও বিভিন্ন প্রকারের ফেনলিক পাওয়া যায়। মরিঙ্গার ছাল গোন্ড তৈরির জন্যএবং তার ফুলগুলি ভেষজ টনিক হিসাবে ব্যবহার করা হয়। মরিঙ্গার পুরো গাছ ঔষধি ব্যবহারের জন্য ব্যবহৃত হয়। সাহান প্রধানত আফগানিস্তান, উপ-হিমালয় অঞ্চলে, বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে পাওয়া যায়।
মরিঙ্গার সুবিধা এবং অসুবিধাগুলি নিম্নলিখিত।
ত্বক চকচকে করতে
মরিঙ্গার শুঁটি থেকে তৈরি সবজি বা তার বীজের তেল ত্বকে লাগালে ত্বক সবসময় চকচকে করে। কারণ এটায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ পাওয়া যায়। ভিটামিন এ চামড়া সৌন্দর্য বজায় রাখায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মরিঙ্গা সেবন করলে শুষ্ক ত্বকও ফুটে ওঠে। শুধু তাই নয়, মরিঙ্গা আপনার মুখের ব্রণ নির্মূল করে এবং আপনার ত্বক পরিষ্কার করে তোলে।
শুক্রাণুর সংখ্যা বৃদ্ধি
মরিঙ্গার ফলের সাহায্যে শুক্রাণুর সংখ্যা এবং মান উন্নত করা যায়। মরিঙ্গা মাসিকের সময় নারীর শরীরের অনেক সমস্যাও দূর করে। সহজন খেলে মহিলাদের গর্ভাবস্থার সময় অনেক সমস্যাও দূর হয়। পুরুষদের শুক্রাণু সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের বীর্য ঘনীভূত করার সহায়ক সহজন।
শিশুদের জন্য
শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্যও মরিঙ্গাগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। আপনাকে বলি যে মরিঙ্গায় ক্যালসিয়াম, লোহা, ম্যাগনেসিয়াম এবং ফসফরাস ইত্যাদি সব অনেক পরিমাণ পাওয়া যায়। শিশুদের দেহে ক্যালসিয়াম হাড় ও দাঁত তৈরির সহায়ক। যদিও গর্ভবতী মহিলাদের মরিঙ্গা সেবন করান হয় তাহলে তাদের সন্তানদের শরীরও ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। মরিঙ্গায় পাওয়া সব উপাদানগুলো একটি শিশুর সুস্থ শরীর পালনে একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
মাথা ব্যথার চিকিৎসা
এছাড়াও আপনি মাথা ব্যথায় বিরক্ত হলে সহজনের ব্যবহারের দ্বারা পরিত্রাণ পেতে পারেন। মরিঙ্গা পাতার পেস্ট তৈরি করে ক্ষতে লাগাতে পারেন। মাথা ব্যথায় এর সুবিধা গ্রহণ করতে মরিঙ্গার সবজি বানিয়ে খেতে পারেন। আপনি চাইলে সহজনের পাতা পিষে এটাকে হালকা গরম করে মাথায় লেপেও এর সুবিধা উপভোগ করতে পারেন। তাছাড়া, এর বীজ পিষে এর গন্ধ শুঁকলেও মাথা ব্যথা দূর হতে পারে। সহজনের বীজের পাউডারও মাথাব্যথা দূর করতে ব্যবহৃত হয়।
উচ্চ রক্তচাপ
উচ্চ রক্তচাপ থেকে ভুগতে থাকা ব্যক্তিরা মরিঙ্গার সাহায্যে পরিত্রাণ পেতে পারে। ওদের সহজনের পাতাগুলির রস বের করে ওটার একটি ডিকোশন তৈরি করে সেবন করলে সেটা পরিত্রাণ সরবরাহ করতে পারে। এছাড়া, এই সহজন আপনাকে বমিভাব, বমি করা ইত্যাদি সমস্যা থেকে রক্ষা করে।
পাচক সমস্যা নিষ্পত্তি
মরিঙ্গার ব্যবহার হজম, ডায়রিয়া, কোলাইটিস ইত্যাদি পচন সম্পর্কিত সমস্যাগুলি দূর করতেও করা হয়। একটি চামচ মরিঙ্গার তাজা পাতার রস এক চা চামচ মধুতে নারকেলের জল মিশিয়ে পান করলে পাচক সম্পর্কিত সমস্ত সমস্যা থেকে আপনি ত্রাণ পাবেন। আপনি যদি চান, আপনি তার শুঁটিরসবজি তৈরি করেও খেতে পারেন। এটিও আপনাকে কোষ্ঠকাঠিন্য ইত্যাদি সমস্যা থেকে পরিত্রাণ দেবে। শুধু এই নয়, সহজন কিডনি এবং মূত্রাশয়ের সমস্যায় ভোগা রোগীদেরও খাওয়ানো যেতে পারে। পোলিও-এর ক্ষেত্রেও এর সুবিধেগুলিও দেখা যায়।
মরিঙ্গার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
গর্ভাবস্থায় গর্ভবতী মহিলাদের মরিঙ্গার পাতা, শিকড়, ছাল এবং ফুল এড়িয়ে চলা উচিত।
সংবেদনশীল পেটের মানুষদের এর সবজি খাওয়া এড়াতে হবে।
গর্ভ ধারনের কয়েক সপ্তাহ পরেই এর ব্যবহার করা উচিত।
মাসিকের সময়ের মরিঙ্গার ব্যবহার পিত্তকে বাড়িয়ে তোলে। তাই এই সময়ের এটির ব্যবহার এড়াতে হবে।
যাদের রক্তক্ষরণ ব্যাধি আছে তাদের এটা গ্রহণ করা চলবে না।
সজিনা পাতার গুড়া নিতে যোগাযোগ করুন 01401-437555