05/09/2025
বাংলার এক ছোট্ট গ্রামে রফিকের শৈশব ছিল কুয়াশা ঢাকা শীতের সকাল আর মাটির উঠোনে শুকাতে দেওয়া মাছের গল্প। টাকি, শোল, বোয়াল—জীবন্ত প্রাণগুলো যেন মায়ের হাতের জাদুতে অমৃত হয়ে উঠত। রফিকের মা প্রতিদিন ভোরের নরম আলো ফোটার আগেই ঘুম থেকে উঠতেন। ঠাণ্ডা জলের স্পর্শে সজাগ হয়ে উঠত তাঁর হাত, যা নিখুঁত দক্ষতায় মাছ কাটত, ধুত, আর তাতে মাখিয়ে দিত যত্নের লবণ। এরপর উঠোনের মাদুর বা চাটাইয়ে বিছিয়ে দিতেন সারি সারি মাছ, যেন রোদের উষ্ণতায় তারা নতুন জীবন পাবে। ছোট্ট রফিক মায়ের পাশেই বসে থাকত, নিষ্পাপ চোখে দেখত এই দৈনন্দিন যাদু। মায়ের হাতের ছোঁয়ায় সাধারণ মাছ কীভাবে অসাধারণ হয়ে উঠত, সেই মুগ্ধতা তার ছোট্ট মনে গভীর ছাপ ফেলত। আর মনে মনে একরাশ স্বপ্ন বুনত – “আইজকা না জানি মায় কোন শুঁটকি রানবো!” সেই ঘ্রাণ, সেই দৃশ্য তার স্মৃতির গভীরে এক অমলিন ছবি হয়ে অঙ্কিত হচ্ছিল।
বছর গড়িয়ে গেছে। রফিক এখন শহরের বুকে এক সফল মানুষ, বড় অফিসের ব্যস্ত কর্মকর্তা। আধুনিকতার চাকচিক্য তাকে ঘিরে রেখেছে, কিন্তু মায়ের হাতের শুঁটকির ঘ্রাণ, উনুনের পাশে বসে ভাত খাওয়ার সেই দিনগুলো, তার সত্তার গভীরে আজও অমলিন। সেই শুঁটকি ভর্তা কি কেবলই খাবার ছিল? না, তা ছিল মমতা আর ভালোবাসার এক অমূল্য উপহার, যা মায়ের অদৃশ্য হাতের ছোঁয়ায় জাদুর মতো রূপ নিত।
আজ মা আর নেই। গ্রামের বাড়িতে গেলে উঠোনটা আজও শুঁটকির মায়াবী ঘ্রাণে ভরে থাকে। সেই চিরচেনা গন্ধ যখন নাকে আসে, রফিকের বুকটা হঠাৎ কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। মনে হয়, সময় যেন থমকে গেছে। মা বুঝি ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন, স্মিত হেসে বলছেন—
“খা বাবা, তোর পছন্দের টাকি শুঁটকি ভর্তা বানাইছি। গরম ভাত দিয়ে মেখে খা, দেখবি সব দুঃখ ভুলি যাবি।”
শুঁটকির স্বাদে মিশে আছে শুধু মাছের ঘ্রাণ নয়, আছে শৈশবের সোনালী স্মৃতি, মায়ের অনাবিল মমতা আর আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য গল্প। প্রতিটি কণার সাথে যেন মিশে আছে এক হারানো অধ্যায়, এক অব্যক্ত ভালোবাসা।