07/06/2026
এদেশে সাজনা পাতা আগে কেউ কোনোদিন এভাবে খাওয়ার কথা ভাবেনি!
হুমম, আমি সজনে শাক বা সাজনা পাতার কথা বলছি! অনেকেই এটি ভর্তা করে, ভাজি করে বা তরকারিতে রান্না করে খায়। দেশে ইদানীং সাজনা পাতার গুঁড়া বা মরিংগা পাউডার খাওয়ার বেশ প্রচলন হয়েছে।
কিন্তু সাজনা পাতা খাওয়ার সবচেয়ে উত্তম ও বৈজ্ঞানিক উপায় হলো এটি ফার্মেন্ট বা গাঁজন করে খাওয়া!
রান্না করলে বা ড্রাই করলে যেখানে অনেক পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়ে যায়, সেখানে ল্যাকটো-ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়ায় সাজনা পাতার পুষ্টি উলটো বেড়ে যায়! যা কয়েক গুণ পর্যন্ত বাড়ে! মূলত বায়োএভেইলিবিলিটি বাড়ে।
এই আইডিয়াটি হয়তো আপনার কাছে একদম নতুন, কিন্তু এর উপকারিতা জানলে আপনি আজই পাকশালায় ছুটবেন তৈরি করার জন্য!
প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা সাজনা পাতায় প্রায় ৯.৪ গ্রাম প্রোটিন থাকে, যা উদ্ভিজ্জ উৎসের মধ্যে অন্যতম সেরা! এছাড়া আছে ৪৪০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১৪৭ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম, ৩৩৭ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম এবং ৫১.৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি।
এই পাতাটি মূলত তিন ধরণের মানুষের জন্য রহমত।
প্রথম, যারা অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন কিন্তু বাজেটের কারণে নিয়মিত লাল মাংস, কলিজা খেতে পারেননা তাদের জন্য, কারণ এতে পালংশাকের চেয়েও কয়েক গুণ বেশি আয়রন আছে, সাথে আছে ভিটামিন সি—এর সহায়তায় শরীর দ্রুত আয়রন শোষন করে।
দ্বিতীয়, উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য, এর পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং কোয়েরসেটিন নামক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রক্তনালীকে রিল্যাক্স রাখে।
তৃতীয়, ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের রোগীদের জন্য, ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে এর আইসোথিওসায়ানেটস উপাদানটি দারুণ ভূমিকা রাখে।
কাঁচা সাজনা পাতায় কিছু অ্যান্টি-নিউট্রিয়েন্ট থাকে, যা শরীরে পুষ্টি শোষণে বাধা দেয়। যখন আপনি ল্যাকটো-ফার্মেন্টেশন করবেন, তখন উপকারী ল্যাকটোব্যাসিলাস ব্যাকটেরিয়া এই বাধাগুলোকে চুরমার করে দেয়। ফলে সাজনা পাতার পুষ্টির বায়ো-অ্যাভেইলেবিলিটি বা শরীরের গ্রহণ করার ক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যায়! এছাড়া, কাঁচা সজনে পাতার যে একটা ঝাঁঝালো স্বাদ বা ঘাসের মতো গন্ধ থাকে, ফার্মেন্টেশনের পর সেটি চমৎকার এক টক ও হালকা নোনতা স্বাদে রূপান্তরিত হয়।
এখন বড় প্রশ্ন হলো, গাছের পাতা এভাবে কাঁচা অবস্থায় ফার্মেন্ট করে খাওয়া আদৌ নিরাপদ কি না!
বিজ্ঞান বলছে, এটি শতভাগ নিরাপদ। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা জার্নাল PubMed Central এবং Journal of Food Science and Technology-তে প্রকাশিত একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, ফার্মেন্টেশনের ফলে সাজনা পাতার ফাইটেট প্রায় ৬০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায় এবং এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের কার্যকারিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। তাই এটি ফার্মেন্ট করে খাওয়া ভাল।
তাছাড়া পাতা ফার্মেন্ট করে খাওয়ার ইতিহাস পৃথিবীতে নতুন নয়। মিয়ানমারে চা পাতা ফার্মেন্ট করে 'লাপেত' নামক জনপ্রিয় খাবার বানায়, নেপালে রায়ো বা মুলা শাক ফার্মেন্ট করে 'গুন্ড্রুক' বানায়।
ঘরে ফার্মেন্টেড মরিংগা লিভস্ খুব সহজেই প্রস্তুত করতে পারবেন। সাজনা পাতা যেহেতু ছোট এবং পাতলা, তাই একা একা এটাকে ফার্মেন্ট করতে গেলে পাতাগুলো জারের ভেতর ঠিকমতো ডুবিয়ে রাখা যায়না এবং ফাঙ্গাস পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই শুধু সাজনা পাতা না করা উচিত। এর সাথে রসালো এবং শক্ত গঠনের সবজি মিশিয়ে দারুণভাবে ফার্মেন্ট করা সম্ভব। যেমন- কাঁচা পেঁপে, মুলা, গাজর, শসা, বাঁধাকপি ইত্যাদি।
তবে শসা দিয়ে করলে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যাবে না। অল্প দিনেই খেয়ে শেষ করতে হবে। বাকি যেকোনো সবজির ক্ষেত্রে সাজনা পাতার সাথে মিশিয়ে অনায়াসে কয়েক মাস সংরক্ষণ করা যাবে।
ফ্রেশ সাজনা পাতা ধুয়ে শুকিয়ে নিন। এবার ওজনে মূল সবজিটি রাখুন ৭০-৮০% আর সাজনা পাতা রাখুন ২০-৩০%। কাপের মাপে, ১ কাপ সাজনা পাতার সাথে ৩ থেকে ৪ কাপ কুচানো সবজি।
সবজি ও পাতার মোট ওজনের ২% লবণ দিতে হবে। আন্দাজ করে দিলে ১ কেজি মিশ্রণের জন্য প্রায় ২০ গ্রাম লবণ (নন-আয়োডাইজড সি-সল্ট হলে উত্তম) ওপরে ছড়িয়ে দিন। এই লবণই সবজি থেকে রস বের করবে এবং খারাপ ব্যাকটেরিয়া ছড়াতে দেবে না।
এবার হাত দিয়ে খুব ভালো করে কচলাতে থাকুন। বাঁধাকপি, মুলা, গাজর বা কাঁচা পেঁপের মতো সবজির ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ মিনিট জোর দিয়ে চটকাতে হবে, যতক্ষণ না সবজিগুলো নরম হয়ে তা থেকে প্রচুর পানি বের হচ্ছে।
এবার একটি পরিষ্কার শুকনো কাঁচের জারে এই মিশ্রণটি চেপে চেপে ভরুন, যেন ভেতরে কোনো বাতাস আটকে না থাকে।
সবশেষে মিশ্রণটির নিজস্ব রস যেন জারের ওপরে অন্তত আধা ইঞ্চি ভাসমান থাকে। সবজি বা পাতা সবসময় নিজস্ব পানির নিচে ডুবে থাকতে হবে; নইলে ফাঙ্গাস পড়ে যাবে। যেন ভেসে না ওঠে সেজন্য পরিষ্কার ভারী কিছু দিয়ে চেপে রাখতে পারেন।
জারের মুখ হালকাভাবে আটকে ঘরের কোনো অন্ধকার ঠান্ডা জায়গায় রেখে দিন। সবজির ধরন এবং আবহাওয়ার ওপর ভিত্তি করে ফারমেন্টেশনের সময়কাল ভিন্ন হয়। বাঁধাকপির জন্য ৩ থেকে ৫ দিন; গাজর, মুলা, কাঁচা পেঁপের জন্য ৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগতে পারে।
এই ফার্মেন্টেশনের সময় জারের ভেতর কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস হয়। তাই প্রতিদিন অন্তত একবার জারের মুখ সামান্য লুজ করে গ্যাস বের করে দিয়ে আবার হালকা আটকে দিতে হবে।
যদি জারের ওপরে হালকা সাদা রঙের পাতলা আস্তরণ বা ফেনা পড়ে, তবে ভয়ের কিছু নেই; ওটা ইস্ট, চামচ দিয়ে তুলে ফেলে দিলেই হবে। কিন্তু যদি জারে কালো, সবুজ বা নীল রঙের লোমশ ফাঙ্গাস দেখেন কিংবা পঁচা দুর্গন্ধ পান, তবে বুঝবেন ক্ষতিকর জীবাণু সেটি নষ্ট করে ফেলেছে। তখন ফেলে দিতে হবে।
সঠিকভাবে তৈরি করার পর যখনই দেখবেন পাতা ও সবজির রঙ কিছুটা জলপাই বা কালচে-সবুজ হয়েছে এবং চমৎকার টক স্বাদ চলে এসেছে, তখন জারের মুখ শক্ত করে এয়ারটাইটভাবে আটকে ফ্রিজের নরমালে রেখে দিন। ফ্রিজে ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যাবে, ফলে এটি ৩ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত একদম ফ্রেশ, ক্রাঞ্চি ও পুষ্টিগুণে ভরপুর থাকবে। বের করে খাওয়ার সময় সর্বদা পরিষ্কার ও শুকনো চামচ ব্যবহার করবেন।
এটি একটি লিভিং ফুড এবং প্রোবায়োটিকে ভরপুর, তাই কখনোই গরম করে বা গরম কিছুর সাথে খাওয়া যাবে না; এতে উপকারী ব্যাকটেরিয়ারা মরে যাবে। এটি খাওয়ার সবচেয়ে উত্তম এক নিয়ম হলো প্রতিদিন দুপুরের খাবারের সাথে এক বা দুই চামচ সাইড ডিশ বা আচার হিসেবে খাওয়া। এটি সালাদের সাথেও মিশিয়ে দিতে পারেন।
যারা দীর্ঘদিন ধরে হজমের সমস্যা, পেটের সমস্যায় ভুগছেন, রক্তস্বল্পতা আছে কিংবা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, তারা প্রতিদিন ফার্মেন্টেড সাজনা পাতা খেলে অনেক উপকার পেতে পারেন।
শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রায় ৭০-৮০% নির্ভর করে অন্ত্রের ওপর। প্রতিদিন ১-২ চামচ করে খেলে ফারমেন্টেড সাজনা পাতা আপনাকে সুস্থ রাখতে এবং রোগবালাই ধারেকাছে ঘেঁষতে না দিতে সাহায্য করবে।
সাজনা পাতায় প্রচুর ভিটামিন ও মিনারেল থাকে, আর ফারমেন্টেশনের কারণে সেগুলো শরীর খুব সহজে শোষণ করতে পারে। এটি খেলে শরীর ভেতর থেকে পুষ্টি পাবে।
মন ভালো রাখার হরমোন 'সেরোটোনিন'-এর সিংহভাগ তৈরি হয় পেটে। নিয়মিত ফার্মেন্টেড ফুড খেলে স্ট্রেস কমাতে, ঘুম ভালো হতে হেল্প হবে।
ফার্মেন্টেড ফুড শরীরের ইনফ্লামেশন দূর করে। ফলে বয়স বাড়লেও সহজে হার্টের রোগ, লিভারের সমস্যা বা বাতের ব্যথার মতো ক্রনিক অসুখগুলো শরীরে বাসা বাঁধতে পারেনা।
Mission: Captain Green