16/08/2026
ওহির পূর্বাভাস!
২০. চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হলে নবুওয়াতপ্রাপ্তির বিভিন্ন পূর্বাভাস প্রকাশ পেতে শুরু করে।
ক. সত্য স্বপ্ন দেখতেন।
খ. লোকালয় থেকে দূরে হেরা গুহায় একাকী নির্জনবাস ভালো লাগত।
গ. চলার পথে পাথর ও গাছ নবীজিকে সালাম দিত।
ঘ. ফেরেশতাদের নূর দেখতে পেতেন।
ওহির সূচনা
২১. চল্লিশ বছর বয়সে ওহি নাযিল হলো। তিনি তখন হেরা গুহায়। জিবরাইল সূরা ক্বলামের প্রথম পাঁচটি আয়াত নিয়ে এলেন:
اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ اقْرَأْ وَ رَبُّكَ الْأَكْرَمُ الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ عَلَمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَم
'পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিণ্ড ('আলাক') থেকে। পড়ো, আর তোমার রব মহা সম্মানিত, যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না (সূরা আলাক: ১-৫)।'
২২. এরপর বেশ কিছুদিন বিরতি দিয়ে নাযিল হলো সূরা মুদ্দাসসির। আল্লাহ তাআলা বললেন:
يَأَيُّهَا الْمُدَّثِرُ ﴾ قُمْ فَأَنْذِرُ ﴿٢﴾ وَرَبَّكَ فَكَبِّرْ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ وَلَا تَمْنُنْ تَسْتَكْثِرُ ﴿٢﴾ وَلِرَبِّكَ
فَاصْبِر
'হে বস্ত্রাচ্ছাদিত ব্যক্তি! উঠুন, অতঃপর সতর্ক করুন। আর আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন। আপনার পোশাক পবিত্র রাখুন। অপবিত্রতা ও মূর্তিপূজা থেকে দূরে থাকুন। অধিক পাওয়ার আশায় অনুগ্রহ করবেন না। আর আপনার রবের সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য ধারণ করুন (সূরা মুদ্দাসসির: ১-৭)।'
এবার মানুষকে দাওয়াত দেওয়ার আদেশ দেওয়া হলো। শুরু হলো ইসলামের পথযাত্রা। সূচনা হলো সর্বশেষ সর্বশেষ নবীর মিশন।
দাওয়াহ
২৩. নবীজির জীবনে ইসলামের দাওয়াত দুই প্রকার:
ক. মক্কী যুগের দাওয়াহ।
খ. মাদানী জীবনের দাওয়াহ।
মক্কী জীবনের দাওয়াহ দুই প্রকার:
ক. প্রকাশ্য দাওয়াহ।
খ. গোপনে দাওয়াহ।
গোপন দাওয়াত
২৪. আল্লাহর হুকুম পেয়ে নবীজি গোপনে দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। প্রথমে পরিবারে দাওয়াত দিলেন। দাওয়াতে সাড়া দিলেন পরিবারের লোকজন। সহধর্মিণী খাদিজা ও কন্যারা। চাচাত ভাই আলী বিন আবি তালেব, যায়দ বিন হারেসা রা.।
২৫. এবার বাইরে। একান্ত আস্থা ও প্রিয়ভাজনদের দাওয়াত দিলেন। দাওয়াত পেয়ে সাথে সাথেই আবু বকর রা. ইসলামগ্রহণ করলেন। দাওয়াতের কথা আস্তে আস্তে জানাজানি হলো। ফকির-গরিবরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলামে দাখিল হতে শুরু করল।
২৬. নবীজির পাশাপাশি নবদীক্ষিত সাহাবিগণও দাওয়াত দিতে শুরু করলেন। নবীজি তাদেরকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে বললেন। প্রকাশ্যে কিছু করতে নিষেধ করলেন। সাহাবায়ে কেরাম গোপনে সলাত আদায় করতেন। কুরাইশ নেতাদের চোখ বাঁচিয়ে পাহাড়ে-গুহায় গিয়ে সলাত আদায় করতেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে পরবর্তী নির্দেশ আসা পর্যন্ত এভাবে দাওয়াত কার্য চলতে থাকল।
২৭. মিরাজের রাতে সলাত ফরয হওয়ার আগে, মুস্তাহাব সলাত আদায় করা হতো। সূর্যোদয়ের আগে দুই রাকাত, সূর্যাস্তের পর দুই রাকাত। দুটি আয়াতে এর বিবরণ আছে:
وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَ قَبْلَ الْغُرُوبِ
'আর সূর্যোদয়ের আগে এবং সূর্যাস্তের আগে আপনার রবের প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করুন (তাসবিহ পাঠ করুন) (সূরা ক্বাফ: ৩৯)।'
وَسَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ بِالْعَشِيِّ وَالْإِبْكَارِ
'আর সকাল-সন্ধ্যায় আপনার রবের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা
ঘোষণা করুন (সূরা গাফির: ৫৫)।'
২৮. হাফেয ইবনে হাজার রহ. বলেছেন, আল্লাহর রাসূল মিরাজের আগেও নিঃসন্দেহে সলাত আদায় করতেন। সাহাবায়ে কেরামও। কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত সলাত ফরয হওয়ার আগেও কোনো ফরয সলাত ছিল কি না, এ বিষয়ে মতভেদ আছে। কারো কারো মতে, তখন সূর্যোদয়ের পূর্বে ও সূর্যাস্তের পরে সলাত ছিল। এই আয়াতই তার প্রমাণ:
وَ سَبِّحْ بِحَمْدِ رَبِّكَ قَبْلَ طُلُوعِ الشَّمْسِ وَقَبْلَ الْغُرُوبِ ﴿۴﴾
২৯. আরকাম ইবনু আবিল আরকামের ঘরকে নবীজি গোপন দাওয়াহর কেন্দ্র বানালেন। এখানে বসেই নবীজি সা. দীনের দাওয়াত দিতেন। গোপনে আগত ব্যক্তিদেরকে শিক্ষা দিতেন। এভাবে তিন বছর চলল। বেশ কিছু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলেন।
প্রকাশ্য দাওয়াত
৩০. এবার আর গোপন নয়। সরাসরি প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ এল:
فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ
'অতএব আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করুন এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন (সূরা হিজর: ৯৪)।'
৩১. আল্লাহর রাসূল সা. কালবিলম্ব না করে সাফা পাহাড়ে আরোহণ করলেন। সবাইকে জড়ো করে ঘোষণা দিলেন, আমি বিশ্ববাসীর প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসূল।
৩২. আল্লাহর রাসূলের ঘোষণা শুনেই চাচা আবু লাহাব তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলল:
تَبَّا لَكَ سَائِرَ اليَوْمِ أَلِهَذَا جَمَعْتَنَا؟
'তোমার ধ্বংস হোক! এজন্যই আমাদের জমায়েত করেছ?'
আবু লাহাবের ঔদ্ধত্যপূর্ণ অভিশাপ বাক্যের প্রত্যুত্তরে আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন:
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ
'ধ্বংস হয়েছে আবু লাহাবের দুই হাত। সে নিজেও ধ্বংস
হয়েছে (সূরা লাহাব: ১)
কুরাইশের প্রতিক্রিয়া
৩৩. প্রকাশ্য ঘোষণার পর কুরাইশের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাল। কুরাইশের এক প্রতিনিধিদল আবু তালেবের সাথে দেখা করল। তিনি যেন ভাতিজাকে তার নতুন ধর্মের দাওয়াত দান থেকে বিরত রাখেন।
৩৪. কুরাইশের প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলো। নবীজি সা. রিসালাতের দায়িত্ব থেকে একবিন্দুও হটলেন না। চাচাও ভাতিজাকে বাধা দিলেন না। কুরাইশ এবার ভিন্ন পন্থায় অগ্রসর হলো। ওয়ালিদ বিন মুগিরাকে পাঠাল। কিছু প্রস্তাবনা দিয়ে।
ওয়ালিদের প্রস্তাবনা
৩৫. ওয়ালিদ তার কথা শেষ করল। আল্লাহর রাসূল ওয়ালিদকে কুরআন তেলাওয়াত করে শোনালেন। ওয়ালিদ আল্লাহর কালাম শুনে অভিভূত হয়ে পড়ল।
৩৬. আচ্ছন্ন অবস্থায় কুরাইশ নেতৃবৃন্দের কাছে ফিরে গেল। তাদেরকে মুহাম্মাদের অনুসরণ করার পরামর্শ দিলেন। অথবা মুহাম্মাদকে আরবদের মাঝে নিজের মতো কাজ করে যেতে দিতে বললেন। ওয়ালিদের পরামর্শ কুরাইশরা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিলো। ওয়ালিদও বিভ্রান্ত হয়ে গা বাছাতে আল্লাহর রাসূলকে 'জাদুকর' আখ্যা দিলো।
৩৭. ওয়ালিদের ধৃষ্টতার মোক্ষম জবাব দিলেন আল্লাহ তাআলা। নাযিল হলো:
ذَرْنِي وَ مَنْ خَلَقْتُ وَحِيْدًا وَ جَعَلْتُ لَهُ مَالًا مَّمْدُودًا ﴿٢﴾ وَ بَنِينَ شُهُودًا ﴿٣﴾ وَ مَهَّدْتُ لَهُ تَنْهِيدًا ﴿ ثُمَّ يَطْمَعُ أَنْ أَزِيدَ ﴿١٥﴾ كَلَّا
إِنَّهُ كَانَ لِايْتِنَا عَنِيْدًا سَأُرْهِقُهُ صَعُودًا ﴿ا﴾ إِنَّهُ فَكَرَ وَ قَدَّرَ فَقُتِلَ كَيْفَ قَدَّرَ مَ قُتِلَ كَيْفَ قَدَّرَ ﴿٢٠﴾ ثُمَّ نَظَرَ ا ثُمَّ عَبَسَ وَبَسَرَ ﴿۲۲﴾ ثُمَّ أَدْبَرَ وَ اسْتَكْبَرَ ﴿۲۳﴾ فَقَالَ إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ يُؤْثَرُ ﴿۲۴﴾ إِنْ هُذَا إِلَّا قَوْلُ الْبَشَرِ ﴿۵﴾ سَأُصْلِيْهِ سَقَرَ ﴿٢٦﴾
'আমাকে ও সেই ব্যক্তিকে ছেড়ে দিন, যাকে আমি একাকী সৃষ্টি করেছি। আর তাকে দিয়েছি বিপুল সম্পদ, এবং উপস্থিত থাকার মতো সন্তানসন্ততি আর তার জন্য সবকিছু সুপ্রতিষ্ঠিত করেছি। এরপরও সে আশা করে যে আমি তাকে আরো বেশি দিই! কখনো না! নিশ্চয়ই সে আমার আয়াতসমূহের বিরোধী ছিল। অচিরেই আমি তাকে এক কঠিন আরোহণে (কঠোর শাস্তিতে) নিক্ষেপ করব। সে চিন্তা করেছে এবং পরিকল্পনা করেছে। ধ্বংস হোক সে! কীভাবে সে পরিকল্পনা করল! আবারও ধ্বংস হোক সে! কীভাবে সে পরিকল্পনা করল! তারপর সে তাকাল। তারপর সে ভ্রু কুঁচকালো ও মুখ বিকৃত করল। তারপর সে পেছনে ফিরে গেল এবং অহংকার করল। অতঃপর বলল, 'এ তো কেবল এক জাদু, যা পূর্ব থেকে চলে আসছে। এ তো মানুষেরই কথা ছাড়া কিছু নয়।' অচিরেই আমি তাকে সাকার (জাহান্নাম)-এ নিক্ষেপ করব (সূরা মুদ্দাসসির : ১১-২৬)।'
৩৮. এই সময়কালে ইসলাম গ্রহণ করলেন, অন্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম। নবীজি সা. পরবর্তী সময়ে তাকে মুয়াযযিন নিয়োগ করেছিলেন।
প্রতিক্রিয়া ও নির্যাতন
৩৯. কুরাইশ ইসলামের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগল। তারা অত্যন্ত সুকৌশলে ইসলামের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত আক্রমণ শুরু করল। তারা সংঘবদ্ধভাবে:
ক. কুরআন সম্পর্কে নানা সন্দেহ উসকে দিতে শুরু করল।
খ. নানাভাবে সরাসরি কুরআনের বিরোধিতা করতে লাগল।
গ. নানা প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মুসলমানকে ইসলাম থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করল।
ঘ. ইসলাম ও মুসলমান নিয়ে উপহাস, ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে লাগল। ইসলামকে নানাভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে লাগল।
নির্যাতনের স্টিমরোলার
৪০. শতচেষ্টাতেও নবীজি ও মুসলমানদের নিরস্ত করতে না পেরে, নিরীহ মুসলমানদের উপর অমানুষিক অকথ্য নির্যাতন চালাতে শুরু করল। মুসলমানদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলল।
৪১. আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে চাচা আবু তালেবের মাধ্যমে সুরক্ষা দিলেন। অসহায় মুসলমানরা কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই পড়ে পড়ে মার খেতে লাগলেন। সবচেয়ে বেশি নির্মমতার শিকার হলেন খাব্বাব ইবনুল আরাত্ত রা.।
দাসমুক্তি
৪২. এহেন দুর্দিনে আবু বকর রা. নিজে চাপের মুখে থেকেও অসহায় মুসলমানদের সাহায্যার্থে সর্বস্ব নিয়ে এগিয়ে এলেন। নির্যাতিত দাস-দাসীদের অবিশ্বাস্য চড়ামূল্যে কিনে আযাদ করার মহতী উদ্যোগ নিলেন। দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হলেন, বিলাল বিন রাবাহ ও আমের বিন ফুহায়রা রা.।
নবীজিকে বিদ্রুপ
৪৩. কুরাইশরা নিত্যনতুন পন্থায় ইসলামের বিরোধিতা করতে লাগল। এই পর্যায়ে তাদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হলেন নবীজি সা.। মুশরিকরা 'আদাজল' খেয়ে নবীজির বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা শুরু করল। রাস্তাঘাটে, ঘরেবাহিরে যেখানে-সেখানে নবীজিকে সরাসরি ঠাট্টা-বিদ্রুপ বাণে জর্জরিত করতে লাগল। আসওয়াদ বিন আবদে ইয়াগুস ও আসওয়াদ বিন মুত্তালিব ছিল এ ব্যাপারে অগ্রগামী।
Tazkiyah - তাজকিয়াহ Najmus Saadh