15/03/2024
আম ম্যাঙ্গিফেরা গণের বিভিন্ন প্রজাতির গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উদ্ভিদে জন্মানো এক ধরনের সুস্বাদু ফল। কাঁচা অবস্থায় আমের রং সবুজ এবং পাকা অবস্থায় হলুদ হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে খাওয়ার জন্যই এই ফল চাষ করা হয়। এই প্রজাতিগুলোর বেশিরভাগই বুনো আম হিসেবে প্রকৃতিতে পাওয়া যায়। গণটি অ্যানাকার্ডিয়াসি (Anacardiaceae) পরিবারের সদস্য। আম ভারতীয় উপমহাদেশীয় ফল। এর আদি নিবাস দক্ষিণ এশিয়া। সেখান থেকেই গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের একটি সাধারণ ফল হয়ে "সাধারণ আম" বা "ভারতীয় আম", যার বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা (Mangifera indica), অন্যতম সর্বাধিক আবাদকৃত ফল হিসেবে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। ম্যাঙ্গিফেরা গণের অন্যান্য প্রজাতিগুলো (যেমন: হর্স ম্যাঙ্গো, ম্যাঙ্গিফেরা ফ্লোটিডা) স্থানীয়ভাবে আবাদ করা হয়।ধারণা করা হয়, আম প্রায় সাড়ে ৬০০ বছরের পুরনো।
আম ফল সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় এত পছন্দনীয় ফল পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। এমন কোন জাতি নেই যারা আম পছন্দ করেনা। তাই একে সন্মান দিয়ে ʼফলের রাজাʼ বলা হয়।
আমের জন্মস্থান নিয়ে রয়েছে নানা তর্ক-বিতর্ক। বৈজ্ঞানিক ‘ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা’ নামের এ ফল ভারতীয় অঞ্চলের কোথায় প্রথম দেখা গেছে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও আমাদের এ জনপদেই যে আমের আদিবাস— এ সম্পর্কে আম বিজ্ঞানীরা একমত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭-এ আলেকজান্ডার সিন্ধু উপত্যকায় আম দেখে ও খেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এ সময়ই আম ছড়িয়ে পড়ে মালয় উপদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জ ও মাদাগাস্কারে।
চীন পর্যটক হিউয়েন সাং ৬৩২ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এ অঞ্চলে ভ্রমণে এসে বাংলাদেশের আমকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করেন। ১৩৩১ খ্রিস্টাব্দ থেকে আফ্রিকায় আম চাষ শুরু হয়। এরপর ১৬ শতাব্দীতে পারস্য উপসাগরে, ১৬৯০ সালে ইংল্যান্ডের কাচের ঘরে, ১৭ শতাব্দীতে ইয়েমেনে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে, ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে আম চাষের খবর জানা যায়। ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মাটিতে প্রথম আমের আঁটি থেকে গাছ হয়। এভাবেই আম ফলটি বিশ্ববাসীর দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়।
জানা যায়, মোগল সম্রাট আকবর ভারতের শাহবাগের দাঁড়ভাঙায় এক লাখ আমের চারা রোপণ করে উপমহাদেশে প্রথম একটি উন্নত জাতের আম বাগান সৃষ্টি করেন। আমের আছে বাহারি নাম বর্ণ, গন্ধ ও স্বাদ। গোলাপখাস,ফজলি, আশ্বিনা, ল্যাংড়া, ক্ষীরশাপাতি, গোপালভোগ, কল্পনা,মোহনভোগ জিলাপিভোগ, লক্ষণভোগ, মিছরিভোগ, বোম্বাই ,চৌসা,ক্ষীরভোগ, বৃন্দাবনী, চন্দনী, হাজিডাঙ্গ, সিঁদুরা, গিরিয়াধারী, বউভুলানী, জামাইপছন্দ, বাদশভোগ, রানীভোগ, দুধসর, মিছরিকান্ত, বাতাসা, মধুচুসকি, রাজভোগ, মেহেরসাগর, কালীভোগ, সুন্দরী, আম্রপালি, পানবোঁটা, দেলসাদ, কালপাহাড়সহ চাঁপাইনবাবগঞ্জে পাওয়া যায় প্রায় ৩০০ জাতের আম। তবে অনেকগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায়।
পৃথিবীতে প্রায় ৩৫ প্রজাতির আম আছে। আমের প্রায় কয়েকশ জাত রয়েছে। যেমন: ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, খিরসাপাত, অরুনা, আম্রপালি, মল্লিকা, সুবর্নরেখা, মিশ্রিদানা, নিলাম্বরী, কালীভোগ, কাঁচামিঠা, আলফানসো, বারোমাসি, তোতাপুরী, কারাবাউ, কেঊই সাউই, গোপাল খাস, কেন্ট, সূর্যপূরী, পাহুতান, ত্রিফলা, হাড়িভাঙ্গা, ছাতাপরা, গুঠলি, লখনা, আদাইরা, কলাবতী আম রূপালি ইত্যাদি। আমের ফলের আকার, আকৃতি, মিষ্টতা, ত্বকের রঙ এবং ভেতরের ফলের বর্ণ (যা ফ্যাকাশে হলুদ, সোনালি বা কমলা হতে পারে) জাতভেদে পরিবর্তিত হয়। ভারতের মালদহ , মুর্শিদাবাদ-এ প্রচুর পরিমাণে আম চাষ হয়ে থাকে। আম ভারত ,হাইতি, ফিলিপাইন ও পাকিস্তানের জাতীয় ফল, এবং বাংলাদেশের জাতীয় গাছ। বাংলাদেশের রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, নাটোর, সাতক্ষীরা, যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম চাষ বেশি পরিমাণে হয়ে থাকে।
রান্নায় ব্যবহারঃ
আম রান্নায় বহুল ব্যবহৃত একটি ফল। টক, কাঁচা আমের ভর্তা, চাটনি ও আচার বানানো হয়।[২৫] ডাল এবং বাঙালি রন্ধনশৈলীতে অন্যান্য খাবারে ব্যবহার করা হয়, অথবা লবণ, মরিচ বা সয়া সসের সাথে কাঁচা খাওয়া যেতে পারে। আমের পানা নামে গ্রীষ্মকালীন এক ধরনের পানীয় আম থেকেই তৈরি হয়। আমের পাল্প থেকে জেলি তৈরি করে বা লাল রঙা ডাল এবং কাঁচা মরিচ দিয়ে রান্না করে ভাতের সাথে পরিবেশন করা হয়। আমের লাচ্ছি দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে বেশ জনপ্রিয়,[২৬] যা পাকা আম বা আমের পাল্পের সাথে মাখন/দুধ ও চিনির সাথে মিশ্রিত করে তৈরি করা হয়। পাকা আম তরকারিতেও ব্যবহৃত হয়।আমরস চিনি বা দুধের সাথে আম দিয়ে তৈরি একটি জনপ্রিয় পানীয়, যা চাপাতি বা পুরির সাথে খাওয়া হয়। পাকা আম থেকে নেওয়া পাল্পম্যাঙ্গাদা নামক মোরব্বা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। "অন্ধ্র আভাকায়া" কাঁচা, পাল্পসমৃদ্ধ এবং টক আমের সাথে মরিচের গুঁড়ো, মেথি বীজ, সরিষার গুঁড়ো, লবণ এবং চিনাবাদাম তেলের সাথে মিশিয়ে তৈরি এক ধরনের আচার। ডাল প্রস্তুতিতেও আম অন্ধ্র প্রদেশে ব্যবহৃত হয়। গুজরাটিরা চান্ডা (মসলাযুক্ত, মিষ্টি আমের তৈরি খাবার) বানাতে আম ব্যবহার করে।
আম মোরব্বা (ফল সংরক্ষণ পদ্ধতি), মুরাম্বা (মিষ্টি, পাকা আমের তৈরি খাবার), আমচুর (শুকনো এবং চূর্ণ কাঁচা আম), এবং আচার (একটি মসলাযুক্ত সরিষা তেল ও এলকোহল মিশ্রিত খাবার) তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়। পাকা আমগুলো প্রায়শই পাতলা করে কেটে খোসা বাদ দেওয়া হয় এবং তারপর কাটা হয়। পাপ্ত বারগুলো কিছু দেশে প্রাপ্ত শুকনো পেয়ারার বারের মতো। ফলটি খাদ্যশস্য পণ্যগুলোতে (যেমন মুসেলি এবং ওট গ্রানোলাতে) মেশানো হয়। প্রায়শই হাওয়াইয়ে আমকাঠ প্রস্তুত করা হয়।
কাঁচা আম ব্যাগুং (বিশেষত ফিলিপাইনে), মাছের সস, ভিনেগার, সয়া সস, বা লবণ (কেবল লবণ বা মসলা মিশিয়ে) দিয়ে খাওয়া যেতে পারে। মিষ্টি, পাকা আমের টুকরাগুলো শুকনো করে (কখনও কখনও বীজহীন তেঁতুলের সাথে মিলিয়ে ম্যাঙ্গোরাইন্ড তৈরি করে) খাওয়াও জনপ্রিয়। আম দিয়ে আমের রস, আমের মধু বানানো যায় এবং আইসক্রিম এবং শরবতের প্রধান ও স্বাদ সৃষ্টির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
আমকে এছাড়াও রস, স্মুথি, আইসক্রিম, ফলের বার, র্যাসপাডোস (raspados), অ্যাগুয়াস ফ্রেস্কাস (Aguas frescas), পাই (pies), এবং মিষ্টি চিলি সস, অথবা চ্যাময় (Chamoy) এর সঙ্গে মিশিয়ে মিষ্টি ও মসলাযুক্ত চিলি পেস্ট তৈরিতে করতে ব্যবহার করা হয়। এটি ঝাল মরিচের গুঁড়ো এবং লবণ মেশানো কাঠি বা তাজা ফলের সংমিশ্রনের একটি প্রধান উপাদান হিসেবে জনপ্রিয়। মধ্য আমেরিকায় কাঁচা আমকে হয় নুন, ভিনেগার, গোল মরিচ এবং ঝাল সসের সাথে মিশ্রিত খাওয়া হয় অথবা পাকার পর বিভিন্নভাবে খাওয়া হয়।
আমের টুকরার ভর্তা করা হয়, আবার একটি আইসক্রিম উপর চূড়া হিসেবে ব্যবহার করা হয় কিংবা দুধ এবং যেমন বরফ সঙ্গে মিশ্রিত করে মিল্কশেক প্রস্তুত করা হয়। মিষ্টি আঠালো ভাতে নারকেল দিয়ে স্বাদ বাড়ানো হয়, তার পরে ডেজার্ট হিসেবে পাকা আম পরিবেশন করা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে আমের ফিশ সস এবং রাইস ভিনেগার সহকারে আচার বানানো হয়। আমের সালাদে ফিস সস এবং শুকনো চিংড়ি সহযোগে কাঁচা আম ব্যবহার করা যেতে পারে। কনডেন্সড মিল্ক সহ আমকে চাঁচা বরফের চূড়া হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
ইতিহাসঃ
জেনেটিক বিশ্লেষণ এবং মেঘালয়ের দামালগিরির কাছে পাওয়া প্যালিওসিন যুগের আম গাছের পাতার জীবাশ্মের সঙ্গে আধুনিক আম তুলনা করে জানা যায় আম গণের উৎপত্তি ছিল ভারতীয় এবং এশীয় মহাদেশীয় প্লেটের সংযোগস্থলে, ভারতীয় উপমহাদেশে, প্রায় ৬০ মিলিয়ন বছর আগে। সম্ভবত ২০০০ খ্রিস্টপূর্বের প্রথম দিকে ভারতে আম চাষ করা হত। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০-৫০০ অবধি আমকে পূর্ব এশিয়ায় আনা হয়েছিল, ১৪ ই শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে সোয়াহিলি উপকূলে আম পাওয়া যেত, এবং ১৫ শতকে ফিলিপাইনে এবং ১৬শ শতাব্দীতে পর্তুগিজ পরিব্রাজকরা ব্রাজিলে আম নিয়ে এসেছিলেন।
মালাবার অঞ্চলের ডাচ কমান্ডার হেন্ডরিক ভ্যান রিডি তাঁর ১৬৭৮ সালের হর্টাস মালাবারিকাসে গ্রন্থে অর্থনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন উদ্ভিদ হিসেবে আমের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। যখন ১৭শ শতাব্দীতে আমেরিকান উপনিবেশগুলোতে প্রথম আম আমদানি করা হয়েছিল, তখন সংরক্ষণের অভাবে এগুলোর আচার বানাতে হয়েছিল। অন্যান্য ফলগুলোরও আচার বানানো হয়েছিল এবং সেগুলো "আম" এর নামেই পরিচিত ছিল, বিশেষত বেল মরিচ এবং ১৮শ শতাব্দীতে, "ম্যাংগো" শব্দটি ক্রিয়াপদে পরিণত হয়েছিল যার অর্থ ছিল "আচার বানানো"।
আম একটি বিবেচনা করা হয় বিবর্তনীয় কালবৈষম্য হিসেবে (একযুগের বস্তু, ব্যক্তি, ঘটনা ইত্যাদিকে ভুল করে অন্য যুগের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলা), যেখানে বিলুপ্ত বিবর্তনীয় জীবের মাধ্যমে বীজ ছড়িয়ে পড়ে- যেমনভাবে হয়েছিল প্রাণীজগতের স্তন্যপায়ীরা।