03/05/2025
সাল ১৯৭৪।
ঢাকা থেকে বহু দূরের এক গ্রাম—নিমপুর। ঘন সবুজ গাছপালা ঘেরা, মেঠো পথের দু’পাশে পাকা ধানক্ষেত, আর একটিমাত্র বাজার যেখানে সন্ধ্যার পর আলো জ্বলে না। এই গ্রামের সবচেয়ে পুরনো বাড়ি, ‘চৌধুরী বাড়ি’, সেই ১৮ শতকের মাঝামাঝি নির্মিত, মাটি, কাঠ আর লোহার মিশেলে তৈরি এক রাজবাড়ির ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এখনও।
সেই বাড়িতেই আসে রাহেলা।
বয়স মাত্র একুশ। শহরে বড় হওয়া মেয়ে। বাবা নেই, মা সদ্য মারা গেছেন। মানসিকভাবে বিধ্বস্ত অবস্থায় রাহেলাকে তার মামা আনেন এই চৌধুরী বাড়িতে।
মামা বলেন, “শহর তোকে শেষ করে দেবে। এখানে আয়। একটুখানি সবুজ, একটু নিঃশ্বাস।”
কিন্তু রাহেলার প্রথম দিনেই বুঝতে বাকি থাকেনি—এই বাড়ির বাতাসে কেবল সবুজ নেই, আছে এক ধরনের ঘন, ভারী নীরবতা।
চৌধুরী বাড়ির পরিবেশ আলাদা। দেয়ালে আঁকা পুরনো ছবি, কাঠের পাটাতনের কড়মড় শব্দ, রাতে ঘরের বাইরে কার যেন ধীর পায়ে হাঁটার শব্দ। প্রথম রাতে ঘুম আসেনি রাহেলার।
সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল—ঘরের কোণায় রাখা লোহার ফ্রেমের আয়নাটা।
এমনভাবে বসানো, যেন কেউ তার পেছনে দাঁড়ালেই সেটায় প্রতিচ্ছবি পড়বে না। কিন্তু রাহেলা দেখতে পেল—রাতে সে যখন বিছানায়, তখন আয়নায় শুধু তার চেহারাই নয়, যেন পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর ছায়াও পড়ে! ধূসর, অস্পষ্ট, কিন্তু ছিল।
সকালে উঠে এসব কথা ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। মামা তখন গরুর দেখাশোনা নিয়ে ব্যস্ত।
রাহেলা উঠোন পেরিয়ে গেলেন পেছনের বাঁশবনের দিকে। সেই বনটা দূর থেকে খুব সাধারণ লাগলেও, কাছাকাছি আসতেই একটা শীতল বাতাস গায়ে লাগল। অথচ তখন সকাল আটটা।
"ওখানে যাস না মা!" হঠাৎ একটা কণ্ঠ কানে এলো।
রাহেলা চমকে দেখলেন—এক বৃদ্ধা, শীর্ণ শরীর, চোখে-মুখে অদ্ভুত শুষ্কতা, ছেঁড়া শাড়ি পরা।
বৃদ্ধা আবার বললেন, “এই বাড়ির মেয়েরা বাঁশবনের দিকে গেলে ফিরে আসে না। তারা হারিয়ে যায়। সময়ের গর্ভে, ছায়ার ভেতর…”
“আপনি কে?” কণ্ঠটা কেঁপে গেল রাহেলার।
বৃদ্ধা কেবল হেসে বললেন, “আমি? আমি অনেক আগেই হারিয়েছি আমার নাম। তুই সাবধানে থাকিস, মা।”
আর তারপর যা ঘটল, সেটা চোখের ভুল হতে পারে—কিন্তু রাহেলা স্পষ্ট দেখলেন, বৃদ্ধা হেঁটে চলে গেলেন গাঁয়ের মাঝ বরাবর দিয়ে, কিন্তু তার পায়ের নিচে কোনো ছায়া ছিল না।
রাহেলা দাঁড়িয়ে রইলেন নিঃশব্দে। দূরে কোথাও শালিক ডাকল, আর পেছনে চৌধুরী বাড়ির চুড়ায় বাতাসে ঝাঁকুনি খেল একটা খালি দোলনা।
চলবে…
গল্প: চৌধুরী বাড়ি
লেখায়ঃ ছদ্মবেশী
পর্ব-১