06/01/2024
শিলজিৎ / শিলাজিৎ কি?
শিলাজিতের উপকারিতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সেবনের মাত্রা।
শিলাজিৎ হল একটি প্রাকৃতিকভাবে উপলব্ধ খনিজ পদার্থ যা পাওয়া যায় ভারতীয় উপমহাদেশের হিমালয় ও হিন্দুকুশ পর্বতমালায়। এটি একটি বিরল প্রজাতির রজন যা তৈরি হয় হাজার বছর ধরে পচন ধরা গাছ ও উদ্ভিদের উপকরণ থেকে। এই আটকে থাকা উদ্ভিদ উপকরণ বাদামী থেকে কালো রঙের চটচটে আঠার মত একটি পদার্থ হিসেবে বেরিয়ে আসে পাথরের ফাঁক থেকে। আয়ুর্বেদ, ভারতের ঐতিহ্যবাহী ওষুধ ব্যবস্থা হাজারো বছর ধরে শিলাজিৎ ব্যবহার করে চলেছে এটির স্বাস্থ্যবর্ধক বৈশিষ্টের জন্য। চরক সংহিতা ও সুশ্রুত সংহিতা, যেখানে এটি “সোনার মত ধাতব পাথর” এবং নরম ও আঠাল বস্তু হিসেবে বর্ণিত আছে। আয়ুর্বেদে শিলাজিৎকে একটি “রসায়ন”(শক্তিদায়ক ওষুধ)হিসেবে ধরা হয় এর সার্বিক স্বাস্থ্য উন্নীত করার উপকারিতা উল্লেখ করার সময়। আসলে, শিলাজিৎ নামটি অনুবাদ করলে যথাযোগ্যভাবেই তা দাঁড়ায় “পর্বতশৃঙ্গের বিজয়ী ও দুর্বলতার ধ্বংসকারী”। দুর্ভাগ্যবশতঃ, আধুনিক বিজ্ঞানের এই প্রাকৃতিক আশ্চর্যটিকে এখনও অনুসন্ধান করা বাকি।
জানতেন কি?
আয়ুর্বেদিক ডাক্তারদের মতে, শিলাজিতের গন্ধ গোমূত্রর মত বলা হয়। লোককথায় দাবি করা হয় যে যদি এটি নির্ভেজাল রূপে সেবন করা হয়, তাহলে এটি পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত উপকারী।
শিলাজিৎ সম্পর্কিত কিছু প্রাথমিক তথ্যঃ
লাতিন নামঃ অ্যাসফাল্টাম পাঞ্জাবিনিয়াম
প্রচলিত নামঃ দস্তা, খনিজ পিচ, খনিজ মোম, শিলাজিৎ
সংস্কৃত নামঃ শিলাজিৎ,শিলাজিতা
ভৌগলিক বন্টনঃ শীলাজিৎ সাধারণত অত্যন্ত সহজলভ্য হিমালয়ে যার মধ্যে হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, অরুণাচল প্রদেশ এবং কাশ্মীরে এটি বৃহত্তম পরিমাণে মজুদ রয়েছে। চীন, নেপাল, পাকিস্তান, তিব্বত, এবং আফগানিস্তানেও এটি পাওয়া যায়।শিলাজি
তের স্বাস্থ্যপকারিতা - Health benefits of shilajit in Bengali
শিলাজিতের বেশ কিছু নিরাময়কারী উপকারিতা আছে তবে এটি বিশেষতঃ পরিচিত একটি স্বাস্থ্যবর্ধক টনিক হিসেবে। ভাল স্বাস্থ্য উন্নীত করার ক্ষেত্রে শিলাজিতের কিছু ব্যবহার সম্পর্কে একটু খতিয়ে দেখা যাক।
ওজন কমানোয় সহায়তাঃ ক্লিনিকাল গবেষণা ইঙ্গিত করে যে শিলাজিতে কিছু সক্রিয় মৌল রয়েছে যা BMI বাড়িয়ে ওজন ও কোমরের পরিধি কমাতে সাহায্য করে।
কোষ্ঠকাঠিণ্য কমায়ঃ শিলাজিৎ শরীরে টনিকের মত কাজ করে যার ফলে এটি অন্ত্রের পেশীগুলিকে শক্ত করে হজমে সাহায্য করে এবং শরীর থেকে খাদ্য নিষ্কাশন করে কোষ্ঠকাঠিণ্য থেকে মুক্তি দেয়ে।
শুক্রাণুর গুন্তি বাড়ায়ঃ 1.5 মাস ধরে নিয়মিত শিলাজিৎ সেবন করলে তা বীজকোষ উদ্দীপক হরমোন বাড়িয়ে তোলে যার ফলে এটি শুক্রাণুর গুন্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে যে বিশেষ ভাবে কার্যকর তা দেখা গেছে।
পাহাড়ি অসুস্থতা থেকে মুক্তি দেয়ঃ উচ্চতার কারণে হওয়া অসুস্থতার সার্বিক সমাধান হল শিলাজিৎ। এটি যে শুধুমাত্র চাপ ও উদ্বেগ থেকেই মুক্তি দেয় তা নয়, উচ্চতার কারণে হওয়া ফুসফুসের সমস্যা হাইপক্সিয়াও কমিয়ে দেয়।
রক্তাল্পতা থেকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেয়ঃ শিলাজিৎ হল লোহার একটি ভাল উৎস, যা হিমোগ্লোবিন ও লাল রক্তকোষের গুন্তি বাড়ায়। টনিক হওয়ার কারণে এটি রক্তাল্পতাগ্রস্ত লোকজনদের মধ্যে দুর্বলতা ও ক্লান্তি কমায়।
অ্যালজাইমার’স অগ্রগতি থামায়ঃ গবেষণায় প্রমাণিত তথ্য ইঙ্গিত করে যে শিলাজিতে থাকা ফাল্ভিক অ্যাসিড মস্তিষ্কে টাউ প্রোটিনের অতিরিক্ত পুঞ্জিভূত হওয়া রোধ করে, অন্যভাবে বলতে গেলে যা স্নায়ুক্ষয় ও অ্যালজাইমার’স হওয়ার কারণ,তা আটকায়।
পাকস্থলিতে ঘা হওয়া আটকায়ঃ শিলাজিৎ গ্যাস্ট্রিক নিঃসরণ কমিয়ে পাকস্থলির আস্তরণকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে আল্সার হওয়া রোধ করে বলে শোনা যায়।
ডায়াবিটিসের জন্য শিলাজিৎ - Shilajit for diabetes in Bengali
আয়ুর্বেদে শিলাজিৎ তার ডায়াবিটিসরোধী বৈশিষ্টের জন্য পরিচিত। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও ডায়াবিটিসের লক্ষণগুলি কমাতে আয়ুর্বেদিক ডাক্তারেরা ডায়াবিটিসে আক্রান্ত রুগীদের শিলাজিৎ সেবন করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। উপরন্তু, আয়ুর্বেদিক ডাক্তারেরা শিলাজিৎ সেবন করার উপদেশ দিয়ে থাকেন বারংবার রাত্রিকালীন প্রস্বাব, যা বার্ধক্য ও ডায়াবিটিসেরলক্ষণ, তা কমাতে। ভারতে হওয়া কিছু গবেষণা ইঙ্গিত করে যে ডায়াবিটিসরোধী ওষুধের সাথে শিলাজিৎ সেবন করলে তা শুধুমাত্র প্রথাগত ওষুধের চেয়ে বেশি কার্যকর রক্তে শর্করাভাব কমাতে। যদিও, মানুষের ওপর গবেষণার অভাবের কারণে ডায়াবিটিসে আক্রান্ত রুগীদের ডাক্তারদের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া বাঞ্ছনীয় যে কোন আকারে শিলাজিৎ সেবন করার আগে।
কোলেস্টেরলের জন্য শিলাজিৎ - Shilajit for cholesterol in Bengali
আয়ুর্বেদ অনুযায়ী শিলাজিৎ কোলেস্টেরলের মাত্রা পরিচালন করতে কার্যকর। গবেষণা প্রমাণ করে যে নিয়মিত 2 গ্রাম শিলাজিৎ সেবন করলে তা বেশি ঘনত্বের চর্বি বা “ভাল কোলেস্টেরল”-এর মাত্রা বাড়ানোর সাথে সাথেই কম ঘনত্বের চর্বি বা “খারাপ কোলেস্টেরল” কমাতে সক্ষম। এও ইঙ্গিত করা হয় শিলাজিতে থাকা ফাল্ভিক অ্যাসিড এই রজনের হাইপলিপিডেমিক(রক্তে কোলেস্টেরল কমায়)। উপরন্তু, শিলাজিতে ভিটামিন সি ও ভিটামিন ই আছে যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে পরিচিত। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ধমনীতে প্লাক জমে ওঠা থেকে আটকায়, যার ফলে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।
ওজন কমাতে শিলাজিৎ -
বিশ্বজুড়ে বেড়ে ওঠা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত চিন্তার কারণের অন্যতম হল স্থুলতা। আধুনিক সংস্কৃতি এবং জীবনধারা এই সমস্যা সামাল দেওয়াকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। বস্তুতঃ WHO স্থুলতাকে “বিশ্বের মহামারী” আখ্যা দিয়েছে। গবেষণার আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশ হওয়া একটি প্রবন্ধ ইঙ্গিত করে যে শারীরিক টিস্যুগুলিতে অক্সিজেনের জোগান ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য না থাকাই স্থুলতার প্রধান কারণ। উপরন্তু এও বলা হয় যে শিলাজিৎ হল ফাল্ভিক অ্যাসিড, খনিজ বস্তু ও লোহার একটি অত্যন্ত ভাল উৎস, যা শরীরে লাল রক্তকোষের সংখ্যা বাড়ায়। সেই কারণে, যত তাড়াতাড়ি এই কোষগুলি প্রতিস্থাপন হবে, তত তাড়াতাড়ি টিস্যুগুলিতে অক্সিজেনের জোগান পৌঁছবে।
ওজন কমানোর প্রোগ্রামে শিলাজিতের একটি সম্পূরক হিসেবে প্রভাব পরীক্ষা করা হচ্ছে।