18/12/2025
ভাই, দুনিয়া নিয়ে আমাদের কত স্বপ্ন, তাই না? ব্র্যান্ডের জামা পরতে হবে, ভালো পারফিউম মাখতে হবে, লেটেস্ট গ্যাজেট লাগবে। কিন্তু সাহাবীদের ত্যাগের স্ট্যান্ডার্ডটা কোথায় ছিল একটু চিন্তা করেন।
মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-এর কথা আপনারা সবাই কমবেশি জানেন। মক্কার সবচেয়ে সুদর্শন যুবক। ধনী পরিবারের সন্তান। উনি যখন মক্কার রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেন, রাস্তার ধুলোবালি পর্যন্ত সুগন্ধে ম’ম করত। মক্কার মেয়েরা পর্দার আড়াল থেকে তাকিয়ে থাকত—ওই যে মুসআব যাচ্ছে। যেই পোশাক তিনি একবার পরতেন, সেটা দ্বিতীয়বার পরতেন না। ইয়ামেন থেকে তাঁর জন্য স্পেশাল জুতা আসত।
সেই মুসআব ইসলাম গ্রহণ করলেন। তাঁর মা তাঁকে সব সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করল। যে ছেলেটা রেশমি কাপড় ছাড়া গায়ে কিছু জড়াত না, সেই ছেলের গায়ে এখন তালি দেওয়া মোটা চট। চামড়া খসখসে হয়ে গেছে। একদিন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে দেখে কেঁদে ফেলেছিলেন। তিনি সাহাবীদের বললেন, "আমি এই ছেলেকে মক্কায় দেখেছি, তার চেয়ে সুখী এবং সুন্দর পোশাকধারী আর কেউ ছিল না। আর আজ দেখো, আল্লাহর দ্বীনের জন্য তার কী অবস্থা!"
উহুদের যুদ্ধের দিন। মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) ইসলামের পতাকাবাহী। তিনি শহীদ হলেন। যুদ্ধ শেষ। সাহাবীরা লাশ খুঁজছেন। মুসআবকে পাওয়া গেল।
ভাই, দৃশ্যটা কল্পনা করেন। মক্কার সেই সবচেয়ে ধনী যুবকটি মাটিতে পড়ে আছেন। সাহাবীরা তাকে দাফন করবেন, কিন্তু সমস্যা হলো—তার কাফন দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত কাপড় নেই। তার পরনে একটা ছোট চাদর। সাহাবীরা যখন চাদরটা দিয়ে তার মাথা ঢাকেন, তখন তার পা বেরিয়ে যায়। আবার যখন পা ঢাকেন, তখন মাথা বেরিয়ে যায়।
তারা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গেলেন। ইয়া রাসূলুল্লাহ! কী করব? নবীজি (সা.) ছলছল চোখে বললেন, "তোমরা তার মাথাটা ঢেকে দাও, আর পায়ের ওপর 'ইজখির' ঘাস (লতাপাতা) দিয়ে দাও।"
সুবহানাল্লাহ! চিন্তা করতে পারেন? যেই ছেলের জন্য ইয়েমেন থেকে পোশাক আসত, মৃত্যুর পর তার নিজের একটা পূর্ণাঙ্গ কাফন জুটল না! ঘাস দিয়ে পা ঢাকতে হলো। অথচ তিনি জান্নাতের মেহমান হয়ে গেছেন।
এর অনেক বছর পরের ঘটনা। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)। আশারায়ে মুবাশশারার একজন। অনেক ধনী সাহাবী ছিলেন পরবর্তী জীবনে। একদিন তিনি রোজা রেখেছেন। ইফতারের সময় হয়েছে। তাঁর সামনে ভালো ভালো খাবার আনা হয়েছে—গোশত, রুটি।
খাবার দেখে হঠাৎ আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর কান্না শুরু হলো। তিনি খাবার হাত দিয়ে ঠেলে দিলেন। তিনি কাঁদছেন আর বলছেন,
"মুসআব ইবনে উমাইর শহীদ হয়েছেন। তিনি আমার চেয়ে উত্তম ছিলেন। অথচ দাফনের সময় তার একটা কাফনও জোটেনি। হামজা (রা.) শহীদ হয়েছেন, তিনি আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন, তারও কাফন জোটেনি। আর আজ! আজ আমাদের জন্য দুনিয়ার সব দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। আমার ভয় হচ্ছে, আল্লাহ কি আমাদের সব প্রতিদান দুনিয়াতেই দিয়ে দিচ্ছেন? আখেরাতে আমাদের জন্য কিছু বাকি থাকবে তো?"
তিনি আর খেতে পারলেন না। খাবার সামনে পড়ে রইল, তিনি কাঁদতে কাঁদতে উঠে গেলেন।
ভাই, এটাই ছিল সাহাবীদের সাইকোলজি। তারা দুনিয়া পেলেও কাঁদতেন, না পেলেও সবর করতেন। আর আমরা? আমরা একটু কিছু পেলেই খুশিতে বাকবাকুম হয়ে যাই, আর একটু কিছু হারালে আল্লাহকে দোষারোপ করি। আব্দুর রহমান ইবনে আউফ জান্নাতি সাহাবী হওয়ার পরেও ভয় পাচ্ছেন যে, দুনিয়ার এই বিরিয়ানি-কোরমা খেয়ে ফেললে আখেরাতের মেন্যু থেকে কিছু কমে যাবে কিনা। আর আমাদের কোনো খবরই নেই।
আমরা আসলে ভাই কিছুই করতে পারি নাই। সাহাবীদের সেই ত্যাগের গল্পের সামনে আমাদের এই 'ইসলাম পালন' খুব নগণ্য। আল্লাহ আমাদের সেই বুঝ দান করুন।
রেফারেন্স (Authentic Sources):
১. মুসআব (রা.)-এর কাফন ও ঘাস দিয়ে পা ঢাকার ঘটনা:
গ্রন্থ: সহীহ বুখারী।
অধ্যায়: কিতাবুল জানাযা (জানাজা অধ্যায়)।
হাদিস নম্বর: ১২৭৬, ১৩৫৩ (খাব্বাব ইবনুল আরাত রা. থেকে বর্ণিত)।
২. আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর খাবার দেখে কান্নার ঘটনা:
গ্রন্থ: সহীহ বুখারী।
অধ্যায়: কিতাবুল মাগাযী (যুদ্ধ অভিযান অধ্যায়)।
হাদিস নম্বর: ৪০৪৫ (ইব্রাহীম ইবনে আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত)।
৩. মুসআবের পূর্বের অবস্থা দেখে রাসূল (সা.)-এর কান্না:
গ্রন্থ: জামে আত-তিরমিজি।
হাদিস নম্বর: ২৪৭৪।