02/09/2025
ঢাকার এক নামী স্কুলে তখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। স্টেজের উপর আলো, মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়িয়ে আছে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র—মুহিন। বয়সে কিশোর, কিন্তু কণ্ঠে যেন এক অদ্ভুত জাদু। গান শুরু হতেই চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ছাত্র-শিক্ষক, অভিভাবক—সবাই একেবারে মুগ্ধ হয়ে শুনল। গান শেষ হতেই হাততালির ঝড় উঠল। সেদিন থেকেই স্কুলে মুহিনের পরিচিতি হয়ে গেল—“ওই যে ছেলেটা, গানটা অসাধারণ গায়।”
সেই অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে বসে ছিল দশম শ্রেণির ছাত্রী, স্কুলের সবার কাছে সবচেয়ে সুন্দরী হিসেবে পরিচিত—শারমিন। লম্বা চুল, ফর্সা রঙ, চোখে এক অদ্ভুত স্বপ্নময়তা। পরীক্ষার ফলাফল থেকে শুরু করে বিতর্ক প্রতিযোগিতা—সব জায়গাতেই সে সেরা। অনুষ্ঠান শেষে বন্ধুরা যখন মুহিনকে ঘিরে প্রশংসা করছিল, শারমিন হেসে কাছে এসে দাঁড়াল। মুহিন লজ্জায় গুটিয়ে গেল।
শারমিন বলল,
—“তুমি দারুণ গান গাও। সত্যিই অসাধারণ।”
মুহিন গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
—“ধ… ধন্যবাদ আপু।”
শারমিন হাসল,
—“আপু কেন? আমি তো শারমিন। চাইলে নাম ধরেই ডাকতে পারো।”
সেদিনের ছোট্ট আলাপই মুহিনের মনে এক অদ্ভুত আলোড়ন তুলল। বয়সে দু’ক্লাস বড় হলেও শারমিনের হাসি, চোখ, কথাবার্তা মুহিনের ভেতরে এক অজানা আগুন জ্বালিয়ে দিল।
দিন গড়িয়ে যেতে লাগল। করিডোরে দেখা হলে দুজনেই একটু থেমে দাঁড়াত, লাইব্রেরিতে বই খুঁজতে গিয়ে কখনও হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে আলাপ হতো। ধীরে ধীরে সেই আলাপ বেড়ে গেল। শারমিন মুগ্ধ হতো মুহিনের কণ্ঠে, মুহিন মুগ্ধ হতো শারমিনের চোখের গভীরতায়।
একদিন স্কুলের ছাদে, বিকেলবেলায় পড়াশোনার অজুহাতে দু’জন দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে রইল। হঠাৎ মুহিন বলল,
—“তুমি তো আমার থেকে অনেক বড়, কিন্তু কেন জানি মনে হয় তোমাকে ছাড়া আমি কিছুই না।”
শারমিনের চোখে অদ্ভুত ঝিলিক।
—“বয়স বড় হলে কি হৃদয় ছোট হয় নাকি? আমি তোমাকে ভালোবাসি, মুহিন।”
শব্দগুলো শুনে মুহিন যেন হঠাৎ অন্য জগতে চলে গেল। বুকের ভেতরে ঝড় উঠল, কণ্ঠ আটকে গেল। শুধু বলল,
—“আমি তোমাকে আজীবন গান শুনিয়ে যাব, শারমিন।”
সেদিন প্রথমবার দু’জনের হাত একসাথে জড়াল।
এরপর থেকে প্রতিটি দিন যেন রঙিন হয়ে গেল। স্কুলের করিডোর, মাঠ, লাইব্রেরি—সব জায়গাই তাদের গোপন সম্পর্কের সাক্ষী হয়ে উঠল। তবে সবকিছু গোপনে রাখতে হতো। সমাজ, পরিবার, বয়সের ফারাক—সবই যেন তাদের বিরুদ্ধে ছিল। তবুও ভালোবাসা থেমে থাকেনি।
একদিন রাতে ফোনে শারমিন বলল,
—“মুহিন, যদি একদিন আমাদের আলাদা করে দেয়? যদি আমি অন্য কারো হয়ে যাই?”
মুহিন গলায় দৃঢ়তা এনে বলল,
—“অসম্ভব। তুমি আমার, আমি তোমার। কোনো শক্তি আমাদের আলাদা করতে পারবে না।”
কিন্তু জীবন সবসময় প্রতিশ্রুতি রাখে না।
ধীরে ধীরে তাদের সম্পর্কের খবর স্কুলে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। বন্ধুদের মধ্যে ফিসফিসানি, গুজব—সবকিছু ভেসে বেড়াতে লাগল। একদিন বিকেলে গোপনে দেখা করার সময় আচমকা ধরা পড়ে গেল তারা। শারমিনের বড় ভাই হঠাৎ সেখানে এসে হাজির। হাতে হাতে নাতে ধরা পড়ে গেল দু’জন।
ভাই ক্ষিপ্ত হয়ে মুহিনকে মারতে উদ্যত হলো। মুহিন ভয় আর আতঙ্কে কাঁপছিল। বাঁচার জন্য সে বলল,
—“আমি তো কিছুই করি নাই। সব দোষ শারমিনের। ও-ই আমাকে ডেকেছিল।”
শারমিন অবাক হয়ে স্থির হয়ে গেল। বিশ্বাস করতে পারল না মুহিন এমন কথা বলবে। তার চোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, বুকের ভেতরটা ভেঙে গেল।
সেদিন থেকেই শারমিনের পরিবারের সিদ্ধান্ত হলো—এই সম্পর্ক শেষ করতে হবে। খুব শিগগিরই তাকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে। শারমিন কাঁদতে কাঁদতে মুহিনকে বলল,
—“তুমি কেন সব দোষ আমার উপর দিলে? তুমি কি আমাকে সত্যি ভালোবাসনি?”
মুহিন মুখ ঘুরিয়ে নিল। ভেতরে ভেতরে কষ্টে মরলেও সে স্বীকার করল না। বলল,
—“আমাদের কিছুই হওয়ার না। ভুলে যাও।”
এরপর হঠাৎ করেই সবকিছু শেষ হয়ে গেল। শারমিনকে বিয়ে দেওয়া হলো।
সময় বয়ে গেল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে মুহিন একসময় দেশের নামকরা গায়ক হয়ে উঠল। টিভি, রেডিও, স্টেডিয়ামের কনসার্ট—সব জায়গায় শুধু তার নাম। ভক্তদের ভিড়, মিডিয়ার আলো—সবকিছু মুহিনকে ঘিরে ধরল। কিন্তু আলো-ঝলমল মঞ্চের পেছনে যখন সে একা থাকত, তার ভেতরে শুধু একটাই নাম প্রতিধ্বনি করত—শারমিন।
শারমিন meanwhile সংসারী হলো। স্বামী, সংসার, দুই সন্তান—এক মেয়ে, এক ছেলে। বাইরে থেকে স্বাভাবিক জীবন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে শারমিন ছিল ভাঙা। স্বামীর সাথে সম্পর্ক ভালো ছিল না। জীবন অনেক কঠিন হয়ে উঠল যখন ছোট ছেলেটির ক্যান্সার ধরা পড়ল।
চিকিৎসার খরচ টানতে টানতে পরিবার একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেল। স্বামী অন্যদিকে সরে গেল, সংসার ভেঙে গেল। শারমিন সারারাত ছেলের মাথায় হাত রেখে কাঁদত, কোথা থেকে টাকা আসবে সেই চিন্তায় পাগল হয়ে যেত।
এই সময়েই হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ল—দেশের সবচেয়ে বড় গায়ক মুহিন কনসার্ট করছে, আর সেই কনসার্টের সমস্ত আয় যাবে এক ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায়।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুহিন ঘোষণা দিল,
—“আজকের প্রতিটি গান আমি গাইব একজন বিশেষ মানুষ আর তার সন্তানের জন্য। আমি চাই, আমার গান অন্তত একটা জীবন বাঁচাতে সাহায্য করুক।”
হল ভরে উঠল হাততালিতে। কিন্তু সেই ভিড়ের মধ্যে বসে থাকা শারমিন অঝোরে কাঁদতে লাগল। তার বুক ফেটে যাচ্ছিল।
কনসার্ট শেষে ব্যাকস্টেজে শারমিন মুখোমুখি হলো মুহিনের। দুজনেই কয়েক সেকেন্ড কিছু বলতে পারল না। তারপর শারমিন ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
—“তুমি আমাকে কেন ভুলতে পারলে না, মুহিন? এত বছর পরও কেন এই করছো?”
মুহিনের চোখ লাল হয়ে উঠল।
—“আমি কি তোমাকে কোনোদিন ভুলতে পেরেছি, শারমিন? আমার প্রতিটি গানেই তুমি ছিলে। তুমি হয়তো আমাকে ক্ষমা করবে না, কিন্তু আজ তোমার ছেলের জন্য আমি কিছু করতে চেয়েছি।”
শারমিন হাত দিয়ে চোখ মুছল, গলা কাঁপছিল।
—“তুমি জানো, তোমার কারণে আমার জীবন ধ্বংস হয়েছিল। কিন্তু আজ তুমি-ই আবার আমার ছেলের জীবনের শেষ আশার আলো।”
মুহিন কাঁপা কণ্ঠে বলল,
—“ক্ষমা করো, শারমিন। আমি সেইদিন ভয়ে ভুল কথা বলেছিলাম। আজীবন সেই ভুলের শাস্তি আমি পেয়েছি। আমি কখনো বিয়ে করিনি, শুধু তোমার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছি।”
শারমিন কিছু বলতে পারল না। শুধু ছুটে গিয়ে মুহিনের কাঁধে মাথা রেখে অঝোরে কাঁদতে লাগল। মুহিনও কেঁদে ফেলল।
কথা বলার আর কোনো প্রয়োজন ছিল না। সবকিছু স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
মুহিন আজীবন বিয়ে করল না। শারমিন সংসারের ভার নিয়ে বেঁচে রইল। কিন্তু দুজনের হৃদয়ের ভেতরেই থেকে গেল এক অসম্পূর্ণ ভালোবাসা, যেটা কখনো মরেনি।
অসম্পূর্ণ হলেও, সেটাই ছিল সবচেয়ে নিখুঁত ভালোবাসা।