01/07/2026
মাত্র ১০ টাকা থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার সাম্রাজ্য! টানবাজারের ‘বাদশা’ হয়ে ওঠার এক অবিশ্বাস্য রূপকথা**
১৯৭৫ সালের এক কিশোর। বয়স মাত্র ১৪ বছর, অষ্টম শ্রেণিতে পড়েন। সংসারে তীব্র আর্থিক টানাপোড়েন। বাবার কাপড়ের ব্যবসা থাকলেও স্বাধীনতার পর পরিবারটি চরম সংকটে পড়ে যায়। পড়াশোনা ছেড়ে বাধ্য হয়ে সংসারের হাল ধরতে হলো।
পকেটে মাত্র **১০টি টাকা** নিয়ে মাদারীপুরের শিবচর থেকে লঞ্চে উঠে বসলেন সেই কিশোর। গন্তব্য—নারায়ণগঞ্জের সুতার আড়ত 'টানবাজার'। চেনা এক বড় ভাইয়ের গদিতে সুতার ওপর রাত কাটানো সেই ১৪ বছরের কিশোরটিই আজকের বাংলাদেশের বস্ত্র খাতের অন্যতম শীর্ষ কাণ্ডারি—**জনাব মো. বাদশা মিয়া**।
আজকের ফিচার পোস্টে আমরা জানবো মাত্র ৪ টাকা লাভ দিয়ে ব্যবসা শুরু করা এক "খেটেখাওয়া" মানুষের সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার 'বাদশা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ' হয়ে ওঠার রোমাঞ্চকর গল্প।
# # # 🔹 প্রথম আয় মাত্র ৪ টাকা! যেভাবে শুরু হলো 'বাদশা'র পথচলা
টানবাজারে আসার পর প্রথম দিকে সুতার দালালি (এক দোকানের সুতা অন্য দোকানে বেচে কমিশন নেওয়া) শুরু করেন তিনি। এক বেল সুতা বিক্রি করতে পারলে কমিশন মিলত ৭ টাকা।
টাকাপয়সা না থাকলেও তাঁর সততা ও কাজের প্রতি নিষ্ঠা দেখে গাজীপুরের কাশেম কটন মিলের নির্বাহী পরিচালক তাঁকে স্নেহ করে ১-২ বেল সুতা বরাদ্দ দিতেন। সেই সুতা জয়দেবপুর থেকে গরুর গাড়িতে করে এনে, বাসে চাপিয়ে ফুলবাড়িয়া স্টেশন হয়ে অনেক কষ্টে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে আসতেন কিশোর বাদশা মিয়া।
* **৪ টাকার প্রথম লাভ:** রব ভূঁইয়া নামের এক গদি থেকে এক বান্ডিল (১০ পাউন্ড) সুতা বাকিতে কিনে এক ক্রেতার কাছে বিক্রি করে তাঁর প্রথম লাভ হয়েছিল মাত্র ৪ টাকা!
* **২২ বছর বয়সেই কোটিপতি:** কঠোর পরিশ্রম আর বুদ্ধিমত্তার জোরে ১৯৮২ সালের মধ্যে (মাত্র ২২ বছর বয়সে) কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়ে যান তিনি। ১৯৮৩ সালে একসঙ্গে ৪-৫টি টেক্সটাইল মিলের একক এজেন্ট হন, যেখানে একেকটি মিলে জামানত দিতে হতো ৫০ লাখ টাকা।
# # # 🔹 জেদ থেকে পোশাক শিল্পে এবং স্বপ্নের কারখানা
টানবাজারের সুতা ব্যবসায়ী সমিতির টানা দুবারের সফল সভাপতি বাদশা মিয়া দীর্ঘদিন স্কয়ার টেক্সটাইলসহ বড় বড় মিলের সুতার এজেন্ট ছিলেন। কিন্তু ১৯৯৯ সালে তিনি একরকম 'জেদ' করেই পোশাক কারখানায় পা রাখেন।
**কেন সেই জেদ?**
তাঁর ভাষায়, পোশাক কারখানার মালিকেরা সুতা কিনে সময়মতো টাকা পরিশোধ করতেন না। এই ঝামেলা এড়াতেই পঞ্চবটীতে ৪০০ মেশিন নিয়ে সোয়েটার কারখানা দিয়ে বসেন।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০০৩ সালে ভালুকায় ১০০ বিঘা জমির ওপর নিজের প্রথম বস্ত্রকল (স্পিনিং মিল) প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ২০১৬ সালে হবিগঞ্জে আড়াই শ বিঘা জমির ওপর ১,২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে তোলেন অত্যাধুনিক 'পাইওনিয়ার ডেনিম' কারখানা।
আজ তাঁর তিলে তিলে গড়া **বাদশা টেক্সটাইল, কামাল ইয়ার্ন, পাইওনিয়ার নিটওয়্যার ও পাইওনিয়ার ডেনিম**—এই ৪টি প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন **২৫,০০০-এর বেশি কর্মী**। বার্ষিক লেনদেন ৪০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩,৫০০ কোটি টাকা), যার পুরোটাই বৈদেশিক মুদ্রা! টানা পাঁচবার রপ্তানি ট্রফিও জিতেছে তাঁর প্রতিষ্ঠান।
# # # 🔹 ৩০০ কোটি টাকার ধাক্কা এবং সততার অনন্য নজির
ব্যবসা মানেই উত্থান-পতন। ২০১১ সালে বিশ্ববাজারে তুলার দামে এক বিশাল ধস নামে। ১ ডলার ৯০ সেন্টে চুক্তিবদ্ধ তুলা দেশে আসার আগেই দাম কমে ১ ডলারের নিচে নেমে যায়। এক ধাক্কায় **৩০০ কোটি টাকার লোকসান** গোনেন বাদশা মিয়া!
অনেক ব্যবসায়ী যখন চুক্তিভঙ্গ করে কালো তালিকাভুক্ত হচ্ছিলেন, তখন বাদশা মিয়া লোকসান মেনে নিয়েও চুক্তি বজায় রাখেন। তাঁর স্পষ্ট কথা—**"ঋণখেলাপি বা চুক্তিভঙ্গ আমার ব্যবসায়িক জীবনের ডিকশনারিতে নেই।"** এই সততাই তাঁকে আজ এই উচ্চতায় এনেছে।
# # # 💼 "আমি হলাম কামলা মানুষ"— ৬০ বছরেও তরুণের উদ্যম
আজ ৬০ বছর বয়সে এসেও মো. বাদশা মিয়া দিনে ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন। ঘুমান মাত্র ৫ ঘণ্টা। প্রায়ই মাঝরাতে ঢাকা থেকে গাড়ি ছুটিয়ে চলে যান ভালুকা বা হবিগঞ্জের কারখানায়। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা সচল থাকা কারখানার পুরোটা পায়ে হেঁটে চক্কর দেন, উৎপাদন দেখেন, তারপর ঘুমাতে যান।
হাসতে হাসতে তিনি বলেন—
> *"আমি হলাম কামলা (খেটেখাওয়া) মানুষ। কারখানায় কাজ করতেই আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। প্রতিষ্ঠানকে টেকসই করতে হলে কর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পরিশ্রম করতে হয়। এর বিকল্প কোনো বুদ্ধি নেই।"*
>
অবসরে কারখানার আশপাশে শাকসবজি আর ফলমূলের চাষবাস (খেতখামারি) করতে ভালোবাসেন তিনি। এখন তাঁর সঙ্গে ব্যবসায় যোগ দিয়েছেন তাঁর দুই ছেলে—কামাল উদ্দিন আহমেদ ও মহিউদ্দিন আহমেদ। তবে বাদশা মিয়ার কড়া নিয়ম—প্রতিষ্ঠানে যে-ই চাকরি করতে আসুক, তাকে প্রথমে কয়েক মাস কারখানায় হাতেকলমে কায়িক শ্রম দিয়ে কাজ শিখতে হবে, তারপর মূল পদে বসতে হবে।
# # # 🎯 তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বাদশা মিয়ার পরামর্শ:
১. **কাজ শিখুন:** প্রথমে কাজটা খুব ভালোভাবে শিখতে হবে। খুঁটিনাটি না জানলে নেতৃত্ব দেওয়া যায় না।
২. **লেগে থাকুন:** যেকোনো পরিস্থিতিতে সততার সাথে কাজের পেছনে লেগে থাকতে হবে।
৩. **আরাম-আয়েশ পরিহার করুন:** মালিকেরা বেশি আরাম-আয়েশ করলে প্রতিষ্ঠান ধসে পড়ে।
# # # 💔 জীবনে কোনো অতৃপ্তি নেই
অজপাড়া গাঁ থেকে উঠে এসে হাজার হাজার মানুষের রুটিরুজির ব্যবস্থা করা এই সফল মানুষটির মনে আজ কোনো অতৃপ্তি নেই। জীবনের এই দীর্ঘ পথচলা শেষে তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত লাইনগুলো—
> *"প্রথম যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে,*
> *কেঁদেছিলে তুমি একা, হেসেছিল সবে।*
> *এমন জীবন তুমি করিবে গঠন,*
> *মরণে হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভুবন।"*
>
পকেটের ১০ টাকাকে সততা, শ্রম আর মেধা দিয়ে ৩,৫০০ কোটি টাকার সম্পদে রূপান্তর করা মো. বাদশা মিয়া আমাদের দেশের তরুণ সমাজের জন্য এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। স্যালুট এই দূরদর্শী শিল্পোদ্যোক্তাকে! 🇧🇩
**আপনার মন্তব্য জানান:** ১০ টাকা থেকে শুরু করে এই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ার গল্পটি আপনার কেমন লাগলো? তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য তাঁর এই জীবনযুদ্ধ কি শিক্ষণীয় নয়? পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সবাইকে জানার সুযোগ করে দিন।