18/05/2026
বাসে উঠার পর থেকে ঘামের গন্ধ। ইচ্ছে হলো একবার বলি এই যুবকটে সরে যেতে। কিন্তু সেটাতো বলা যায় না। বলাটা ভারি অন্যায়। সে তার সিটে বসেছে। আমি আমার সিটে। আর তাছাড়া আমি জমিদার নই যে, কাউকে বলব অন্য সিটে যান।
ভাবলাম নিজেই উঠে যাই। কিন্তু যুবকটার চোখের দিকে তাকিয়ে আর পারলাম না। খুব ক্লান্ত দু' চোখ। সে চোখে রাজ্যের চিন্তা। সে নিজেই কষ্ট পাচ্ছে যেন। তার ফোন এলো। ফোনটা কানে ধরেই বলল, আম্মা পরীক্ষা হইছে কোনোরকম। দোয়া কইরো একটু। পরীক্ষা দিতে আইসা অনেক খরচ হইছে গো। সারারাত ঘুমাইতে পারিনি। সুমনের মেসেও জায়গা নাই।
ও প্রান্ত থেকে তার মা সম্ভবত বললেন, সে খেয়েছে কিনা। যুবকটা বলল, খাইছি। চিন্তা নিও না। আর খড়গুলান পারলে একটু রোদে দিও। আমি এসে বেচতে যাব।
ফোন কেটে গেল। যুবকটা ব্যাগ থেকে প্রশ্নপত্র বের করে সম্ভবত তার কোনো বন্ধুকে ফোন দিল।
তোর কয়টা উত্তর কারেক্ট হইছে রে?
জানিস আমারতো চারটা মনে ভুল হয়ে গেছে! টিকতে পারবো কিনা! তোরাতো ভাই শহরে থেকে কোচিং করছিস। আমারতো ওই সুযোগ নাই। তবে আমি আশাবাদি। এইবার কিছু একটা হবেই দেখিস। বারবার ঢাকায় এসে পরীক্ষা দেয়া সম্ভব না আমার জন্য ৷ আচ্ছা দোয়া করিস দোস্ত আমার জন্য।
অন্যের ফোনে আড়িপাতা অন্যায়। তবুও কখনো কখনো এই অন্যায়টা আমি করি।
খেয়াল করলাম যুবকটার শরীরের গন্ধ আর আমার লাগছে না। সেতো পরিশ্রমী যুবক। আর আমরাতো এসি/ফ্যানের নিচে বসা মানুষ। আমাদের শরীরে কী আর এত ঘাম হয়! আমরা বাবার টাকায় পড়াশোনা করেছি। ইচ্ছেমতোন খরচ করেছি। জীবন কীভাবে গড়তে হয়, অভাব আর ইচ্ছার সাথে কীভাবে ব্যালেন্স করতে হয় এই যুবকরা ভালো জানে আমাদের চেয়ে। যুবকের পায়ে দুই ফিতার স্যান্ডেল। হয়তো কিনেছে মফস্বলের কোনো দোকান থেকে। বড়ই বেমানান এই বয়সে এমন স্যান্ডেল। শার্টের কলারের সুতা ফেঁসে গেছে ।
এক ফাঁকে আরও একটা কল এলো তার। সম্ভবত তার ছোট বোন কিছু একটা আবদার করলো। সে আচ্ছা আনবো- বলে ফোন রেখে তার আরেক বন্ধুকে কল দিল। দোস্ত শ তিনেক টাকা পাঠাতে পারবি জলদি। আমি পরে হাতে টাকা হলে দিয়ে দেব।
কথাগুলো বেশ ধীরে বলল। যেন কেউ না শোনে।
আরে আর বলিস না। জেরিন(ছোট বোন) ওর জন্য একটা জুতা নিতে বলছে। না নিয়ে গেলে কেমন হয়।
দোস্ত একটা কাজ কর না। তোরতো শমশের ভাই এর সাথে ভালো খাতির। ভাইকে বল না আমাকে দুই তিন কাঠা জমি ওই যে বিলের পশ্চিমদিকটা, আমাকে বর্গা দিতে। আমি চাষ করবো। অর্ধেক অর্ধেক দেব অসুবিধা নাই। একটু বল না আমার জন্য ৷ জমি চাষ না করলে এই বছর চলবোনে কেমন করে৷ সবইতো বুঝিস। যদিও আমাকে কথা দিছে দেবেন।
বাস গাবতলি এলো। যুবকটা নামবে। কিন্তু আমার ইচ্ছে করছে তার পাশে আরেকটু বসি। আরেকটু জানি জীবন কত সংগ্রামের হয়! যুবক বুঝাই যায় অনেক কষ্টে এতদূর পড়াশোনা করেছে। সে তার পরিবারের হাল ধরেছে পাশাপাশি।
এদিকে আমাদের দেশের চাকরির পরীক্ষাগুলো প্রায়ই ঢাকায় হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসে পরীক্ষা দিতে৷ এই পরীক্ষাগুলো নিজ নিজ জেলায় হলে ছেলেমেয়েদের অন্তত গরীব যারা তাদেরতো পেরেশানিটা কম হতো। খরচ কমতো। কী জানি এসব কি আমরা বুঝি!
যাইহোক, যুবকটাকে বললাম, ভাই পরীক্ষা কেমন হলো? জীবনটা খুব কঠিন না? যুবকটা খুব আস্তে কিন্তু আত্নবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিলো। কষ্ট না করলে ভালো কিছু পাব কী করে। জীবনটাই পরীক্ষার। ইনশাআল্লাহ ভালো কিছু হবে। ভালোই হয়েছে পরীক্ষা।
কেউ কাউকে চিনি না তবুও সে বলল, দোয়া রাইখেন ভাইয়া।
অবশ্যই। কারণ এই যুবকেরা খাঁটি মানুষ হবে একদিন। এরা জানে কিভাবে জীবনকে শত বিপদে আপদে রোদ বৃষ্টিতে পুড়ে-ভিজে শক্ত করে সোজা করে রাখতে হয়। খুব পারবে এরা।