08/06/2026
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম)-এর কর্মময় জীবন
ভূমিকা
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও যুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্র গঠনে যে কজন কালজয়ী মানুষ ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন, তাঁদের মধ্যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে একজন নির্ভীক বীর মুক্তিযোদ্ধা, দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক এবং আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার।
জন্ম ও কর্মজীবন
জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলী থানার বাগবাড়ী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে কর্মরত অবস্থায় তিনি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন।
মুক্তিযুদ্ধে অবদান ও স্বাধীনতার ঘোষণা
জিয়াউর রহমানের কর্মজীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ২৬শে মার্চ রাতে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন, যা দিশেহারা বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার চূড়ান্ত সাহস জুগিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি প্রথমে ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার এবং পরবর্তীতে ‘জেড ফোর্স’ (Z Force)-এর অধিনায়ক হিসেবে সম্মুখ সমরে বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন। এই অনন্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার তাঁকে ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে।
রাষ্ট্র পরিচালনা ও দূরদর্শী পদক্ষেপ
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। চরম রাজনৈতিক সংকটময় মুহূর্তে দেশভার নিয়ে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন। ১৯৭৮ সালে তিনি 'বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল' (বিএনপি) গঠন করেন।
আধুনিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনে তাঁর উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো হলো:
১৯ দফা কর্মসূচি: দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য তিনি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার এই যুগান্তকারী কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
খাল খনন ও কৃষি বিপ্লব: কৃষিক্ষেত্রে পানি সেচ ও খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে তিনি দেশব্যাপী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ঐতিহাসিক 'খাল খনন কর্মসূচি' শুরু করেন।
অর্থনৈতিক অগ্রগতি: তিনি বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করে পোশাক (গার্মেন্টস) শিল্পের ভিত্তি স্থাপন করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্স আয়ের পথ সুগম করেন।
সার্ক (SAARC) গঠন: আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি 'সার্ক' গঠনের ঐতিহাসিক উদ্যোগ নেন।
জাতীয়তাবাদ ও মহাপ্রয়াণ
জিয়াউর রহমান বাঙালি সংস্কৃতির সাথে ভূখণ্ডগত পরিচয়ের সমন্বয় ঘটিয়ে 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ'-এর ধারণা প্রবর্তন করেন। এই মহান দেশপ্রেমিক ও কর্মবীর ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউজে একদল বিপথগামী সেনাসদস্যের হাতে শাহাদাত বরণ করেন। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
উপসংহার
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম) তাঁর সততা, কঠোর পরিশ্রম ও দেশপ্রেমের কারণে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে নেওয়ার পেছনে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। তাঁর কর্মময় জীবন ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের জন্য দেশপ্রেমের এক মহান অনুপ্রেরণা।